Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

মনের মণিকোঠায় -- ৩০ ( অয়ন ও শক্তিদাদুর কথা)



             মনের মণিকোঠায়                  



                                                      
                        


                      অর্ঘ্য ঘোষ


( এই কলমে এমনই কিছু হারিয়ে যাওয়া মানুষের কথা ধারাবাহিক ভাবে তুলে ধরা হবে যারা নিতান্তই প্রান্তজীবি। বৃহত্তর সমাজে তাদের স্থান নেই বলেলেই চলে। তাদের জন্ম মৃত্যু এমনকি আসল নামও আজ সংগ্রহ করা কঠিন।তাদের পরিবারের লোকেরাও সে তথ্য ঠিকঠাক দিতে পারেন নি।প্রচলিত নামেই তারা আজও এলাকার কারও কারও মনে ধুসর স্মৃতি হয়ে রয়েছেন। স্মৃতির চাদর সরালেই অবয়বটা স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। আমার ছোটবেলায় দেখা মনের মণিকোঠায় ঠাঁই করে নেওয়া ওইসব চরিত্রের সঙ্গে আপনিও মিল খুঁজে পেতে পারেন আপনার দেখা কোন মানুষের মধ্যে )





                       অয়নের কথা 


                                                                            



                    ( ৫৯ )




অয়নের ভাল নাম ছিল সায়ন্তন ঘোষ। ময়ূরেশ্বরের ষাটপলশা লাগোয়া বড়ডিবুর গ্রামে ছিল তার বাড়ি। সে ছিল আমার প্রিয় কবিকাকু এবং কৃষ্ণা পিসির একমাত্র সন্তান। সেই সুবাদে আমার সম্পর্কিত ভাই। সম্পর্কিত ভাই হলেও সরাসরি সে আমাকে কোনদিনই ' অর্ঘ্যদা' বলে সম্বোধন করে নি। বরং আমার খুড়তুতো-পিসতুতো ভাইদের মতোই বড়দা বলে ডাকত। স্বভাবতই বলার অপেক্ষা রাখে না তার সঙ্গে নৈকট্য আপনজনের থেকেও কিছু কম ছিল না। আমিও তাকে নিজের ভাইয়ের মতোই মনে করতাম।সেই জন্যই হয়তো কত বকাবকি করতে পেরেছি তাকে।সে সব আজও মনে পড়ে।



                                                ষাটপলশা এলাকায় কোন সংবাদ পরিস্থিতি তৈরি হলে সেই খবর যদি আমি ' মিস ' করতাম তাহলে প্রথম ফোনটা করে আমি ঝাড়তাম অয়নকে।বলতাম , খুব তো দাদা দাদা করিস , নিজেদের কোন খবর করার হলে ফোন করতে ভুল  হয় না।আর তোর গ্রামের পাশেই অত বড়ো একটা খবর হয়ে বসে আছে , একবার জানানোরও প্রয়োজন মনে করলি না ? বলা বাহুল্য ওই ঝাঁড় খাওয়ার পরই অয়ন খুব বিব্রত হয়ে পড়ত। দৌঁড়ঝাঁপ করে সংবাদটা সংগ্রহের ব্যবস্থা করে দিত। তারপর বলত , প্লিজ বড়দা ভুল হয়ে গিয়েছিল কিছু মনে কোর না। ভাবখানা এমন যেন সে আমার বেতনভূক কর্মী , খবরের কথা জানানোর জন্য যেন তার দাসখত লেখা আছে। ভালোবাসা না থাকলে ওই ভাবে তাকে বকতে পারতাম? ঘুরিয়ে তো ও আমাকেই অপমান করে দিতে পারত।কিন্তু ওর কাছে যা সম্মান পেয়েছি তা কোনদিন ভুলব না। অনেক সময় শুনেছি , ও নাকি গর্ব করে বলেছে জানো আমার বড়দা আনন্দবাজারের সাংবাদিক।                                 



                                                    অথচ কোনদিন আমার পরিচিতি ভাঙ্গায় নি। অথচ ওর পেশাগত কারণে সেটারই সম্ভাবনা ছিল প্রবল। ষাটপলশা রাঙামাটি পল্লী উন্নয়ণ সমিতি নামে একটা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিল অয়ন। আর ছিল বইয়ের ব্যবসা। ষাটপলশা হাটে ছিল তার বইয়ের দোকান। খবর সংগ্রহে ও দিকে গেলেই একবার করে বসতে হোত ওর দোকানে। চা খেতে খেতে নানা রকম গল্প হত।মনে আছে , একবার অয়ন আমাকে বলেছিল , বড়দা তোমার তো অনেকের সঙ্গে চেনাশোনা , দু-চারজন মাস্টার মশাইকে বলে ওদের স্কুলের বুকলিষ্টে আমার পাবলিসার্শের দু-একটা বই ঢুকিয়ে দাও না। তাহলে আমি কিছু কমিশন পাব। শুনে আমি বলেছিলাম , দেখ ওইসব বই লিষ্টে ঢুকিয়ে কিছু শিক্ষক কিম্বা স্কুল নিজেরা টাকা নেয়। সেক্ষেত্রে আমি বললে অনুরোধে ঢেঁকি গিলবে। তারপর আমার সম্পর্কে খারাপ ধারণা পোষণ করবে। আবার কেউ কেউ সরাসরি নাকচ করে দেবে। সে ক্ষেত্রে আমি খুব ছোট হয়ে যাব। তুই কি চাস আমি তাদের চোখে ছোট হয়ে যায় ? তার চেয়ে দুটো বইয়ে কত কমিশন পাবি বল , সেটা বরং আমি দিয়ে দিচ্ছি।




                                         বলা বাহুল্য তারপর থেকে অয়ন আমাকে আর ওই অনুরোধ করে নি।তাবলে আমাদের কোন দুরত্ব তৈরি হয় নি। বরং নৈকট্য আরও বেড়েছে। নিজেই বিষয়টি উপলব্ধি করে বলেছে , বড়দা তোমার জায়গায় তুমিই ঠিক আছ। আমিই অন্যায় আবদার করেছিলাম।অয়নের মধ্যে একটা দরদী মন ছিল। কোন ছেলে - মেয়ে ভালো রেজাল্ট করে ভর্তি হতে পারছে না , কেউ চিকিৎসা করাতে পারছে না জানার পরই অয়ন আমাকে ফোন করে বলেছে , বড়দা ছোট করে একটা খবর করে দাও না , তাহলেই ব্যবস্থা হয়ে যাবে। তার অনুরোধে এই রকম অনেক খবর আমাকে করতে হয়েছে। আর ওইসব ক্ষেত্রে সমস্যার সমাধান হলেই অয়ন ফোন করে বলেছে , বড়দা দারুন একটা কাজ হলো। 



                                                              অয়নকে আমি বই করে দিয়ে সাহার্য্য করতে পারি নি , কিন্তু অয়ন আমাকে অনেক সাহার্য্য করেছে। পেশাগত কারণে অনেকেই আমাদের কাছে আসেন তাদের অভাব অভিযোগ , দাবি-দাওয়া নিয়ে। কেউ আসেন রক্তের কার্ডের জন্য , কেউ আসেন প্রশাসনের ভুল রিপোর্টের জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়া বার্ধক্য ভাতা চালুর দাবি নিয়ে , আবার আইনের ম্যারপ্যাঁচে ভাতা থেকে বঞ্চিত সহায় সম্বলহীন বহু বিধবাও আসেন করুণ আর্তি নিয়ে। সব ক্ষেত্রে সংবাদ করেও কোন লাভ হয় না।এমনই বহু ক্ষেত্রে ফোন করেছি অয়ন কিম্বা রাঙামাটি পল্লী উন্নয়ন সমিতির কর্ণধার হলধর মণ্ডলকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই রক্তের কার্ড পৌঁচ্ছে গিয়েছে বাড়িতে। আর রাঙামাটি  পল্লী  উন্নয়ণ সমিতি আমার সম্মান রক্ষা করতে বেশ কিছু বিধবাকে বছরের পর বছর মাসে সরকারি ভাতার হারে টাকা পৌঁচ্ছে দিয়েছে বাড়িতে । ভালোবাসার এই ঋণ আমি শোধ করব কেমন করে ? 



                                        কারণ সেই সুযোগ না দিয়েই অয়ন ২০১৭ সালের ১ লা জুলাই আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছে। খবরটা আমায় প্রথম দিয়েছিল হলধর। কিছুতেই মানতে পারছিলাম না। ছুটে গিয়েছিলাম ওদের বাড়ি।খাটে তখন সাধকের মতো শুয়ে আছে অয়ন।গালে হালকা দাড়ি , মুখে সেই অমলিন হাসি।পায়ের কাছে বসে কেঁদেই চলেছে একমাত্র মেয়ে আর স্ত্রী। কৃষ্ণা পিসি আত্মীয় বাড়িতে ছিলেন। তাকে খবর দেওয়া হয়েছে। রাস্তার মধ্যে রয়েছেন। যাওয়া আসার পথে দেখেছিলাম অয়নদের বাড়ি মুখী মানূষের ঢ্ল। অয়নকে শেষ দেখা দেখতে মানুষ সেদিন ভেঙে পড়েছিল ওদের বাড়িতে। বলার অপেক্ষা রাখে না মানুষের ওই ঢল বলে দিচ্ছিল এলাকায় কতটা জনপ্রিয় ছিল অয়ন। 
আজ অয়ন নেই। কিন্তু আমার মনের মণিকোঠায় একটা বড়ো জায়গা জুড়ে রয়ে গিয়েছে সে।আজও আমার মোবাইলে তার নাম লোড করা রয়েছে। আমাদের ' খোলা-হাওয়া' হোয়ার্টস  গ্রুপেও অর্ন্তভুক্ত রয়েছে তার নাম। মাঝে মধ্যে প্রোফাইল পিকচার খুলে দেখি তার হাসি মুখ। ইচ্ছে করেই ডিলিট করি নি , করতে পারবও না কোনদিন।কিছু প্রিয় নাম , কিছু প্রিয় মুখ আর কিছু স্মৃতি ডিলিট করা যায় না সারাজীবন।  




                 ------০-----

                                                 
    

                                                                                        শক্তিদাদুর কথা 





                    ( ৬০ )


শক্তিদাদুর পুরো নাম ছিল শক্তিপদ ভান্ডারী। বাড়ি ছিল ময়ূরেশ্বরের নবগ্রামে। আমার দাদুর বন্ধু স্থানীয় ছিলেন। সেই সূত্রে আমি তাকে দাদু বলতাম। উনি দাদুকে বলতেন সুরিতদা ( সুহৃদ রঞ্জন ঘোষ )। আমাকে বলতেন দাদুভাই। শক্তিদাদুর সঙ্গে আমার পরিচয় ভগবতীপুর-নবগ্রাম মহামন্ত্র আশ্রমে। দাদু নিয়মিত ওই আশ্রমে যেতেন।একসময় দাদুর সঙ্গে আমিও যেতাম।শক্তিদাদুও নিয়মিত আশ্রমে আসতেন। সেই সূত্রেই তাকে আমার খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। বেশ দশাসই চেহারা ছিল তার। মাথা ভর্তি সাদা চুল। সম্ভবত বাত জনিত কারণে কিছুটা পা টেনে হাঁটতেন। 


                                            ছোটবেলায় আমি খুব দুষ্টু ছিলাম। আশ্রমে গিয়েও প্রচুর দুষ্টুমি করতাম । দাদু বকাবকি করতেন। শক্তিদাদু তখন  দাদুকে বলতেন , সুরিতবাবু বকলে হবে ? ওদের তো এখন দুষ্টুমি করারই বয়েস।সে সময় আশ্রমে একটা কাঁচামিঠে আমের গাছ ছিল। আমের সময় ঝড়ে আম পড়লে আমার জন্য কুড়িয়ে রেখে দিতেন শক্তিদাদু।মনে পড়ে শক্তিদাদু সে সময় আশ্রমে লেবু দিয়ে চা করতেন।আর আমি গিয়ে হাত পেতে দাঁড়াতাম। উনি আমার হাতে  চামচে করে চিনি তুলে দিতেন। আমি বার বার চাইতাম,উনিও আমার আবদার মেটাতেন। 

           
                                  দাদুর সঙ্গে অনেকবার তাদের বাড়িও গিয়েছি। শক্তিদাদুদের বাড়িতে গেলেই চিনি ছিটিয়ে চপচপে করে সর মাখা মুড়ি ছিল  বাঁধা খাবার। শক্তিদাদু ছিলেন নিস্তান। পরেও বহুবার তাদের বাড়ি গিয়েছি। কারণ তার এক নাতি বিপদতারণ আমার সহপাঠী বন্ধু। বিপদতারণের সঙ্গে যখনই ওদের বাড়ি গিয়েছি , তখন দেখা হয়েছে তার সঙ্গে। দাদুর খবরাখবর নিয়েছেন। আশ্রমের সেই দিনগুলির স্মৃতিচারণ করেছেন। আজও শক্তিদাদুকে মনে পড়ে।                              

  ( চলবে )

                

                  পড়ুন / পড়ান 




             নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


          ১৯  নভেম্বর থেকে প্রতিদিন সকাল ১০ টার মধ্যে প্রকাশিত হচ্ছে





                ধারাবাহিক উপন্যাস 



                       সালিশির রায় 

                                                                

সালিশি সভার রায়ে সর্বস্ব হারানো এক আদিবাসী তরুণীর ঘুরে দাঁড়ানোর , অন্যকে দাঁড় করানোর মর্মস্পর্শী কাহিনী অবলম্বনে ধারাবাহিক উপন্যাস --

                   


                                                                  


খুব কাছে থেকে দেখা আদিবাসী সমাজের এক তরুণীর মর্মান্তিক পরিণতির ঘটনা । একসময় ঘটনাটি নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে তোলপাড় হয়েছিল। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমের নজর এড়িয়ে গিয়েছিল অনেক ঘটনা।সেই ঘটনাই তুলে ধরা হয়েছে এই কাহিনীতে। আদিবাসী সমাজের ভাষা আলাদা , কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো ভাবের প্রকাশও আলাদা। কিন্তু দুঃখ , জ্বালা , যন্ত্রণার অভিব্যক্তি মনে হয় মানুষ মাত্রেরই এক।সেই সব জ্বালা যন্ত্রনার অভিব্যক্তি বৃহত্তর সমাজের উপযোগী ভাষা এবং ভাবের প্রকাশ ভঙ্গিতে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র। ত্রুটি -বিচ্যুতি থাকাটাই স্বাভাবিক।তাই সবিনয়ে আগাম মার্জনা চেয়ে নিচ্ছি। একটাই প্রার্থনা , ভালো লাগলে বলুন , বলুন খারাপ লাগলেও।ধন্যবাদ। 

   

              ------০-----

                                                              

No comments:

Post a Comment