বিষ্টুর কথা
( ৬১ )
অর্ঘ্য ঘোষ
বিষ্টুর ভালো নাম সোমনাথ মুস্তাফি। তার সঙ্গে যখন আমর প্রথম আলাপ তখন সে অবশ্য লিখত মুস্তৌফি। কর্মসূত্রে আনন্দবাজার পত্রিকায় সেটা মুস্তাফি হয়ে যায়। প্রথম দিকে অবশ্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাহিত হয়ে আসা এহেন পদবী পরিবর্তন সে মন থেকে মেনে নিতে পারে নি।প্রথম প্রকাশিত ছবির নিচে নামের পাশে ওই পদবি দেখে সে আমায় ফোন করে অনুযোগ জানিয়ে ছিল। আমি ভেবেছিলাম হয়তো ' প্রিন্টিং মিসটেক'।তাই সঙ্গে সঙ্গে ফোন করেছিলাম আমাদের আনন্দবাজারের তদানীন্তন জেলা ' ডেস্কে'। জেলা ডেস্ক থেকে জানানো হয়েছিল , ' সংবাদপত্রে প্রকাশিত বানানটাই ঠিক'।তারপর থেকেই মুস্তৌফি থেকে মুস্তাফি হয়ে যায় সোমনাথ।সে প্রায় ১৪ বছর আগের কথা।কিন্তু মনে হচ্ছে এই তো সেদিন।
( ২০০৩ সালে ২৪ নভেম্বর প্রকাশিত সোমনাথের প্রথম ছবি )
সেটা ছিল ২০০৩ সালের এপ্রিল মাস। আমি তখন সবে আনন্দবাজার পত্রিকায় বীরভূমের রামপুরহাট মহকুমা , লাভপুর , নানুর , সাঁইথিয়া এবং মুর্শিদাবাদ জেলার কান্দী মহকুমা এলাকায় সংবাদ সংগ্রহের কাজে যোগ দিয়েছি।
সংবাদের জন্য প্রয়োজনীয় ছবি এবং সংবাদ সংগ্রহের কাজে সুবিধার জন্য আমি অফিসের অনুমতি ক্রমে চুক্তিতে তিনজন চিত্র সংবাদিককে সহযোগী হিসাবে কাজে সামিল করেছিলাম। সোমনাথ ছিল তাদেরই অন্যতম। নানুর এলাকা তখন অগ্নিগর্ভ , খুন-জখম নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার একার পক্ষে তাই সবদিক সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। কারণ নানুর থেকে আমার বাড়ির দুরত্ব প্রায় ৭০ কি,মি।তাও বাঁশের সাঁকো কিম্বা নৌকায় নদী পেরিয়ে যেতে হয়।তাই নানুর এলাকায় একজন ফটোগ্রাফার খুব প্রয়োজন ছিল।
সেই কাজের জন্য প্রথমে আমি গিয়েছিলাম কীর্ণাহার লাগোয়া আলিগ্রামের কল্যাণ আচার্য্যের কাছে। কল্যাণ তখন বর্তমান কাগজে চিত্র সংবাদিক হিসাবে কাজ করছে।
তার কাছেই সোমনাথের নাম জানতে পারি।তারপর একদিন আমি আর রামপুরহাটের অধিকার পত্রিকার সম্পাদক আশিস মন্ডল নানুর যাই।সোমনাথ তখন তার নানুর সুপার মার্কেটে নটরাজ স্টুডিওতে ছিল। কথা বার্তা বলার পর সেদিনই আমরা নানুর এলাকায় বেশ কয়েকটা খবর সংগ্রহ করি। তার মধ্যে ২০০৩ সালের ২৪ নভেম্বর প্রকাশিত হয় সাওতা-কুমিড়া জুনিয়ার হাইস্কুলের খবর।সেই খবরেই প্রথম ছবি সহ সোমনাথের নাম প্রকাশিত হয়। আর সেদিন থেকেই সোমনাথ মুস্তৌফি হয়ে যায় মুস্তাফি।
তারপর তো দীর্ঘ পথ চলা।কোনদিন হয়তো মধ্য রাতে খবর পেয়েছি পাপুড়ি গ্রামে কেতুগ্রামের বর্তমান বিধায়ক সেখ শাহনয়াজের ভাইয়ের দেহ বোমায় ছিন্নভিন্ন দেহ পড়ে রয়েছে।আবার কোনদিন খবর পেয়েছি পালুন্দি গ্রামের মোড়ে পড়ে রয়েছে তৃণমূল নেতা সোনা চৌধুরীর লাশ।গ্রামের ভিতরে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে আর এক তৃণমূল নেতা ভরত মাঝিকে।যত দ্রুত সম্ভব পৌঁচেছি নানুরে।তারপর তাকে সঙ্গে করে ঘটনাস্থল অভিমুখে বাইক হাঁকিয়েছি।
যেতে যেতে দেখেছি দাউ দাউ করে জ্বলছে সেরপুর , খুজুটিপাড়া , থুপসড়ার মতো গ্রামের পর গ্রাম। প্রকাশ্যে বোমা -বন্দুক নিয়ে টহল দিয়েছে মাস্কেট বাহিনী। গোলাগুলির মাঝে প্রাণ হাতে করে ছবি আর সংবাদ সংগ্রহ করে ফিরেছি দুজনে। সবদিন বাড়ি ফেরা সম্ভব হয় নি। ফোনে খবর পাঠিয়ে থেকে গিয়েছি সোমনাথের বাড়িতে।আবার সোমনাথ বহুবার আমার বাড়িতে থেকেছে।একই বিছানায় দুজনে পাশাপাশি শুয়ে গল্প করেছি কত রাত। আবার সোমানাথের স্টুডিও কিম্বা কল্যাণের কীর্ণাহারের স্টুডিও্তে খবরের কাগজে মুড়ি ঢেলে একসঙ্গে তেলেভাজা মেখে খেয়েছি কতদিন।সেখানে সাংবাদিক পরিতোষ দাসও থাকত। আবার কীর্ণাহারের লজের দোতলা কিম্বা সোমনাথের স্টুডিরও সামনে ফিষ্টও করেছি বহুদিন।বেশ আনন্দেই কেটে যেত দিনগুলি।
কোন কোন দিন অবশ্য আমি পৌঁছোনোর আগেই সে পৌঁচ্ছে যেত ঘটনাস্থলে।আমার জন্য তথ্য সংগ্রহ করে রাখত।তারপর আমি পৌঁচ্ছোতেই বলত , কি বস আজ দিলাম তো চিক।তোমার আগেই চলে এলাম। আমি বলতাম , তা দিলে আজ।কিন্তু তোলা থাকল।যেদিন আমার এলাকাতে খবর হবে সেদিন এই চিক শোধ করে দেব।আবার সবদিন আমি পৌঁচ্ছোতেই পারি নি। সেসব দিন চরম উৎকন্ঠায় কেটেছে আমার।সেই উৎকন্ঠা থেকে সোমনাথই আমায় উদ্ধার করেছে।
সেই সব স্মৃতি আজও আমাকে নাড়া দেয়। ২০১০ সালের ২৯ জুনের সেই সন্ধ্যাটার কথা আজও স্পষ্ট মনে পড়ে। হঠাৎ সোমনাথের ফোন -- ' অর্ঘ্যদা আনন্দ দাস নৃশংসভাবে খুন হয়ে পড়ে আছে বাড়ির সামনে। দুষ্কৃতিরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে , এলাকায় ঢোকা যাচ্ছে না।কি করব ? শুনেই তো আমার প্যালপিটিশন শুরু হয়ে যায়।সেই সময় বাড়ি থেকে বেড়িয়ে নানুরে গিয়ে খবর সংগ্রহ করে দফতরে পাঠাতে পাঠাতে সেদিনের কাগজ ছাপার সময় অতিক্রান্ত হয়ে যেত। তাই খুব দুঃশ্চিন্তায় পড়ে ছিলাম। সোমনাথকে বলেছিলাম , আজকের মতো ম্যানেজ করতে পারবে না ? সকালেই পৌঁচ্ছে যাব।সোমনাথ বলেছিল , দেখছি কতদুর কি করা যায় ? আধ ঘণ্টা খানেক পর আবার সোমনাথের ফোন-- অর্ঘ্যদা চিন্তা নেই , ছবি সহ তথ্য পেয়ে গিয়েছি। তারপর সোমনাথের কাছে তথ্য নিয়ে খবরটা পাঠিয়ে কার্যত হাঁফ ছেড়ে বাঁচি আমি।সংবাদ মাধ্যমের লোক ছাড়া পাঠকরা বুঝবেন না ওইসব মুহুর্তগুলো সাংবাদিক - চিত্র সংবাদিকদের কি উদ্বেগে কাটে। পরদিন সম্ভবত একমাত্র আমাদের কাগজেই নানুরের প্রাক্তন সি,পি,এম বিধায়ক আনন্দ দাসের রক্তাক্ত মৃতদেহের ছবি সহ খবর বেরিয়েছিল।
সোমনাথের মুখে সব সময় হাসি লেগেই থাকত। তার সেই হাসি দেখে বোঝার উপায় ছিল না কি নিদারুণ দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করতে হত তাকে। তার কাগজের কাজটি চুক্তি ভিত্তিকই থেকে যায়।ছবি অনুযায়ী টাকা পেত সে। স্টুডিও আর ওই টাকার উপরে নির্ভর করে চলত তার দুই মেয়ের পড়াশোনা সহ ৪ সদস্যের সংসার। তা বলে তার আত্মসম্মান জ্ঞান ছিল প্রখর। মাঝে কয়েক বছর ২৬ জানুয়ারী আমাদের আনন্দবাজার পত্রিকার বীরভূম জেলার সাংবাদিকদের ফ্যামিলি কিম্বা একক পিকনিকের আয়োজন করা হত বিভিন্ন জায়গায়।ওইসব পিকনিকে সোমনাথের কাছে থেকে অন্যদের তুলনায় কম টাকা নেওয়া হত।কখনও বা নেওয়া হত না।তাই ওই সব পিকনিক এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করত সে।কিছু বললেই বলত , জানো তো আমার খুব লজ্জা করে।তোমরা সবাই টাকা দাও , আমি দিতে পারি না।তাই কেমন যেন অস্বস্তি লাগে।আমি অবশ্য বকা-ঝকা করে নিয়ে আসতাম।
( এ ভাবেই আমরা দু'জন বহু জায়গায় সংবাদ সংগ্রহে গিয়েছি )
তার চাহিদাও ছিল সীমিত।আমি তার মেয়ের পড়ার জন্য যৎসামান্য সাহার্য্য করতাম। সেটা বেতন পাওয়ার দিনই অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দিতাম। কিন্তু প্রথম দিকে বারবার চাওয়া সত্ত্বেও আমাকে সে অ্যাকাউন্টের নম্বর দিতে চায় নি।তারপর যদি কখনও বিপদ আপদে সাহার্য্য করেছি , ও সঙ্গে সঙ্গে বলেছে , তুমি আর কত দেবে ? ( মাফ করবেন। এই অংশটুকু আমার নিজেরই আত্মপ্রচার বলে মনে হয়েছে , লিখে একবার কাটলাম। কিন্তু ভেবে দেখলাম , এই অংশটুকু না লিখলে যে সোমনাথের চরিত্রের একটা দিক অন্ধকারেই থেকে যাবে।কেউ তো জানতেই পারবে না সোমনাথ কত অল্পেই সন্তুষ্ট ছিল)। সোমনাথের ওই কথা শুনে আমি নিজে খুব অস্বস্তিতেও পড়ে যেতাম। কারণ কতটুকুই বা সাহার্য্য তাকে আমি করতে পারতাম ? তারও অস্বস্তি টের পেতাম।তাই কথার কথা হিসাবে বলতাম , ঠিক আছে আমার টাকা নিতে তোমার যদি অস্বস্তিই হয় তাহলে লিখে রেখ।তোমার যেদিন সুদিন আসবে সেদিন না হয় শোধ করে দিও।দুর্ভাগ্য সেই সুদিনের মুখ সোমনাথের দেখা হলো না আর।অভাবের সঙ্গে লড়াই করতে করতেই চলে গেল সে। কিন্তু তার কাছেই আমি ঋনী থেকে গেলাম। তার কাছে যে ভালোবাসা , শ্রদ্ধা , আন্তরিকতা পেয়েছি তা তো কোন টাকার অঙ্কে শোধ করা যায় না। শোধ করতে হয় সমপরিমাণ ভালোবাসা , শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা দিয়ে।সেদিক থেকে সোমনাথের ঋণ আমি আর শোধ করার সুযোগ পেলাম না।
৯ ডিসেম্বর ( ২০১৭ ) ভোরে ফোনে সোমনাথের নম্বর ভেসে উঠতেই ভাবলাম নিশ্চয় কোথাও বড়ো ধরণের অঘটন কিছু ঘটছে। সেই খবর সংগ্রহে যাওয়ার জন্যই সোমনাথ ফোন করেছে।তাই অভ্যাস বশেই ফোন ধরেই বললাম -- হ্যা বলো , এর মধ্যে কোথাই কি ঘটল আবার ? রাতেই তো কথা হল।কিন্তু সেই পরিচিত গলাটির পরিবর্তে ভেসে এলো অন্যগলা।ততক্ষণে আমার মনে আশংকা আর উদ্বেগের দোলাচল শুরু হয়ে গিয়েছে।তার মধ্যে শুনতে পেলাম ফোনের অন্যপ্রান্ত থেকে ভেসে আসছে সোমনাথের ভাইয়ের গলা।কাঁদতে কাঁদতে সে বলল -- অর্ঘ্যদা দাদা আর নেই। ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আনার পথে স্টোক হয়ে মারা গিয়েছে।শুনেই কথা হারিয়ে গেল আমার।নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।রাতেই তো কথা হলো।রবিবার আমাদের এখানে 'খোলা হাওয়া' হোয়ার্টস গ্রুপের একটি অনুষ্ঠানে তার বন্ধুর মেয়ে সংযুক্তাকে নিয়ে আসার কথা ছিল সোমনাথের।তারমধ্যেই সোমনাথের অন্য একটি ফোন থেকে তার স্ত্রী সুমনা বলল-- দাদা , আপনার ভাইয়ের খুব শরীর খারাপ।বর্ধমান নিয়ে যেতে হবে তাড়াতাড়ি চলে আসুন। বুঝলাম সুমনাকে তখনও সোমনাথের মৃত্যু সংবাদ জানানো হয়নি।একটা বিষয়ে সাহার্য্যের জন্য ফোন করলাম বুড়োদাকে ( সুব্রত ভট্টাচার্য্য )। বুড়োদাও কিছুক্ষণের মধ্যে ফোন করে জানালেন , চিন্তা নেই আমরাও সোমানাথের পরিবারের পাশেই আছি।
( মৃত্যুর আগের দিন তোলা ২০১৭ সালের ৯ ডিসেম্বর প্রকাশিত সোমনাথের শেষ ছবি )
সকালে যখন নানুর পৌঁছোলাম তখন সোমনাথের বাড়ির সামনে লোক ভেঙে পড়েছে। উঠোনে শুয়ে রয়েছে সোমনাথ।ঠোটের কোনে এসে যেন থমকে গিয়েছে চির পরিচিত সেই হাসির রেশ। মনে হচ্ছিল সোমনাথ যেন বলছে , বস এবারেও তোমায় চিক দিয়ে গেলাম। স্ত্রী আর ছোট মেয়ে অনুমিতা সমানে কেঁদে চলেছে।কাঁদছেন আত্মীয়-স্বজন পাড়া পড়শি মানুষজন।কেবল নির্বাক হয়ে গিয়েছে সোমনাথের বড়ো মেয়ে সায়নিতা।হাজার চেষ্টা করেও কেউ তাকে কাঁদাতে বা কথা বলাতে পারছেন না। সাংবাদিক বন্ধুরা , বহু বিশিষ্টজন সহ নানুরের ওসি তপাই বিশ্বাস মালা দিয়ে গেলেন। বিনীত ভাবে সোমনাথের দাদার কাছে ওসি চেয়ে নিলেন তার অন্ত্যোষ্টির ব্যয় ভারের দায়িত্ব।এসব দেখতে দেখতে জলে ভরে উঠছিল চোখ।মনে মনে ভাবছিলাম এত লোক তাকে ভালোবাসত ?
বাড়ি ফিরে এসেও কোন কাজে মন বসাতে পারছি না। কেবল তারই কথা মনে পড়ছে। আমার লেখালিখির সবখানেই সে জড়িয়ে রয়েছে। যে মনের মণিকোঠায় তাকে নিয়ে লিখছি সেটার অলংকরণও সে'ই করে দিয়েছে। অভ্যাস বসে বারে বারে ফোন করতে চলে যাচ্ছি। দিনে প্রয়োজন-অপ্রয়োজনে কতবার যে দুজনের ফোনে কথা হত তার ঠিক নেই। কেউ কোন কাগজ কিম্বা বইপত্র দিতে চাইলে সোমনাথের দোকানে দিতে বলতাম।সোমনাথ সময় মতো তা আমাকে পৌঁছে দিত।নানুর গেলে সেই তার দোকানেই বসতাম।আসলে নানুরে সোমনাথই আমার একমাত্র ঠিকানা হয়ে উঠেছিল।সেই ঠিকানাটাও হারিয়ে গেল।








শুধু আক্ষেপ রয়ে গেলো যে মানুষ আনন্দ বাজার পত্রিকায় খবর যোগান দিত তার খবর আনন্দ বাজার পত্রিকায় পেলাম না। বড় অদ্ভুত ও বেমানান লাগছে।
ReplyDelete