Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

মনের মণিকোঠায় -- ৪০ ( ধীরেন সান্যালের কথা)





             মনের মণিকোঠায়                  



                                                      
                        


                      অর্ঘ্য ঘোষ



( এই কলমে এমনই কিছু হারিয়ে যাওয়া মানুষের কথা ধারাবাহিক ভাবে তুলে ধরা হবে যারা নিতান্তই প্রান্তজীবি। বৃহত্তর সমাজে তাদের স্থান নেই বলেলেই চলে। তাদের জন্ম মৃত্যু এমনকি আসল নামও আজ সংগ্রহ করা কঠিন।তাদের পরিবারের লোকেরাও সে তথ্য ঠিকঠাক দিতে পারেন নি।প্রচলিত নামেই তারা আজও এলাকার কারও কারও মনে ধুসর স্মৃতি হয়ে রয়েছেন। স্মৃতির চাদর সরালেই অবয়বটা স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। আমার ছোটবেলায় দেখা মনের মণিকোঠায় ঠাঁই করে নেওয়া ওইসব চরিত্রের সঙ্গে আপনিও মিল খুঁজে পেতে পারেন আপনার দেখা কোন মানুষের মধ্যে )






           পন্ডিতমশাইয়ের কথা 



                      ( ৭০ )



                            নর -- নরৌ -- নরাঃ

                            বেঞ্চির উপর দাঁড়া 
                              বেঞ্চি গেল সরে 
                                নর গেল পড়ে 


এই শব্দগুলো মনে এলেই মনে পড়ে যায় পণ্ডিতমশাইয়ের কথা। কতই বা বয়েস হবে তখন , সবে হয়তো হাইস্কুলের আঙিনায় পা রেখেছি। তবু আজও যেন ছবির মতো ভিড় করে  আসে সব। হাঁড়িগড়ে পুকুরের পাড়ে কাঁচা মিঠে আমের গাছ। তারই গায়ে পাকা একতলা  কোয়ার্টার। কোয়ার্টারে ঢোকার মুখে ছোট্ট তুলসীমন্দির , তার গায়ে গোয়ালচালায় বাঁধা শ্যামলী গাই। তিড়িং বিড়িং করে লাফিয়ে বেড়াছে লালুবাছুর। সামনের বাগান থেকে ভেসে আসছে কাঁঠালিচাপা ফুলের গন্ধ।কোয়ার্টারের রোয়াকে বসে রয়েছে কয়েকজন ছেলেমেয়ে। আর গোরুর পরিচর্যা করতে করতে ভোলেভালে চেহারার একজন মানুষ   আউড়ে চলছেন , বল নরৌ-নরো- নরা। আর আমরা বাইরে থেকে তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বলে চলেছি ' বেঞ্চির উপর দাঁড়া'।


                           মানুষটির নাম ধীরেন্দ্রনাথ স্যান্যাল , সংক্ষেপে লোকে বলতেন ধীরেন স্যান্যাল। পন্ডিতমশাই হিসাবেই তার পরিচিতি ছিল। আসল বাড়ি ছিল মুর্শিদাবাদের ভরতপুর গ্রামে।ময়ুরেশ্বরের লোকপাড়া হাইস্কুলে তিনি মূলত সংস্কৃত পড়াতেন। সপরিবারে থাকতেন স্কুল লাগোয়া কোয়ার্টারে।তার ছেলে সুখেন ছিল আমাদের সহপাঠী। সেই সুবাদে ওই কোয়ার্টারেও যাতায়াত ছিল আমাদের। সেইসময় মাস্টারমশাইদের ছাত্রছাত্রীরা ভক্তির পাশাপাশি খুব ভয়ও করত। অধিকাংশই এড়িয়ে চলার চেষ্টা করত। কিন্তু পণ্ডিতমশাই ছিলেন নিপাট ভালোমানুষ গোছের। তাই তাকে বিশেষ ভয় টয় কেউ খুব একটা পেত না। কারণ হাজার দুষ্টুমিতেও তার কাছে  থেকে মিলত প্রছন্ন প্রশয়।


   

                                                     মনে পড়ে তার কোয়ার্টারের পিছনে ছিল একটি বেলের গাছ , আর পুকুরঘাটের দরজার পাশে ছিল একটি কাঁচামিঠে আমের গাছ।আমরা যারা স্থানীয় তারা তো বটেই , স্কুলের টিফিনের সময় বাইরের ছাত্রছাত্রীরাও  ঢিল ছুড়ে বেল পাকলে বেল , আমের সময় কাঁচা আম পাড়তাম। সেইসব ঢিল গিয়ে  পড়ত কোয়ার্টারের ছাদ কিম্বা উঠোনে। আর ভিতর থেকে পন্ডিতমশাই গলা তুলে বলে উঠতেন -- কে রে ? যাই দাঁড়া। ব্যস, ওই পর্যন্তই। বলাবাহুল্য আমরা তাই একটুও ভয় পেতাম না। কারণ ততদিনে আমাদের জানা হয়ে গিয়েছে যতই ভয় দেখান না কেন , পন্ডিতমশাই বাইরে আসবেন না। আর যদি আসেনও তাহলে শাস্তির বদলে জুটতে পারে উপহার। কোন কোন দিন আমাদের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে বেড়িয়ে আসতেন বটে , কিন্তু তার হাতে ছড়ি থাকত না , থাকত ঝুড়ি।সেই ঝুড়িতে থাকত কুড়িয়ে রাখা আম কিম্বা বেল। সেগুলো আমাদের হাতে দিয়ে বলতেন , আর জ্বালাস নে বাপু বাড়ি যা সব। সুখেন অবশ্য মাঝে মধ্যে আমাদের হাত থেকে আম আর বেল রক্ষা করতে বাবার দোহাই দিয়ে বলতে - বাবা কিন্তু খুব রেগে আছে। বাইরে বেরিয়ে সবার পিঠের ছাল তুলে নেবে। এক্ষেত্রেও আমরা তার কথা কানে তুলতাম না। বরং আম খেয়ে তার অপুষ্ট আঁটিটা  সুর করে ' কাঁই রে কাঁই , পরের ছেলেকে লাগলে পড়ে নামদোষ নাই ' বলে ছুড়ে মারতাম। অগত্যা রণে ভঙ্গ  দিয়ে সুখনও আমাদের সঙ্গে সামিল হত। 


                                                      ভয় না করলেও অধিকাংশ মানুষই কিন্তু তাকে ভক্তিশ্রদ্ধা করতেন। আমার বাবাই তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। স্পষ্ট বক্তা এবং একগুঁয়ে হিসাবে পরিচিতি ছিল বাবার। ভয়ভুতো তো নয়ই , কাউকে খুব একটা কেয়ার -টেয়ার করতেন  না বলেও প্রচলিত আছে।কিন্তু পন্ডিতমশাইয়ের প্রতি ছিল তার অগাধ শ্রদ্ধা।নিজে একজন স্কুলশিক্ষক হয়েও প্রতিদিন সকালে পণ্ডিতমশাইয়ের কোয়ার্টারে গিয়ে গাই দুইয়ে দিয়ে আসতেন। পন্ডিতমশাইও আসতেন আমাদের বাড়ি। বাবাকে তিনিও নিজের ছেলের মতোই স্নেহ করতেন। আসতেন পন্ডিতমশাইয়ের স্ত্রীও। বাবা তাকে ' মা ' বলে ডাকতেন। আর তিনি বলতেন , প্রভাত ( আমার বাবার নাম ) আমার বড়ো ছেলে। মনে আছে পন্ডিতমশাই বাবাকে বিনামুল্যে একটা বকনা বাছুর দিয়েছিলেন। সেই বাছুরটা আমরা দুই ভাই লালন পালন করতাম। কিন্তু কোন দিন দৈবাৎ যদি সেই বাছুর গলায় দড়ি খোলা পেত তাহলে তার পিছনে পিছনে আমাদের দুই ভাইকে তিন চারখানা গাঁ ছুটিয়ে পন্ডিতমশাইয়ের কোয়ার্টারের গিয়ে হাজির হত। ক্লান্ত বিধ্বস্ত চেহারায় আমরাও হাজির হতাম। মনে মনে বাবাকে বাছুরটা দেওয়ার জন্য খুব রাগ হত পণ্ডিতমশাইয়ের উপরে। সেটা আঁচ করেই বোধহয় পণ্ডিতমশাই বলতেন , আরে রাগ করলে হবে , কথায় আছে বাঁধা গরু ছাড়া পেলে ত্রিভূবন দেখিয়ে ছাড়ে। তারপর বাছুরের গলায় দড়ি পড়িয়ে আমাদের হাতে দিতেন।পরবর্তীকালে সেই বকনাবাছুরই বড়ো গাই হয়। তার দুধের সর , ক্ষীর খাওয়ার সময় পণ্ডিতমশাইয়ের কথা উঠত।



                                           সে সময় লোকপাড়া হাইস্কুলে একজন শিক্ষিকা সহ হাতেগোনা মাত্র পাঁচজন শিক্ষক ছিলেন ছিলেন মূলত বামপন্থী মানসিকতার। কেন জানি না তাদের বলা হত পঞ্চপান্ডব। তাদের নিয়ে একটা শ্লেষাত্মক ছড়াও প্রচলিত ছিল। পণ্ডিতমশাই ছিলেন সেই পঞ্চপাণ্ডবদেরই একজন।তার মৃত্যুর দিনটা আমার আজও স্পষ্ট মনে আছে। কোয়ার্টারেই মৃত্যু হয় তার। সকালেই খবর পেয়ে ছুটে যায় আমরা। গিয়ে দেখি কোয়ার্টার লাগোয়া ছাতিমতলায় শায়িত রয়েছে তার মৃতদেহ। শিক্ষক অনুকূলবাবু বাড়ি থেকে আনা ফুল ছড়িয়ে দিচ্ছেন মৃতদেহের উপর। একগোছা ধুপবাতি মাথার কাছে জ্বালিয়ে দিচ্ছেন শিক্ষিকা তৃপ্তি শীল।বাবা পন্ডিতমশাইয়ের স্ত্রীকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে নিজেই কেঁদে ফেলছেন। শেষযাত্রায় কাঁধ দিয়েছিলেন বাবাও।আজ আর সেই কোয়ার্টার নেই , নেই সেই আম কিম্বা বেলগাছ। কিন্তু পন্ডিতমশাইয়ের কথা আজও ভুলতে পারি নি। 


                                                           

    ( চলবে )

                

                  পড়ুন / পড়ান 




             নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


          ১৯  নভেম্বর থেকে প্রতিদিন সকাল ১০ টার মধ্যে প্রকাশিত হচ্ছে





                ধারাবাহিক উপন্যাস 



                       সালিশির রায় 

                                                                

সালিশি সভার রায়ে সর্বস্ব হারানো এক আদিবাসী তরুণীর ঘুরে দাঁড়ানোর , অন্যকে দাঁড় করানোর মর্মস্পর্শী কাহিনী অবলম্বনে ধারাবাহিক উপন্যাস --

                   


                                                                  


খুব কাছে থেকে দেখা আদিবাসী সমাজের এক তরুণীর মর্মান্তিক পরিণতির ঘটনা । একসময় ঘটনাটি নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে তোলপাড় হয়েছিল। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমের নজর এড়িয়ে গিয়েছিল অনেক ঘটনা।সেই ঘটনাই তুলে ধরা হয়েছে এই কাহিনীতে। আদিবাসী সমাজের ভাষা আলাদা , কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো ভাবের প্রকাশও আলাদা। কিন্তু দুঃখ , জ্বালা , যন্ত্রণার অভিব্যক্তি মনে হয় মানুষ মাত্রেরই এক।সেই সব জ্বালা যন্ত্রনার অভিব্যক্তি বৃহত্তর সমাজের উপযোগী ভাষা এবং ভাবের প্রকাশ ভঙ্গিতে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র। ত্রুটি -বিচ্যুতি থাকাটাই স্বাভাবিক।তাই সবিনয়ে আগাম মার্জনা চেয়ে নিচ্ছি। একটাই প্রার্থনা , ভালো লাগলে বলুন , বলুন খারাপ লাগলেও।ধন্যবাদ। 

   

                ------০------ 

              
                                     

No comments:

Post a Comment