অর্ঘ্য ঘোষ
( এই কলমে এমনই কিছু হারিয়ে যাওয়া মানুষের কথা ধারাবাহিক ভাবে তুলে ধরা হবে যারা নিতান্তই প্রান্তজীবি। বৃহত্তর সমাজে তাদের স্থান নেই বলেলেই চলে। তাদের জন্ম মৃত্যু এমনকি আসল নামও আজ সংগ্রহ করা কঠিন।তাদের পরিবারের লোকেরাও সে তথ্য ঠিকঠাক দিতে পারেন নি।প্রচলিত নামেই তারা আজও এলাকার কারও কারও মনে ধুসর স্মৃতি হয়ে রয়েছেন। স্মৃতির চাদর সরালেই অবয়বটা স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। আমার ছোটবেলায় দেখা মনের মণিকোঠায় ঠাঁই করে নেওয়া ওইসব চরিত্রের সঙ্গে আপনিও মিল খুঁজে পেতে পারেন আপনার দেখা কোন মানুষের মধ্যে )
কটার আসল নাম ছিল প্রভাত ভল্লা। তার বাবার নাম ছিল কটা । কিন্তু কি করে যেন কটা হিসাবেই তার পরিচিতি হয়ে উঠেছিল। আসলে নেপালিদের মতো দেখতে আর খুব ফর্সা ছিল সে। সম্ভবত সেই হিসাবেই তাকে সবাই কটা বলত। লোকে ভুলেই গিয়েছিল কটা আসলে তার বাবার নাম।ঘটনা এমনও ঘটেছে , আমরাই অনেক সময় তার বাড়ি গিয়ে তার বাবাকেই জিজ্ঞেস করে বসেছি -- কটা নেই বাড়িতে ? ততদিনে বিষয়টি জানা হয়ে গিয়েছে তার বাবারও। তাই আর আশ্চর্য্য হতেন না। বরং ছেলেকে ডেকে দিয়ে বলতেন -- দেখ কারা সব তোকে ডাকতে এসেছে।
ময়ূরেশ্বরের রসুনপুর গ্রামের এক দিনমজুর পরিবারের ছেলে ছিল প্রভাত। নিজেও প্রথম দিকে দিনমজুরি করত। আমার চেয়ে বয়সে বছর কয়েক বছরের ছোট ছিল। প্রথম দিকে আমাকে অর্ঘ্যদা বলত , শেষের দিকে শুধুই দাদা বলে ডাকত।দিনমজুরি করলেও হৃদয়টা ছিল বিরাট। আর ছিল চরম ফুটবল পাগল। মূলত ফুটবল খেলার সুবাদেই তার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। আমি তখন লোকপাড়া প্রতিবাদ ক্লাবের সম্পাদক ছিলাম। প্রভাত ক্লাবের টিমের ক্যাপটেন ছিল। খেলত মূলত ডিফেন্সে , তবে টিম গোল করতে না পারলে রেগে মেগে বল নিয়ে উঠে গিয়ে নিজে গোল দিয়ে টিমকে জিতিয়ে দিয়েছে। তারজন্যই বহু মাঠে অবধারিত হারের হাত থেকে আমাদের দল রক্ষা পেয়ে চ্যাম্পিয়ান হয়ে ফিরেছে।
অত খেলা পাগল ছেলে খুব কমই দেখা যায়। দিনমজুরি না করলে তার দিন চলত না। কিন্তু কোথাও খেলার খবর পেলেই হল। সকালেই হাজির হয়ে যেত আমার কাছে। ক্লাব থেকে এন্ট্রি ফি দেওয়ার নিশ্চয়তা পেলে সাইকেল নিয়েই চলে যেত আন্দি।সেখানে খোরজুনার অতুল ঘোষের দোকান। অতুল আমাদের টিমে খেলত। অতুলকে নিয়ে ফিরত। দিন এমনও গিয়েছে কোনদিন আন্দি থেকেই সরাসরি খেলার মাঠে চলে যেতে হয়েছে , আবার একবেলা দিনমজুরি করেও যেতে হয়েছে , পেটে ভাতটুকুও জোটে নি , তবু খালি পেটেই মাঠ মাতিয়ে দিয়েছে সে।সে সময় ক্লাবেরও সবদিন মুড়ি-ঘুগনি কিনে দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না। কিন্তু তা নিয়ে প্রভাতকে কখনও অনুযোগ করতে শুনি নি।আমার কাছ কেবল তার আবদার ছিল , প্রতিটি গোল করার জন্য এক প্লেট ঘুগনি সহ একটা ডিম।আজ ভাবি কত সামান্য চাহিদা ছিল তার। অথচ খুব বড়ো মাপের ফুটবলার ছিল সে। সেই সময় তার খেলা যে দেখেছে সেই বলেছে , উপযুক্ত পরিবেশ আর প্রশিক্ষণ পেলে প্রভাত কলকাতার নামী দলগুলোতে খেলার সুযোগ পেত।
তবে কোন বিষয়েই তার আক্ষেপ ছিল না। আসলে প্রভাত ছিল বরাবরই বেহিসেবী। হয়তো আগের দিন টিম জিতেছে।তাই পরের দিন আর কাজে যায় নি সে। মোড়ে শ্রীদাম দে'র মিষ্টির দোকানে কয়েকজন মিলে আড্ডা দিচ্ছি।হঠৎ প্রভাত বলে , খিদে পেয়েছে দাঁড়াও একটা করে মিষ্টি বলি। তারপর কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সবার জন্য একটা করে মিষ্টির অর্ডার দিয়ে বসে। সেটা খাওয়া শেষ হতে না হতেই বলে , না গো খিদেটা আরও বেড়ে গেল। বলে ফের একে একে ৫ টা করে মিষ্টির অর্ডার দিয়ে দেয়। খাওয়া শেষে আমরা সবাই মিলে চাঁদা করে দাম মেটাতে গেলে প্রভাত রেগে কাঁই।বলে , তাহলে আমি গরীব বলে আমার পয়সায় খাবে না তো ? অগত্যা আমাদের হাত গুটিয়ে নিতে হয়।আর প্রভাত আগের দিন মজুর খেটে পাওয়া ৫০ টাকা দিয়ে দাম মিটিয়ে দেয়। আজ ভাবি প্রভাতের সঙ্গে আমাদের অন্তরের কত তফাত।তার থেকে অনেকগুণ অবস্থাপন্ন পরিবারের হওয়া স্বত্ত্বেও কেউ আমরা সেদিন একক ভাবে ওই দাম মেটানোর কথা ভাবতে পারি নি , চাঁদা করে দিতে চেয়েছিলাম। আর প্রভাত তার একদিনের হাড়ভাঙা খাটনির টাকা কেমন হেলায় আমাদের পিছনে খরচ করে দিয়েছিল।
প্রভাত ছিল এরকমই। একদিন হঠাৎ করে বলল , আজ তোমাদের আমার বাড়িতে নিমন্ত্রণ। একটা হাঁস আছে তোমাদের খাওয়াব। প্রভাতকে এড়িয়ে যাওয়ারও উপায় নেই।তাহলে রেগে মেগে যা ইচ্ছা তাই বলে দেবে। অগত্যা আমি বাপি আর উত্তম সন্ধ্যেবেলায় তার বাড়ি গেলাম।মাটির উপরের দোতলায় আমাদের বসিয়ে রান্না বান্নার ব্যবস্থা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল সে।কিছুক্ষণ পরেই উপরেই একটি বাচ্চার কান্না শুনতে পেলাম। ছুটে এলেন প্রভাতের স্ত্রী ।তার মুখেই শুনলাম , বাচ্চাটার কয়েকদিন ধরে জ্বর , পয়সার অভাবে ডাক্তার দেখানো হচ্ছে না। কথাটা শুনেই খুব বিব্রত হয়ে পড়লাম আমরা। টাকার অভাবে যার ছেলের ডাক্তার দেখানো হচ্ছে না , সে কিনা আমাদের হাঁস কেটে খাওয়াচ্ছে ? হাঁসটা বিক্রি করেই তো ডাক্তার দেখানো যেত।সেই কথা তুলতেই প্রভাত বলে , ছাড়ো তো আমাদের বাড়ির ছেলেমেয়ের অসুখ বিসুখে ডাক্তার লাগে না।এমনিতেই সেরে যাবে ।বলাবাহুল্য সেদিন গলা দিয়ে আমাদের খাবার নামছিল না। আসার সময় আমাদের যার কাছে যা টাকা ছিল তা প্রভাতের স্ত্রী'র হাতে তুলে দিতে যেতেই হইহই করে ওঠে প্রভাত। প্রচণ্ড রেগে বলে , তোমরা কি এটা হোটেল পেয়েছো , খেয়ে দাম দিতে আসছ ? সেদিন কার্যত হাতে পায়ে ধরে প্রভাতের স্ত্রী'র হাতে টাকা কটা দিয়ে আসতে পেরেছিলাম।
পরে অবশ্য পুলিশে চাকরি পায় প্রভাত। কিন্তু সেই সুখ তার স্থায়ী হয় নি।বছর চারেক আগে মোটর বাইকে দুর্গাপুরে কাজে যোগ দিতে যাওয়ার পথে ডাম্পারের ধাক্কায় মৃত্যু হয় তার।তার মরদেহ ক্লাবে এনে শোকসভা করা হয়েছিল।আজ প্রভাত নেই , কিন্তু তাকে ঘিরে রয়ে গিয়েছে বহু স্মৃতি। কান পাতলেই যেন শুনতে পাই সেই আবদার , অর্ঘ্যদা গোল করেছি , ডিম ঘুগনি বলো।
জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ জানা লোক বলতে যা বোঝায় দীনুকাকা ছিলেন তাই। তার আসল নাম ছিল দীননাথ প্রামানিক। বাড়ি ছিল ময়ূরেশ্বরের ষাটপলশা। কিন্তু বিবাহসূত্রে থাকতেন ময়ূরেশ্বরেরই কেঁউহাট গ্রামে।আমার বাবার ছাত্র সুনীল মন্ডল , সত্যনারায়ণ রুজদের বন্ধু স্থানীয় ছিলেন দীনুকাকা।সেই সূত্রে আমাদের বাড়িও আসা যাওয়া ছিল তার। আমার বাবাকে বলতেন গুরুদেব।ভারি রসিক মানুষ ছিলেন। সেই জন্য জনপ্রিয়ও ছিলেন।
জীবন জীবিকার তাগিদে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম পেশায় দেখা গিয়েছে তাকে। কখনও সেলুন খুলে চুল দাঁড়ি কেটেছেন তো কখনও কম্পাউন্ডারি করেছেন। রেডিও-টেপ মেরামতের দোকান খোলার পাশাপাশি গান শেখাতেও দেখা গিয়েছে তাকে। ভি,ডি,ও হল করার পাশাপাশি করেছেন ভ্রমণ ব্যবসাও।কিন্তু কোনটাই বেশিদিন স্থায়ী হয় নি।
আমার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে কাকুর আলুর ব্যবসার সুবাদে। আমার ছোটকাকু প্রশান্ত ঘোষ একসময় আলুর আড়ত খুলেছিলেন। দীনুকাকা সেই আড়তের কর্মী ছিলেন। আলুর গাড়ি নিয়ে তখন যেতে হত ওইরঙ্গাবাদ , মালদহ , শিলিগুড়ি প্রভৃতি জায়গায়। প্রতিটি গাড়িতেই আমি আর দিনু কাকা যেতাম। আমাদের কাজ ছিল ওইসব আড়তে আলূু পৌঁছানোর পর আড়তদারের কাছে কিছু টাকা নিয়ে একজন ফিরে আসা। পরে বাকি টাকা নিয়ে আর একজন ফেরা। ট্রাকে যাওয়া থেকে আড়তে থাকার সময় মজার মজার কথা বলে জমিয়ে রাখতেন দীনুকাকা। ট্রাক ডাইভার থেকে আড়তদার , সবাই উপভোগ করত তার কথা। ক্যানসারে বছর পনেরো আগে তার মৃত্যু হয়। আজ দীনুকাকা নেই , কিন্তু তার সঙ্গে কাটানো সেই দিনগুলোর কথা আজও আমার মনে পড়ে।
খুব কাছে থেকে দেখা আদিবাসী সমাজের এক তরুণীর মর্মান্তিক পরিণতির ঘটনা । একসময় ঘটনাটি নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে তোলপাড় হয়েছিল। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমের নজর এড়িয়ে গিয়েছিল অনেক ঘটনা।সেই ঘটনাই তুলে ধরা হয়েছে এই কাহিনীতে। আদিবাসী সমাজের ভাষা আলাদা , কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো ভাবের প্রকাশও আলাদা। কিন্তু দুঃখ , জ্বালা , যন্ত্রণার অভিব্যক্তি মনে হয় মানুষ মাত্রেরই এক।সেই সব জ্বালা যন্ত্রনার অভিব্যক্তি বৃহত্তর সমাজের উপযোগী ভাষা এবং ভাবের প্রকাশ ভঙ্গিতে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র। ত্রুটি -বিচ্যুতি থাকাটাই স্বাভাবিক।তাই সবিনয়ে আগাম মার্জনা চেয়ে নিচ্ছি। একটাই প্রার্থনা , ভালো লাগলে বলুন , বলুন খারাপ লাগলেও।ধন্যবাদ।
কটার কথা
( ৩৯ )
কটার আসল নাম ছিল প্রভাত ভল্লা। তার বাবার নাম ছিল কটা । কিন্তু কি করে যেন কটা হিসাবেই তার পরিচিতি হয়ে উঠেছিল। আসলে নেপালিদের মতো দেখতে আর খুব ফর্সা ছিল সে। সম্ভবত সেই হিসাবেই তাকে সবাই কটা বলত। লোকে ভুলেই গিয়েছিল কটা আসলে তার বাবার নাম।ঘটনা এমনও ঘটেছে , আমরাই অনেক সময় তার বাড়ি গিয়ে তার বাবাকেই জিজ্ঞেস করে বসেছি -- কটা নেই বাড়িতে ? ততদিনে বিষয়টি জানা হয়ে গিয়েছে তার বাবারও। তাই আর আশ্চর্য্য হতেন না। বরং ছেলেকে ডেকে দিয়ে বলতেন -- দেখ কারা সব তোকে ডাকতে এসেছে।
ময়ূরেশ্বরের রসুনপুর গ্রামের এক দিনমজুর পরিবারের ছেলে ছিল প্রভাত। নিজেও প্রথম দিকে দিনমজুরি করত। আমার চেয়ে বয়সে বছর কয়েক বছরের ছোট ছিল। প্রথম দিকে আমাকে অর্ঘ্যদা বলত , শেষের দিকে শুধুই দাদা বলে ডাকত।দিনমজুরি করলেও হৃদয়টা ছিল বিরাট। আর ছিল চরম ফুটবল পাগল। মূলত ফুটবল খেলার সুবাদেই তার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। আমি তখন লোকপাড়া প্রতিবাদ ক্লাবের সম্পাদক ছিলাম। প্রভাত ক্লাবের টিমের ক্যাপটেন ছিল। খেলত মূলত ডিফেন্সে , তবে টিম গোল করতে না পারলে রেগে মেগে বল নিয়ে উঠে গিয়ে নিজে গোল দিয়ে টিমকে জিতিয়ে দিয়েছে। তারজন্যই বহু মাঠে অবধারিত হারের হাত থেকে আমাদের দল রক্ষা পেয়ে চ্যাম্পিয়ান হয়ে ফিরেছে।
অত খেলা পাগল ছেলে খুব কমই দেখা যায়। দিনমজুরি না করলে তার দিন চলত না। কিন্তু কোথাও খেলার খবর পেলেই হল। সকালেই হাজির হয়ে যেত আমার কাছে। ক্লাব থেকে এন্ট্রি ফি দেওয়ার নিশ্চয়তা পেলে সাইকেল নিয়েই চলে যেত আন্দি।সেখানে খোরজুনার অতুল ঘোষের দোকান। অতুল আমাদের টিমে খেলত। অতুলকে নিয়ে ফিরত। দিন এমনও গিয়েছে কোনদিন আন্দি থেকেই সরাসরি খেলার মাঠে চলে যেতে হয়েছে , আবার একবেলা দিনমজুরি করেও যেতে হয়েছে , পেটে ভাতটুকুও জোটে নি , তবু খালি পেটেই মাঠ মাতিয়ে দিয়েছে সে।সে সময় ক্লাবেরও সবদিন মুড়ি-ঘুগনি কিনে দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না। কিন্তু তা নিয়ে প্রভাতকে কখনও অনুযোগ করতে শুনি নি।আমার কাছ কেবল তার আবদার ছিল , প্রতিটি গোল করার জন্য এক প্লেট ঘুগনি সহ একটা ডিম।আজ ভাবি কত সামান্য চাহিদা ছিল তার। অথচ খুব বড়ো মাপের ফুটবলার ছিল সে। সেই সময় তার খেলা যে দেখেছে সেই বলেছে , উপযুক্ত পরিবেশ আর প্রশিক্ষণ পেলে প্রভাত কলকাতার নামী দলগুলোতে খেলার সুযোগ পেত।
তবে কোন বিষয়েই তার আক্ষেপ ছিল না। আসলে প্রভাত ছিল বরাবরই বেহিসেবী। হয়তো আগের দিন টিম জিতেছে।তাই পরের দিন আর কাজে যায় নি সে। মোড়ে শ্রীদাম দে'র মিষ্টির দোকানে কয়েকজন মিলে আড্ডা দিচ্ছি।হঠৎ প্রভাত বলে , খিদে পেয়েছে দাঁড়াও একটা করে মিষ্টি বলি। তারপর কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সবার জন্য একটা করে মিষ্টির অর্ডার দিয়ে বসে। সেটা খাওয়া শেষ হতে না হতেই বলে , না গো খিদেটা আরও বেড়ে গেল। বলে ফের একে একে ৫ টা করে মিষ্টির অর্ডার দিয়ে দেয়। খাওয়া শেষে আমরা সবাই মিলে চাঁদা করে দাম মেটাতে গেলে প্রভাত রেগে কাঁই।বলে , তাহলে আমি গরীব বলে আমার পয়সায় খাবে না তো ? অগত্যা আমাদের হাত গুটিয়ে নিতে হয়।আর প্রভাত আগের দিন মজুর খেটে পাওয়া ৫০ টাকা দিয়ে দাম মিটিয়ে দেয়। আজ ভাবি প্রভাতের সঙ্গে আমাদের অন্তরের কত তফাত।তার থেকে অনেকগুণ অবস্থাপন্ন পরিবারের হওয়া স্বত্ত্বেও কেউ আমরা সেদিন একক ভাবে ওই দাম মেটানোর কথা ভাবতে পারি নি , চাঁদা করে দিতে চেয়েছিলাম। আর প্রভাত তার একদিনের হাড়ভাঙা খাটনির টাকা কেমন হেলায় আমাদের পিছনে খরচ করে দিয়েছিল।
প্রভাত ছিল এরকমই। একদিন হঠাৎ করে বলল , আজ তোমাদের আমার বাড়িতে নিমন্ত্রণ। একটা হাঁস আছে তোমাদের খাওয়াব। প্রভাতকে এড়িয়ে যাওয়ারও উপায় নেই।তাহলে রেগে মেগে যা ইচ্ছা তাই বলে দেবে। অগত্যা আমি বাপি আর উত্তম সন্ধ্যেবেলায় তার বাড়ি গেলাম।মাটির উপরের দোতলায় আমাদের বসিয়ে রান্না বান্নার ব্যবস্থা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল সে।কিছুক্ষণ পরেই উপরেই একটি বাচ্চার কান্না শুনতে পেলাম। ছুটে এলেন প্রভাতের স্ত্রী ।তার মুখেই শুনলাম , বাচ্চাটার কয়েকদিন ধরে জ্বর , পয়সার অভাবে ডাক্তার দেখানো হচ্ছে না। কথাটা শুনেই খুব বিব্রত হয়ে পড়লাম আমরা। টাকার অভাবে যার ছেলের ডাক্তার দেখানো হচ্ছে না , সে কিনা আমাদের হাঁস কেটে খাওয়াচ্ছে ? হাঁসটা বিক্রি করেই তো ডাক্তার দেখানো যেত।সেই কথা তুলতেই প্রভাত বলে , ছাড়ো তো আমাদের বাড়ির ছেলেমেয়ের অসুখ বিসুখে ডাক্তার লাগে না।এমনিতেই সেরে যাবে ।বলাবাহুল্য সেদিন গলা দিয়ে আমাদের খাবার নামছিল না। আসার সময় আমাদের যার কাছে যা টাকা ছিল তা প্রভাতের স্ত্রী'র হাতে তুলে দিতে যেতেই হইহই করে ওঠে প্রভাত। প্রচণ্ড রেগে বলে , তোমরা কি এটা হোটেল পেয়েছো , খেয়ে দাম দিতে আসছ ? সেদিন কার্যত হাতে পায়ে ধরে প্রভাতের স্ত্রী'র হাতে টাকা কটা দিয়ে আসতে পেরেছিলাম।
পরে অবশ্য পুলিশে চাকরি পায় প্রভাত। কিন্তু সেই সুখ তার স্থায়ী হয় নি।বছর চারেক আগে মোটর বাইকে দুর্গাপুরে কাজে যোগ দিতে যাওয়ার পথে ডাম্পারের ধাক্কায় মৃত্যু হয় তার।তার মরদেহ ক্লাবে এনে শোকসভা করা হয়েছিল।আজ প্রভাত নেই , কিন্তু তাকে ঘিরে রয়ে গিয়েছে বহু স্মৃতি। কান পাতলেই যেন শুনতে পাই সেই আবদার , অর্ঘ্যদা গোল করেছি , ডিম ঘুগনি বলো।
----০----
দীনুকাকার কথা
( ৪০ )
জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ জানা লোক বলতে যা বোঝায় দীনুকাকা ছিলেন তাই। তার আসল নাম ছিল দীননাথ প্রামানিক। বাড়ি ছিল ময়ূরেশ্বরের ষাটপলশা। কিন্তু বিবাহসূত্রে থাকতেন ময়ূরেশ্বরেরই কেঁউহাট গ্রামে।আমার বাবার ছাত্র সুনীল মন্ডল , সত্যনারায়ণ রুজদের বন্ধু স্থানীয় ছিলেন দীনুকাকা।সেই সূত্রে আমাদের বাড়িও আসা যাওয়া ছিল তার। আমার বাবাকে বলতেন গুরুদেব।ভারি রসিক মানুষ ছিলেন। সেই জন্য জনপ্রিয়ও ছিলেন।
জীবন জীবিকার তাগিদে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম পেশায় দেখা গিয়েছে তাকে। কখনও সেলুন খুলে চুল দাঁড়ি কেটেছেন তো কখনও কম্পাউন্ডারি করেছেন। রেডিও-টেপ মেরামতের দোকান খোলার পাশাপাশি গান শেখাতেও দেখা গিয়েছে তাকে। ভি,ডি,ও হল করার পাশাপাশি করেছেন ভ্রমণ ব্যবসাও।কিন্তু কোনটাই বেশিদিন স্থায়ী হয় নি।
আমার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে কাকুর আলুর ব্যবসার সুবাদে। আমার ছোটকাকু প্রশান্ত ঘোষ একসময় আলুর আড়ত খুলেছিলেন। দীনুকাকা সেই আড়তের কর্মী ছিলেন। আলুর গাড়ি নিয়ে তখন যেতে হত ওইরঙ্গাবাদ , মালদহ , শিলিগুড়ি প্রভৃতি জায়গায়। প্রতিটি গাড়িতেই আমি আর দিনু কাকা যেতাম। আমাদের কাজ ছিল ওইসব আড়তে আলূু পৌঁছানোর পর আড়তদারের কাছে কিছু টাকা নিয়ে একজন ফিরে আসা। পরে বাকি টাকা নিয়ে আর একজন ফেরা। ট্রাকে যাওয়া থেকে আড়তে থাকার সময় মজার মজার কথা বলে জমিয়ে রাখতেন দীনুকাকা। ট্রাক ডাইভার থেকে আড়তদার , সবাই উপভোগ করত তার কথা। ক্যানসারে বছর পনেরো আগে তার মৃত্যু হয়। আজ দীনুকাকা নেই , কিন্তু তার সঙ্গে কাটানো সেই দিনগুলোর কথা আজও আমার মনে পড়ে।
( চলবে )
পড়ুন / পড়ান
নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন
১৯ নভেম্বর থেকে প্রতিদিন সকাল ১০ টার মধ্যে প্রকাশিত হচ্ছে
ধারাবাহিক উপন্যাস
সালিশির রায়
সালিশি সভার রায়ে সর্বস্ব হারানো এক আদিবাসী তরুণীর ঘুরে দাঁড়ানোর , অন্যকে দাঁড় করানোর মর্মস্পর্শী কাহিনী অবলম্বনে ধারাবাহিক উপন্যাস --
খুব কাছে থেকে দেখা আদিবাসী সমাজের এক তরুণীর মর্মান্তিক পরিণতির ঘটনা । একসময় ঘটনাটি নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে তোলপাড় হয়েছিল। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমের নজর এড়িয়ে গিয়েছিল অনেক ঘটনা।সেই ঘটনাই তুলে ধরা হয়েছে এই কাহিনীতে। আদিবাসী সমাজের ভাষা আলাদা , কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো ভাবের প্রকাশও আলাদা। কিন্তু দুঃখ , জ্বালা , যন্ত্রণার অভিব্যক্তি মনে হয় মানুষ মাত্রেরই এক।সেই সব জ্বালা যন্ত্রনার অভিব্যক্তি বৃহত্তর সমাজের উপযোগী ভাষা এবং ভাবের প্রকাশ ভঙ্গিতে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র। ত্রুটি -বিচ্যুতি থাকাটাই স্বাভাবিক।তাই সবিনয়ে আগাম মার্জনা চেয়ে নিচ্ছি। একটাই প্রার্থনা , ভালো লাগলে বলুন , বলুন খারাপ লাগলেও।ধন্যবাদ।




দারুন লাগে ॥ কখনও দুঃখ কখনও আনন্দ আবার কখনও কান্নাও পায় ॥ ভীষণ ভাল লাগছে ॥
ReplyDelete