অর্ঘ্য ঘোষ
( এই কলমে এমনই কিছু হারিয়ে যাওয়া মানুষের কথা ধারাবাহিক ভাবে তুলে ধরা হবে যারা নিতান্তই প্রান্তজীবি। বৃহত্তর সমাজে তাদের স্থান নেই বলেলেই চলে। তাদের জন্ম মৃত্যু এমনকি আসল নামও আজ সংগ্রহ করা কঠিন।তাদের পরিবারের লোকেরাও সে তথ্য ঠিকঠাক দিতে পারেন নি।প্রচলিত নামেই তারা আজও এলাকার কারও কারও মনে ধুসর স্মৃতি হয়ে রয়েছেন। স্মৃতির চাদর সরালেই অবয়বটা স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। আমার ছোটবেলায় দেখা মনের মণিকোঠায় ঠাঁই করে নেওয়া ওইসব চরিত্রের সঙ্গে আপনিও মিল খুঁজে পেতে পারেন আপনার দেখা কোন মানুষের মধ্যে )
তার নাম আজিদ না অজিত তা নিয়ে এলাকায় যথেষ্ট মতানৈক্য রয়েছে। তবে তার ভাই মজিদের সঙ্গে আজিদ হিসাবেই তার নাম সমোচ্চারিত হয়। তার পোশাকি নাম ছিল আজিদ সেখ। ময়ূরেশ্বরের রামকৃষ্ণপুর গ্রামে ছিল তার বাড়ি। পেশায় ছিলেন রাজমিস্ত্রী। সেই সুবাদেই তার সঙ্গে আমাদের চেনাশোনা।
তিনি আমাদের একটা ছোট্ট বাড়ি তৈরি করেছিলেন। সেই থেকেই বাবার খুব প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন। বাবা তার স্বীকৃতিও দিয়েছিলেন। ছোটবেলায় দেখেছি আমাদের বাড়ির সদর দরজার মাথার উপর সিমেণ্ট দিয়ে খোদাই করে লেখা ছিল ' প্রভাত --মিঠু ভিলা ( আমার বাবা- মায়ের নাম)। নিচের লাইনে অপেক্ষাকৃত ছোট হরফে নির্মাতা হিসাবে ছিল আজিদের নাম। সে সময় আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে ছিল পায়ে চলার রাস্তা। সেই রাস্তা দিয়ে আমার প্রাইমারি স্কুলের বন্ধুরা যাতায়াত করতে। যাওয়া আসার পথে লেখাটা দেখে দেখে তাদের মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। তারা আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলত -- ' প্রভাত - মিঠু ভিলা আজিদ।
১৯৭৮ সালের বন্যায় সেই তোরণ ভেঙে যায়। তারপরেও বাবা আজিদকাকুকে ডেকে ফের নির্মাণ করতে বলেছিলেন। কিন্তু অসুস্থতার কারণে তিনি তা করতে পারেন নি। তিনি ভালো লড়িয়েও ছিলেন। নিজের ভাইয়ের সঙ্গেও লড়াই করেছেন। তাই লড়াইয়ের ঢোল বাজলেই হাজির হয়ে যেতাম মাঠে। আজিদকাকু কাউকে চিৎ করলেই হাত তালি দিয়ে উঠতাম। তারপর যখন উদ্যোক্তারা তার গলায় মেডেল পড়িয়ে দিতেন তখন মনে হত যেন আমিই মেডেল জিতেছি।
যে সবদিন বাবা লড়াই দেখতে যেতে পারতেন না সেইসব দিন মেডেল নিয়ে আজিদকাকু আসতেন আমাদের বাড়িতে। তখন আমার তাকে রামায়ণের গল্পে শোনা যোদ্ধাদের মতো মনে হতো। আমি তখন কাছে পিঠে থাকলে মেডেলটা পড়িয়ে দিতেন আমার গলায়। আমার কেমন যেন চাপা গর্ব অনুভব হত।যে লোকেটাকে লড়াইয়ের মাঠে সবাই সপ্রশংস দৃষ্টিতে দেখছিল সেই লোকটাই আমাদের এক কাছের ভেবে নিজেকে রীতিমতো সৌভাগ্যবান মনে হোত। আজ তিনি নেই , কিন্তু সত্যিই কি নেই ? মন অন্তত সে কথা বলে না ।
নানাদাদুর কথা
( ১৯ )
লোকে তাকে বলত নারাণ মোড়ল । পোশাকি নাম ছিল নারায়ণ মণ্ডল। আমরা নানাদাদু বলে ডাকতাম। বেঁটে খাটো চেহারার মানুষটির একটি চোখ ছিল সাদা। কোনও কারণে ছোটবেলায় নাকি নষ্ট হয়ে যায় ওই চোখ। নানাদাদুর বাড়ি ছিল মুর্শিদাবাদ জেলার বড়ঞা থানা এলাকার রুইগ্রামে। ঢেকা গ্রামে ছিল তার বোনের বাড়ি। সেই সূত্রে ওই গ্রামে তার যাতায়াত ছিল।নিজে ঘর সংসার করেন নি।কিন্তু ছিলেন ভাগ্নে অন্তপ্রাণ। আমার দাদামশাই ( দাদুর বাবা ) হৃষীকেশ ঘোষ তাকে আমাদের জমি সম্পত্তি দেখভালের জন্য নিয়োগ করেন।
দাদু - ঠাকুরমার মুখে শুনেছি নিজে ঘর সংসার না করলেও আমার বাবা-কাকাদের সন্তান স্নেহে মানুষ করেছেন। পরবর্তীকালে অবশ্য তিনি আমাদেরই নিকট আত্মীয় বিশিষ্ট ডাক্তার দূর্গাচরণ ঘোষের বাড়িতে ম্যানেজার হিসাবে নিযুক্ত হন। কিন্তু আমাদের পরিবারের প্রতি তার আনুগত্য ছিল অটুট।আমাকেও নিজের নাতির মতোই স্নেহ করতেন।
সে সময় ডাক্তারদাদুদের বাড়িতে অনেক গাই গরু ছিল। প্রচুর দুধ হত , আর হত সর। সেই সর নানাদাদু বাটি ভর্তি করে তুলে রাখতেন। প্রতিদিন সকালে এসেই আমাকে বগলদাবা করে নিয়ে যেতেন। তারপর সেই সর মেখে মুড়ি দিতেন। আমি ভালো বাসতাম বলে রসকরা ( চিনির নারকেল নারু ) করে বয়ামে ভরে রাখতেন। তারপর কাজে বেরোনোর আগে আমাকে আবার ঘাড়ে করে আমাদের বাড়িতে পৌঁচ্ছে দিয়ে যেতেন।
সে সময় আমাদের নিজের বাড়িতে কোন টিউবওয়েল ছিল না। তাই মা আমাকে তেল মাখিয়ে স্নান করাতে নিয়ে যেতেন ডাক্তারদাদুদের বাড়ি। কাজ না থাকলে নানাদাদু আমার স্নানের জল টিপে দিতেন। তারপর কোনদিন নানাদাদুর কাছেই ভাত খেয়ে ফিরতাম। কোনদিন বা মোটা মাছের মাথাটা নানাদাদু আমার জন্য বাটিতে ভরে তুলে দিতেন মায়ের হাতে।নানাদাদুর রান্নার হাতটি ছিল বড়ো চমৎকার। তাই আমার বাবা-কাকাদেরও মাঝে মধ্যে নানাদাদুর হেঁসেলে ঢুঁ মারতে দেখছি।
সেসময় সন্ধ্যেবেলায় ডাক্তারদাদুদের বৈঠকখানার বারন্দায় দাদু কিম্বা বাবা-কাকাদের তাস - দাবার আসর বসত। নানাদাদুর কাজ ছিল হারিকেন জালিয়ে , শতরঞ্জ বিছিয়ে সেই আসরের ব্যবস্থা করে দেওয়া। মাঝে মধ্যে চায়ের যোগান , হুকোয় আগুনও দিতে হত তাকে। তার একটা চকচকে পিতলের লাইটার ছিল। কেন জানি না সেই লাইটটার প্রতি আমার খুব লোভ ছিল। একদিন হুকোয় আগুন দিয়ে নানাদাদু সেই লাইটারটা শতরঞ্জে নামিয়ে রেখে চা আনতে গিয়েছেন, আর সুযোগ বুঝে সেটা পকেটে পুরে নিয়েছি। সেদিন আর নানাদাদুর লাইটারের কথা মনে পড়ে নি।
কিন্তু বাড়িতে এসে বাবা - মায়ের কাছে ধরা পড়ে গিয়েছিলাম। খুব এক প্রস্ত বকাবকিও খেয়েছিলাম। পরেরদিন স্নান করতে নিয়ে যাওয়ার সময় মা নানাদাদুর হাতে সেই লাইটারটা ফিরিয়ে দিয়ে কুণ্ঠার সঙ্গে বলেছিলেন , কাকা আপনার নাতি কাল এই লাইটারটা নিয়ে পালিয়েছিল।লাইটারটা একপলক দেখেই নানাদাদু সঙ্গে সঙ্গে বলেছিলেন , নিয়ে পালিয়েছিল তোমাকে কে বলল বৌমা , আমিই তো ওকে রাখতে দিয়ে চেয়ে নিতে ভুলে গিয়েছিলাম।
মায়ের আর বুঝতে বাকি থাকে নি নানাদাদু আমাকে শাস্তির হাত থেকে বাঁচানোর জন্য মিথ্যা বলছেন। তাই নানাদাদুর সামনেই মা সেদিন বলেছিলেন , দিনরাত পাখি পড়ার মতো করে পড়ানো হচ্ছে , ' না বলিয়া পরের জিনিস নেওয়া পাপ।তবু কিছু শেখে না।' নানাদাদু বলেছিলেন -- বৌমা , আমি কি ওর পর ? তোমরা হয়তো আমাকে নিজের ভাবতে পারো না , কিন্তু দাদুভাই আমাকে পর ভাবে না , কি দাদুভাই তাই তো ? আমি কোন কথা বলতে পারি নি , নানাদাদুকে জড়িয়ে ধরে ' ভ্যা ' করে কেঁদে ফেলেছিলাম। নানাদাদু আমাকে কাঁধে তুলে নাচাতে নাচাতে সেই কান্না থামিয়েছিলেন। আজ নানাদাদু পৃথিবীতে নেই , কিন্তু আমার অন্তরে ভীষণভাবে রয়ে গিয়েছেন।
সেসময় সন্ধ্যেবেলায় ডাক্তারদাদুদের বৈঠকখানার বারন্দায় দাদু কিম্বা বাবা-কাকাদের তাস - দাবার আসর বসত। নানাদাদুর কাজ ছিল হারিকেন জালিয়ে , শতরঞ্জ বিছিয়ে সেই আসরের ব্যবস্থা করে দেওয়া। মাঝে মধ্যে চায়ের যোগান , হুকোয় আগুনও দিতে হত তাকে। তার একটা চকচকে পিতলের লাইটার ছিল। কেন জানি না সেই লাইটটার প্রতি আমার খুব লোভ ছিল। একদিন হুকোয় আগুন দিয়ে নানাদাদু সেই লাইটারটা শতরঞ্জে নামিয়ে রেখে চা আনতে গিয়েছেন, আর সুযোগ বুঝে সেটা পকেটে পুরে নিয়েছি। সেদিন আর নানাদাদুর লাইটারের কথা মনে পড়ে নি।
কিন্তু বাড়িতে এসে বাবা - মায়ের কাছে ধরা পড়ে গিয়েছিলাম। খুব এক প্রস্ত বকাবকিও খেয়েছিলাম। পরেরদিন স্নান করতে নিয়ে যাওয়ার সময় মা নানাদাদুর হাতে সেই লাইটারটা ফিরিয়ে দিয়ে কুণ্ঠার সঙ্গে বলেছিলেন , কাকা আপনার নাতি কাল এই লাইটারটা নিয়ে পালিয়েছিল।লাইটারটা একপলক দেখেই নানাদাদু সঙ্গে সঙ্গে বলেছিলেন , নিয়ে পালিয়েছিল তোমাকে কে বলল বৌমা , আমিই তো ওকে রাখতে দিয়ে চেয়ে নিতে ভুলে গিয়েছিলাম।
মায়ের আর বুঝতে বাকি থাকে নি নানাদাদু আমাকে শাস্তির হাত থেকে বাঁচানোর জন্য মিথ্যা বলছেন। তাই নানাদাদুর সামনেই মা সেদিন বলেছিলেন , দিনরাত পাখি পড়ার মতো করে পড়ানো হচ্ছে , ' না বলিয়া পরের জিনিস নেওয়া পাপ।তবু কিছু শেখে না।' নানাদাদু বলেছিলেন -- বৌমা , আমি কি ওর পর ? তোমরা হয়তো আমাকে নিজের ভাবতে পারো না , কিন্তু দাদুভাই আমাকে পর ভাবে না , কি দাদুভাই তাই তো ? আমি কোন কথা বলতে পারি নি , নানাদাদুকে জড়িয়ে ধরে ' ভ্যা ' করে কেঁদে ফেলেছিলাম। নানাদাদু আমাকে কাঁধে তুলে নাচাতে নাচাতে সেই কান্না থামিয়েছিলেন। আজ নানাদাদু পৃথিবীতে নেই , কিন্তু আমার অন্তরে ভীষণভাবে রয়ে গিয়েছেন।
-----০----
আজিদ মিস্ত্রির কথা
( ২০ )
তার নাম আজিদ না অজিত তা নিয়ে এলাকায় যথেষ্ট মতানৈক্য রয়েছে। তবে তার ভাই মজিদের সঙ্গে আজিদ হিসাবেই তার নাম সমোচ্চারিত হয়। তার পোশাকি নাম ছিল আজিদ সেখ। ময়ূরেশ্বরের রামকৃষ্ণপুর গ্রামে ছিল তার বাড়ি। পেশায় ছিলেন রাজমিস্ত্রী। সেই সুবাদেই তার সঙ্গে আমাদের চেনাশোনা।
তিনি আমাদের একটা ছোট্ট বাড়ি তৈরি করেছিলেন। সেই থেকেই বাবার খুব প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন। বাবা তার স্বীকৃতিও দিয়েছিলেন। ছোটবেলায় দেখেছি আমাদের বাড়ির সদর দরজার মাথার উপর সিমেণ্ট দিয়ে খোদাই করে লেখা ছিল ' প্রভাত --মিঠু ভিলা ( আমার বাবা- মায়ের নাম)। নিচের লাইনে অপেক্ষাকৃত ছোট হরফে নির্মাতা হিসাবে ছিল আজিদের নাম। সে সময় আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে ছিল পায়ে চলার রাস্তা। সেই রাস্তা দিয়ে আমার প্রাইমারি স্কুলের বন্ধুরা যাতায়াত করতে। যাওয়া আসার পথে লেখাটা দেখে দেখে তাদের মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। তারা আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলত -- ' প্রভাত - মিঠু ভিলা আজিদ।
১৯৭৮ সালের বন্যায় সেই তোরণ ভেঙে যায়। তারপরেও বাবা আজিদকাকুকে ডেকে ফের নির্মাণ করতে বলেছিলেন। কিন্তু অসুস্থতার কারণে তিনি তা করতে পারেন নি। তিনি ভালো লড়িয়েও ছিলেন। নিজের ভাইয়ের সঙ্গেও লড়াই করেছেন। তাই লড়াইয়ের ঢোল বাজলেই হাজির হয়ে যেতাম মাঠে। আজিদকাকু কাউকে চিৎ করলেই হাত তালি দিয়ে উঠতাম। তারপর যখন উদ্যোক্তারা তার গলায় মেডেল পড়িয়ে দিতেন তখন মনে হত যেন আমিই মেডেল জিতেছি।
যে সবদিন বাবা লড়াই দেখতে যেতে পারতেন না সেইসব দিন মেডেল নিয়ে আজিদকাকু আসতেন আমাদের বাড়িতে। তখন আমার তাকে রামায়ণের গল্পে শোনা যোদ্ধাদের মতো মনে হতো। আমি তখন কাছে পিঠে থাকলে মেডেলটা পড়িয়ে দিতেন আমার গলায়। আমার কেমন যেন চাপা গর্ব অনুভব হত।যে লোকেটাকে লড়াইয়ের মাঠে সবাই সপ্রশংস দৃষ্টিতে দেখছিল সেই লোকটাই আমাদের এক কাছের ভেবে নিজেকে রীতিমতো সৌভাগ্যবান মনে হোত। আজ তিনি নেই , কিন্তু সত্যিই কি নেই ? মন অন্তত সে কথা বলে না ।



No comments:
Post a Comment