অন্যরকম
( বোলপুরে ভিক্ষাজীবির বাড়িতে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সদস্যরা )
কোথাও সামান্য কিছু চাল ডাল আর সবজিপাতি । কোথাও বা একটা সস্তার কম্বল আর গোটা পঞ্চাশেক টাকা । তাতেই বেশ কিছু মুখে ওঁরা ফুটিয়ে তুললেন অমুল্য হাসি । ওঁদের একজন ছোট্ট একটা মুদিখানার দোকানদার তামালকান্তি দাস । অন্যজন লাভপুরের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্ণধার অশোক মন্ডল।
তামালবাবুর নিজের সংসারেই নুন আনতে পান্তা
ফুরনোর হাল । তবুও ২০ জন ভিক্ষাজীবির হাতে শীতবস্ত্র তুলে দিলেন তিনি।সাঁইথিয়ার
মৃতদাসপুরে তাদের অভাবের সংসার । যৎসামান্য জমিভাগ চাষ আর একটি ছোট্ট মুদিখানার
দোকানের উপরের নির্ভর করেই চলে তার মা-স্ত্রী ,মেয়ে সহ ৮ সদস্যের যৌথ পরিবার । সব
মিলিয়ে মাসিক হাজার তিনেক টাকাও আয় হয় না । তার ফলে সংসারে অভাব লেগেই রয়েছে ।
কিন্তু সব তুচ্ছ করে এদিন তিনি ২০ জন ভিক্ষারীর হাতে একটি করে কম্বল সহ নগদ ৫০
টাকা করে তুলে দেন ।
দুঃস্থদের
প্রতি সহমর্মিতা অবশ্য এই প্রথম নয় । মৃতদাসপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক দেবজিৎ
চট্টোপাধ্যায় , অরুণ মণ্ডলরা জানান , দুঃস্থ ছেলেমেয়েদের বইপত্র কিনে দেওয়া থেকে
শুরু করে দুঃস্থ রোগীদের হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া , ওষুধের ব্যবস্থা করার মতো
পরপোকার নিজের সাধ্যের বাইরে গিয়েও করেন তামালবাবু । নিজের আর্থিক দৈন্যতার কথা
ভাবেন না ।
( তামালবাবুর দোকানে ভিক্ষাজীবিরা )
তামালবাবুর
মা সন্ধ্যাদেবী জানান , ছোটবেলায় স্বামীকে হারিয়ে ওকে অনেক কষ্ট করে মানুষ করেছি ।
দুঃস্থদের কষ্টটা ও মর্মে মর্মে জানে । তাই যতটা পারে পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে ।
সংসারে হাজারো অভাব থাকলেও আমরা কোনদিন আপত্তি তুলি নি , বরং উৎসাহিত করেছি।
তামালবাবু
জানান , প্রতিবারই শীতে ভিক্ষারীদের কাঁপতে কাঁপতে ভিক্ষা করতে দেখি । তখনই মনে
মনে ঠিক করেছিলাম ওদের একটা করে শীতবস্ত্র দেব । ভিক্ষাজীবি
শ্যামাপদ দাস , মধুবালা দাস , নমিতা দাসরা জানান , আমাদের কথা এভাবে তো এর আগে তো
কেউ ভাবে নি । ঈশ্বর ওর মঙ্গল করবেন।
অন্যদিকে অশোকবাবুও দুঃখ কষ্টকে খুব কাছে থেকে দেখেছেন । তাই নিজের সাধ্যমতো মানুষের দুঃখ দুর করার চেষ্টা করেন । সেইজন্যই অন্যের সহযোগিতায় লাভপুরের ইন্দাস জয়দুর্গা রুর্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি নামে একটা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা গড়ে তুলেছেন । এবারের পুজোয় ওই সংস্থার পক্ষ থেকে এক হাজার দুঃস্থ শিশুকে পোশাক দেওয়া হয়েছে । সম্প্রতি বোলপুরের নীলডাঙ্গা আদিবাসী পাড়ার ভিক্ষাজীবি ভাদু হাঁসদার বাড়িতে গিয়ে ১ মাসের প্রয়োজনীয় সমস্ত রকম খাদ্য সামগ্রী পৌঁচ্ছে দিয়ে এসেছেন তারা।
ভাদু হাঁসদা শারীরিক ভাবে অক্ষম । সবদিন ভিক্ষায় বেরোতে পারেন না। সেদিন কার্যত অনাহারে কাটে ভাদু আর তার স্ত্রীর । তাই তাদের বাড়িতে ওই খাদ্য সামগ্রী পৌঁচ্ছে দিয়েছেন সংস্থার সদস্যরা। আর সেই সাহার্য্য পেয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন ওই আদিবাসী ভিক্ষাজীবি । কোন রকমে কেবল বলতে পারেন , এখন মাঝে মধ্যে দু-একদিন ভিক্ষা করতে যেতে না পারলেও আমাদের আর না খেয়ে থাকতে হবে না। অশোকবাবু জানান , কিছু কিছু মানুষের চাহিদা এত কম , অথচ সেটুকুর নাগালও তারা পান না । সেটুকু পেলে তাদের মুখে যে স্বর্গীয় হাসি ফুটে ওঠে তা দেখার সৌভাগ্য যদি সবার হতো তাহলে পৃথিবীটার চালচিত্রই বদলে যেত।
আমরাও কি সামর্থ্য অনুযায়ী সেই সামর্থ্যের অধিকারি হতে পারি না ? মাঝে মধ্যে একটু অন্যরকম হতে ?
----০----


No comments:
Post a Comment