অর্ঘ্য ঘোষ
( এই কলমে এমনই কিছু হারিয়ে যাওয়া মানুষের কথা ধারাবাহিক ভাবে তুলে ধরা হবে যারা নিতান্তই প্রান্তজীবি। বৃহত্তর সমাজে তাদের স্থান নেই বলেলেই চলে। তাদের জন্ম মৃত্যু এমনকি আসল নামও আজ সংগ্রহ করা কঠিন।তাদের পরিবারের লোকেরাও সে তথ্য ঠিকঠাক দিতে পারেন নি।প্রচলিত নামেই তারা আজও এলাকার কারও কারও মনে ধুসর স্মৃতি হয়ে রয়েছেন। স্মৃতির চাদর সরালেই অবয়বটা স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। আমার ছোটবেলায় দেখা মনের মণিকোঠায় ঠাঁই করে নেওয়া ওইসব চরিত্রের সঙ্গে আপনিও মিল খুঁজে পেতে পারেন আপনার দেখা কোন মানুষের মধ্যে )
মাসকাকুর আসল নাম ছিল বাসুদেব রাজ। বাড়ি ছিল মুর্শিদাবাদের বেলডাঙ্গা গ্রামে । মাছ চাষের ব্যবসা করতে এসেছিলেন আমাদের এলাকায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের বড়ো অংশকেই কাকা বলে সম্বোধন করতেন। দেখাদেখি তাকেও অধিকাংশ জন বিশেষত ছোটরা কাকু বলে সম্বোধন করত। মাছকে তিনি সাধারণ ' মাস ' বলতেন। আর তা থেকেই তার পরিচিতি হয়ে যায় মাসকাকু হিসাবে।
পরবর্তীকালে স্থানীয় ষাটপলশায় বিয়ে এবং কুমারপুরে বাড়ি করে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। চরম দৈন্যের সঙ্গে নিত্যদিন লড়াই করেছেন।সবার সঙ্গে সহজ ভাবে মিশতে পারতেন। অবস্থাপন্নদের মোটরবাইক কিম্বা ঘোড়ায় তাকে যেমন সওয়ার হতে দেখেছি , তেমনই জেলেদের সঙ্গে পুকুরে নেমে জাল টানতেও দেখেছি। দাম কিছুটা বেশি পাওয়ার জন্য সাইকেলের পিছনে হাঁড়ি বেঁধে দুর-দূরান্তের আড়তে মাছ নিয়ে গিয়েছেন। অনেকে তাই নিয়ে তাকে নানা তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেছেন। কিন্তু তিনি সব হাসিমুখে উড়িয়ে দিয়েছেন।
হয়তো তীব্র অপমান বোধ তাকে বিদ্ধ করেছে , আমরা সেদিন কেউ সেই খবর রাখার প্রয়োজন মনে করি নি। তিনি নীলকণ্ঠের মতো হজম করতে বাধ্য হয়েছেন সেই জ্বালা। কারণ যারা তাকে অপমান করতেন তাদের তাকে না হলেও চলে যেত , কিন্তু তার যে তাদের না হলে চলত না।কারণ অপমানের চেয়েও পেটের জ্বালা যে অনেক বেশি। তারই মাছ চাষের আয়ের উপর নির্ভর ছিল দুই ছেলের লেখাপড়া সহ ৪ সদস্যের সংসার। তাই হাসি দিয়েই তাকে আড়াল করে রাখতে হতো বোবা কান্না।
বেশি পুঁজি ছিল না। তাই প্রথমদিকে কোন পুকুর ঠিকায় চাষ করার জন্য নিতে পারতেন না। মূলত মাছ কেনাবেচারই ব্যবসা করতেন।সম্ভবত প্রথম ঢেকায় একটি পুকুর ঠিকায় নিয়েছিলেন।সেই পুকুরের মাছ আগলানো নিয়ে একটা মজার ঘটনার কথা প্রচলিত রয়েছে। একে বাইরে থেকে এসেছেন , তার উপরে একটু নিরীহ প্রকৃতির ছিলেন বলে তার পুকুরে মাছ চুরি বিশেষ করে ছিপে মাছ ধরার প্রবণতটা ছিল বেশি। একদিন বিকালে তাই ওইসব মাছ শিকারীদের ধরার জন্য মাসকাকু পুকুর পাড়ে যান। গিয়ে দেখেন চারিদিকে কেউ ছিপ কেউ বা খোঁচা হাতে মাছ ধরছেন।
তিনি তখন তাদের ভয় দেখানোর জন্য বলেন , আজ আর কোন শালার ছাড়ান নাই। ওসিকে বলাই আছে , সব ক'টার নামে একটা করে কেস ঠুকে দিয়ে চলে আসব।বলা বাহুল্য তার ওই কথা শুনে কার কোন হেলদোলই হয় না।কারণ সবাই তো জানে , মাসকাকু আর যাই করুক না কেন তাদের নামে কেস করবে না। তখন তিনি বলেন , তোদের লজ্জাও হয় না। তাতেও কোন কাজ হয় না , কিন্তু মাসকাকু নিজেই লজ্জায় পড়ে যান। মুখ ঘুরিয়ে দেখেন , ছিপ হাতে বসে রয়েছন সম্ভ্রান্ত এক ব্যক্তি।তখন আর মুখ লুকানোর জায়গা পান না তিনি। কোনরকমে বলেন , অঃ কাকু আপনি ? ধরুন ধরুন যত ইচ্ছে ধরুন। আপনি তো শখ করে ধরছন।তারপরেই পুকুর পাড় থেকে চলে আসেন। এই ছিলেন মাস কাকু।
মাছ চাষ করেই দুই ছেলেকে মানুষ করেছেন। তাদের একজন ব্যবসা করে । অন্যজন টিউশানি পড়ায়।আজ মাসকাকু নেই।কিন্তু ভুলি নি তার কথা।
ডাক্তারদাদুর আসল নাম ছিল দিবাকর সরখেল। আসল বাড়ি ছিল মুর্শিদাবাদ জেলার গুণানন্দবাটি। আমার জন্মের আগে তিনি লোকপাড়া গ্রামে আসেন।সেই অর্থে পাশ করা ডাক্তার না হলেও গুণানন্দবাটি সংলগ্ন এলাকায় তার চিকিৎসার সুখ্যাতি ছিল। আত্মীয়তার সুবাদে ওই গ্রামে তখন যাতায়াত ছিল লোকপাড়া লাগোয়া বজরহাট গ্রামের বাসিন্দাদের। তারা ডাক্তারবাবুকে গিয়ে লোকপাড়া এলাকায় চেম্বার খোলার জন্য অনুরোধ করেন। ডাক্তারবাবু তাদের বলেন থাকার ব্যবস্থা করে দিলে তিনি যেতে রাজী আছেন। বজরহাট গ্রামের বাসিন্দারা তখন তাদের পরিকল্পনার কথা খুলে বলেন লোকপাড়া গ্রামের বিশিষ্ট ব্যক্তি মোতিলাল ঘোষকে। মোতিলালবাবু চেম্বার সহ ডাক্তারবাবুর থাকার ব্যবস্থা করে দেন তার বৈঠকখানায়। তারপর আলাদা জায়গাও দেন বাড়ি করার জন্য । সেই জায়গায় মোতিলালবাবু , বজরহাট সহ অন্যান্য গ্রামবাসীদের সহযোগিতায় গড়ে উঠে ডাক্তারদাদুর বাড়ি সহ নিজস্ব ডিসপেনসারি।
সেই ডিসপেনসারির কথা আজও আমার স্পষ্ট মনে পড়ে। মাটির ঘরের দোতলার উপরে ছিল তার ডিসপেনসারি। সারা মেঝেময় ওষুধ আর ওষুধ।জোলাপ, পেনিসিলিনের তীব্র গন্ধ। যখন যেতাম দেখতাম ডাক্তারদাদু খলনুড়ি দিয়ে ওষুধ গুড়ছেন নয়তো কাঁচি দিয়ে কাগজ কেটে কেটে বোতলে ওষুধ মাপের জন্য সাঁটাচ্ছেন। বসে বসে তাই দেখতাম।আসার সময় বলতেন , হাঁ কর। তারপর মুখে বোতল থেকে খানিকটা সিরাপ ঢেলে দিতেন। সেই স্বাদ যেন এখনো মুখে লেগে আছে। বলা বাহুল্য সিরাপের লোভই ডাক্তারদাদুর দোতলায় টেনে নিয়ে যেত আমাকে।
ডাক্তারদাদুর সঙ্গেই জড়িয়ে আছে তার ঘোড়ার স্মৃতি। ডাক্তারদাদুর যেমন দশাসই চেহারা ছিল তেমনই ছিল তার বিশাল ঘোড়া। তা নিয়ে আমাদের একটা চাপা গর্বও ছিল। পাশের কুলিয়ারা গ্রামের ডাক্তার রমাপতি চট্টোরাজেরও ঘোড়া ছিল।কিন্তু তার ঘোড়া ছিল তুলনামূলক খর্বকায়। সে সময় কুলিয়ারা গ্রামে স্কুল ছিল না।ওই গ্রামের ছেলেমেয়েরা আমাদের গ্রামের স্কুলে পড়তে আসত। ডাক্তারদাদুর বাড়ির কাছেই ছিল আমাদের প্রাইমারি স্কুল। তখন তাদের সঙ্গে ঘোড়া নিয়ে তর্ক বেঁধে যেত। আমরা বলতাম আমাদের ঘোড়া ভালো, ওরা বলত ওদের। কত মধুর ছিল সেইসব দিন। পাড়ার ডাক্তারবাবুর ঘোড়াকেও কেমন নিজেদের ভাবতে পারতাম। কোন ভেদবুদ্ধি মাথায়ই আসত। না ওদের, না আমাদের। সেই ঘোড়া নিয়ে আমাদের বাড়িতে প্রায়ই বেড়াতে আসতেন ডাক্তারদাদু। ফেরার সময় আমাকে ঘোড়ার পিঠে চাপিয়ে লাগাম ধরে কিছুদুর হেঁটে হেঁটে যেতেন তিনি। ডাক্তারদাদুর মতো ঘোড়াটা ছিল ভালো। দিব্যি আমাকে কাঁধে নিয়ে থাকত , কিছু করত না। সেইসব দিন পাড়া আর স্কুলের বন্ধুদের কাছে আমার প্রেস্টিজটাই যেন বেড়ে যেত। ঘোড়ায় চাপার অভিজ্ঞতা ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে সাতকাহন করে গল্প করতাম।
একবার শেষ পৌষমাসের রাতে ডাক্তারদাদুর সেই ঘোড়াটা চুরি হয়ে যায়। ডাক্তারদাদুর খুব মন খারাপ হয়ে যায়। আমারও মন খারাপ হয়েছিল। কত চেপেছি ঘোড়াটার পিঠে। পরে অবশ্য ডাক্তারদাদু আবার একটা ঘোড়া কেনেন। ঘোড়ায় চেপে দুর -দুরান্তে ডাকে যেতেন তিনি। রাত-বিরাতে তার ঘোড়ার খুরের শব্দ শোনা যেত। চাহিদা বিশেষ কিছু ছিল না। যে যা হাতে তুলে দিতেন তাই নিতেন ।একটু পেটুক স্বভাবের ছিলেন , তাই নগদ টাকা পয়সার বদলে বাড়ির হাঁস-মুরগির ডিম , আলুটা - মুলোটা দিলেই বেশি খুশি হতেন।
শেষের কয়েকটা মাস তার ইজিচেয়ারে কেটেছে। পড়ে গিয়ে পক্ষঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তখন দেখতাম তার ঘোড়ার চোখে জল গড়াচ্ছে।জল তার চোখেও। আজ তিনি নেই , কিন্তু সেই ছবিটা যেন আজও চোখের সামনে ভাসে। আমি বসে আছি ঘোড়ার পিঠে , লাগাম ধরে সামনে হেঁটে চলেছেন ডাক্তারদাদু।
খুব কাছে থেকে দেখা আদিবাসী সমাজের এক তরুণীর মর্মান্তিক পরিণতির ঘটনা । একসময় ঘটনাটি নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে তোলপাড় হয়েছিল। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমের নজর এড়িয়ে গিয়েছিল অনেক ঘটনা।সেই ঘটনাই তুলে ধরা হয়েছে এই কাহিনীতে। আদিবাসী সমাজের ভাষা আলাদা , কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো ভাবের প্রকাশও আলাদা। কিন্তু দুঃখ , জ্বালা , যন্ত্রণার অভিব্যক্তি মনে হয় মানুষ মাত্রেরই এক।সেই সব জ্বালা যন্ত্রনার অভিব্যক্তি বৃহত্তর সমাজের উপযোগী ভাষা এবং ভাবের প্রকাশ ভঙ্গিতে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র। ত্রুটি -বিচ্যুতি থাকাটাই স্বাভাবিক।তাই সবিনয়ে আগাম মার্জনা চেয়ে নিচ্ছি। একটাই প্রার্থনা , ভালো লাগলে বলুন , বলুন খারাপ লাগলেও।ধন্যবাদ।
মাসকাকুর কথা
( ২৭ )
মাসকাকুর আসল নাম ছিল বাসুদেব রাজ। বাড়ি ছিল মুর্শিদাবাদের বেলডাঙ্গা গ্রামে । মাছ চাষের ব্যবসা করতে এসেছিলেন আমাদের এলাকায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের বড়ো অংশকেই কাকা বলে সম্বোধন করতেন। দেখাদেখি তাকেও অধিকাংশ জন বিশেষত ছোটরা কাকু বলে সম্বোধন করত। মাছকে তিনি সাধারণ ' মাস ' বলতেন। আর তা থেকেই তার পরিচিতি হয়ে যায় মাসকাকু হিসাবে।
পরবর্তীকালে স্থানীয় ষাটপলশায় বিয়ে এবং কুমারপুরে বাড়ি করে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। চরম দৈন্যের সঙ্গে নিত্যদিন লড়াই করেছেন।সবার সঙ্গে সহজ ভাবে মিশতে পারতেন। অবস্থাপন্নদের মোটরবাইক কিম্বা ঘোড়ায় তাকে যেমন সওয়ার হতে দেখেছি , তেমনই জেলেদের সঙ্গে পুকুরে নেমে জাল টানতেও দেখেছি। দাম কিছুটা বেশি পাওয়ার জন্য সাইকেলের পিছনে হাঁড়ি বেঁধে দুর-দূরান্তের আড়তে মাছ নিয়ে গিয়েছেন। অনেকে তাই নিয়ে তাকে নানা তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেছেন। কিন্তু তিনি সব হাসিমুখে উড়িয়ে দিয়েছেন।
হয়তো তীব্র অপমান বোধ তাকে বিদ্ধ করেছে , আমরা সেদিন কেউ সেই খবর রাখার প্রয়োজন মনে করি নি। তিনি নীলকণ্ঠের মতো হজম করতে বাধ্য হয়েছেন সেই জ্বালা। কারণ যারা তাকে অপমান করতেন তাদের তাকে না হলেও চলে যেত , কিন্তু তার যে তাদের না হলে চলত না।কারণ অপমানের চেয়েও পেটের জ্বালা যে অনেক বেশি। তারই মাছ চাষের আয়ের উপর নির্ভর ছিল দুই ছেলের লেখাপড়া সহ ৪ সদস্যের সংসার। তাই হাসি দিয়েই তাকে আড়াল করে রাখতে হতো বোবা কান্না।
বেশি পুঁজি ছিল না। তাই প্রথমদিকে কোন পুকুর ঠিকায় চাষ করার জন্য নিতে পারতেন না। মূলত মাছ কেনাবেচারই ব্যবসা করতেন।সম্ভবত প্রথম ঢেকায় একটি পুকুর ঠিকায় নিয়েছিলেন।সেই পুকুরের মাছ আগলানো নিয়ে একটা মজার ঘটনার কথা প্রচলিত রয়েছে। একে বাইরে থেকে এসেছেন , তার উপরে একটু নিরীহ প্রকৃতির ছিলেন বলে তার পুকুরে মাছ চুরি বিশেষ করে ছিপে মাছ ধরার প্রবণতটা ছিল বেশি। একদিন বিকালে তাই ওইসব মাছ শিকারীদের ধরার জন্য মাসকাকু পুকুর পাড়ে যান। গিয়ে দেখেন চারিদিকে কেউ ছিপ কেউ বা খোঁচা হাতে মাছ ধরছেন।
তিনি তখন তাদের ভয় দেখানোর জন্য বলেন , আজ আর কোন শালার ছাড়ান নাই। ওসিকে বলাই আছে , সব ক'টার নামে একটা করে কেস ঠুকে দিয়ে চলে আসব।বলা বাহুল্য তার ওই কথা শুনে কার কোন হেলদোলই হয় না।কারণ সবাই তো জানে , মাসকাকু আর যাই করুক না কেন তাদের নামে কেস করবে না। তখন তিনি বলেন , তোদের লজ্জাও হয় না। তাতেও কোন কাজ হয় না , কিন্তু মাসকাকু নিজেই লজ্জায় পড়ে যান। মুখ ঘুরিয়ে দেখেন , ছিপ হাতে বসে রয়েছন সম্ভ্রান্ত এক ব্যক্তি।তখন আর মুখ লুকানোর জায়গা পান না তিনি। কোনরকমে বলেন , অঃ কাকু আপনি ? ধরুন ধরুন যত ইচ্ছে ধরুন। আপনি তো শখ করে ধরছন।তারপরেই পুকুর পাড় থেকে চলে আসেন। এই ছিলেন মাস কাকু।
মাছ চাষ করেই দুই ছেলেকে মানুষ করেছেন। তাদের একজন ব্যবসা করে । অন্যজন টিউশানি পড়ায়।আজ মাসকাকু নেই।কিন্তু ভুলি নি তার কথা।
----০----
ডাক্তারদাদুর কথা
( ২৮ )
ডাক্তারদাদুর আসল নাম ছিল দিবাকর সরখেল। আসল বাড়ি ছিল মুর্শিদাবাদ জেলার গুণানন্দবাটি। আমার জন্মের আগে তিনি লোকপাড়া গ্রামে আসেন।সেই অর্থে পাশ করা ডাক্তার না হলেও গুণানন্দবাটি সংলগ্ন এলাকায় তার চিকিৎসার সুখ্যাতি ছিল। আত্মীয়তার সুবাদে ওই গ্রামে তখন যাতায়াত ছিল লোকপাড়া লাগোয়া বজরহাট গ্রামের বাসিন্দাদের। তারা ডাক্তারবাবুকে গিয়ে লোকপাড়া এলাকায় চেম্বার খোলার জন্য অনুরোধ করেন। ডাক্তারবাবু তাদের বলেন থাকার ব্যবস্থা করে দিলে তিনি যেতে রাজী আছেন। বজরহাট গ্রামের বাসিন্দারা তখন তাদের পরিকল্পনার কথা খুলে বলেন লোকপাড়া গ্রামের বিশিষ্ট ব্যক্তি মোতিলাল ঘোষকে। মোতিলালবাবু চেম্বার সহ ডাক্তারবাবুর থাকার ব্যবস্থা করে দেন তার বৈঠকখানায়। তারপর আলাদা জায়গাও দেন বাড়ি করার জন্য । সেই জায়গায় মোতিলালবাবু , বজরহাট সহ অন্যান্য গ্রামবাসীদের সহযোগিতায় গড়ে উঠে ডাক্তারদাদুর বাড়ি সহ নিজস্ব ডিসপেনসারি।
সেই ডিসপেনসারির কথা আজও আমার স্পষ্ট মনে পড়ে। মাটির ঘরের দোতলার উপরে ছিল তার ডিসপেনসারি। সারা মেঝেময় ওষুধ আর ওষুধ।জোলাপ, পেনিসিলিনের তীব্র গন্ধ। যখন যেতাম দেখতাম ডাক্তারদাদু খলনুড়ি দিয়ে ওষুধ গুড়ছেন নয়তো কাঁচি দিয়ে কাগজ কেটে কেটে বোতলে ওষুধ মাপের জন্য সাঁটাচ্ছেন। বসে বসে তাই দেখতাম।আসার সময় বলতেন , হাঁ কর। তারপর মুখে বোতল থেকে খানিকটা সিরাপ ঢেলে দিতেন। সেই স্বাদ যেন এখনো মুখে লেগে আছে। বলা বাহুল্য সিরাপের লোভই ডাক্তারদাদুর দোতলায় টেনে নিয়ে যেত আমাকে।
ডাক্তারদাদুর সঙ্গেই জড়িয়ে আছে তার ঘোড়ার স্মৃতি। ডাক্তারদাদুর যেমন দশাসই চেহারা ছিল তেমনই ছিল তার বিশাল ঘোড়া। তা নিয়ে আমাদের একটা চাপা গর্বও ছিল। পাশের কুলিয়ারা গ্রামের ডাক্তার রমাপতি চট্টোরাজেরও ঘোড়া ছিল।কিন্তু তার ঘোড়া ছিল তুলনামূলক খর্বকায়। সে সময় কুলিয়ারা গ্রামে স্কুল ছিল না।ওই গ্রামের ছেলেমেয়েরা আমাদের গ্রামের স্কুলে পড়তে আসত। ডাক্তারদাদুর বাড়ির কাছেই ছিল আমাদের প্রাইমারি স্কুল। তখন তাদের সঙ্গে ঘোড়া নিয়ে তর্ক বেঁধে যেত। আমরা বলতাম আমাদের ঘোড়া ভালো, ওরা বলত ওদের। কত মধুর ছিল সেইসব দিন। পাড়ার ডাক্তারবাবুর ঘোড়াকেও কেমন নিজেদের ভাবতে পারতাম। কোন ভেদবুদ্ধি মাথায়ই আসত। না ওদের, না আমাদের। সেই ঘোড়া নিয়ে আমাদের বাড়িতে প্রায়ই বেড়াতে আসতেন ডাক্তারদাদু। ফেরার সময় আমাকে ঘোড়ার পিঠে চাপিয়ে লাগাম ধরে কিছুদুর হেঁটে হেঁটে যেতেন তিনি। ডাক্তারদাদুর মতো ঘোড়াটা ছিল ভালো। দিব্যি আমাকে কাঁধে নিয়ে থাকত , কিছু করত না। সেইসব দিন পাড়া আর স্কুলের বন্ধুদের কাছে আমার প্রেস্টিজটাই যেন বেড়ে যেত। ঘোড়ায় চাপার অভিজ্ঞতা ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে সাতকাহন করে গল্প করতাম।
একবার শেষ পৌষমাসের রাতে ডাক্তারদাদুর সেই ঘোড়াটা চুরি হয়ে যায়। ডাক্তারদাদুর খুব মন খারাপ হয়ে যায়। আমারও মন খারাপ হয়েছিল। কত চেপেছি ঘোড়াটার পিঠে। পরে অবশ্য ডাক্তারদাদু আবার একটা ঘোড়া কেনেন। ঘোড়ায় চেপে দুর -দুরান্তে ডাকে যেতেন তিনি। রাত-বিরাতে তার ঘোড়ার খুরের শব্দ শোনা যেত। চাহিদা বিশেষ কিছু ছিল না। যে যা হাতে তুলে দিতেন তাই নিতেন ।একটু পেটুক স্বভাবের ছিলেন , তাই নগদ টাকা পয়সার বদলে বাড়ির হাঁস-মুরগির ডিম , আলুটা - মুলোটা দিলেই বেশি খুশি হতেন।
শেষের কয়েকটা মাস তার ইজিচেয়ারে কেটেছে। পড়ে গিয়ে পক্ষঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তখন দেখতাম তার ঘোড়ার চোখে জল গড়াচ্ছে।জল তার চোখেও। আজ তিনি নেই , কিন্তু সেই ছবিটা যেন আজও চোখের সামনে ভাসে। আমি বসে আছি ঘোড়ার পিঠে , লাগাম ধরে সামনে হেঁটে চলেছেন ডাক্তারদাদু।
( চলবে )
নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন
আজ রবিবার ১৯ নভেম্বর থেকে প্রতিদিন সকাল ১০ টার মধ্যে প্রকাশিত হবে
ধারাবাহিক উপন্যাস
সালিশির রায়
সালিশি সভার রায়ে সর্বস্ব হারানো এক আদিবাসী তরুণীর ঘুরে দাঁড়ানোর , অন্যকে দাঁড় করানোর মর্মস্পর্শী কাহিনী অবলম্বনে ধারাবাহিক উপন্যাস --
খুব কাছে থেকে দেখা আদিবাসী সমাজের এক তরুণীর মর্মান্তিক পরিণতির ঘটনা । একসময় ঘটনাটি নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে তোলপাড় হয়েছিল। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমের নজর এড়িয়ে গিয়েছিল অনেক ঘটনা।সেই ঘটনাই তুলে ধরা হয়েছে এই কাহিনীতে। আদিবাসী সমাজের ভাষা আলাদা , কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো ভাবের প্রকাশও আলাদা। কিন্তু দুঃখ , জ্বালা , যন্ত্রণার অভিব্যক্তি মনে হয় মানুষ মাত্রেরই এক।সেই সব জ্বালা যন্ত্রনার অভিব্যক্তি বৃহত্তর সমাজের উপযোগী ভাষা এবং ভাবের প্রকাশ ভঙ্গিতে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র। ত্রুটি -বিচ্যুতি থাকাটাই স্বাভাবিক।তাই সবিনয়ে আগাম মার্জনা চেয়ে নিচ্ছি। একটাই প্রার্থনা , ভালো লাগলে বলুন , বলুন খারাপ লাগলেও।ধন্যবাদ।



No comments:
Post a Comment