অর্ঘ্য ঘোষ
( এই কলমে এমনই কিছু হারিয়ে যাওয়া মানুষের কথা ধারাবাহিক ভাবে তুলে ধরা হবে যারা নিতান্তই প্রান্তজীবি। বৃহত্তর সমাজে তাদের স্থান নেই বলেলেই চলে। তাদের জন্ম মৃত্যু এমনকি আসল নামও আজ সংগ্রহ করা কঠিন।তাদের পরিবারের লোকেরাও সে তথ্য ঠিকঠাক দিতে পারেন নি।প্রচলিত নামেই তারা আজও এলাকার কারও কারও মনে ধুসর স্মৃতি হয়ে রয়েছেন। স্মৃতির চাদর সরালেই অবয়বটা স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। আমার ছোটবেলায় দেখা মনের মণিকোঠায় ঠাঁই করে নেওয়া ওইসব চরিত্রের সঙ্গে আপনিও মিল খুঁজে পেতে পারেন আপনার দেখা কোন মানুষের মধ্যে )
( স্কুলের পুজোয় লাল্টু )
লাল্টুর ভালো নাম ছিল প্রণব মণ্ডল। তাদের আদি বাড়ি ছিল সাঁইথিয়ার কাঁতুর গ্রামে। বিবাহসূত্রে তার বাবা তুষারকান্তি মণ্ডল কুলিয়ারা গ্রামে বসবাস শুরু করেন।পরে লোকপাড়া গ্রামে বাড়ি করেন। লাল্টু ছিল আমার ভাই রাজীবদের বন্ধু স্থানীয়।
লাল্টুর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা হয় লোকপাড়া প্রতিবাদ ক্লাবের সূত্রে। রাজীব, বাপি কোলে , অনিরুদ্ধ দাস , রাজেন ব্যানার্জী , লাল্টু সহ আমাদের ভ্রাতৃ স্থানীয়দের হাতে আমি একসময় সংখ্যা গরিষ্ঠ সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রতিবাদ ক্লাব পরিচালনার ভার তুলে দিয়েছিলাম। লাল্টু ছিল সেইসময় ক্লাবের নবগঠিত পরিচালন সমিতির সহ সম্পাদক।কিন্তু ক্লাবের ওই পরিচালন সমিতি আমারই এক বন্ধু স্থানীয় ক্লাব সদস্যের গাত্রদাহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।বিভিন্ন বেনিয়মের প্রতিবাদ করায় আমাদের ক্লাব সে সময় তদানীন্তণ শাসকদল সি,পি,এমেরও চক্ষুশুল ছিল।তাই আমার সেই বন্ধুস্থানীয় সদস্য শাসকদলের মদতে ক্লাবে হামলা চালায় , লাল্টুদের মারধোর করে তালা ঝুলিয়ে দেয়।
শুধু তাই নয় , লাল্টু , রাজীব ,জয় , বাপিদের নামে পুলিশের কাছ মিথ্যা অভিযোগও দায়ের করে। পুলিশ তাদের ধরপাকড়ের জন্য বাড়িতে বাড়িতে রেড শুরু করে।আমি গ্রেফতারি এড়াতে তাদের বিভিন্ন জায়গায় সরিয়ে রাখার চেষ্টা করি। শাসকদলের ভয়ে সেই সময় কেউ আশ্রয়ও দিতে চাইছিল না। বেলেড়ার গ্রামের বাসিন্দা স্কুলশিক্ষক স্বপন মণ্ডল কিন্তু সব উপেক্ষা করে ওদের আশ্রয় দিয়েছিলেন। ওই ঘটনায় লাল্টু সহ অন্যান্যদের অভিভবকেরা খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে। কারণ সেই সময় লাল্টুরা কলেজ কিম্বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সবার সামনেইএতখন উজ্বল ভবিষৎ।
আইনী জটিলতায় ফেঁসে গেলে সেই ভবিষ্যৎ নষ্ট হওয়ার আশংকায় তাদের রাতের ঘুম তখন উবে গিয়েছে।ওই পরিস্থিতিতে আমার নিজেকেই অপরাধী মনে হচ্ছিল।কেন ওদের ক্লাবে আনতে গেলাম -- শুধু সেই আক্ষেপ কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল আমাকে।খুব অসহায় হয়ে পড়েছিলাম।তখন আমি আনন্দবাজার কাগজে যোগ দিই নি। পুলিশ -প্রশাসন মহলে সেই পরিচিতও ছিল না , যে আসল কথাটা বলে আইনী জটিলতা থেকে ওদের উদ্ধার করব। সেই অসহয়তা থেকে আমাকে সেই সময় উদ্ধার করে আমার দুই সাংবাদিক বন্ধু অশোক রায় এবং আশিস মন্ডল।তারই এস , ডি , পি ,ও'কে ঘটনার কথা বলে ওদের আইনী জটিলতা থেকে উদ্ধার করে।
লাল্টু ছিল খুব হিসাবী আর মেধাবী ছাত্র। যৎসামান্য জমি আর ছোট্ট একটা নটকোনের দোকানের উপর নির্ভর করেই চলত লাল্টু , তার দিদি অপর্ণার লেখাপড়া সহ ৪ সদস্যের সংসার। লেখাপড়ার পাশাপাশি বাবার অবর্তমানে দোকানও সামলাতে হত তাকে। সাইকেলে করে আনতে হত দোকানের মালপত্রও। তা সত্ত্বেও ভালো নম্বর সহ ইংরাজী অনার্স নিয়ে বি,এ পাশ করার পর এম , এ ' তে ভর্তি হয়েছিল। তাকে ঘিরে কত স্বপ্ন ছিল তার বাবা-মায়ের।কিন্তু সেই স্বপ্ন আচমকা ধূলিসাৎ হয়ে যায়। লাল্টুর ছিল মৃগী রোগ। ১৯৯৯ সালের এক বিকালে আমাদের গ্রামের বাইরে সেচখালে শৌচকর্ম করতে গিয়ে জলে পড়ে মৃত্যু হয় তার।
দিনটা আজও আমার স্পষ্ট মনে আছে। খবর পেয়ে ছুটতে-ছুটতে গিয়ে দেখি ক্যানেলের জলে মুখ গুঁজে পড়ে রয়েছে লাল্টু। পড়ে রয়েছে সাইকেল , জুতো। উলকুণ্ডা শ্মশানে দাহ করা হয় তাকে। শেষ পর্যন্ত ছিলাম সেখানে। চোখের সামনে ছাই হয়ে যেতে দেখলাম মিস্টি মুখের ছেলেটিকে। আমাদের বাড়ি থেকে তাদের বাড়ির পাশ দিয়েই লোকপাড়ার মোড়ে যেতে হয়। দিনে বার কয়েক মোড় যায়। তাদের বাড়ির সামনের বেলগাছ পার হওয়ার সময় মনে পড়ে যায় লাল্টুকে। শেষ যাত্রায় যাওয়ার আগে ওই গাছটার নিচেই দীর্ঘক্ষণ শুয়েছিল সে।
( ৪২ )
তার আসল নাম সরস্বতী মণ্ডল । লোকে বলত লয়ী ক্ষেপী । মস্তিকে বিকৃতি ছিল । পরিবারের ' ল ' ভাইয়ের বৌ ছিল বলেই সম্ভবত তাকে লয়ী বলা হত। ময়ূরেশ্বরের রসুনপুর গ্রামের এক মধ্যবিত্ত চাষি পরিবারের গৃহবধু ছিলেন তিনি। দীর্ঘদিন আগে স্বামীকে হারিয়েছিলেন। দুই মেয়ের বিয়ে আর এক ছেলেকে মানুষ করতে গিয়ে জমি-সম্পত্তি সব বিকিয়ে যায়। গ্রামের অনেকে মনে করেন নামে মাত্র দামে নাকি ওইসব জমি সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়া হয়।
তারপর থেকেই নাকি মাথার গন্ডগোলের সুত্রপাত হয় তার। তাবলে কিন্তু পাগলামো করতেন না। পঞ্চায়েতে ওইসব জিনিস হাতানোর অভিযোগ জানাতে আসতেন।অভিযুক্ত হিসাবে অবশ্য সচরাচর কারও নাম শোনা যেত না তার মুখ থেকে।তবে জেরা করলে তার এক নিকট আত্মীয়ের নাম মাঝে মধ্যে বলতেন। পঞ্চায়েত খোলা থাক বা না'ই থাক অধিংকাশ দিনই হাজির হতেন লোকপাড়া স্কুল মোড় লাগোয়া ঢেকা পঞ্চায়েতে।
সব সময় বলতে আমার সোনার সিংহাসন ছিল , ৫০০ ভরি সোনা ছিল , ২০ বিঘে বাকুরি ( চারদিক সমান বড় জমি ) ছিল , একবাক্স টাকা ছিল , সব ওরা নিয়ে নিয়েছে। তারপর ইঁট , খোলামকুচি দিয়ে পঞ্চায়েতের দেওয়াল কিম্বা মেঝেতে দিনের পর দিন লিখেই চলতেন ওইসব জমি সম্পত্তির হিসাব।তার খিদে তেষ্টা , শীতবোধ ছিল বলে মনেই হোত না। শুধু একটা খাটো একটা কাপড় পড়ে চলে আসতেন।
কাউকে কোনদিন খাবার চাইতে দেখি নি। বরং পঞ্চায়েত লাগোয়া একটি মিষ্টির দোকান আর বাড়িতে বাসনপত্র মেজে দিয়ে যে যা দিয়েছে তাই খেয়েছেন। বাকি সময়টা পঞ্চায়েতের দেওয়ালে ওই হিসাব লিখেতেন। ওইটুকুই ছিল তার মাথার রোগ। তার ওই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কতজন তাকে নিয়ে কত মজা করেছে। আর অনেক সময় তার মসুল তাকেই গুনতে হয়েছে। কিন্তু সব ভুলে গিয়েছেন তিনি । পরদিন হয়তো আবার তার কাছেই হাজির হয়েছেন । সন্ধ্যা নামলে হাঁটতে হাঁটতে ফিরতেন। আজ লয়ি নেই , কিন্তু তার ওই বিচিত্র হিসাব কষার কথা অনেকেরই মনে আছে।
খুব কাছে থেকে দেখা আদিবাসী সমাজের এক তরুণীর মর্মান্তিক পরিণতির ঘটনা । একসময় ঘটনাটি নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে তোলপাড় হয়েছিল। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমের নজর এড়িয়ে গিয়েছিল অনেক ঘটনা।সেই ঘটনাই তুলে ধরা হয়েছে এই কাহিনীতে। আদিবাসী সমাজের ভাষা আলাদা , কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো ভাবের প্রকাশও আলাদা। কিন্তু দুঃখ , জ্বালা , যন্ত্রণার অভিব্যক্তি মনে হয় মানুষ মাত্রেরই এক।সেই সব জ্বালা যন্ত্রনার অভিব্যক্তি বৃহত্তর সমাজের উপযোগী ভাষা এবং ভাবের প্রকাশ ভঙ্গিতে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র। ত্রুটি -বিচ্যুতি থাকাটাই স্বাভাবিক।তাই সবিনয়ে আগাম মার্জনা চেয়ে নিচ্ছি। একটাই প্রার্থনা , ভালো লাগলে বলুন , বলুন খারাপ লাগলেও।ধন্যবাদ।
লাল্টুর কথা
( স্কুলের পুজোয় লাল্টু )
( ৪১ )
লাল্টুর ভালো নাম ছিল প্রণব মণ্ডল। তাদের আদি বাড়ি ছিল সাঁইথিয়ার কাঁতুর গ্রামে। বিবাহসূত্রে তার বাবা তুষারকান্তি মণ্ডল কুলিয়ারা গ্রামে বসবাস শুরু করেন।পরে লোকপাড়া গ্রামে বাড়ি করেন। লাল্টু ছিল আমার ভাই রাজীবদের বন্ধু স্থানীয়।
লাল্টুর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা হয় লোকপাড়া প্রতিবাদ ক্লাবের সূত্রে। রাজীব, বাপি কোলে , অনিরুদ্ধ দাস , রাজেন ব্যানার্জী , লাল্টু সহ আমাদের ভ্রাতৃ স্থানীয়দের হাতে আমি একসময় সংখ্যা গরিষ্ঠ সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রতিবাদ ক্লাব পরিচালনার ভার তুলে দিয়েছিলাম। লাল্টু ছিল সেইসময় ক্লাবের নবগঠিত পরিচালন সমিতির সহ সম্পাদক।কিন্তু ক্লাবের ওই পরিচালন সমিতি আমারই এক বন্ধু স্থানীয় ক্লাব সদস্যের গাত্রদাহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।বিভিন্ন বেনিয়মের প্রতিবাদ করায় আমাদের ক্লাব সে সময় তদানীন্তণ শাসকদল সি,পি,এমেরও চক্ষুশুল ছিল।তাই আমার সেই বন্ধুস্থানীয় সদস্য শাসকদলের মদতে ক্লাবে হামলা চালায় , লাল্টুদের মারধোর করে তালা ঝুলিয়ে দেয়।
শুধু তাই নয় , লাল্টু , রাজীব ,জয় , বাপিদের নামে পুলিশের কাছ মিথ্যা অভিযোগও দায়ের করে। পুলিশ তাদের ধরপাকড়ের জন্য বাড়িতে বাড়িতে রেড শুরু করে।আমি গ্রেফতারি এড়াতে তাদের বিভিন্ন জায়গায় সরিয়ে রাখার চেষ্টা করি। শাসকদলের ভয়ে সেই সময় কেউ আশ্রয়ও দিতে চাইছিল না। বেলেড়ার গ্রামের বাসিন্দা স্কুলশিক্ষক স্বপন মণ্ডল কিন্তু সব উপেক্ষা করে ওদের আশ্রয় দিয়েছিলেন। ওই ঘটনায় লাল্টু সহ অন্যান্যদের অভিভবকেরা খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে। কারণ সেই সময় লাল্টুরা কলেজ কিম্বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সবার সামনেইএতখন উজ্বল ভবিষৎ।
আইনী জটিলতায় ফেঁসে গেলে সেই ভবিষ্যৎ নষ্ট হওয়ার আশংকায় তাদের রাতের ঘুম তখন উবে গিয়েছে।ওই পরিস্থিতিতে আমার নিজেকেই অপরাধী মনে হচ্ছিল।কেন ওদের ক্লাবে আনতে গেলাম -- শুধু সেই আক্ষেপ কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল আমাকে।খুব অসহায় হয়ে পড়েছিলাম।তখন আমি আনন্দবাজার কাগজে যোগ দিই নি। পুলিশ -প্রশাসন মহলে সেই পরিচিতও ছিল না , যে আসল কথাটা বলে আইনী জটিলতা থেকে ওদের উদ্ধার করব। সেই অসহয়তা থেকে আমাকে সেই সময় উদ্ধার করে আমার দুই সাংবাদিক বন্ধু অশোক রায় এবং আশিস মন্ডল।তারই এস , ডি , পি ,ও'কে ঘটনার কথা বলে ওদের আইনী জটিলতা থেকে উদ্ধার করে।
লাল্টু ছিল খুব হিসাবী আর মেধাবী ছাত্র। যৎসামান্য জমি আর ছোট্ট একটা নটকোনের দোকানের উপর নির্ভর করেই চলত লাল্টু , তার দিদি অপর্ণার লেখাপড়া সহ ৪ সদস্যের সংসার। লেখাপড়ার পাশাপাশি বাবার অবর্তমানে দোকানও সামলাতে হত তাকে। সাইকেলে করে আনতে হত দোকানের মালপত্রও। তা সত্ত্বেও ভালো নম্বর সহ ইংরাজী অনার্স নিয়ে বি,এ পাশ করার পর এম , এ ' তে ভর্তি হয়েছিল। তাকে ঘিরে কত স্বপ্ন ছিল তার বাবা-মায়ের।কিন্তু সেই স্বপ্ন আচমকা ধূলিসাৎ হয়ে যায়। লাল্টুর ছিল মৃগী রোগ। ১৯৯৯ সালের এক বিকালে আমাদের গ্রামের বাইরে সেচখালে শৌচকর্ম করতে গিয়ে জলে পড়ে মৃত্যু হয় তার।
দিনটা আজও আমার স্পষ্ট মনে আছে। খবর পেয়ে ছুটতে-ছুটতে গিয়ে দেখি ক্যানেলের জলে মুখ গুঁজে পড়ে রয়েছে লাল্টু। পড়ে রয়েছে সাইকেল , জুতো। উলকুণ্ডা শ্মশানে দাহ করা হয় তাকে। শেষ পর্যন্ত ছিলাম সেখানে। চোখের সামনে ছাই হয়ে যেতে দেখলাম মিস্টি মুখের ছেলেটিকে। আমাদের বাড়ি থেকে তাদের বাড়ির পাশ দিয়েই লোকপাড়ার মোড়ে যেতে হয়। দিনে বার কয়েক মোড় যায়। তাদের বাড়ির সামনের বেলগাছ পার হওয়ার সময় মনে পড়ে যায় লাল্টুকে। শেষ যাত্রায় যাওয়ার আগে ওই গাছটার নিচেই দীর্ঘক্ষণ শুয়েছিল সে।
------০-----
লয়ি ক্ষেপীর কথা
( ৪২ )
তার আসল নাম সরস্বতী মণ্ডল । লোকে বলত লয়ী ক্ষেপী । মস্তিকে বিকৃতি ছিল । পরিবারের ' ল ' ভাইয়ের বৌ ছিল বলেই সম্ভবত তাকে লয়ী বলা হত। ময়ূরেশ্বরের রসুনপুর গ্রামের এক মধ্যবিত্ত চাষি পরিবারের গৃহবধু ছিলেন তিনি। দীর্ঘদিন আগে স্বামীকে হারিয়েছিলেন। দুই মেয়ের বিয়ে আর এক ছেলেকে মানুষ করতে গিয়ে জমি-সম্পত্তি সব বিকিয়ে যায়। গ্রামের অনেকে মনে করেন নামে মাত্র দামে নাকি ওইসব জমি সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়া হয়।
তারপর থেকেই নাকি মাথার গন্ডগোলের সুত্রপাত হয় তার। তাবলে কিন্তু পাগলামো করতেন না। পঞ্চায়েতে ওইসব জিনিস হাতানোর অভিযোগ জানাতে আসতেন।অভিযুক্ত হিসাবে অবশ্য সচরাচর কারও নাম শোনা যেত না তার মুখ থেকে।তবে জেরা করলে তার এক নিকট আত্মীয়ের নাম মাঝে মধ্যে বলতেন। পঞ্চায়েত খোলা থাক বা না'ই থাক অধিংকাশ দিনই হাজির হতেন লোকপাড়া স্কুল মোড় লাগোয়া ঢেকা পঞ্চায়েতে।
সব সময় বলতে আমার সোনার সিংহাসন ছিল , ৫০০ ভরি সোনা ছিল , ২০ বিঘে বাকুরি ( চারদিক সমান বড় জমি ) ছিল , একবাক্স টাকা ছিল , সব ওরা নিয়ে নিয়েছে। তারপর ইঁট , খোলামকুচি দিয়ে পঞ্চায়েতের দেওয়াল কিম্বা মেঝেতে দিনের পর দিন লিখেই চলতেন ওইসব জমি সম্পত্তির হিসাব।তার খিদে তেষ্টা , শীতবোধ ছিল বলে মনেই হোত না। শুধু একটা খাটো একটা কাপড় পড়ে চলে আসতেন।
কাউকে কোনদিন খাবার চাইতে দেখি নি। বরং পঞ্চায়েত লাগোয়া একটি মিষ্টির দোকান আর বাড়িতে বাসনপত্র মেজে দিয়ে যে যা দিয়েছে তাই খেয়েছেন। বাকি সময়টা পঞ্চায়েতের দেওয়ালে ওই হিসাব লিখেতেন। ওইটুকুই ছিল তার মাথার রোগ। তার ওই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কতজন তাকে নিয়ে কত মজা করেছে। আর অনেক সময় তার মসুল তাকেই গুনতে হয়েছে। কিন্তু সব ভুলে গিয়েছেন তিনি । পরদিন হয়তো আবার তার কাছেই হাজির হয়েছেন । সন্ধ্যা নামলে হাঁটতে হাঁটতে ফিরতেন। আজ লয়ি নেই , কিন্তু তার ওই বিচিত্র হিসাব কষার কথা অনেকেরই মনে আছে।
( চলবে )
পড়ুন / পড়ান
নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন
১৯ নভেম্বর থেকে প্রতিদিন সকাল ১০ টার মধ্যে প্রকাশিত হচ্ছে
ধারাবাহিক উপন্যাস
সালিশির রায়
সালিশি সভার রায়ে সর্বস্ব হারানো এক আদিবাসী তরুণীর ঘুরে দাঁড়ানোর , অন্যকে দাঁড় করানোর মর্মস্পর্শী কাহিনী অবলম্বনে ধারাবাহিক উপন্যাস --
খুব কাছে থেকে দেখা আদিবাসী সমাজের এক তরুণীর মর্মান্তিক পরিণতির ঘটনা । একসময় ঘটনাটি নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে তোলপাড় হয়েছিল। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমের নজর এড়িয়ে গিয়েছিল অনেক ঘটনা।সেই ঘটনাই তুলে ধরা হয়েছে এই কাহিনীতে। আদিবাসী সমাজের ভাষা আলাদা , কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো ভাবের প্রকাশও আলাদা। কিন্তু দুঃখ , জ্বালা , যন্ত্রণার অভিব্যক্তি মনে হয় মানুষ মাত্রেরই এক।সেই সব জ্বালা যন্ত্রনার অভিব্যক্তি বৃহত্তর সমাজের উপযোগী ভাষা এবং ভাবের প্রকাশ ভঙ্গিতে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র। ত্রুটি -বিচ্যুতি থাকাটাই স্বাভাবিক।তাই সবিনয়ে আগাম মার্জনা চেয়ে নিচ্ছি। একটাই প্রার্থনা , ভালো লাগলে বলুন , বলুন খারাপ লাগলেও।ধন্যবাদ।



স্মৃতি সততই সুখের নয় ! !
ReplyDeleteধন্যবাদ ।
Delete