অর্ঘ্য ঘোষ
( এই কলমে এমনই কিছু হারিয়ে যাওয়া মানুষের কথা ধারাবাহিক ভাবে তুলে ধরা হবে যারা নিতান্তই প্রান্তজীবি। বৃহত্তর সমাজে তাদের স্থান নেই বলেলেই চলে। তাদের জন্ম মৃত্যু এমনকি আসল নামও আজ সংগ্রহ করা কঠিন।তাদের পরিবারের লোকেরাও সে তথ্য ঠিকঠাক দিতে পারেন নি।প্রচলিত নামেই তারা আজও এলাকার কারও কারও মনে ধুসর স্মৃতি হয়ে রয়েছেন। স্মৃতির চাদর সরালেই অবয়বটা স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। আমার ছোটবেলায় দেখা মনের মণিকোঠায় ঠাঁই করে নেওয়া ওইসব চরিত্রের সঙ্গে আপনিও মিল খুঁজে পেতে পারেন আপনার দেখা কোন মানুষের মধ্যে )
ঝাড়া ডোমের ভালো নাম ছিল শান্তি দলুই। আমরা ঝাড়ুদা বলে ডাকতাম। আমাদের বাড়ির পিছনেই ছিল তাদের ছোট্ট বাড়ি। আমাদের কৃষাণ ছিলেন। কিন্তু আচার আচরণের গুণে আমাদের পরিবারেরই একজন হয়ে উঠেছিলেন। চাষের কাজ না থাকলে আমাদের বাড়িতেই পড়ে থাকতেন। বাড়ি টুকটাক কাজ করতেন। বাঁশের ঝুঁড়ি বুনতেও জানতেন। আমাদের বাড়িতে বসেও ঝুড়ি বুনছেন কতদিন।
আমার শৈশবের অনেকখানি জুড়ে রয়েছেন ঝাড়ুদা। খুব সুন্দর গানের গলা ছিল তার। গল্পও বলতে পারতেন খুব ভালো। গান করে করে প্রতিদিন বলতেন কাঞ্চনমালা , শঙ্খমালা , ঝিনুকমালাদের গল্প।এক একটা গল্প শেষ হতে লেগে যেত ১০/১২ দিন। আমরা তো বটেই সেই গল্পের শ্রোতা ছিলেন বাবার সান্ধ্য আসরের বন্ধুরাও।
ধান ওঠার মরসুমে স্কুল ছুটির পর প্রায় প্রতিদিনই আমরা দুইভাই দুটো থলে নিয়ে ঝাড়ুদার সঙ্গে মাঠে যেতাম।আমাদের এলাকায় ব্রহ্মদৈত্য মেলা হয় পয়লা মাঘ। মেলাটি ঢেকার মেলা হিসাবেই পরিচিত। সেই সময় ওই মেলায় নিজের পছন্দসই কিছু কেনার অর্থ সংস্থানের জন্য ছোট ছেলেমেয়েরা মাঠে মাঠে ঝড়ে পড়ে থাকা ধানের শীষ কুড়িয়ে বেড়াত। তারপর মেলার আগের দিন সেই শীষ ঝড়িয়ে বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করত। আমরাও দুই ভাই ঝাড়ু'দার সঙ্গে মাঠে গিয়ে ওইভাবে ধানের শীষ কুড়োতাম। জমির ফাটলে হোঁচট খেয়ে পায়ের আঙুল রক্তাক্ত করে তুলতাম। আর কেঁদে একসা হতাম। সেই কান্না শুনে ধান কাটা ফেলে ছুটে আসতেন ঝাড়ুদা।তারপর জমির আল থেকে দূর্বা ঘাস তুলে চিবিয়ে লাগিয়ে দিতেন আঙুলের মাথায়। তাতে রক্ত থামলেও আমাদের কান্না থামত না।কারণ আঙুলের ব্যথার চেয়েও সেদিন আর ধান কুড়োতে না পারাটা আমাদের বেশি কষ্ট দিত।
বিষয়টা আন্দাজ করে ঝাড়ুদা তখন কোনদিন নিজের কাজ ফেলে ধানের শীষ কুড়িয়ে দিতেন। কোনদিন বা আমাদের জমির ধানের ডগার শিষ কেটে ঝোলা ভর্তি করে দিতেন। সেদিন বুঝিনি , আজ বুঝি তার মতো একজন দিন এনে দিন খাওয়া মানুষকে আমাদের কান্না থামাতে কত ক্ষতি স্বীকার করতে হয়েছিল। সন্ধ্যার আগে লাগোয়া কাশিপুরের বৈরাগীদের জমি থেকে দুই ভাইকে দুটো আখ কেটে এনে দিতেন। তারপর আমাদের ঝোলা দুটো নিজের কাঁধে তুলে নিতেন। চাঁদের আলোয় গোন আল ( চওড়া আলপথ ) ধরে আমরা দু'ভাই আখ খেতে খেতে আর ঝাড়ু'দার গান শুনতে শুনতে বাড়ি ফিরতাম। বার্মা আখের সেই স্বাদ যেন আজও মুখে লেগে আছে। কান পাতলেই যেন শুনতে পাই ঝাড়ুদার মিহি গলার সেই গানও।
হঠাৎ করে একদিন ঝাড়ুদা সপরিবারে উধাও হয়ে যান। সে ঘটনা আজও ভুলি নি। আমার বাবার মাছ মাংস খুব প্রিয় ছিল। কিন্তু সে সময় যৎসামান্য বেতনের স্কুলটিচার বাবার তা কিনে খাওয়ার সামার্থ্য ছিল না। তাই বাবা ঝাড়ুদাকে নিয়ে একটা খাঁসি কাটিয়েছিলেন। সে সময় খাঁসি কেটে তালপাতার ঠোঙ্গায় বাড়ি বাড়ি ' ভাগা ' ( খাঁসির দাম অনুযায়ী কয়েকটা সমান ভাগে ভাগ ) পৌচ্ছে দেওয়া হত। কেউ কেউ নিজে হাতে নিয়েও যেতেন। যারা ওইসব ব্যবস্থাপত্র করতেন তারা মাথা এবং ছাঁট মাংস পেতেন। কোথাও কোথাও একটা ভাগাও পেতেন। তারপর বাড়ি বাড়ি টাকা তুলে খাঁসির দাম মেটানো হত।
সেই দিনটার কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে। আমাদের বাড়ির সামনে তেঁতুলতলায় কলাপাতা বিছিয়ে 'ভাগা' সাজানো হচ্ছে। আর সেই ভাগা ঝাড়ুদা তালপাতার ঠোঙ্গায় মুড়ে বাড়ি বাড়ি দিয়ে আসছেন। বাবা একটা খাতায় নামগুলো লিখে রাখছেন। তিন চারদিন পর বাবা বললেন , হ্যা রে এবার টাকাগুলো তোল , খাঁসির দাম মেটাতে হবে। ঝাড়ুদা বলেছিলেন , কাকাবাবু সবাই আজ নয় , কাল করছে। তারপর বাবা নাকি একদিন দুগলি ঠাকুমা সামনা সামানি পেয়ে বলেন , হ্যা পিসিমা আজও খাঁসির দামটা দিলে না ? ঠাকুমা বলেছিলেন , সে কি বাবা , আমি তো পরদিনই ঝাড়ার হাতে টাকা দিয়েছি। বাবা বাড়িতে সে কথা তুলতেই ঝাড়ুদা বলেন , হ্যা গো বলতে ভুলে গিয়েছি , কাল সকালেই এনে দেব।
পরদিন সকালেই দেখা যায় দুই ছেলে রাম-লক্ষণ আর স্ত্রী'কে নিয়ে ঝাড়ুদা গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছেন। পরে শোনা যায় ঝাড়ুদা নাকি বেশিরভাগ টাকাই তুলে নিয়েছিল। খুব মন খারাপ হয়ে যায় আমাদের। বাবা বার বার আক্ষেপ করতে থাকেন , তুই একবার আমাকে খুলে বললি না , আমি কি তোকে খেয়ে ফেলতাম ? মা বাবাকে খাঁসি কাটার জন্য বকাবকি করতে থাকেন। বাবা ঝাড়ুদাকে ফিরিয়ে আনার জন্য বহু খোঁজাখুঁজি করেছিলেন।কিন্তু তার আত্মীয়রা সে সময় ঝাড়ুদার হদিশ দিতে পারেন নি।
অনেক বছর পর একবার গ্রামে ফিরেছিলেন ঝাড়ুদা। দেখা করতে এসেছিলেন আমাদের বাড়িতে। সেদিন আমাদের কারও চোখ শুকনো ছিল না। ঝাড়ুদা কাঁদতে কাঁদতে বাবাকে বলেছিলেন , কাকাবাবু আমি ক্ষমা চাইতে এসেছি। তোমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘতকতা করেছিলাম , তাই তোমাদের ক্ষমা না পেলে মরেও আমার শান্তি হবে না। বাবা ঝাড়ু'দার দুই হাত জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, আর বলিস নে ঝাড়া , তুই চলে যাওয়ার পর আমি ডানহাত হারা হয়ে পড়েছি। বাড়ি তৈরির ব্যবস্থা করে দিচ্ছি তুই ফিরে আয়। ঝাড়ুদা বলেছিলেন , বহরমপুরের কাছে কলাবাগানে ঘরবাড়ি সব করে ফেলেছি। দেখি যদি সে সবের কোন ব্যবস্থা করতে পারি তাহলে নিশ্চয় ফিরে আসব কাকাবাবু।তবে পাকাপাকি ভাবে যদি আসতে নাও পারি তাহলে বছরে একবার করে আসবই। কিন্তু সেই কথা রাখতে পারেন নি ঝাড়ুদা।পড়ে তার মৃত্যুর খবর পেয়েছিলাম।ঝাড়ুদা চলে গিয়েছেন , কিন্তু মনের মণিকঠায় তাকে ঘিরে রয়ে গিয়েছে অনেক সোনালি স্মৃতি।
-----০----
তার আসল নাম ছিল ভক্তিপদ মণ্ডল। লোকে বলত ভক্তি মাড়োয়ারি। কিন্তু কেন যে তাকে মাডোয়ারি বলা হত তা নিয়ে অবশ্য এলাকায় নানা মুনির নানা মত প্রচলিত আছে। কেউ বলেন , মাড়োয়ারিদের মতো বাচনভঙ্গি ছিল বলেই তাকে ওই নামে ডাকা হত। আবার কারো মতে , দোকানদার ছিলেন বলেই তাকে মাড়োয়ারি বলা হত। ময়ূরেশ্বরের রসুনপুর গ্রামে ছিল তার বাড়ি।
আমার দাদুর বন্ধু স্থানীয় ছিলেন ছোটখাটো চেহেরার লোকটি।পরণে অধিকাংশ সময় থাকত খাটো ধুতি আর হাফ হাতা গেঞ্জি। চোখে কাঁচ ঝাঁপসা হয়ে যাওয়া দড়ি দিয়ে বাঁধা ডাঁট ভাঙা চশমা। বলার অপেক্ষা রাখে না অভাব ছিল নিত্য সঙ্গী। কিন্তু ভালো আর সৎ মানুষ হিসাবে পরিচিতি ছিল তার। একটা লাঠি ঠুঁকতে ঠুঁকতে আমাদের বাড়ি আসেতন।যেতেন ভগবতীপুর-নবগ্রাম মহামন্ত্র আশ্রমেও। দোল , জন্মাষ্ঠমীর অনুষ্ঠানের চাঁদা তোলার জন্য দাদুদের সঙ্গে গ্রামে গ্রামে ঘুরতে দেখেছি তাকে। আমাদের পরিবারের ভোজকাজেও অগ্রণী ভূমিকা নিতেও দেখেছি।
আমি তাকে ভক্তিদাদু বলে ডাকতাম। উনি আমায় দাদুভাই বলতেন। বাবা - কাকাদের মুখে শুনেছি ভক্তিদাদুর নাকি প্রথমে লোকপাড়া হাই স্কুলের কাছে এবং পরে লোকপাড়া ব্যাঙ্ক সংলগ্ন এলাকায় চা-তেলেভাজার দোকান ছিল। সেই দোকানের সূত্র ধরেই ভক্তিদাদু মাড়োয়ারি উপাধি পেয়েছিলেন বলেই অনেকের অনুমান। আজ ভক্তিদাদু নেই , কিন্তু তার লাঠি নিয়ে হাঁটাটা আজও স্পষ্ট মনে আছে।
খুব কাছে থেকে দেখা আদিবাসী সমাজের এক তরুণীর মর্মান্তিক পরিণতির ঘটনা । একসময় ঘটনাটি নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে তোলপাড় হয়েছিল। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমের নজর এড়িয়ে গিয়েছিল অনেক ঘটনা।সেই ঘটনাই তুলে ধরা হয়েছে এই কাহিনীতে। আদিবাসী সমাজের ভাষা আলাদা , কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো ভাবের প্রকাশও আলাদা। কিন্তু দুঃখ , জ্বালা , যন্ত্রণার অভিব্যক্তি মনে হয় মানুষ মাত্রেরই এক।সেই সব জ্বালা যন্ত্রনার অভিব্যক্তি বৃহত্তর সমাজের উপযোগী ভাষা এবং ভাবের প্রকাশ ভঙ্গিতে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র। ত্রুটি -বিচ্যুতি থাকাটাই স্বাভাবিক।তাই সবিনয়ে আগাম মার্জনা চেয়ে নিচ্ছি। একটাই প্রার্থনা , ভালো লাগলে বলুন , বলুন খারাপ লাগলেও।ধন্যবাদ।
ঝাড়া ডোমের কথা
( ৩৩ )
ঝাড়া ডোমের ভালো নাম ছিল শান্তি দলুই। আমরা ঝাড়ুদা বলে ডাকতাম। আমাদের বাড়ির পিছনেই ছিল তাদের ছোট্ট বাড়ি। আমাদের কৃষাণ ছিলেন। কিন্তু আচার আচরণের গুণে আমাদের পরিবারেরই একজন হয়ে উঠেছিলেন। চাষের কাজ না থাকলে আমাদের বাড়িতেই পড়ে থাকতেন। বাড়ি টুকটাক কাজ করতেন। বাঁশের ঝুঁড়ি বুনতেও জানতেন। আমাদের বাড়িতে বসেও ঝুড়ি বুনছেন কতদিন।
আমার শৈশবের অনেকখানি জুড়ে রয়েছেন ঝাড়ুদা। খুব সুন্দর গানের গলা ছিল তার। গল্পও বলতে পারতেন খুব ভালো। গান করে করে প্রতিদিন বলতেন কাঞ্চনমালা , শঙ্খমালা , ঝিনুকমালাদের গল্প।এক একটা গল্প শেষ হতে লেগে যেত ১০/১২ দিন। আমরা তো বটেই সেই গল্পের শ্রোতা ছিলেন বাবার সান্ধ্য আসরের বন্ধুরাও।
ধান ওঠার মরসুমে স্কুল ছুটির পর প্রায় প্রতিদিনই আমরা দুইভাই দুটো থলে নিয়ে ঝাড়ুদার সঙ্গে মাঠে যেতাম।আমাদের এলাকায় ব্রহ্মদৈত্য মেলা হয় পয়লা মাঘ। মেলাটি ঢেকার মেলা হিসাবেই পরিচিত। সেই সময় ওই মেলায় নিজের পছন্দসই কিছু কেনার অর্থ সংস্থানের জন্য ছোট ছেলেমেয়েরা মাঠে মাঠে ঝড়ে পড়ে থাকা ধানের শীষ কুড়িয়ে বেড়াত। তারপর মেলার আগের দিন সেই শীষ ঝড়িয়ে বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করত। আমরাও দুই ভাই ঝাড়ু'দার সঙ্গে মাঠে গিয়ে ওইভাবে ধানের শীষ কুড়োতাম। জমির ফাটলে হোঁচট খেয়ে পায়ের আঙুল রক্তাক্ত করে তুলতাম। আর কেঁদে একসা হতাম। সেই কান্না শুনে ধান কাটা ফেলে ছুটে আসতেন ঝাড়ুদা।তারপর জমির আল থেকে দূর্বা ঘাস তুলে চিবিয়ে লাগিয়ে দিতেন আঙুলের মাথায়। তাতে রক্ত থামলেও আমাদের কান্না থামত না।কারণ আঙুলের ব্যথার চেয়েও সেদিন আর ধান কুড়োতে না পারাটা আমাদের বেশি কষ্ট দিত।
বিষয়টা আন্দাজ করে ঝাড়ুদা তখন কোনদিন নিজের কাজ ফেলে ধানের শীষ কুড়িয়ে দিতেন। কোনদিন বা আমাদের জমির ধানের ডগার শিষ কেটে ঝোলা ভর্তি করে দিতেন। সেদিন বুঝিনি , আজ বুঝি তার মতো একজন দিন এনে দিন খাওয়া মানুষকে আমাদের কান্না থামাতে কত ক্ষতি স্বীকার করতে হয়েছিল। সন্ধ্যার আগে লাগোয়া কাশিপুরের বৈরাগীদের জমি থেকে দুই ভাইকে দুটো আখ কেটে এনে দিতেন। তারপর আমাদের ঝোলা দুটো নিজের কাঁধে তুলে নিতেন। চাঁদের আলোয় গোন আল ( চওড়া আলপথ ) ধরে আমরা দু'ভাই আখ খেতে খেতে আর ঝাড়ু'দার গান শুনতে শুনতে বাড়ি ফিরতাম। বার্মা আখের সেই স্বাদ যেন আজও মুখে লেগে আছে। কান পাতলেই যেন শুনতে পাই ঝাড়ুদার মিহি গলার সেই গানও।
হঠাৎ করে একদিন ঝাড়ুদা সপরিবারে উধাও হয়ে যান। সে ঘটনা আজও ভুলি নি। আমার বাবার মাছ মাংস খুব প্রিয় ছিল। কিন্তু সে সময় যৎসামান্য বেতনের স্কুলটিচার বাবার তা কিনে খাওয়ার সামার্থ্য ছিল না। তাই বাবা ঝাড়ুদাকে নিয়ে একটা খাঁসি কাটিয়েছিলেন। সে সময় খাঁসি কেটে তালপাতার ঠোঙ্গায় বাড়ি বাড়ি ' ভাগা ' ( খাঁসির দাম অনুযায়ী কয়েকটা সমান ভাগে ভাগ ) পৌচ্ছে দেওয়া হত। কেউ কেউ নিজে হাতে নিয়েও যেতেন। যারা ওইসব ব্যবস্থাপত্র করতেন তারা মাথা এবং ছাঁট মাংস পেতেন। কোথাও কোথাও একটা ভাগাও পেতেন। তারপর বাড়ি বাড়ি টাকা তুলে খাঁসির দাম মেটানো হত।
সেই দিনটার কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে। আমাদের বাড়ির সামনে তেঁতুলতলায় কলাপাতা বিছিয়ে 'ভাগা' সাজানো হচ্ছে। আর সেই ভাগা ঝাড়ুদা তালপাতার ঠোঙ্গায় মুড়ে বাড়ি বাড়ি দিয়ে আসছেন। বাবা একটা খাতায় নামগুলো লিখে রাখছেন। তিন চারদিন পর বাবা বললেন , হ্যা রে এবার টাকাগুলো তোল , খাঁসির দাম মেটাতে হবে। ঝাড়ুদা বলেছিলেন , কাকাবাবু সবাই আজ নয় , কাল করছে। তারপর বাবা নাকি একদিন দুগলি ঠাকুমা সামনা সামানি পেয়ে বলেন , হ্যা পিসিমা আজও খাঁসির দামটা দিলে না ? ঠাকুমা বলেছিলেন , সে কি বাবা , আমি তো পরদিনই ঝাড়ার হাতে টাকা দিয়েছি। বাবা বাড়িতে সে কথা তুলতেই ঝাড়ুদা বলেন , হ্যা গো বলতে ভুলে গিয়েছি , কাল সকালেই এনে দেব।
পরদিন সকালেই দেখা যায় দুই ছেলে রাম-লক্ষণ আর স্ত্রী'কে নিয়ে ঝাড়ুদা গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছেন। পরে শোনা যায় ঝাড়ুদা নাকি বেশিরভাগ টাকাই তুলে নিয়েছিল। খুব মন খারাপ হয়ে যায় আমাদের। বাবা বার বার আক্ষেপ করতে থাকেন , তুই একবার আমাকে খুলে বললি না , আমি কি তোকে খেয়ে ফেলতাম ? মা বাবাকে খাঁসি কাটার জন্য বকাবকি করতে থাকেন। বাবা ঝাড়ুদাকে ফিরিয়ে আনার জন্য বহু খোঁজাখুঁজি করেছিলেন।কিন্তু তার আত্মীয়রা সে সময় ঝাড়ুদার হদিশ দিতে পারেন নি।
অনেক বছর পর একবার গ্রামে ফিরেছিলেন ঝাড়ুদা। দেখা করতে এসেছিলেন আমাদের বাড়িতে। সেদিন আমাদের কারও চোখ শুকনো ছিল না। ঝাড়ুদা কাঁদতে কাঁদতে বাবাকে বলেছিলেন , কাকাবাবু আমি ক্ষমা চাইতে এসেছি। তোমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘতকতা করেছিলাম , তাই তোমাদের ক্ষমা না পেলে মরেও আমার শান্তি হবে না। বাবা ঝাড়ু'দার দুই হাত জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, আর বলিস নে ঝাড়া , তুই চলে যাওয়ার পর আমি ডানহাত হারা হয়ে পড়েছি। বাড়ি তৈরির ব্যবস্থা করে দিচ্ছি তুই ফিরে আয়। ঝাড়ুদা বলেছিলেন , বহরমপুরের কাছে কলাবাগানে ঘরবাড়ি সব করে ফেলেছি। দেখি যদি সে সবের কোন ব্যবস্থা করতে পারি তাহলে নিশ্চয় ফিরে আসব কাকাবাবু।তবে পাকাপাকি ভাবে যদি আসতে নাও পারি তাহলে বছরে একবার করে আসবই। কিন্তু সেই কথা রাখতে পারেন নি ঝাড়ুদা।পড়ে তার মৃত্যুর খবর পেয়েছিলাম।ঝাড়ুদা চলে গিয়েছেন , কিন্তু মনের মণিকঠায় তাকে ঘিরে রয়ে গিয়েছে অনেক সোনালি স্মৃতি।
-----০----
ভক্তি মাড়োয়ারির কথা
( ৩৪ )
তার আসল নাম ছিল ভক্তিপদ মণ্ডল। লোকে বলত ভক্তি মাড়োয়ারি। কিন্তু কেন যে তাকে মাডোয়ারি বলা হত তা নিয়ে অবশ্য এলাকায় নানা মুনির নানা মত প্রচলিত আছে। কেউ বলেন , মাড়োয়ারিদের মতো বাচনভঙ্গি ছিল বলেই তাকে ওই নামে ডাকা হত। আবার কারো মতে , দোকানদার ছিলেন বলেই তাকে মাড়োয়ারি বলা হত। ময়ূরেশ্বরের রসুনপুর গ্রামে ছিল তার বাড়ি।
আমার দাদুর বন্ধু স্থানীয় ছিলেন ছোটখাটো চেহেরার লোকটি।পরণে অধিকাংশ সময় থাকত খাটো ধুতি আর হাফ হাতা গেঞ্জি। চোখে কাঁচ ঝাঁপসা হয়ে যাওয়া দড়ি দিয়ে বাঁধা ডাঁট ভাঙা চশমা। বলার অপেক্ষা রাখে না অভাব ছিল নিত্য সঙ্গী। কিন্তু ভালো আর সৎ মানুষ হিসাবে পরিচিতি ছিল তার। একটা লাঠি ঠুঁকতে ঠুঁকতে আমাদের বাড়ি আসেতন।যেতেন ভগবতীপুর-নবগ্রাম মহামন্ত্র আশ্রমেও। দোল , জন্মাষ্ঠমীর অনুষ্ঠানের চাঁদা তোলার জন্য দাদুদের সঙ্গে গ্রামে গ্রামে ঘুরতে দেখেছি তাকে। আমাদের পরিবারের ভোজকাজেও অগ্রণী ভূমিকা নিতেও দেখেছি।
আমি তাকে ভক্তিদাদু বলে ডাকতাম। উনি আমায় দাদুভাই বলতেন। বাবা - কাকাদের মুখে শুনেছি ভক্তিদাদুর নাকি প্রথমে লোকপাড়া হাই স্কুলের কাছে এবং পরে লোকপাড়া ব্যাঙ্ক সংলগ্ন এলাকায় চা-তেলেভাজার দোকান ছিল। সেই দোকানের সূত্র ধরেই ভক্তিদাদু মাড়োয়ারি উপাধি পেয়েছিলেন বলেই অনেকের অনুমান। আজ ভক্তিদাদু নেই , কিন্তু তার লাঠি নিয়ে হাঁটাটা আজও স্পষ্ট মনে আছে।
( চলবে )
পড়ুন / পড়ান
নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন
১৯ নভেম্বর থেকে প্রতিদিন সকাল ১০ টার মধ্যে প্রকাশিত হচ্ছে
ধারাবাহিক উপন্যাস
সালিশির রায়
সালিশি সভার রায়ে সর্বস্ব হারানো এক আদিবাসী তরুণীর ঘুরে দাঁড়ানোর , অন্যকে দাঁড় করানোর মর্মস্পর্শী কাহিনী অবলম্বনে ধারাবাহিক উপন্যাস --
খুব কাছে থেকে দেখা আদিবাসী সমাজের এক তরুণীর মর্মান্তিক পরিণতির ঘটনা । একসময় ঘটনাটি নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে তোলপাড় হয়েছিল। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমের নজর এড়িয়ে গিয়েছিল অনেক ঘটনা।সেই ঘটনাই তুলে ধরা হয়েছে এই কাহিনীতে। আদিবাসী সমাজের ভাষা আলাদা , কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো ভাবের প্রকাশও আলাদা। কিন্তু দুঃখ , জ্বালা , যন্ত্রণার অভিব্যক্তি মনে হয় মানুষ মাত্রেরই এক।সেই সব জ্বালা যন্ত্রনার অভিব্যক্তি বৃহত্তর সমাজের উপযোগী ভাষা এবং ভাবের প্রকাশ ভঙ্গিতে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র। ত্রুটি -বিচ্যুতি থাকাটাই স্বাভাবিক।তাই সবিনয়ে আগাম মার্জনা চেয়ে নিচ্ছি। একটাই প্রার্থনা , ভালো লাগলে বলুন , বলুন খারাপ লাগলেও।ধন্যবাদ।



No comments:
Post a Comment