অর্ঘ্য ঘোষ
( এই কলমে এমনই কিছু হারিয়ে যাওয়া মানুষের কথা ধারাবাহিক ভাবে তুলে ধরা হবে যারা নিতান্তই প্রান্তজীবি। বৃহত্তর সমাজে তাদের স্থান নেই বলেলেই চলে। তাদের জন্ম মৃত্যু এমনকি আসল নামও আজ সংগ্রহ করা কঠিন।তাদের পরিবারের লোকেরাও সে তথ্য ঠিকঠাক দিতে পারেন নি।প্রচলিত নামেই তারা আজও এলাকার কারও কারও মনে ধুসর স্মৃতি হয়ে রয়েছেন। স্মৃতির চাদর সরালেই অবয়বটা স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। আমার ছোটবেলায় দেখা মনের মণিকোঠায় ঠাঁই করে নেওয়া ওইসব চরিত্রের সঙ্গে আপনিও মিল খুঁজে পেতে পারেন আপনার দেখা কোন মানুষের মধ্যে )
আনারুল ভাইয়ের বাড়ি সাঁইথিয়ার মাঠপলশা গ্রামে। পুরো নাম আনারুল হক। পেশায় ছিলেন মাঠপলশা সমবায় সমিতির ম্যানেজার। রক্তে ছিল ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর নেশা। সাংবাদিকতার সূত্রেই তার সঙ্গে আমার পরিচয়। উনি আমায় ' অর্ঘ্য ভাই ' বলে ডাকতেন। আমি বলতাম ' আনারুল ভাই'। কতবার যে তার বাড়ি গিয়েছি তার ঠিক নেই। উনিও বার কয়েক এসেছেন আমাদের বাড়িতে। যখনই গিয়েছি হয় বাড়িতে , নয়তো সমবায়ের দোতলায় রান্না খাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। কার্যত মাথায় করে রেখেছেন। অত সমাদর খুব কম জায়গাতেই পেয়েছি।
খুব মজার এবং উদার হৃদয়ের মানুষ ছিলেন আনারুল ভাই। সব সময় থাকতেন ফিটফাট। সাদা -প্যান্ট , শার্ট , টুপি , জুতো আর লাল টাই ছিল তার ড্রেসকোড। আর কাঁধে ঝোলানো থাকত একটা হ্যাণ্ড মাইক। মাটি পরীক্ষা -থেকে জল দূষণ সবেতেই প্রশিক্ষণ ছিল। জয় গোস্বামী থেকে জসিমুদ্দিন , মান্না থেকে ভূপেণ হাজারিকা ছিল তার কণ্ঠস্থ। মাঠে ময়দানে গিয়ে প্রথমে কবিতা কিম্বা গান জুড়ে দিতেন।তারপর একে একে লোক জমায়েত হলে মাটি আর জল পরীক্ষা করে দিতেন চাষ , জল শোধন সহ বিভিন্ন বিষয়ের সুলুক সন্ধান।
গ্রামেও রীতিমতো অফিস করে খুলে ছিলেন গণজ্ঞাপনকেন্দ্র। সেখান থেকেও মাইকে ঘণ্টায় ঘণ্টায় সময় জানানোর পাশাপাশি প্রচার করা হত আঞ্চলিক সংবাদ। কোথাই গবাদি পশুর মড়ক লেগেছে , কোথাই পেটের রোগ ছড়িয়ে পড়েছে সেইসব তথ্য জানানোর পাশাপাশি সর্তকতা অবলম্বণের পথনির্দেশও প্রচারিত হয়েছে ওই কেন্দ্র থেকে।
সে সময় গ্রাম ঢোকার মুখেই আনারুল ভাইয়ের সৌজন্যে একটা সাইনবোর্ড লাগানো ছিল। তাতে লেখা ছিল ' গাঁ মানে মাটি নয় , গাঁ মানে মা। আমরা সবাই মায়ের কাছে দায়বদ্ধ।আসুন সেই দায়বদ্ধতা পালন করি।' এমন উচ্চারণ যার হৃদয় থেকে উৎসারিত হয় তার অন্তকরণ সম্পর্কে কিছু বলাটাই বাহুল্য। গ্রামের দুঃস্থদের ঈদ , পুজো কিম্বা শীতে পোশাক নেই , আনারুল ভাই ছুটলেন সাঁইথিয়া। ব্যবসায়ীদের কাছে ঘুরে ঘুরে পোশাক সংগ্রহ করে পৌচ্ছে দিয়েছেন দুঃস্থদের বাড়ি বাড়ি। সংস্কারের অভাবে গ্রামের ঈদগাহ নমাজ পড়ার অযোগ্য হয়ে পড়েছে। গ্রামে গ্রামে চাঁদা তুলে ভোল পাল্টে দিয়েছেন ঈদগাহের।
শুধু নিজেদের ধর্মস্থানই নয় , হিন্দু ধর্মের প্রতিও ছিল তার সমান অনুরাগ। লাগোয়া কুমড়োতরি গ্রামে বহু আগে জমিদারদের বদান্যতায় দুর্গাপুজো চালু ছিল।পুজো পরিচালনার জন্য বরাদ্দ ছিল জমিও। তারপর সেই জমি বেহাত হয়ে যাওয়ায় পুজো বন্ধ হয়ে যায়। ওই গ্রামবাসীদের অনুরোধে আনারুল ভাই প্রশাসনের সহযোগিতায় সেই জমি পুনঃরুদ্ধার করে পুজো চালু করেন।চাঁদা পাকা মন্দিরও নির্মাণ করিয়ে দেন। নিজে দাঁড়িয়ে থেকে পুজোর সমস্ত কাজ সম্পন্ন করেন। শুধু তাই নয় , একবার পুজো এবং ঈদ একই সঙ্গে পড়েছিল। সেবারে আনারুল ভাইয়েরই উদ্যোগে পুজো মণ্ডপেই সংখ্যালঘু ভাইদের জন্য ইফতার পার্টির আয়োজন করেন পুজো কমিটির কর্তারা। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বড়ো নজির এর চেয়ে আর কিছু হয় কি ?
সংবাদ মাধ্যমের প্রতি তার ছিল অগাধ আস্থা। ধরে নিতেন সংবাদ মাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। সে সময় প্রায়ই তার ফোন আসত। উত্তেজিত গলায় কখনো বলতেন , অর্ঘ্যভাই একবার আসতেই হবে , নদীর মাঝে দীপের মতো বাস করছেন ১১ টি গ্রামের মানুষ।ওদের খুব দুর্দশা। একটা কিছু করতেই হবে। কখনো বা বলেছেন , অর্ঘ্য ভাই , হোসেনপুর গ্রামে আজ পর্যন্ত কেউ সরকারি চাকরি পায় নি।একটা খবর হওয়া বড়ো দরকার।নাহলে গ্রামের ছেলেমেয়েরা তো হতাশায় পড়তেই চাইবে না। এমন ভাবে বলতেন যে হাজার ব্যস্ততা স্বত্ত্বেও ফটোগ্রাফারকে নিয়ে আমাকে বার-বার ছুটে যেতে হয়েছে তার ডাকে।
নদী পেরিয়ে তার সঙ্গে গিয়েছি কুলতোড় , ঘাসবেড়া , গোবিন্দপুর , হোসেনপুর , বাগড়াকাঁদা সহ বহু গ্রামে। কি হিন্দু , কি মুসলিম প্রতিটি পরিবারে ছিল তার অবারিত দ্বার। গ্রামবাসীদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেছেন , আর আপনাদের চিন্তা নেই অর্ঘ্যভাই চলে এসেছেন। আপনাদের সমস্যার কথা ওনাকে খুলে সব বলুন , তাহলেই হবে। তখন আমরা খুব অস্বস্তিতে পড়ে যেতাম। সংবাদ প্রকাশিত হলেই যে সব সমস্যার সমাধান হবে এমন তো নয়।কিন্তু তিনি তা মনে করতেন না। জীবনবোধে গভীর বিশ্বাস যার তার কাছে তো কোন কিছুই নেতিবাচক মনে হয় না।আজ আনারুলভাই নেই। কিন্তু তার অর্ঘ্যভাই ডাকটা যেন আজও কান পাতলে শুনতে পাই।
( ২০০৫ সালে আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ )
তার ভালো নাম ছিল তারাপদ কোনাই । ডাক নাম মটর । তা থেকেই তার পরিচিতি হয়ে যায় মটা কোড়া। ছোট খাটো চেহেরার মানুষটি প্রচন্ড সাদা সিধে ছিলেন। অধিকাংশ সময় একটা গামছা কিম্বা খাটো ধুতি পড়ে থাকতেন। গায়ে হাফ হাত গেঞ্জি। গলায় তুলসি কাঠের মালা। খুব ভালো দেওয়াল দিতে পারতেন। তাঁত বুনতেন , বাড়িতে তাঁত যন্ত্র ছিল। সেই যন্ত্রের প্রতি আমার ছিল দুর্ণিবার আর্কষণ। সুতো জড়ানোর মেশিনটা ঘোরানোর জন্য খুব যেতাম তাদের বাড়ি। তার মেজ ছেলে নিতাই আমার বন্ধু। সেইসুত্রে যাতায়াতটাও প্রায় নিয়মিত হয়ে পড়ে।
শেষের দিকে আমাদের জমিও চাষ করতেন । তখন দেখতাম একটি তেল চকচকে একটা বাঁশের নল আর হুঁকো হাতে চাষের কাজ করতে আসতেন। বাঁশের নলে থাকত চকমকি ( পাথরে -পাথরে ঠুকে উদ্ভুত আগুনের ফুলিঙ্গ থেকে শোলা ধরানোর কৃৎকৌশল)। সে সময় এত লাইটার- দেশলাইয়ের প্রচলন ছিল না।ছিল না সহজলভ্যও। মানুষ চকমকির আগুনেই বিড়ি কিম্বা হুঁকো ধরাতেন। সেই চকমকি ধরানো দেখার জন্য কতবার যে ওনার আবদার করেছি তার ঠিক নেই।
তার সম্পর্কে একটা কথা প্রচলিত রয়েছে । স্থানীয় ব্রহ্মদৈত্য মেলা থেকে মাটির খোলা আনতে যাচ্ছি বলে আর বাড়ি ফেরেন নি। যৎসামান্য ওই পয়সা নিয়েই নাকি হেঁটে বৃন্দাবন চলে গিয়েছিলেন। ফিরে আসেন প্রায় দেড় বছর পর। আজ সেই সাধাসিধে মানুষটি আর নেই। কিন্তু তার ওই বৃন্দাবন যাত্রার কথা আজও অনেকের কাছেই আলোচ্য বিষয় হয়ে আছে।
খুব কাছে থেকে দেখা আদিবাসী সমাজের এক তরুণীর মর্মান্তিক পরিণতির ঘটনা । একসময় ঘটনাটি নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে তোলপাড় হয়েছিল। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমের নজর এড়িয়ে গিয়েছিল অনেক ঘটনা।সেই ঘটনাই তুলে ধরা হয়েছে এই কাহিনীতে। আদিবাসী সমাজের ভাষা আলাদা , কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো ভাবের প্রকাশও আলাদা। কিন্তু দুঃখ , জ্বালা , যন্ত্রণার অভিব্যক্তি মনে হয় মানুষ মাত্রেরই এক।সেই সব জ্বালা যন্ত্রনার অভিব্যক্তি বৃহত্তর সমাজের উপযোগী ভাষা এবং ভাবের প্রকাশ ভঙ্গিতে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র। ত্রুটি -বিচ্যুতি থাকাটাই স্বাভাবিক।তাই সবিনয়ে আগাম মার্জনা চেয়ে নিচ্ছি। একটাই প্রার্থনা , ভালো লাগলে বলুন , বলুন খারাপ লাগলেও।ধন্যবাদ।
আনারুল ভাইয়ের কথা
( ২৯ )
আনারুল ভাইয়ের বাড়ি সাঁইথিয়ার মাঠপলশা গ্রামে। পুরো নাম আনারুল হক। পেশায় ছিলেন মাঠপলশা সমবায় সমিতির ম্যানেজার। রক্তে ছিল ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর নেশা। সাংবাদিকতার সূত্রেই তার সঙ্গে আমার পরিচয়। উনি আমায় ' অর্ঘ্য ভাই ' বলে ডাকতেন। আমি বলতাম ' আনারুল ভাই'। কতবার যে তার বাড়ি গিয়েছি তার ঠিক নেই। উনিও বার কয়েক এসেছেন আমাদের বাড়িতে। যখনই গিয়েছি হয় বাড়িতে , নয়তো সমবায়ের দোতলায় রান্না খাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। কার্যত মাথায় করে রেখেছেন। অত সমাদর খুব কম জায়গাতেই পেয়েছি।
খুব মজার এবং উদার হৃদয়ের মানুষ ছিলেন আনারুল ভাই। সব সময় থাকতেন ফিটফাট। সাদা -প্যান্ট , শার্ট , টুপি , জুতো আর লাল টাই ছিল তার ড্রেসকোড। আর কাঁধে ঝোলানো থাকত একটা হ্যাণ্ড মাইক। মাটি পরীক্ষা -থেকে জল দূষণ সবেতেই প্রশিক্ষণ ছিল। জয় গোস্বামী থেকে জসিমুদ্দিন , মান্না থেকে ভূপেণ হাজারিকা ছিল তার কণ্ঠস্থ। মাঠে ময়দানে গিয়ে প্রথমে কবিতা কিম্বা গান জুড়ে দিতেন।তারপর একে একে লোক জমায়েত হলে মাটি আর জল পরীক্ষা করে দিতেন চাষ , জল শোধন সহ বিভিন্ন বিষয়ের সুলুক সন্ধান।
গ্রামেও রীতিমতো অফিস করে খুলে ছিলেন গণজ্ঞাপনকেন্দ্র। সেখান থেকেও মাইকে ঘণ্টায় ঘণ্টায় সময় জানানোর পাশাপাশি প্রচার করা হত আঞ্চলিক সংবাদ। কোথাই গবাদি পশুর মড়ক লেগেছে , কোথাই পেটের রোগ ছড়িয়ে পড়েছে সেইসব তথ্য জানানোর পাশাপাশি সর্তকতা অবলম্বণের পথনির্দেশও প্রচারিত হয়েছে ওই কেন্দ্র থেকে।
সে সময় গ্রাম ঢোকার মুখেই আনারুল ভাইয়ের সৌজন্যে একটা সাইনবোর্ড লাগানো ছিল। তাতে লেখা ছিল ' গাঁ মানে মাটি নয় , গাঁ মানে মা। আমরা সবাই মায়ের কাছে দায়বদ্ধ।আসুন সেই দায়বদ্ধতা পালন করি।' এমন উচ্চারণ যার হৃদয় থেকে উৎসারিত হয় তার অন্তকরণ সম্পর্কে কিছু বলাটাই বাহুল্য। গ্রামের দুঃস্থদের ঈদ , পুজো কিম্বা শীতে পোশাক নেই , আনারুল ভাই ছুটলেন সাঁইথিয়া। ব্যবসায়ীদের কাছে ঘুরে ঘুরে পোশাক সংগ্রহ করে পৌচ্ছে দিয়েছেন দুঃস্থদের বাড়ি বাড়ি। সংস্কারের অভাবে গ্রামের ঈদগাহ নমাজ পড়ার অযোগ্য হয়ে পড়েছে। গ্রামে গ্রামে চাঁদা তুলে ভোল পাল্টে দিয়েছেন ঈদগাহের।
শুধু নিজেদের ধর্মস্থানই নয় , হিন্দু ধর্মের প্রতিও ছিল তার সমান অনুরাগ। লাগোয়া কুমড়োতরি গ্রামে বহু আগে জমিদারদের বদান্যতায় দুর্গাপুজো চালু ছিল।পুজো পরিচালনার জন্য বরাদ্দ ছিল জমিও। তারপর সেই জমি বেহাত হয়ে যাওয়ায় পুজো বন্ধ হয়ে যায়। ওই গ্রামবাসীদের অনুরোধে আনারুল ভাই প্রশাসনের সহযোগিতায় সেই জমি পুনঃরুদ্ধার করে পুজো চালু করেন।চাঁদা পাকা মন্দিরও নির্মাণ করিয়ে দেন। নিজে দাঁড়িয়ে থেকে পুজোর সমস্ত কাজ সম্পন্ন করেন। শুধু তাই নয় , একবার পুজো এবং ঈদ একই সঙ্গে পড়েছিল। সেবারে আনারুল ভাইয়েরই উদ্যোগে পুজো মণ্ডপেই সংখ্যালঘু ভাইদের জন্য ইফতার পার্টির আয়োজন করেন পুজো কমিটির কর্তারা। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বড়ো নজির এর চেয়ে আর কিছু হয় কি ?
সংবাদ মাধ্যমের প্রতি তার ছিল অগাধ আস্থা। ধরে নিতেন সংবাদ মাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। সে সময় প্রায়ই তার ফোন আসত। উত্তেজিত গলায় কখনো বলতেন , অর্ঘ্যভাই একবার আসতেই হবে , নদীর মাঝে দীপের মতো বাস করছেন ১১ টি গ্রামের মানুষ।ওদের খুব দুর্দশা। একটা কিছু করতেই হবে। কখনো বা বলেছেন , অর্ঘ্য ভাই , হোসেনপুর গ্রামে আজ পর্যন্ত কেউ সরকারি চাকরি পায় নি।একটা খবর হওয়া বড়ো দরকার।নাহলে গ্রামের ছেলেমেয়েরা তো হতাশায় পড়তেই চাইবে না। এমন ভাবে বলতেন যে হাজার ব্যস্ততা স্বত্ত্বেও ফটোগ্রাফারকে নিয়ে আমাকে বার-বার ছুটে যেতে হয়েছে তার ডাকে।
নদী পেরিয়ে তার সঙ্গে গিয়েছি কুলতোড় , ঘাসবেড়া , গোবিন্দপুর , হোসেনপুর , বাগড়াকাঁদা সহ বহু গ্রামে। কি হিন্দু , কি মুসলিম প্রতিটি পরিবারে ছিল তার অবারিত দ্বার। গ্রামবাসীদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেছেন , আর আপনাদের চিন্তা নেই অর্ঘ্যভাই চলে এসেছেন। আপনাদের সমস্যার কথা ওনাকে খুলে সব বলুন , তাহলেই হবে। তখন আমরা খুব অস্বস্তিতে পড়ে যেতাম। সংবাদ প্রকাশিত হলেই যে সব সমস্যার সমাধান হবে এমন তো নয়।কিন্তু তিনি তা মনে করতেন না। জীবনবোধে গভীর বিশ্বাস যার তার কাছে তো কোন কিছুই নেতিবাচক মনে হয় না।আজ আনারুলভাই নেই। কিন্তু তার অর্ঘ্যভাই ডাকটা যেন আজও কান পাতলে শুনতে পাই।
( ২০০৫ সালে আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ )
----০-----
মটা কোড়ার কথা
( ৩০ )
তার ভালো নাম ছিল তারাপদ কোনাই । ডাক নাম মটর । তা থেকেই তার পরিচিতি হয়ে যায় মটা কোড়া। ছোট খাটো চেহেরার মানুষটি প্রচন্ড সাদা সিধে ছিলেন। অধিকাংশ সময় একটা গামছা কিম্বা খাটো ধুতি পড়ে থাকতেন। গায়ে হাফ হাত গেঞ্জি। গলায় তুলসি কাঠের মালা। খুব ভালো দেওয়াল দিতে পারতেন। তাঁত বুনতেন , বাড়িতে তাঁত যন্ত্র ছিল। সেই যন্ত্রের প্রতি আমার ছিল দুর্ণিবার আর্কষণ। সুতো জড়ানোর মেশিনটা ঘোরানোর জন্য খুব যেতাম তাদের বাড়ি। তার মেজ ছেলে নিতাই আমার বন্ধু। সেইসুত্রে যাতায়াতটাও প্রায় নিয়মিত হয়ে পড়ে।
শেষের দিকে আমাদের জমিও চাষ করতেন । তখন দেখতাম একটি তেল চকচকে একটা বাঁশের নল আর হুঁকো হাতে চাষের কাজ করতে আসতেন। বাঁশের নলে থাকত চকমকি ( পাথরে -পাথরে ঠুকে উদ্ভুত আগুনের ফুলিঙ্গ থেকে শোলা ধরানোর কৃৎকৌশল)। সে সময় এত লাইটার- দেশলাইয়ের প্রচলন ছিল না।ছিল না সহজলভ্যও। মানুষ চকমকির আগুনেই বিড়ি কিম্বা হুঁকো ধরাতেন। সেই চকমকি ধরানো দেখার জন্য কতবার যে ওনার আবদার করেছি তার ঠিক নেই।
তার সম্পর্কে একটা কথা প্রচলিত রয়েছে । স্থানীয় ব্রহ্মদৈত্য মেলা থেকে মাটির খোলা আনতে যাচ্ছি বলে আর বাড়ি ফেরেন নি। যৎসামান্য ওই পয়সা নিয়েই নাকি হেঁটে বৃন্দাবন চলে গিয়েছিলেন। ফিরে আসেন প্রায় দেড় বছর পর। আজ সেই সাধাসিধে মানুষটি আর নেই। কিন্তু তার ওই বৃন্দাবন যাত্রার কথা আজও অনেকের কাছেই আলোচ্য বিষয় হয়ে আছে।
( চলবে )
নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন
আজ রবিবার ১৯ নভেম্বর থেকে প্রতিদিন সকাল ১০ টার মধ্যে প্রকাশিত হবে
ধারাবাহিক উপন্যাস
সালিশির রায়
সালিশি সভার রায়ে সর্বস্ব হারানো এক আদিবাসী তরুণীর ঘুরে দাঁড়ানোর , অন্যকে দাঁড় করানোর মর্মস্পর্শী কাহিনী অবলম্বনে ধারাবাহিক উপন্যাস --
খুব কাছে থেকে দেখা আদিবাসী সমাজের এক তরুণীর মর্মান্তিক পরিণতির ঘটনা । একসময় ঘটনাটি নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে তোলপাড় হয়েছিল। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমের নজর এড়িয়ে গিয়েছিল অনেক ঘটনা।সেই ঘটনাই তুলে ধরা হয়েছে এই কাহিনীতে। আদিবাসী সমাজের ভাষা আলাদা , কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো ভাবের প্রকাশও আলাদা। কিন্তু দুঃখ , জ্বালা , যন্ত্রণার অভিব্যক্তি মনে হয় মানুষ মাত্রেরই এক।সেই সব জ্বালা যন্ত্রনার অভিব্যক্তি বৃহত্তর সমাজের উপযোগী ভাষা এবং ভাবের প্রকাশ ভঙ্গিতে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র। ত্রুটি -বিচ্যুতি থাকাটাই স্বাভাবিক।তাই সবিনয়ে আগাম মার্জনা চেয়ে নিচ্ছি। একটাই প্রার্থনা , ভালো লাগলে বলুন , বলুন খারাপ লাগলেও।ধন্যবাদ।



দারুন দারুন ! ! আনারুল ভাই অপূর্ব ॥
ReplyDelete