Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

মনের মণিকোঠায় -- ১৮ রামদাস, লেবা মাস্টার





             মনের মণিকোঠায়                  



                                                      
                        


                      অর্ঘ্য ঘোষ



( এই কলমে এমনই কিছু হারিয়ে যাওয়া মানুষের কথা ধারাবাহিক ভাবে তুলে ধরা হবে যারা নিতান্তই প্রান্তজীবি। বৃহত্তর সমাজে তাদের স্থান নেই বলেলেই চলে। তাদের জন্ম মৃত্যু এমনকি আসল নামও আজ সংগ্রহ করা কঠিন।তাদের পরিবারের লোকেরাও সে তথ্য ঠিকঠাক দিতে পারেন নি।প্রচলিত নামেই তারা আজও এলাকার কারও কারও মনে ধুসর স্মৃতি হয়ে রয়েছেন। স্মৃতির চাদর সরালেই অবয়বটা স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। আমার ছোটবেলায় দেখা মনের মণিকোঠায় ঠাঁই করে নেওয়া ওইসব চরিত্রের সঙ্গে আপনিও মিল খুঁজে পেতে পারেন আপনার দেখা কোন মানুষের মধ্যে )



                 রামদাস বাউলের কথা



                    ( ৩৫ )

                                                              

তার নাম ছিল রামচরণ ভল্লা।লোকে তাকে রামদাস বাউল হিসাবেই চিনতেন।আমি বলতাম রামদা । উনিও আমাকে অর্ঘ্যদা বলেই ডাকতেন। বেশ কয়েকবার তার বাড়ি গিয়েছি। উনিও বার দু'য়েক এসেছেন।তাছাড়া যখন যেখানে দেখা হয়েছে গল্প করেছি। শুনেছি গানও। সাংবাদিকতার সূত্রেই তার সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ। সে প্রায় বছর বাইশেক আগের কথা। তখন কলকাতা থেকে প্রকাশিত   'রাজপথ' নামে একটা বাংলা দৈনিকে সাংবাদিকতার কাজ করতাম। সেই কাগজে 'তাহাদের কথা ' বিভাগে অবহেলিত মানুষদের নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হত। সেই সংবাদ সংগ্রহের জন্যই প্রথম আমি রামদার বাড়ি গিয়েছিলাম। সে সময় রামদা ভারত উৎসবে এদেশের প্রতিনিধি হিসাবে বেশ কিছু দেশ ঘুরে এসেছেন। কিন্তু অভাব ঘোচে নি তার সংসারে।       

       
                               ময়ুরেশ্বরের মনোহরপুর গ্রামে একচিলতে কাদাছিটে মাটির বাড়িতে ছিল রামদাসের বাস। সেই বাড়ির দেওয়াল জুড়ে সে সময় শোভা পেত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে তোলা রামদার বিভিন্ন ভঙ্গিমার হাসি মুখের ছবি।কারণ ভারত উৎসবে দেশের প্রতিনিধি হিসাবে তিনি বাউল গানে মাতিয়ে এসেছিলেন ইংল্যান্ড, আমেরিকা , রাশিয়া সহ বিভিন্ন দেশের মাটি। কিছু টাকা, শংসাপত্র আর চমকদার ওইসব ছবি নিয়ে ফিরেছিলেন। কিন্তু পেট ভরে নি তাতে। কারণ দেশের সম্মান বৃদ্ধি করলেও তার দিকে আর ফিরেও তাকায় নি কেউ।

       
                                          মাঝখান থেকে কার্যত ' না ঘরকা -  না ঘাটকা ' হয়ে পড়েছিলেন তিনি। আদতে ছিলেন দিনমজুর ভল্লা পরিবারের ছেলে। ছোট বেলায় মনের টানে বাউল হয়েছিলেন।তার উপরে ডাক্তারদের মতোই বিদেশ ফেরত তকমা জুটেছিল। তাই বিদেশ ফেরত বাউলকে কেউ মজুর খাটতেও ডাকত না। খ্যাতির বিড়ম্বনা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলেন তিনি।বাউল গেয়ে পেট ভরে নি। জোটে নি দিনমজুরীও। কিছুদিন হাটে হাটে সবজিও বিক্রিও করেছেন। সে সময় আমি আমার লেখা একটা গান তাকে দিয়েছিলাম। ময়ূরাক্ষী নদী এবং বন্যা বিষয়ক গানটা সুর করে আমাকে শুনিয়েছিলেন। জানি না কোন অনুষ্ঠানে গেয়েছিলেন কিনা। কিন্তু যখনই তার সঙ্গে দেখা হয়েছে অন্যান্য গানের সঙ্গে সেই গানটাও তিনি একবার করে শুনিয়েছেন।     

                             
                                               শেষ বয়সে চরম কষ্টে দিন কেটেছে তার।বার বার আবেদন করেও কোন শিল্পীভাতা জোটে নি। জুটেছিল মাসিক ৭০০ টাকা হারে কৃষি পেনশন। কিন্তু তাতে তেমন সুসার হয়নি সংসারে। কারণ দীর্ঘদিন পক্ষাঘাতগ্রস্থ অবস্থায় শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছিলেন। সেই সময় ষাটপলশা যাওয়া আসার পথে  মাঝে মধ্যে তার বাড়ি গিয়েছি। শয্যাশায়ী হয়ে পড়ে থাকতে দেখেছি। কোথাই হারিয়ে গিয়েছে সেই অনাবিল হাসিমাখা মুখ।অভাবের ছোবল প্রতিটি অঙ্গে।হাত দুটো জড়িয়ে ধরে কিছু বলতে পারেন নি। শুধু নিঃশব্দে ভিজিয়েছেন কুঁচকে যাওয়া চোখের কোল।কি সকরুণ আর্তি ঝড়ে পড়ত সেই চোখে। হাত দুটো ধরে আবার যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসতাম।কিন্তু সেবারে আর প্রতিশ্রুতি রাখতে পারিনি।আবার তার বাড়ি যাওয়ার আগেই  বাংলা ২০২১ সালের ২৭ শে চৈত্র  কার্যত অর্ধাহারে  বিনা চিকিৎসায় তার মৃত্যু হয়।আজ রামদা নেই , কিন্তু ভুলি নি তাকে। চোখ বুজলেই যেন তার সেই নির্ভেজাল হাসিমাখা মুখটা যেন আজও স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে।        


                                                                 


( ১৯৯৫ সালে ' রাজপথ ' পত্রিকায় প্রকাশিত রাম'দা সম্পর্কিত সংবাদ ,  ছবিতে জার্মানে ভারত উৎসবে রামদা )

                     ----০----



                                          

                  লেবা মাস্টারের কথা  


                      (  ৩৬ )



লেবা মাস্টারের ভালো নাম ছিল সুনীল ভট্টাচার্য। ময়ূরেশ্বরের কুলিয়াড়া গ্রামে ছিল তার বাড়ি। লোকপাড়া প্রাইমারি স্কুলে তার কাছে তৃতীয় আর চতুর্থ শ্রেণীতে পড়েছি। তবে তার বড়ো পরিচয় ছিল তিনি ছিলেন আমার বাবার অন্তরঙ্গ বন্ধু। সেই সূত্রে নিয়মিত আমাদের বাড়িতে যাতায়াত ছিল।তার ছেলে রথীনও আমার বন্ধু স্থানীয়। সেই সুবাদে তাদের বাড়িতেও আমার মাঝে মধ্যে যাতায়াত ছিল। আমরা কখনও বলতাম লেবাকাকা আবার কখনও বলতাম স্যার।        


                                  শিক্ষক হিসাবে যতটা না মনে আছে , পরিবারের একজন শুভাকাঙ্খী হিসাবে তাকে মনে আছে অনেক বেশি। তার জন্যই অনেক বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা পেয়েছি আমরা। সে কথা আজও ভুলি নি। সি , পি, এমের তখন দোদণ্ড প্রতাপ।কার্যত হাতে মাথা কাটার মতো পরিস্থিতি , বিশেষত আমাদের এলাকায়।লেবা মাস্টার ছিলেন সি, পি,এমের সক্রিয় কর্মী তথা ষাটপলশা লোকাল কমিটির সদস্য। সংশ্লিষ্ট ঢেকা পঞ্চায়েত এবং ময়ূরেশ্বর ২ নং পঞ্চায়েত সমিতির সদস্যও নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি।
    

                                         আমার বাবা প্রথম দিকে স্বাধীনতা সংগ্রামী প্রয়াত দূর্গা ব্যানার্জীর নেতৃত্বে সি,পি,আই এবং পরে সমবায় মন্ত্রী প্রয়াত ভক্তিভূষণ মণ্ডলের হাত ধরে ফরোয়ার্ড ব্লক দলের সংগঠন গড়ে তোলেন। সেই সময় ঋণমুক্তি আন্দোলন এবং বজরহাট গ্রামের জুলুম সেখ হত্যাকে কেন্দ্র করে বাবাদের সংগঠন কিছুটা দানা বাঁধতে শুরু করে। সেটাই তখনকার স্থানীয় সি,পি,এম নেতাদের কাছে গাত্রদাহের কারণ হয়ে ওঠে। কারণে অকারণে আমদের বাড়ি ঘেরাও করে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ প্রায় নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।


                                   সেইসময় লেবাকাকার মুখেই শুনেছি , তাকে নাকি সি,পি,এম নেতারা আমাদের বাড়ি না আসার জন্য প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করতেন। কিন্তু লেবাকাকা সেই কথা কানে তো তোলেনই নি , অনেকক্ষেত্রে সি,পি,এমের আক্রমণের পরিকল্পনা বাবাকে জানিয়ে সজাগ করে দিয়েছেন।সেই পূর্বাভাস অনুযায়ী আমরা সে সময় বেশ কিছু উটকো ঝামেলার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছি।আসলে রাজনীতির চেয়েও তার কাছে বড়ো ছিল বাল্যকালের বন্ধুত্ব। বাবাকে দেখেছি সি,পি,এমের সঙ্গে সংঘাত হলেও লেবাকাকার সঙ্গে বন্ধুত্বে কখনও চিঁড় ধরেনি।জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত দুজনে ছিলেন অভিন্ন হৃদয় বন্ধু। টেজারিতে লাইফ সার্টিফিকেট জমা দিতে যাবে কে, না লেবা ? বাবার অবসরকালীণ প্রাপ্যের জন্য সিউড়ি ডি,আই অফিসে কাগজপত্রও জমা দিয়েছেন সেই লেবা কাকা। দুজনেই রাজনীতিকে রাজনীতির জায়গায় রাখতে পেরেছিলেন, ব্যক্তি সম্পর্কের উপর ছায়া ফেলতে দেন নি। আজকের দিনে তা নেহাতই কষ্টকল্পনা।      

                     
                                    দু'দুবার জনপ্রতিনিধি  নির্বাচিত হয়েছেন , কিন্তু কোথাও তার ছাপ পড়ে নি। একেবারে সাধারণ একটা ধুতি আর ফুলসার্ট জামা থাকত পরনে। তাকে কখনও জুতো কিম্বা চটি পায়ে দিতে দেখি নি।পায়ে ' বাইফোঁড় বা কুলআঁটি ' থাকার জন্য সমান ভাবে পা ফেলতে পারতেন না। কিছুটা খুঁড়িয়ে হাটতেন। সম্ভবত সেই কারণেই জুতো পড়তে পারতেন না। তাই নিয়ে একটা মজার কথা চালু ছিল সে সময়।সবাই মজা করে বলত , বাটা কোম্পানি  আদালতের নিষেধাজ্ঞা জারি করে লেবামাস্টারের জুতো পড়া বন্ধ করে দিয়েছে। আজ বাবা নেই , লেবা মাস্টারও নেই।কিন্তু বাবার মতো তার কথাও অনুক্ষণ মনে পড়ে।                                                          


                                      
           

               ( চলবে )

                

                  পড়ুন / পড়ান 




             নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


          ১৯  নভেম্বর থেকে প্রতিদিন সকাল ১০ টার মধ্যে প্রকাশিত হচ্ছে





                ধারাবাহিক উপন্যাস 



                       সালিশির রায় 

                                                                

সালিশি সভার রায়ে সর্বস্ব হারানো এক আদিবাসী তরুণীর ঘুরে দাঁড়ানোর , অন্যকে দাঁড় করানোর মর্মস্পর্শী কাহিনী অবলম্বনে ধারাবাহিক উপন্যাস --

                   


                                                                  


খুব কাছে থেকে দেখা আদিবাসী সমাজের এক তরুণীর মর্মান্তিক পরিণতির ঘটনা । একসময় ঘটনাটি নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে তোলপাড় হয়েছিল। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমের নজর এড়িয়ে গিয়েছিল অনেক ঘটনা।সেই ঘটনাই তুলে ধরা হয়েছে এই কাহিনীতে। আদিবাসী সমাজের ভাষা আলাদা , কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো ভাবের প্রকাশও আলাদা। কিন্তু দুঃখ , জ্বালা , যন্ত্রণার অভিব্যক্তি মনে হয় মানুষ মাত্রেরই এক।সেই সব জ্বালা যন্ত্রনার অভিব্যক্তি বৃহত্তর সমাজের উপযোগী ভাষা এবং ভাবের প্রকাশ ভঙ্গিতে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র। ত্রুটি -বিচ্যুতি থাকাটাই স্বাভাবিক।তাই সবিনয়ে আগাম মার্জনা চেয়ে নিচ্ছি। একটাই প্রার্থনা , ভালো লাগলে বলুন , বলুন খারাপ লাগলেও।ধন্যবাদ। 

     

                ------০------ 

               


                                                              

No comments:

Post a Comment