অর্ঘ্য ঘোষ
( এই কলমে এমনই কিছু হারিয়ে যাওয়া মানুষের কথা ধারাবাহিক ভাবে তুলে ধরা হবে যারা নিতান্তই প্রান্তজীবি। বৃহত্তর সমাজে তাদের স্থান নেই বলেলেই চলে। তাদের জন্ম মৃত্যু এমনকি আসল নামও আজ সংগ্রহ করা কঠিন।তাদের পরিবারের লোকেরাও সে তথ্য ঠিকঠাক দিতে পারেন নি।প্রচলিত নামেই তারা আজও এলাকার কারও কারও মনে ধুসর স্মৃতি হয়ে রয়েছেন। স্মৃতির চাদর সরালেই অবয়বটা স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। আমার ছোটবেলায় দেখা মনের মণিকোঠায় ঠাঁই করে নেওয়া ওইসব চরিত্রের সঙ্গে আপনিও মিল খুঁজে পেতে পারেন আপনার দেখা কোন মানুষের মধ্যে )
রেডিওদাদুর আসল নাম ছিল বংশীধর বন্দ্যোপাধ্যায় । এলাকার মানুষের কাছে বাদলবাবু হিসাবেই পরিচিত ছিলেন তিনি। ময়ূরেশ্বরের লোকপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ওই মানুষটি ছিলেন আদতে পড়তি জমিদার বাড়ির সন্তান। কিন্তু জমিদারি বড়াইয়ের ছিটেফোঁটাও ছিল না তার চলন বলনে।বরং নিন্তাতই প্রান্তজীবির মতোই ছিল তার জীবন যাপন।তাই জমিদার বাড়ির অন্যান্য সদস্যদের তুলনায় তিনি ছিলেন প্রান্তজীবিদের কাছের মানুষ , সুঃখদুঃখের ভাগীদার।
আমার বাবা মা তাকে দাদু বলে ডাকতেন , আমরাও দাদু বলেই ডাকতাম।কখনও কখনও রেডিও দাদু বলতাম। কারণ তার বাড়িতে ছিল ফিলিপ্স কোম্পানির মস্ত এক রেডিও।সে সময় অত বড়ো আকারের রেডিও খুব একটা দেখা যেত না। ৬ টা বড়ো সাইজের এভারেডী ব্যাটারি লাগত সেই রেডিও চালাতে। রেডিও দাদুর ছিল অভাবের সংসার , তবু রেডিও চালানোর সৌখিনতা বজায় রেখেছিলেন বরাবর। রেডিও খারাপ হয়ে গেলে মেরামত করতে ছুটতেন বোলপুর কিম্বা সিউড়ি।গমগম করে দিনরাত বাজত সেই রেডিও। সেসময় অধিকাংশ গরীব পরিবারে রেডিও ছিল না।তারা বুধবারের সন্ধ্যায় যাত্রা , অনুরোধের আসর কিম্বা মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের স্তোত্রপাঠ শুনতে ভিড় জমাতেন তার বাড়িতে। শুধু দুঃস্থরাই নন , ওইসব বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানে আমাদের মতো যাদের বাড়িতে ছোট রেডিও ছিল তারাও সদলবলে হাজির হতাম তার বাড়িতে। বড়ো রেডিওতে ওইসব অনুষ্ঠান শুনতে যেন অন্যরকম লাগত , কেমন যেন ভরাট মনে হত।দাদুও ওইসব শ্রোতাদের মধ্যে বড়দের চা , ছোটদের বিস্কুট দিয়ে আপ্যায়িত করতেন।তখন গ্রামাঞ্চলের দোকানে বিস্কুট পাওয়া যেত না।তাই সাঁইথিয়া থেকে বিস্কুট আনিয়ে আলমারিতে ভরে রাখতেন।বলা বাহুল্য সেই বিস্কুটের লোভেও আমরা সেসময় দাদুর রেডিওর নিয়মিত শ্রোতা হয়ে উঠেছিলাম। আর সেই রেডিও বাদলদাদুকে অন্য পরিচিতি দিয়েছিল।
( সেই রেডিও )
রেডিওদাদুর কথা
( ৬৯ )
রেডিওদাদুর আসল নাম ছিল বংশীধর বন্দ্যোপাধ্যায় । এলাকার মানুষের কাছে বাদলবাবু হিসাবেই পরিচিত ছিলেন তিনি। ময়ূরেশ্বরের লোকপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ওই মানুষটি ছিলেন আদতে পড়তি জমিদার বাড়ির সন্তান। কিন্তু জমিদারি বড়াইয়ের ছিটেফোঁটাও ছিল না তার চলন বলনে।বরং নিন্তাতই প্রান্তজীবির মতোই ছিল তার জীবন যাপন।তাই জমিদার বাড়ির অন্যান্য সদস্যদের তুলনায় তিনি ছিলেন প্রান্তজীবিদের কাছের মানুষ , সুঃখদুঃখের ভাগীদার।
আমার বাবা মা তাকে দাদু বলে ডাকতেন , আমরাও দাদু বলেই ডাকতাম।কখনও কখনও রেডিও দাদু বলতাম। কারণ তার বাড়িতে ছিল ফিলিপ্স কোম্পানির মস্ত এক রেডিও।সে সময় অত বড়ো আকারের রেডিও খুব একটা দেখা যেত না। ৬ টা বড়ো সাইজের এভারেডী ব্যাটারি লাগত সেই রেডিও চালাতে। রেডিও দাদুর ছিল অভাবের সংসার , তবু রেডিও চালানোর সৌখিনতা বজায় রেখেছিলেন বরাবর। রেডিও খারাপ হয়ে গেলে মেরামত করতে ছুটতেন বোলপুর কিম্বা সিউড়ি।গমগম করে দিনরাত বাজত সেই রেডিও। সেসময় অধিকাংশ গরীব পরিবারে রেডিও ছিল না।তারা বুধবারের সন্ধ্যায় যাত্রা , অনুরোধের আসর কিম্বা মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের স্তোত্রপাঠ শুনতে ভিড় জমাতেন তার বাড়িতে। শুধু দুঃস্থরাই নন , ওইসব বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানে আমাদের মতো যাদের বাড়িতে ছোট রেডিও ছিল তারাও সদলবলে হাজির হতাম তার বাড়িতে। বড়ো রেডিওতে ওইসব অনুষ্ঠান শুনতে যেন অন্যরকম লাগত , কেমন যেন ভরাট মনে হত।দাদুও ওইসব শ্রোতাদের মধ্যে বড়দের চা , ছোটদের বিস্কুট দিয়ে আপ্যায়িত করতেন।তখন গ্রামাঞ্চলের দোকানে বিস্কুট পাওয়া যেত না।তাই সাঁইথিয়া থেকে বিস্কুট আনিয়ে আলমারিতে ভরে রাখতেন।বলা বাহুল্য সেই বিস্কুটের লোভেও আমরা সেসময় দাদুর রেডিওর নিয়মিত শ্রোতা হয়ে উঠেছিলাম। আর সেই রেডিও বাদলদাদুকে অন্য পরিচিতি দিয়েছিল।
( সেই রেডিও )
খুব গুণগ্রাহী মানুষ ছিলেন বাদলদাদু। আমাদের বাড়ি নিয়মিত যাতায়াত ছিল তার। সেই হিসাবে মা মাঝমধ্যে তাকে আমাদের বাড়িতে খেয়ে যেতে বলতেন। প্রতিবার খাওয়ার পরই তাকে বিভিন্ন জায়গায় বলতে শুনতাম , ওঃ নাতবৌয়ের রান্নার হাত কি ? মনে হচ্ছে যেন অমৃত খেলাম। আর কি আন্তরিকতা , হবে না কেন কোন জাতবংশের মেয়ে দেখতে হবে তো। ছামনার মজুমদার বাড়ির (আমার মামার বাড়ি) মতো বাড়ি আর কটা আছে এ তল্লাটে ? মা অবশ্য ওইসব প্রশস্তি শুনতে পেতেন না , কিন্তু মায়ের প্রশংসায় আমাদের বুকটা গর্বে ভরে উঠত। বাদলদাদু ছিলেন ওইরকমই।শুধু আমার মায়ের ক্ষেত্রেই নয়, যে কেউ শাকভাত খাওয়ালেও অন্যের কাছে পোলাও -বিরিয়ানি খাওয়ানোর মতো মুখ করে বলে বেড়াতেন। আজকের দিনে কোথাই সেই গুণগ্রাহিতা ? আজ তো সবাই ছিদ্র খুঁজে বেড়াতেই ব্যস্ত।
স্ত্রী আর পাঁচ ছেলেমেয়ে নিয়ে ছিল তার টানাটানির সংসার। একে অভাব তার উপরে স্ত্রী ছিলেন কিছুটা মস্তিক বিকৃতির শিকার। সাংসারিক এই প্রতিকূলতা স্বত্ত্বেও খুব কম সময়ই তাকে মেজাজ হারাতে দেখেছি। বরং স্ত্রীকে খুব মিস্টি করে "ঠাকরুন' বলে ডাকতে শুনেছি তাকে।সেই ডাকটা আজও আমার কানে লেগে আছে।তবে তার মধ্যে একটা চাপা অভিমান বোধ মাঝে মধ্যে লক্ষ্য করেছি।হৃষ্টপুষ্ট চেহারার মানুষটির চোখ দুটি ছিল খুব ছোট। চোখের পাতা খুলত না বললেই চলে।একই রকম চোখ তার তিন ছেলেমেয়েরও রয়েছে। তাদের ওই শারীরিক ত্রুটি নিয়ে কতজনকে কত কটাক্ষ করতে শুনেছি। দুঃখে অভিমানে হয়তো বুক ফেটে গিয়েছে তবু মুখ ফুটে কাউকে কিছু বলতে পারেন নি। নীরবে হজম করেছেন যাবতীয় অপমান।
কিন্তু মনে রাখেন নি ওইসব কথা , মনের মধ্যে পুষে রাখেন নি রাগও। কেউ বিপদে আপদে পড়লে সাধ্যমতো পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন। কেউ হয় তো বলেছেন , বাবু আমাদের বাড়ির পাশে আপনাদের যে জায়গাটা আছে সেটা পেলে ভালো হয়।দাদু বলতেন , বেশ রে বিক্রি করলে তোকেই দেব জায়গাটা। যথারীতি সেই কথাও রেখেছেন। মূলত জমি-জায়গা বিক্রি করেই চলত দাদুর সংসার।কিন্তু ওইসব ক্ষেত্রে তিনি দাম দেখতেন না। যার সুবিধা হবে তাকেই বিক্রি করতেন।অনেকক্ষেত্রে অন্যরা ওইসব জমি চড়া দামে কিনতে চেয়েছেন , কিন্তু তিনি সবিনয়ে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন ' যথা ধর্ম তথা জয়'। ওকে যে আমি কথা দিয়ে ফেলেছি।তাছাড়া কারও অসুবিধা করলে যে ধর্মে সইবে না। আমি বাপু অধর্ম করতে পারব না। বাস্তবিকই কাউকে অসুবিধায় ফেলে বেশি টাকার লোভে অন্য কাউকে জমি জায়গা বিক্রি করে দেন নি।বরং অপেক্ষেকৃত কম দামে , কিস্তিতে কিস্তিতে টাকা নিয়েও যার যেখানে সুবিধা তাকেই সেখানে জমি - জায়গা বিক্রি করেছেন।আমার বাবাকেও কিছু জায়গা বিক্রি করেছিলেন। লোকে তার এই মহানুভবতাকে বোকামি বলে আখ্যায়িত করত।আর আকাশের দিকে হাত তুলে বাদলদাদু বলতেন , যথা ধর্ম , তথা জয়।উপরে ঈশ্বর আছেন। অধর্ম করতে পারব না।
বাদলদাদুর কাছে আমিও উপকৃত। সেই উপকারের কথা আজও আমি ভুলি নি। আমি তখন কর্মসংস্থানের তাগিদে তার বাড়ির সামনে হাস্কিং মিল খুলেছি। কিন্তু অর্থাভাবে ধান ওজন করার একটা কাঁটা কিনতে পারছিলাম না। আন্দাজে ধান ভাঙানোর বানীর পয়সা নিতে হত। তাই নিয়ে খরিদ্দারদের সঙ্গে মতানৈক্য , খিটিরমিটির লেগেই থাকত। বাদলদাদুর সেটা চোখ এড়ায় নি। আমার আর্থিক সংকটের কথা শুনে হঠাৎ দেখি একদিন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বহরমপুর থেকে ২০০ টাকা দামের একটা কাঁটা কিনে হাজির। সেই টাকার জন্য কোনদিন তাগাদা করেন নি। আমি মিল চালিয়ে যখন যেমন পেরেছি ৫ / ১০ টাকা করে শোধ করেছি।পেশা পরিবর্তনের পর তালাবন্ধ হয়ে আছে সেই মিলঘর। কিন্তু মেশিনপত্র আজও রয়েছে। আর রয়েছে বাদলদাদুর কিনে দেওয়া সেই কাঁটা। বিশ্বকর্মা পুজোর দিন তালা খুলে মেশিনপত্রের সঙ্গে সেই কাঁটাতেও পুজো দেওয়া হয়। আর সেই কাঁটা ছুঁয়ে আমি আজও যেন বাদলদাদুর স্নেহের স্পর্শ পাই।
( চলবে )
পড়ুন / পড়ান
নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন
১৯ নভেম্বর থেকে প্রতিদিন সকাল ১০ টার মধ্যে প্রকাশিত হচ্ছে
ধারাবাহিক উপন্যাস
সালিশির রায়
সালিশি সভার রায়ে সর্বস্ব হারানো এক আদিবাসী তরুণীর ঘুরে দাঁড়ানোর , অন্যকে দাঁড় করানোর মর্মস্পর্শী কাহিনী অবলম্বনে ধারাবাহিক উপন্যাস --
খুব কাছে থেকে দেখা আদিবাসী সমাজের এক তরুণীর মর্মান্তিক পরিণতির ঘটনা । একসময় ঘটনাটি নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে তোলপাড় হয়েছিল। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমের নজর এড়িয়ে গিয়েছিল অনেক ঘটনা।সেই ঘটনাই তুলে ধরা হয়েছে এই কাহিনীতে। আদিবাসী সমাজের ভাষা আলাদা , কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো ভাবের প্রকাশও আলাদা। কিন্তু দুঃখ , জ্বালা , যন্ত্রণার অভিব্যক্তি মনে হয় মানুষ মাত্রেরই এক।সেই সব জ্বালা যন্ত্রনার অভিব্যক্তি বৃহত্তর সমাজের উপযোগী ভাষা এবং ভাবের প্রকাশ ভঙ্গিতে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র। ত্রুটি -বিচ্যুতি থাকাটাই স্বাভাবিক।তাই সবিনয়ে আগাম মার্জনা চেয়ে নিচ্ছি। একটাই প্রার্থনা , ভালো লাগলে বলুন , বলুন খারাপ লাগলেও।ধন্যবাদ।



দারুন লাগলো। আমিও বাদল বাবুকে দেখেছি। কিন্তু তোমার কলমে তাঁকে আজ নতুন করে চিনলাম। অনেক ধন্যবাদ।
ReplyDelete