Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

লুপ্তপ্রায় খেলা -- ১



                                                                 
     
  ( শুরু হোল হারিয়ে যাওয়া বা হারিয়ে যেতে বসা বিভিন্ন খেলা নিয়ে ধারাবাহিক লেখা )                       

                 লুপ্তপ্রায় খেলা --- ১
                                                           
             
         
              (   ছবি  --- সোমনাথ মুস্তাফি ) 


                            রাম - সীতা
                                                    

                         


                           হাকিম - পুলিশ 
                                               
                                                            

একসময় স্কুল জীবনের শুরুতেই গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ ছেলেমেয়ে প্রথম যে খেলাটি রপ্ত করত সেই খেলাটির নাম ছিল রাম-সীতা। বছর চল্লিশেক আগেও প্রাথমিক স্কুলের পড়ুয়াদের মধ্যে খেলাটির ব্যাপক প্রচলন ছিল। সাধারণত ক্লাস শুরু হওয়ার আগে  কিম্বা টিফিনের সময় ছেলেমেয়েরা রাম-সীতা খেলায় মেতে উঠত। মূলত কাগজের কুচি দিয়ে খেলা হয় বলে কোথাও কোথাও খেলাটি ' কাগজ কুচি'র খেলা হিসাবেও পরিচিত ছিল। কমপক্ষে ৪ জন ছেলেমেয়ে নিয়ে একক ভাবে খেলাটি হয়। চার জন ছেলেমেয়ের খেলার জন্য প্রয়োজন ১৬ টি চারকোনা কাগজের টুকরো। প্রতি চারটি টুকরোতে লেখা হয় রাম , সীতা,ভরত এবং লক্ষণ। তবে খেলোয়াড় বেশি হলে প্রতিজনের জন্য আরও চারটি করে কাগজকুচি যোগ করতে হয়। সেক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী শত্রুঘ্ন, সুগ্রীব এমন কি হনুমানের নামও লেখা যায়। তবে মূলত প্রথমোক্ত চারজনের নামেই খেলার চল ছিল বেশি। কিন্তু অতিরিক্ত ছেলেমেয়েদের খেলায় অংশ নিতে না পারার মন খারাপ দূর করতেই অনেকটা সান্ত্বনা পুরস্কারের মতোই ওই অতিরিক্ত সংযোজন ঘটানো হত।


         খেলার নিয়মানুযায়ী প্রথমে একজনকে লিডার মনোনীত করা হয় । প্রতিটি রাউন্ডে লিডার পরিবর্তন কিম্বা অপরিবর্তিতও রাখা যায়। লিডার নির্বাচনের পর সবাইকে বৃত্তাকারে বসতে হয়। তারপর লিডার কাগজকুচিগুলি মাথার উপর দিয়ে ছুড়ে দেয়। সেগুলো মাটিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে এক একজন খেলোয়াড় দ্রুত চারটি করে কাগজকুচি কুড়িয়ে নেয়। এরপর প্রত্যেকে দুহাতের আড়ালে দেখে নেয়  নিজের নিজের ভাগ্যে কি কি নাম লেখা কাগজ উঠেছে। যার ভাগ্যে একই নাম লেখা কাগজ যত বেশি সংখ্যক ওঠে ওই খেলায় সে তত বেশি ভাগ্যবান বলে বিবেচিত হয়। কারণ ওই খেলার নিয়ম অনুযায়ী সবাইকে একই নাম লেখা ৪ টি কাগজকুচি সংগ্রহ করতে হয়। এজন্য একজন খেলোয়ার সর্বাধিক বেশি  সংখ্যক নাম লেখা কাগজকুচি নিজের হাতে রেখে ১ টি করে  অপ্রয়োজনীয় কাগজকুচি তার বাঁ পাশের খেলোয়ারের কোলের উপর উল্টো পিঠ করে নামিয়ে দেয়। উদাহরণ হিসাবে ধরা যাক, কোন একজন খেলোয়াড় দুটি রাম , একটি সীতা এবং একটি লক্ষ্মণ লেখা কাগজকুচি পেয়েছে। সেক্ষেত্রে ওই খেলোয়ার রাম লেখা কাগজকুচি দুটি অবশ্যই রাখবে। বাকি দুটির মধ্যে যেকোন একটি পাশের জনকে দেবে। তিনটি এক নাম লেখা কাগজকুচি পেলে তো কোন কথাই নেই , সেই তিনটিকে রেখে অন্যটি চালান করবে। অন্যকে কাগজকুচি দেওয়াকে খেলার পরিভাষায় বলা করে চালান করে দেওয়া বলা হয়।


    
                     ওইভাবে একই নাম লেখা কাগজ কুচি সংগ্রহের জন্য ধারাবাহিকভাবে ওই চালান প্রক্রিয়া চলে। এক্ষেত্রে প্রচন্ড গোপনীয়তা রক্ষার চেষ্টা করা হয়। দু'হাতের আড়ালে রাখা হয় নিজ নিজ কাগজকুচি। কারণ প্রতিপক্ষ কোন খেলোয়াড় যদি জেনে যায় তার পাশের জন কি নাম লেখা কাগজকুচি সংগ্রহ করছে তা হলে বিপদ।সেই নাম লেখা কাগজকুচি যদি প্রতিপক্ষের কাছে থেকে যায় তাহলে নিজের প্রার্থিত চারটি কাগজকুচি না মেলা পর্যন্ত সেটা সে কিছুতেই হাতছাড়া করতে চায় না।যাতে তার আগে অন্যের চারটি কাগজকুচি সংগ্রহ সম্পূূর্ণ না হয়ে যায় তার জন্যই শেষ পর্যন্ত বিপক্ষের প্রার্থিত কাগজকুচিটি কেউ হাতছাড়া করতে চায় না। কারণ খেলার নিয়ম অনুযায়ী যে সবার আগে একই নাম লেখা ৪ টি কাগজকুচি সংগ্রহ করে মেঝেতে নামিয়ে দেখাতে পারবে সেই প্রথম বলে বিবেচিত হবে। এরপর একই নাম লেখা সংগৃহিত কাগজকুচির সংখ্যা অনুযায়ী বাকিদের দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং চতুর্থ স্থান নির্ধারিত হয়।


                                                       রাম - সীতা বা কাগজকুচির মতোই স্কুলস্তরে বাচ্চাদের প্রিয় আরও একটি খেলা প্রচলিত ছিল। খেলাটির নাম হাকিম--পুলিশ।এক্ষেত্রে কাগজকুচি দিয়ে খেলা হলেও নিয়মের কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। এই খেলায় প্রতি জন খেলোয়াড়ের জন্য চারটির বদলে মাত্র ১ টি করে কাগজকুচি বরাদ্দ থাকে। কাগজকুচিগুলিতে লেখা থাকে হাকিম, পুলিশ, চোর এবং ডাকাত। এক্ষেত্রেও খেলোয়াড়ের সংখ্যা বেশি হলে চৌকিদার কিম্বা সিপাইয়ের নাম অর্ন্তভুক্ত করা যায়। হাকিমের জন্য বরাদ্দ থাকে দশ নম্বর।হাকিমের নির্দেশ অনুযায়ী পুলিশ, চৌকিদার কিম্বা সিপাই চোর কিম্বা ডাকাতকে ধরতে পারলে ৮ নং পাওয়ার অধিকারী হয়। ধরতে না পারলে চোর কিম্বা ডাকাত সমপরিমাণ নম্বর পেয়ে যায়। রাম - সীতার মতোই এই খেলাতেই কাগজকুচি প্রথমে একত্রে উপরে ছুড়ে দেওয়া হয়। ক্ষিপ্রতার সঙ্গে  একজন একটি করে কাগজকুচি কুড়িয়ে নেয়। তারপর চোর এবং ডাকাত ছাড়া সবাই কে কি নাম লেখা কাগজ কুড়িয়েছে তা জানিয়ে দেয়।হাকিম লেখা কাগজটি যে সংগ্রহ করতে পারে সে ১০ নং লাভের পাশাপাশি পুলিশ, চৌকিদার, কিম্বা সিপাইকে চোর কিম্বা ডাকাত ধরার হুকুম দেওয়ার অধিকারী হয়। সে পুলিশ, চৌকিদার কিম্বা সিপাইকে বাকি দুজনের মধ্যে কে চোর বা ডাকাত তা চিহ্নিত করার হুকুম জাড়ি করে। 


                         সেই নির্দেশ অনুযায়ী সঠিক জনকে চিহ্নিত করতে পারলেই নির্দেশ পালনকারীর ৮ নম্বর প্রাপ্য হয়। অন্যথায় যাকে চিহ্নিত করতে বলা হয় সেই চোর কিম্বা ডাকাত সমপরিমাণ নম্বর পায়। অর্থাৎ হাকিম যদি পুলিশকে বলে ডাকাত ধরে তাহলে তাকে আন্দাজে কার কাছে ডাকাত লেখা কাগজ আছে তা চিহ্নিত করতে হয়। আন্দাজ সঠিক হয়ে তার ৮ নম্বর জোটে। আন্দাজ ভুল হলে ডাকাতই ৮ নম্বর পেয়ে যায়। একই ভাবে চৌকিদার, সিপাইদের ক্ষেত্রেও চোর- ডাকাত ধরার জন্য সমপরিমাণ নম্বর জোটে। আন্দাজ ভুলে হলে যাদের ধরতে বলা হয় তারাই সেই নম্বর পায়। এইভাবে ১৫/২০ রাউন্ড খেলা শেষে প্রাপ্ত নম্বর অনুযায়ী প্রথম, দ্বিতীয় সহ বাকিদের স্থান নির্ধারিত হয়। একসময় বাচ্চাদের মুখে মুখে ফিরত খেলাদুটির নাম। বই কিম্বা খাতার পাতার ফাঁকে ওইসব কাগজকুচি দেখে অভিভাবক কিম্বা শিক্ষকদের কাছে বকুনি খায় নি এমন ছেলেমেয়ে কমই আছে।সেই স্মৃতি  আজও অনেকের মনের মণিকোঠায় অক্ষয় হয়ে আছে। খেলাটাই শুধু হারিয়ে গিয়েছে। বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা অধিকাংশ জানেই না খেলা দুটির নাম।




                 (  চলবে )


         নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 



    





                      --------০--------

No comments:

Post a Comment