লুপ্তপ্রায় খেলা -- ৪
খেঁটে খেঁটে
' এক থালা বালি - তুই কি আমার শালী , এক থালা মুসুরি - তুই কি আমার শাশুড়ি , এক ভাঁড় দই - তুই কি আমার সই , কিম্বা খেঁটে খেঁটে খেলতে গিয়ে কুড়িয়ে পেলাম বেল -- বেলের ভিতর লেখা আছে ক্ষুদিরামের জেল ।' শ্লীল-অশ্লীল , মানান- বেমানান যাই হোক না কেন একসময় ছেলেমেয়েদের মুখে মুখে ফিরত ওই জাতীয় ছড়া। ঘুমের ঘোরেও নাকি ওই ধরণের ছড়া শোনা যেত ছেলেমেয়েদের মুখে। আর ছেলেমেয়েদের মুখে শুনতে শুনতে ছড়াগুলি অভিভাবকদেরও কান সহা হয়ে উঠেছিল। অবচেতনে তারাও মাঝে মধ্যে আউড়ে ফেলতেন ওইসব ছড়া। আসলে একটি খেলার সৌজন্য একসময় ছড়াগুলির ব্যাপক প্রচলন ছিল ।
খেলাটির নাম খেঁটে - খেঁটে। ছেলেমেয়েরা এক সঙ্গে কিম্বা আলাদা আলাদা ভাবেও ওই খেলায় অংশ নিতে পারে। নিয়মানুযায়ী দুটি দল ভাগ করে খেলাটি হয়। প্রতিটি দল ৮/১০ জন করে খেলোয়াড় থাকাটা বাঞ্ছনীয়। কোন দল আগে ' দান ' নেবে তা স্থির হয় সাধারণত টসের মাধ্যমে। ওই খেলার জন্য মাঠের মাঝে চক - খড়ি কিম্বা শুধুমাত্র লাঠির সাহার্যে একটি ঘর বা বৃত্ত আঁকতে হয়। খেলার পরিভাষায় ওই বৃত্ত বা ঘরটিকে বলা হয় ' খেঁটের ঘর।'
' খেঁটে'র ঘর থেকে ১৫ / ২০ ফুট দুরে একটি সরলরেখা টানা হয় । টসে জয়ী দলের খেলোয়াড়রা প্রথমে ওই সরলরেখার সামনে দাঁড়ায়।তারপর নিজেদের মধ্যে থেকে একজনকে 'খেঁটে' নির্বাচন করে। বাকি খেলোয়াড়দের মধ্যে যে কোন একজনকে এক দমে অর্থাৎ নিঃশ্বাস না ফেলে পচ্ছন্দ অনুযায়ী সুর করে ওই ধরণের ছড়া আউরাতে আউরাতে 'খেঁটে'র হাত ধরে তাকে তার ঘরে অর্থাৎ সেই বৃত্তে বসিয়ে দিয়ে আসতে হয়।এক নিঃশ্বাসে ছড়া আউড়ানোর বিষয়টিকে খেলার ভাষায় ' ডাক ধরা ' বলা হয়।ডাক ধরারও কায়দা রয়েছে। প্রতিবার শুরুতে ছড়াটি পুরো আউড়াতে হলেও পরে কবি গানের ধুয়োর মতো আউড়ে গেলেই চলে। অর্থাৎ প্রথমে 'একথালা বালি তুই কি আমার শালি বলে শুরু করে দম থাকা পর্যন্ত ক্রমান্বয়ে তুই কি আমার শালি - তুই কি আমার শালি - তুই কি আমার শালি বলাটাই প্রচলিত রীতি। ওই ভাবে ' খেটেকে ' তার ঘরে পৌঁছে দিতে যাওয়াটা বেশ বিপদজনক। কারণ 'খেঁটেকে' তার ঘরে পৌঁছে দিয়ে ওই খেলোয়াড়কে ডাক ধরে একদমেই সরলরেখায় ফিরতে হয়।
মাঝপথে যদি তার দম ফুরিয়ে যায় , অর্থাৎ ডাকের ছেদ ঘটে যায় তাহলেই বিপদ।কারণ সেই মুহুর্তে বিপক্ষ দলের খোলোয়াড় তাকে ছুঁয়ে দিলে তার ' মরা ' হয়ে যায়। তখন তাকে অনিদ্দিষ্ট কালের জন্য বাইরে বসে থাকতে হয়। যতক্ষণ না পর্যন্ত তার দলের খেলোয়াড়রা বিপক্ষের কাউকে ' মারতে ' না পারে ততক্ষণ সে প্রাণ ফিরে পায় না। এজন্য খেঁটেকে তার ঘরে পৌঁছে দিতে আসা খেলোয়াড়কে বিপক্ষ দলের খেলোয়াড়রা নিরাপদ দুরত্ব থেকে নানা রকম অঙ্গভঙ্গি সহ উল্টোপাল্টা কথা বলে উত্যক্ত করার চেষ্টা করে। যাতে সে অন্যমনস্ক দম হারিয়ে ফেলে বলে ওই জাতীয় কৌশল অবলম্বন করা হয়।তবে এতে তাদের নিজেদের বিপদের সম্ভাবনাও কম থাকে না। ' ডাকধারী ' খেলোয়াড় যদি তাদের কাউকে ছুঁয়ে দিতে পারে তাহলে সে'ই ' মরা ' বলে পরিগণিত হয়। সেক্ষেত্রে পরবর্তীকালে ''ডাকধারী ' খেলোয়াড়দের মধ্যে কেউ ডাকের সময় দম ফুরিয়ে ' মরা ' না হলে সে'ও প্রাণ ফিরে পায় না অর্থাৎ খেলায় সামিল হতে পারে না।
'খেঁটে'কে তার ঘরে পৌঁছে দেওয়ার পরই মূলত খেলা শুরু হয়। 'খেঁটে'কে নিরাপদে অর্থাৎ বিপক্ষদলের খেলোয়াড়দের ছোঁওয়া বাঁচিয়ে বৃত্তাকার ঘর ছেড়ে সরলরেখায় অবস্থানকারী নিজের দলের খেলোয়াড়দের কাছে পৌঁছানোই হল ওই খেলার মুল লক্ষ্য। 'খেঁটে'কে ঘর ছেড়ে নিরাপদে সরলরেখায় পৌঁছোতে দলীয় খোলোয়াড়দের সাহার্যের করার চমকপ্রদ নিয়ম রয়েছে। নিয়মটি হলো , ' খেঁটে' কে পাহারা দেওয়ার জন্য বিপক্ষের খেলোয়াড়রা বৃত্তাকার ঘরের চারপাশে নিরাপদ দুরত্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। টসে জয়ী দলের খেলোয়াড়রা ক্রমান্বয়ে একে একে সরলরেখা থেকে ডাক ধরে বৃত্তাকার ঘরে এসে 'খেঁটে'র মাথা ছূুয়ে 'খেঁটে'কে নিরাপদে সরলরেখায় পৌঁছোনোর পথ পরিষ্কার করতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিপক্ষ দলের খেলোয়াড়দের তাড়া করে বেড়ায়।
সেই সুযোগে 'খেটে' ছুটে সরলরেখায় পৌছোনোর চেষ্টা করে। তখন 'ডাকধারীর' ছোঁওয়া বাঁচাতে বিপক্ষের খেলোয়াড়রা দুরে ছুটে পালায়। সেইজন্য ছোঁওয়া পড়ার ভয় থাকে না। কারণ ছোঁওয়া পড়লেই 'মরা' হতে হয়। 'মরা ' খেলোয়াড়ের সংখ্যা বেড়ে গেলে 'খেঁটে'কে পাহারাদার কমে যাওয়ায় সমস্যা দেখা দেয়। অন্যদিকে 'ডাকধারী' খেলোয়াড়েরও ঝুঁকি কম থাকে না। বিপক্ষেকে তাড়া করতে গিয়ে দম ফুরিয়ে ছোঁওয়া পড়লেই তাকেও মরা হতে হয়। সেক্ষত্রে বিপক্ষের একজন ' মরা ' খেলোয়াড় জীবন ফিরে পেয়ে খেলায় সামিল হওয়ার সুযোগ লাভ করে। তবে তার ক্ষেত্রে একটি সুবিধাও রয়েছে। দম ফুরিয়ে সরলরেখায় পৌঁছোতে না পারলেও সে সাময়িক ভাবে 'খেটে'র ঘরে আশ্রয় নিতে পারে। তখন আর একজন সহ খেলোয়াড় এসে 'খেঁটে'র ঘর থেকে তার হাত ধরে তাকে সরলরেখায় নিয়ে যায়। ইচ্ছে করলে অর্থাৎ দমের ঘাটতি না হলে সে ওই খেলোয়াড়কে সরল রেখায় পৌঁছে দিয়ে বিপক্ষে অন্যদের মতো তাড়া করতেও পারে। অনেকক্ষেত্রে বিপক্ষকে তাড়া করার পর সরলরেখায় ফেরার সময় 'খেটে'র ঘরে আশ্রয় নেওয়া খেলোয়াড়কেও নিয়ে যাওয়া হয়। আবার ' ডাকধারী' খেলোয়াড় তাড়া করে বিপক্ষের কাউকে ছুঁয়ে দিতে পারলেও সেই ' খেলোয়াড় ' 'মরা' হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি স্বপক্ষীয় একজন মৃত খেলেয়োড় জীবিত হয়ে ওঠে।
ওইভাবে ধারাবাহিক ভাবে টস জয়ী দলের খেলোয়ারদের ক্রমান্বয়ে ' ডাকের ' সুযোগে 'খেটে' যদি বিপক্ষের ছোঁওয়া বাঁচিয়ে সরলরেখায় পৌঁছে যেতে পারে তাহলেই 'চিক' খেয়ে যায় বিপক্ষ। তখন আবার নতুন ভাবে টস করে খেলা শুরু হয়। অন্যথায় বিপক্ষীয়রা যদি মাঝপথ 'খেঁটেকে' ছুয়ে দিতে পারে তাহলেই বিপদ। 'ডাকধারী' গোটা দলটাই ' মরা ' বলে বিবেচিত হয়।তখন বিপক্ষ দল ' দান' নেওয়ার সুযোগ লাভ করে।
চর্চার অভাবে এই খেলাটিও হারিয়ে যেতে বসেছে। অথচ একসময় ওই খেলাকে কেন্দ্র করেই ছেলেমেয়ের মধ্যে সৃজনশীল প্রতিভার স্ফুরণও ঘটেছে। খেলায় ডাকের জন্য প্রচলিত ছড়ার সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে ছেলেমেয়েদের মধ্যে স্থানীয় কোন ব্যক্তি , ঘটনা বা বিশেষ কোন বিষয়ের উপর মুখে মুখে ছড়া মেলানোর প্রবণতা লক্ষ্য করা যেত।সমকালীনতার ছোঁওয়া মিলত ওইসব ছড়ায়। ছোটদের বানানো একটা ছড়া সেই সময় বড়দের মুখে মুখেও ফিরত -- ' খেঁটে খেঁটে খেলতে গিয়ে কুড়িয়ে পেলাম বেল , কেদে ( কাস্তে ) হাতুড়ি জিতে গেল -গাই বাছুর ফেল।'




No comments:
Post a Comment