Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

ঠাকরুন মা -- ২১ /




    ঠাকরুন মা 


             অর্ঘ্য ঘোষ 

  ( ধারাবাহিক উপন্যাস ) 


অন্নপূর্ণা চেয়ে দেখে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন দুই ভাসুর। তাদের দেখে খুব অবাক হয় অন্নপূর্ণা। সেই সায়ন্তন যেদিন খুন হলো সেদিন একবার মাত্র মুখ দেখাতে এসেছিলেন। তারপর আর খোঁজ নেন নি। তাই দুই ভাসুরকে দেখে দ্রুত মাথায় কাপড় টেনে নেয় অন্নপূর্ণা।কিছুক্ষণ কোন কথা বলতে পারে না সে।কিছুটা সামলে নিয়ে একটু  আড়ালে সরে যায় সে। সেখান থেকেই ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বলে - বাবা , জ্যাঠামশাইদের বসতে মোড়া দুটো বের করে দাও তো। 
মোড়াতে বসে প্রথমে বড়ভাসুর বলেন, তোমরা কেমন আছো জানতে এলাম। 
----- কেমন আছি তা তো আপনাদের অজানা নয় বড়দা।
---- সে তো জানিই। সেই জন্যই তো তোমরা যাতে ভালো থাকো তাই একটা প্রস্তাব নিয়ে এসেছি।
 ----- প্রস্তাব , কিসের প্রস্তাব ? 
এবারে কথা শুরু করেন ছোটভাসুর। তিনি বলেন , দেখ বৌমা আমরা ভেবে দেখলাম সায়ন্তন চলে গিয়েছে , সে তো আর ফিরবে না। মাঝখান থেকে আইন আদালত করতে গিয়ে শুধু শুধু তোমার হয়রানি আর অর্থব্যয় হবে। 
---- শুধু শুধু ? 
--- তা নয় , তিনআনিদের সঙ্গে  লড়াইয়ে তুমি পেরে উঠবে ? 
---- লড়াই তো সবে শুরু হয়েছে , এখন থেকেই আপনারা ধরে নিলেন কি করে যে আমি পেরে উঠব না ? 
---- ওদের কত প্রভাব প্রতিপত্তি , অর্থবল। তোমার পাশে কে আছে ?
----- সেটা এক অর্থে ঠিকই বলেছেন , আপন বলতে অবশ্য আমার পাশে কেউ নেই। কিন্তু একেবারেই যে কেউ নেই তা ভাবলেন কি করে ?
ইচ্ছে করেই খোঁচাটা দিল অন্নপূর্ণা। ভাসুরদের কথা শুনে গায়ে জ্বালা ধরে যায় তার। এতদিন কোন খোঁজখবর রাখে নি। আজ  উপদেশ দিতে এসেছেন। কিন্তু ওদের অযাচিতভাবে আসার কারণটা কিছুতেই আন্দাজ করতে পারে না। তাই জিজ্ঞাসা করে --- তা আপনারা কি করতে বলছেন ? 
এবারে শুরু করেন বড়ভাসুর --- বলি কি বৌমা , যা হয়েছে  তা তো আর ফিরবে না। তুমি বরং ওই মামলাটা থেকে  সরে দাঁড়াও।
--- কি বলছেন আপনারা ? সরে দাঁড়াব মানে ?
---- শুধু শুধু কি আর সরে দাঁড়াতে বলছি তোমাকে ?
---- তাহলে ?
 ---- দেখ , তিনআনিরা বলে পাঠিয়েছে তুমি যদি মামলা থেকে সরে দাড়াও তাহলে ওরা তোমাকে ৫ বিঘে জমি দেবে। আর ওদের মেজকর্তার ছেলের সঙ্গে তোমার মেজমেয়ে কনার বিনা পণে বিয়ে দেবে । 


              কথাটা শোনার পরই নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে  না অন্নপূর্ণা। মেজাজ হারিয়ে ফেলে। তীব্র শ্লেষের সঙ্গে  বলে ওঠে -- কি বলছেন আপনারা ? সেদিন কোথাই ছিলেন ? যেদিন আপনারই ভাইকে ওরা বিনা অপরাধে পিটিয়ে খুন করল সেদিন তো একটিবারের জন্য ভাইকে বাঁচাতে ওদেরকে গিয়ে একটা কথা বলারও প্রয়োজন মনে হয়নি আপনাদের। আর আজ কিসের জন্য ওদেরকে বাঁচাতে ছুটে এসেছেন তা কি বুঝিনা ভাবেন ?
 ----- মানে কি বলতে চাইছো তুমি ?
---- দেখুন দাদা , এতদিন আপনাদের সামনে  মুখ তুলে কথা বলিনি , কিন্তু আজ আপনারাই আমাকে কথা বলতে বাধ্য করলেন। আমি কি বলতে চাইছি তা আপনারা ভালোই বুঝেছেন। তবু যখন না বোঝার ভান করছেন , তখন বলছি শুনুন ওরা কি শুধু আমাকেই জমি দেবে ? আপনাদের কিছু দেবে না তা যে বিশ্বাস হয়না দাদা।
 ---- তুমি কি আমাদের দালাল ঠাউরেছ নাকি ?
---- ঠাউরানোর কথা কেন বলছেন , আপনারা তো আসলে সেটাই করতে এসেছেন যেটা দালালরা করে থাকে। তবে সেটা যে সম্ভব হবে না দাদা। আমরা পেটে গামছা বেঁধে পড়ে থাকব , তবু ওদের কাছ থেকে গোটা জমিদারিটা দিলেও নেব না। আর খুনির ঘরে মেয়ের বিয়ে দেওয়ার থেকে গলায় দড়ি কলসি বেঁধে পুকুরে ডুবিয়ে দেব।
 ----- তোমাদের  কপালে দেখছি সেটাই লেখা আছে।
---- কপালে লেখা থাকলে তো আমারও কিছু করার নেই।  আপনাদেরও কিছু করার নেই দাদা। ভাগ্যের হাতে মার খেতে খেতে এখনও যখন মরি নি তখন বিচার শেষ না দেখে মরবও না।
 ---- ঠিক আছে সেটাই দেখা যাবে। 
একরাশ ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে চলে যায় দুই ভাসুর। আর খুব মন খারাপ হয়ে যায় অন্নপূর্ণার। এতদিন যা হয়েছে হয়েছে , ভাই খুন হওয়ার পর তার মাথার উপর তো কেউ নেই। এসময় ভাসুররা কোথাই তার পাশে দাঁড়িয়ে তাকে সাহস যোগাবেন , ভাইয়ের খুনীদের সাজার ব্যবস্থা করবেন , তা নয় উল্টে টাকাপয়সা নিয়ে খুনিদের হয়েই দালালি করতে এসেছেন। ওদের তো অনেক আছে , তবু এত লোভ কেন ভেবে পায় না সে। ভাসুরদের কথা শুনে আরও জেদ চেপে যায়। শেষ না দেখে সেও ছাড়বে না। তাতে বাড়ি বিক্রি করে গাছতলাতে গিয়ে থাকতে হয় তাও সে পিছু হঠবে না। মামলা চালাতে উকিলের খরচ অবশ্য তাকে লাগে না। সরকারি উকিল তো আছেই , সবকিছু তদারকি করছে সন্দীপনও। উকিল বাদ দিয়েও টুকটাক খরচ তো আছে। ভিক্ষার টাকা বাঁচিয়ে সে সন্দীপনের অগোচরে ওইসব খরচ কিছুটা নিজে মেটানোর চেষ্টা করে। সব খরচ সন্দীপনের কাছে থেকে নিতে তার কেমন যেন লাগে।পরে তার টাকা মেটানোর কথা শুনে সন্দীপন রাগারাগি করে।অন্নপূর্ণা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু পারে না। সন্দীপন বলে , মাসীমা আসলে আপনি আমাকে আপন ভাবতে পারেন না তাই ----। 
----- কি যে বলো বাবা , তুমি না থাকলে এই মামলা তো তিনআনিরা তাদের দোকানতলাতেই চুকিয়ে দিয়েছিল। আমি কি এতদুরে আসতে পারতাম ?

                        কিন্তু যত দিন যায় মামলা নিয়ে সন্দীপনকে ততই যেন দুশ্চিন্তাগ্রস্থ দেখায়। আদালত চত্বরেই অন্নপূর্ণা কানাঘুষোয় শুনতে পায় , তাদের পক্ষে এ মামলা জেতা খুব কঠিন। তিনআনিরা নাকি পয়সা দিয়ে তদন্তকারী পুলিশ অফিসারকে কিনে নিয়েছে। তাই বিস্তর ফাঁক -ফোঁকর রেখে মামলা সাজিয়েছেন ওই অফিসার। যাতে ফাঁক -ফোঁকর দিয়ে তিনআনিরা বেরিয়ে যেতে পারে। সরকারি আইনজীবিকেও নাকি ওরা ঘুষ দিয়ে হাত করেছে। তাই তিনি তিনআনিদের উকিলকে চেপে ধরেন না। শুধু একাই লড়ে যায় সন্দীপন। সন্দীপনই তাকে বলেছে , এখন মামলা জেতা পুরোপুরি স্বাক্ষীর উপর নির্ভর করছে। কিন্তু তিনআনিরা নাকি সাক্ষীতেও তাক লাগিয়ে দেবে শোনা যাচ্ছে। অন্নপূর্ণা তাই আর ভাবতে পারে না। মাথাটা সবসময় কেমন যেন ঝিমঝিম করে। মনে মনে ভগবানকে বলে, ঠাকুর তোমার আদালতে তো তুমিই উকিল , তুমিই স্বাক্ষী, তুমিই বিচারক।তোমার তো কিছুই অজানা নয়। তুমিই এর বিহিত কোর।
অন্নপূর্ণার প্রার্থনা বোধ হয় পৌঁছোয় না ঠাকুরের কানে। তাই ফের বিপর্যয় নেমে আসে তার সংসারে। এই বিপর্যয়ের দায় তার উপরে কিছুটা হলেও বর্তায়। কিন্তু অভীকের জন্য যে তাকে এতবড়ো বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হবে তা কোনদিন ভাবেনি অন্নপূর্ণা। পাড়ারই ছেলে অভীক।  শিক্ষিত, দেখতে শুনতেও দিব্যি ভালো। গ্রামে ভদ্রছেলে বলে পরিচিতিও রয়েছে। খুবগুছিয়ে কথা বলে। সৌরভকে টিউশানি পড়াত। ছ'মাস- ন'মাসে বেতনের টাকা পেত , তবু পড়াত আসত নিয়মিত। এমনকি সৌরভ মারা যাওয়ার পরও তার আসা যাওয়া বন্ধ হয়নি। প্রথমদিকে অন্নপূর্ণা ভেবেছিল , কয়েক বছরই তো সৌরভকে পড়িয়েছে, সেইজন্যই হয়তো সৌজন্যের খাতিরে দেখা করতে আসে। কিন্তু আস্তে আস্তে তার ভুলটা ভাঙে। কণার সঙ্গে  তার অন্য রকম সম্পর্কের আভাস পায়। নিশ্চত হওয়ার জন্য সে কনাকেই চেপে ধরেছিল একদিন।
--- হ্যা রে , যা আন্দাজ করছি তা কি সত্যি ?
--- যা , কি যে বলো না মা তুমি।
লজ্জায় মুখ লাল করে পালিয়ে যায় কনা। আর অন্নপূর্ণা ভেবে পায় না সে কি করবে ! তবে তার মনে একটা গোপন আশার সঞ্চারও হয়। পয়সা খরচ করে মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা তো তার নেই। অভীকের সঙ্গে  বিয়ে হলে কণা সুখীই হবে। অর্থ কিম্বা গুণ না থাক , কিন্তু  কণা ঘর আলো করা মেয়ে। তাই সে অভীকের সঙ্গে  মেলামেশাতে কিছুটা প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ই যোগায়। আর মায়ের এই মনোভাব জানার পরই আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে ওরা দু'জনে। অন্নপূর্ণা ভাবে এ বয়সে তো এটাই স্বাভাবিক। এরপরে তো বিয়ে হয়ে গেলে আর এইসব দিন পাবে না। আজ বড়ো আফশোস হয় , সেদিন যদি সে মনে মনে ওই কল্পনা না করত তাহলে হয়তো এই মর্মান্তিক দৃশ্য তাকে দেখতে হত না। একদিন কনাকে ডেকে সে বলে , হ্যা'রে তা এবার অভীককে বিয়ের জন্য বল। ও মত দিলেই ওর বাবা-- মায়ের সঙ্গে  কথা বলতে ওদের বাড়িতে যাব। কণা বলে , মা ও বলছে একটা চাকরি না পেলে ও কিছু করতে পারবে না। ওর বাড়িতে বিয়ে মেনে নেবে না।
---- ও , তাই ?  তাহলে চাকরির চেষ্টাই করুক বরং। তোদের বিয়েটা হয়ে গেলে আমি কিছুটা নিশ্চিন্ত হই। কিছুদিনের মধ্যেই গ্রামের প্রাইমারী স্কুলে চাকরী পায় অভীক। আশায় বুক বাঁধে অন্নপূর্না। যাক , এবার কণাটার একটা গতি হয়ে যাবে। হাসি ফোটে কণার মুখেও। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই সেই হাসি ঢেকে দেয় দুশ্চিন্তার কালো মেঘ। 


                                          চাকরি পাওয়ার পর থেকে আর এদিক মাড়ায় না অভীক। তাই সব সময় কেমন উতলা দেখায় কণাকে। নাওয়া খাওয়া পর্যন্ত করে না। রাতেও ভালো ঘুমোয় না। একদিন রাতে ঘুম ভেঙে অন্নপূর্ণা দেখে বাইরে বসে কাঁদছে কণা। সে গিয়ে মেয়ের মাথায় হাত রাখে। মাথায় হাত বুলোতে বুলোতেই সান্ত্বনা দেয় মেয়েকে - আরে কাঁদছিস কেন ? অভীক খুব ভালো ছেলে। হয়তো কাজের চাপে আসতে পারছে না। কয়েকদিন অপেক্ষা কর , দেখবি ঠিক আসবে। এতদিনের মেলামেশা বলে কথা। 
ওই কথা শোনার পরই মাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে কণা। কাঁদতে কাঁদতে সে বলে ,  কিন্তু আমার যে আর অপেক্ষা করার সময় নেই। আমি সর্বনাশ বাঁধিয়ে বসে আছি গো মা।
কথা শেষ হয় না , কণা উঠে গিয়ে বমি করে। অন্নপূর্ণার বুঝতে বাকি থাকে না সর্বনাশটা আসলে কি ? তার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। এখন কি করবে সে ভেবে পায় না। সর্বনাশের জন্য নিজেকেও ক্ষমা করতে পারে না। মেয়ের একটা গতি লাগবে , সেটা  না ভেবে সে যদি রাশ আলগা না করত তাহলে হয়তো এমনটা হতো না। কিন্তু সেও তো একটা ডুবন্ত মানুষ।খড়কুটো আঁকড়ে বাঁচতে চেয়েছিল।নাহলে মা হয়ে মেয়ের বিয়ে হওয়াটাকে গতি হওয়া ভাবে কেউ ? চিন্তায় চিন্তায় নিঘুমে  মা-- মেয়ের রাত কেটে যায়। অন্নপূর্ণা ভাবে আর বসে থাকা চলে না। মেয়েটাকে বাঁচাতে হবে। তাছাড়া আর যে কোথাও মুখ দেখাতেও পারবে না সে।সবাই তো বলবে , মায়ের আশকারা  পেয়েই মেয়েরা এমন হয়েছে। মেয়েদের দিয়ে ব্যবসা চালাচ্ছে মা। সেই কথা শোনার আগে যেন তার মৃত্যু হয়। সেদিন আর ভিক্ষা করতে বেরোয় না অন্নপূর্ণা। সকাল সকাল স্নান করে সে পৌঁছোয় অভীকদের বাড়ি। ঢোকার মুখেই অভীকের সঙ্গে  দেখা হয়ে যায়। তাকে দেখে অভীক কেমন যেন চোরের মতো পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। ভ্রু কুঁচকে যায় অন্নপূর্ণার। তাহলে কি ইচ্ছাকৃতভাবেই কণাকে এড়িয়ে যাচ্ছে সে ? কু 'গায় অন্নপূর্ণার মন। সরাসরি সে প্রশ্ন করে , কি গো অভীক আর আমাদের বাড়ি যাও কেন ? কণা খুব দুশ্চিন্তায় রয়েছে।
লজ্জার মাথা খেয়ে এর বেশি আর কিছু বলতে পারে না। এরপর দুশ্চিন্তার কারণটা অনুমান করতে অভীকের অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। যে ছেলে ওইরকম কান্ড বাঁধাতে পারে তারপক্ষে তার পরিণাম কি হতে পারে তা উপলব্ধি করতে না পারার কথা নয়। কিন্তু এবারেও কোন কথা বলে না অভীক। মুখ নামিয়ে অন্যদিকে চলে যায়। অন্নপূর্ণার মনে হয় লজ্জার কারণেই কিছু বলতে পারছে না সে। তাই অভীকের বাবা সুনির্মলের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় সে। সেখানে তখন হাজির ছিলেন অভীকের মা আরতিদেবীও। অন্নপূর্ণাকে দেখে দুজনেই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন। কিছুটা সংকোচের সঙ্গে সে বলে , আমি একটা জরুরী কথা বলতে এসেছিলাম।
----- জরুরী কথা ?
----- হ্যা , অভীক আর আমার মেয়ে কণা দুজন দুজনকে ভালোবাসে। বিয়েও করতে চায়। এবারে তো ওদের বিয়েটা না দিলেই নয়।
----- বিয়ে ? যার বাবা চোর আর মা ভিক্ষারী। সেই মেয়ের সঙ্গে  আমার ছেলের বিয়ে ? তুমি দিনে স্বপ্ন-টপ্ন দেখছো না তো ?
--- দেখুন আপনারা যা বলছেন সব ঠিক। কিন্তু আমার মেয়ে তো কোন দোষে দোষী নয়। আপনার ছেলে আমার মেয়েকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
---- প্রতিশ্রুতি! খোঁজখবর  নিয়ে দেখ গে ওই রকম প্রতিশ্রুতি তোমার মেয়েকে আরও অনেকে দিয়েছে।
--- কি বলছেন আপনারা ?  আপনার ছেলে বিয়ে না করলে যে আমার মেয়েকে আত্মহত্যা করতে হবে।ওর গর্ভে যে আপনার ছেলের সন্তান রয়েছে।
--- কি যা তা বলতে এসেছো এখানে ? আগেই তো বললাম তোমার মেয়ের অনেক নাগর আছে। তাদের দায় কেন আমার ভালো ছেলেটার উপর চাপাতে এসেছো বলো তো ? বদনাম দিয়ে মেয়েটাকে আমাদের ঘাড়ে গছাতে চাইছো ? ওই তো ছেলে দাঁড়িয়ে আছে , সে একবার সামনে এসে বলুক দেখি তুমি যা বলছো তা সত্যি , তাহলে দেখব। সে রকম ছেলের জন্ম আমরা দিই নি।
অন্নপূর্ণা দেখে উল্টো দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে অভীক। তার দিকে অনেকক্ষণ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সে। কিন্তু অভীক একটি বারের জন্যও  মুখ ঘোরায় না। সেটা দেখে আত্মপ্রসাদের হাসি ফুটে ওঠে আরতির মুখে। ছেলেকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন , যা বাবা তুই বাড়ির ভিতরে যা।


         সেই কথা শুনে বাধ্য ছেলের বাড়ির ভিতরে চলে যায় অভীক। অন্নপূর্ণা বোঝে তাদের মুখ পুড়তে চলেছে। কপাল পুড়তে চলেছে দুঃখী মেয়েটার। তাই শেষবারের মতো সে মরীয়া হয়ে অভীকের মায়ের পা দুটি জড়িয়ে ধরে বলে , দিদি আপনিও তো মেয়ে , আপনি তো বোঝেন কোন মেয়েই এমন মিথ্যা অপবাদ দিতে পারে না।দ্রুত পা ছাড়িয়ে নিয়ে সরে যান অভীকের মা।কিছুটা দূরে সরে গিয়ে বলেন , সামনের মাসেই ছেলের বিয়ে। ওদের একটাই মেয়ে।দেবে থোবে ভালো। তুমি এসময় ছেলেটার নামে মিথ্যা অপবাদ না দিয়ে বিদায় হও দেখি।
অভীকের বাবা বলেন , চাও তো কিছু টাকা-পয়সা দিতে পারি। শহরে গিয়ে ' পেট খসিয়ে ' চলে আসতে পারে। তারপর একটু সাবধানে চলতে বোল। এখন তো শুনি কত রকম সব ব্যবস্থাপাতি বেরিয়েছে। সেসব মেয়েকে একটু শিখিয়ে পড়িয়ে দিও। তাহলে আর এই রকম বিপত্তিতে পড়তে হবে না।
আর শুনতে পারে না অন্নপূর্ণা। সে কথা বলার ক্ষমতা পর্যন্ত হারিয়ে ফেলে।সেই সুযোগে স্বামীর কথার খেই ধরে আরতি বলে , তুমি খামোকা টাকা পয়সা দিতে যাবে কেন ? ছোটলোকদের স্বভাব জানো না তো ! পাঁচ জায়গায় বলে বেড়াবে ছেলের কুকীর্তি ঢাকতেই টাকা--পয়সা দিয়ে মুখ বন্ধ করতে চাইছে।
--- না , মানে গ্রামেরই তো মেয়ে। নেহাৎ বিপদে পড়ছে বলেই বলা।জবাবে অন্নপূর্ণা বলে , মাপ করবেন , ওই সাহায্য নিতে পারব না। ছোটলোকদের তো বিপদ নিয়েই ঘর করতে হয়। তাই বিপদে আর অত ভয় পাই না। যা হওয়ার হবে।  
---- সেই ভাল। এবার তুমি চলো দেখি , আমি দরজা বন্ধ করব।
তারপর অন্নপূর্ণাকে কার্যত গলা ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে দরজা দেন আরতি। দুশ্চিন্তাগ্রস্থ মন নিয়ে বাড়ির পথ ধরে অন্নপূর্ণা। মুখে তো বলে এল যা হওয়ার হবে , কিন্তু তাই বলে তো হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে পারবে না। যেমন করেই হোক মেয়েটাকে তো বাঁচাতে হবে। শহরে নিয়ে গিয়েই গর্ভপাত করিয়েই আনতে হবে। কিন্তু তাতেও কি বাঁচাতে পারবে কণাকে ? চারিদিকে ঢিঢিকার পড়ে যাবে। কেউ আর বিয়েই করতে চাইবে না। অনেকেই বরং ফুর্তি করার সুযোগ খুঁজবে। বাকি মেয়েগুলোও ওইসব সুযোগ সন্ধানীদের লালসা থেকে রক্ষা পাবে না।  সেইসব কথা ভাবতে ভাবতেই তার মাথার শিরা-উপশিরাগুলো যেন দপ-দপ করতে থাকে। সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ে কণার উপর। তাই তাকে সামনে পেয়ে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না সে। চুলের মুঠি ধরে এলোপাথাড়ি চড় থাপ্পড় মারতে মারতে বলে -- হারামজাদী , নষ্টামি করার সময় মনে ছিল না। গলায় দড়ি দিয়ে মরতে পারলি না। তাহলে আমার হাড় জুড়োত। এভাবে জ্বলে, পুড়ে মরতে হত না। 
অত চড় থাপড় খেয়ে একটুও শব্দ করে না কণা। শুধু তার চোখের কোন দুটো চিক চিক করে। মনটা খুব খারাপ হয়ে যায় অন্নপূর্ণার। রাগের মাথায় অত বড়ো মেয়ের গায়ে হাত তোলাটা যে ঠিক হয়নি , রাগ পড়লে তা উপলব্ধি করে অন্নপূর্ণা। ওই'বা কি করে জানবে ছেলেটা এমনি ভাবে মুখ ফিরিয়ে নেবে ? দুশ্চিন্তায়  অনেক রাত পর্যন্ত ঘুম আসে না অন্নপূর্ণার। শেষ রাতে কখন ঘুমিয়েছে টের পাই না সে। অন্যান্য দিন অন্ধকার থাকতেই ওঠে। প্রাত্যহিক কাজ সেরে ভিক্ষা করতে বেরিয়ে যায়। সেদিন দেরি হয়ে গিয়েছে ভেবে ধড়মড় করে উঠেই স্নান -প্রাতঃকৃত্যের জন্য মাঠের দিকে ছোটে। কিন্তু যোগলকুণ্ডুর বাগান পর্যন্ত গিয়েই মাথা ঘুরে যায় তার।

              ( ক্রমশ )

No comments:

Post a Comment