ঠাকরুন মা
অর্ঘ্য ঘোষ
( ধারাবাহিক উপন্যাস )
পুলিশ তিনআনিদের নিয়ে চলে যেতেই জনমত সম্পূর্ণ ঘুরে যায়। সকাল থেকে দাঁড়িয়ে মজা দেখছিল যে সব গ্রামবাসী তারাই বলাবলি করতে শুরু করে কাজটা বাবুরা ভালো করল না। নির্দোষ একটা মানুষকে বাড়ি থেকে তুলে এনে পিটিয়ে খুন করল , ভগবান কিছুতেই ওদের ক্ষমা করবে না। আমরা ওদের চালটাই এতক্ষণ ধরতে পারিনি। পারলে এভাবে খুন করতে দিতাম না। বাধা দেওয়ার চেষ্টা করতাম। মুহূর্তের মধ্যেই অন্নপূর্ণার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে পড়ে গ্রামবাসীরা। অন্নপূর্ণা উপলব্ধি করে সন্দীপনের জন্যই এমনটা সম্ভব হয়েছে। সন্দীপনই যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করে দিয়েছে চুরির অভিযোগটা সত্যি নয়। সায়ন্তনকে খুন করার জন্যই আসলে চুরির নাটকটা সাজানো হয়েছিল। তারপরই গ্রামের মানুষের একাংশ ঘুরে যায়।সন্দীপন যদি আর একটু আগে আসতে পারত তাহলে হয়তো গণপ্রতিরোধ গড়ে উঠত।আর সেই প্রতিরোধই বাঁচিয়ে দিতে পারত সায়ন্তনকে। তাই আক্ষেপ ঝড়ে পড়ে অন্নপূর্ণার গলায়। কিন্তু আক্ষেপ করার মতো সময় কোথাই তার ? গৌরবকে নিয়ে বেড়িয়ে যাবে সন্দীপন আর গোমস্তাকাকা। গ্রামের কয়েকজনও সঙ্গে যাবে। রামপুরহাট হাসপাতালে ময়নাতদন্তের পর তারাপীঠ শ্মশানেই মুখাগ্নি করে মৃতদেহ সৎকার করে দেওয়া হবে। তাদের পরিবারে বহরমপুরের গঙ্গাতীরেই সৎকারের রীতি প্রচলিত আছে। অন্নপূর্ণারও ইচ্ছা ছিল শেষবারের মতো সায়ন্তনকে একবার বাড়ি ফিরিয়ে এনে গঙ্গা দেবে।
কিন্তু তাদের সব ইচ্ছে তো অপূর্ণই থেকে যায়। খরচের কথা ভেবেই ওই ইচ্ছেও তাকে ত্যাগ করতে হয়। তার তো ময়নাতদন্তের পর মৃতদেহ নিয়ে তারাপীঠে দাহ করারও সামর্থ্য নেই। নেহাতই এসময় দেবদুতের মতো সন্দীপন পাশে এসে দাঁড়িয়েছে তাই , নাহলে স্বামীর সৎকারই আটকে যেত। সন্দীপন বলেছে , মাসীমা আপনি এসব নিয়ে একদম চিন্তা করবেন না। আমি সব সামলে দিচ্ছি।কিছুক্ষণের মধ্যে খবর পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে এসে পৌঁছোয় বাসন্তী , মা , দিদি আর বোন। লোক দেখানো লৌকিকতা করতে এসে দাঁড়ায় ভাসুর--জা'রাও। দুঃখ, দুঃখ মুখ করে সান্ত্বনার বানী শুনিয়েই কয়েক মিনিটের মধ্যেই চলে যায় ভাসুর আর জা'রা। তার অবস্থা তো ওদের অজানা নয়। কিন্তু কি করে কি হবে তা একবার জিজ্ঞেস করারও প্রয়োজন বোধ করে না। পাছে কোন আর্থিক দায় ঘাড়ে চাপে সেই আশংকায় লৌকিকতার নিয়ম রক্ষা করেই চলে যায়। ওরা বললেও অবশ্য অন্নপূর্ণা ওদের কাছে কিছু নিতে পারত না। দিনের পর দিন অভুক্ত কেটেছে , সব জেনেও যারা ফিরেও তাকায় নি তাদের সাহায্য নেওয়ার আগে মৃত্যুই শ্রেয় বলে মনে করে অন্নপূর্ণা।তার বাড়িতে তো হবিশ্যি করার মতো আতপচালটুকুও পর্যন্ত নেই। বাসন্তীর শ্বাশুড়িমা অবশ্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই গুছিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছেন। মা'ও এনেছেন।মা-বাসন্তীরা তো আছেই , গ্রামের লোকজনের আনাগোনায় ঘর প্রায় ভর্তি। কিন্তু ওই একটা মানুষের অভাবই যেন শুনত্যাকে প্রকট করে তুলেছে।
দাহকাজ শেষ করে পরদিনই গোমস্তাকাকারা ফিরে আসেন। কান্নার রোল ওঠে বাড়িতে। গৌরব ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে। ছোট্ট হাত দুটো মেঝেতে সমানে চাপড় মারতে থাকে সে। ব্যাপারটা বুঝতে না পেরে হাত দুটো ধরে অন্নপূর্ণা বলে , এমন করছ কেন বাবা ? হাতে লেগে যাবে যে।
----- লাগাই ভালো মা। এই হাত দিয়েই বাবার মুখে , চিতায় আগুন দিয়েছি। কত করে বললাম আমি পারব না , গোমস্তাদাদু বলল , তুমি আগুন না দিলে বাবা স্বর্গে যেতে পারবে না। আমি বললাম বাবাকে একা স্বর্গে যেতে দেব না। তাও ওরা শুনলো না। জোর করে আমার হাত দিয়ে আগুন ছুঁইয়ে দিল। বাবার কত কষ্ট হলো বলো ? ওরা অত মারল। তারপরে ওই আগুন।জানো মা, আগুনে বাবার খুব জ্বালা করছিল। তাই মাঝে মাঝে সোঁজা হয়ে উঠে পড়ছিল। আর ওরা লাঠির বাড়ি মেরে মেরে বাবাকে আবার আগুনে শুইয়ে দিচ্ছিল।ছেলেকে জড়িয়ে ধরে অন্নপূর্ণা বলে, বাবু আর বলিস না বাবা সইতে পারছি না।তবুও গৌরব বলে চলে , মা দেখ কার্তিক, নরেন, টুম্পা সবার বাবা আছে। আমাদেরই বাবা হারিয়ে গেল। এবার রাতে বাইরে বেরোতে ভয় পেলে কে বলবে , বাবু ভয় নেই যা, আমি আছি। শুধু ভাত খেতে না পারলে কে বলবে বাবু দাঁড়া চট করে একটা মাছ ধরে আনি। বলো মা এবার তুমি বকলে কে আমাদের আদর করে বলবে, বকুক গে, মা'ই তো। চোখের সামনে আমাদের বাবা ছাই হয়ে গেল মা।
কারও চোখ শুকনো থাকে না। গোমস্তাকাকা এগিয়ে এসে গৌরবকে সান্ত্বনা দেন -- দাদুভাই আমার কি কম কষ্ট হচ্ছে ? তোমার বাবাকে বলতে গেলে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছি। তাকেই চলে যেতে হল , কিছুই করতে পারলাম না। কিন্তু তোমাকে তো এখন থেকেই শক্ত হতে হবে। বাবা তো কারও চিরকাল থাকে না। তোমাকেই তো একদিন এই সংসারের হাল ধরতে হবে। তাও কান্না থামতে চায় না গৌরবের। শোকের আবহাওয়া ঘিরে রাখে গোটা পরিবারকে। তেররাত্রির পারলৌকিক কাজ শেষে একে একে ফিরে যায় সবাই।আর এক নিঃসীম শুন্যতা গ্রাস করে নেয় অন্নপূর্ণাকে। এতদিন ঘরভর্তি লোকের মাঝে মনে হতো সায়ন্তনও আছে। কোথাও কোন কাজে গিয়েছে , কাজ মিটলেই যেন ফিরে আসবে।
কিন্তু সবাই চলে যাওয়ার পর অবচেতন মনের সেই ভাবনাটা হারিয়ে যায়। চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সদ্য চলে যাওয়া সায়ন্তনের স্মৃতি বড়ো বেশি জীবন্ত মনে হয় অন্নপূর্ণার।এখনও দেওয়ালে টাঙানো তারে ঝুলছে সেদিন রাতে খুলে রাখা সেই ছাই রঙা জামা।তাতে এখনও লেগে রয়েছে সায়ন্তনের গায়ের সেই পরিচিত গন্ধ।কড়িকাঠে সযত্নে রাখা মাছ ধরার ছিপ।মাছ ধরার বড়ো নেশা ছিল সায়ন্তনের।তাদের তো মাছ কিনে খাওয়ার সামর্থ্য ছিল না। সায়ন্তনের দৌলতেই ছেলেমেয়ের পাতে একটুকুরো মাছ দিতে পারত অন্নপূর্ণা।তাই সায়ন্তন যখন মাছ নিয়ে ফিরত তখন ছেলেমেয়েগুলো হামলে পড়ত। সৌরভ - গৌরব তো ঘাড়ে চেপে বসে আবদার করত - বাবা আজ গোটা মাথাটা কিন্তু আমি খাব। সায়ন্তন বলত , বেশ তাই খাস।
---- না, তুমি মাকে বলে দাও। নাহলে ভেঙে দেবে।
ছেলেদের কথা শুনে সায়ন্তনের মুখে ফুটে উঠত এক নির্ভেজাল হাসি। বলত , আচ্ছা আজ দুজনে আধখানা করে খাও। কাল দুটো মাছ ধরে আনব। তখন দুজনেই গোটা মাথা খেও। তখন ঠোঁট ফুলে ওঠতো মেয়েদের। তারা বলত , বাবা আমরা মেয়ে বলে বুঝি বানের জলে ভেসে এসেছি ? আমরা মাথা পাব না ?
এক গাল হেসে মেয়েদের কাছে টেনে নিয়ে ওদের বাবা বলত , তা কেন হবে ? তোরাও একদিন করে খাবি।
সব কথা মনে পড়ছে আর চোখের জল কিছুতেই বাঁধ মানছে না অন্নপূর্ণার। তার চোখে জল দেখলেই ছেলেমেয়েগুলো কাঁদতে শুরু করবে। তখন কে কাকে সামলাবে ? তাই নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করে সে। কিন্তু নিজেকে ধরে রাখতে পারছে কই ? সৌরভের কথা মনে পড়তেই তো আবার চোখে জল আসে তার।কয়েক বছরের মধ্যেই সংসার থেকে দু'জন মানুষ চলে গেল। যখন সবাই ছিল অভাবের সংসারে তখন একটা পেট মানে বড়ো দায় মনে হত। আর আজ দু'জনের অভাবে কত নিঃসঙ্গ লাগছে। সৌরভ যখন চলে যায় তখন তার পাশে সায়ন্তন ছিল। দুজনেই শোক সামলেছে। সামলেছে বহু ঝড় ঝাপটাও। হতে পারে চোর , মাথার উপর পুরুষ মানুষ বলতে ওই একজনই তো ছিল। আজ সে সম্পূর্ণ একা ।এতগুলো ছেলে মেয়ের মা -বাবা এখন সে। ওদের বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব এখন থেকে তার একার। তাই এবার থেকে শুরু হয় তার বেঁচেবর্তে থাকার একক লড়াই।একসঙ্গে দুটি লড়াই একা লড়তে হবে তাকে। একটা স্বামীর খুনের আইনী লড়াই। অন্যটা খাওয়া পড়ার লড়াই। আইনের লড়াইয়ে অবশ্য তার পাশে সন্দীপন - গোমস্তাকাকারা রয়েছেন। খাওয়া পড়ার লড়াইয়ে কেউ কেউ পাশে থাকার আশ্বাস দিলেও তা সবিনয়ে এড়িয়ে গিয়েছে অন্নপূর্ণা। কারণ বাসন্তী আর বোনের শ্বশুরবাড়ির সাহায্য সে নিতে পারবে না। আর এতদিন যারা তাদের পাশে দাঁড়ায় নি তাদেরও কাছে হাত পাততেও পারবে না। যে কোন একটা কাজ তাকে খুঁজে নিতেই হবে। কাজ বলতে পরের বাড়িতে ধানসিদ্ধ , মুড়িভাজা কিম্বা ঝিগিরি করা। কিন্তু তাদের গ্রামের ক'জনেরই বা পয়সা দিয়ে ওইসব কাজ করানোর সামর্থ্য আছে ? যাদের আছে তাদের কাছে গিয়েও কোন লাভ হয় না। সবাই জানায় , ছোটজাত হলেও কথা ছিল। কিন্তু ব্রাহ্মণের বিধবাকে দিয়ে ওই জাতীয় কাজ করে মহাপাতকের ভাগী হতে তারা পারবে না।
কথাটা শুনে হাসি আসে অন্নপূর্ণার। হায়রে ব্রাহ্মণের বিধবা ! বর্ণ শ্রেষ্ঠত্বের কত গাল ভরা বিশেষণ ! ওই বিশেষণের বেড়িই তার জীবনে যেন নাগফাঁস হয়ে দেখা দিয়েছে। কারও কাছে হাত পাতবে না ভেবেছিল।কিন্তু হাত পাতা ছাড়া যে তার আর কোন গত্যন্তর রইল না। তবে সে সাহায্য কারও নেবে না , হাত পেতে দোরে দোরে ভিক্ষাই করবে। বাসন্তী আর মায়ের আনা চাল ডালে কয়েকটা দিন চলে যাবে। আর সেই রসদ থাকতে থাকতেই ভিক্ষার থালা হাতে পথে নামতে হবে তাকে। ছেলেটা বড়ো না হওয়া পর্যন্ত তাকে ভিক্ষা করেই সংসারটা চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এতদিন মাথার উপরে সায়ন্তন ছিল , স্থায়ী রোজগেরে না হলেও অভাবের দিনগুলোতে তো লড়াইয়ে পাশে পেয়েছে। সেটাই ছিল অনেক। তার উপরে রয়েছে মেয়েদের চিন্তা। খাওয়া পড়ার থেকে একা কি করে চার - চারটে মেয়েকে সামলে রাখবে সেই দুশ্চিন্তায় রাতে ভালোভাবে ঘুমোতে পর্যন্ত পারে না। সব থেকে দুশ্চিন্তা তার হৈমন্তীকে নিয়ে। কোন বিপদ আপদ হলে সে তো নিজেকে বাঁচাতে কোন প্রতিরোধই করতে পারবে না। এতদিনে সমাজকে তার ভালোই চেনা হয়ে গিয়েছে। অসহয়তার সুযোগ নিতে ভালোমানুষীর মুখোশের আড়ালে থাকা মানুষেদের নখ দাঁত বেড়িয়ে পড়তে দেরি হবে না।সায়ন্তন যতদিন ছিল ততদিন তাকে ওই দুশ্চিন্তা করতে হয়নি। তার দাপটে মেয়েদের কেউ উত্যক্ত করতে সাহস পায়নি।ওইসব কথা ভাবতেই গোমাস্তাকাকা এসে পৌঁছোন। তাকে সব কথা খুলে বলে সে। আর সেই কথা শুনে গোমস্তাকাকা আক্ষেপে কপাল চাপড়াতে শুরু করেন। নিজের মনেই বিড় বিড় করেন তিনি -- শেষ পর্যন্ত আমাকে এও দেখতে হলো মা ? পেটের দায়ে জমিদারবাড়ির বৌকে আজ ভিক্ষা করতে হচ্ছে। এককালে এই বাড়ির ভাত বারো ভুতে খেয়েছে। বংশ পরম্পরায় আমরাও তোমাদের অন্নেই প্রতিপালিত। অথচ তোমার এই দুর্দিনে আমি কোন উপকারেই লাগতে পারছি না। আমার যদি সেই সামর্থ্য থাকত তাহলে কিছুতেই তোমাকে ভিক্ষার থালা হাতে নিয়ে রাস্তায় নামতে দিতাম না।কিন্তু আমিও যে নিরুপায় হয়ে পড়েছি মা।এ সহ্য করা যে কত কষ্টের তা আমি কাউকে বলে বোঝাতে পারব না মা।
---- কাকা আপনি শুধু শুধু কষ্ট পাবেন না। এতো আমার নিয়তি। এ বাড়ির বৌ হয়ে আসার পর থেকে ভগবান তো আমার একের পর এক পরীক্ষা নিয়েই চলছেন। জানি না আর কত পরীক্ষা আমাকে দিতে হবে।
---- আমিও তো তাই ভাবি মা। আর ভগবানকে বলি , ঠাকুর এবার তুমি মুখ তুলে চাও।
---- আমি আর ওসব কিছু ভাবি না কাকা। আমি ভিক্ষায় বেরিয়ে গেলে আপনি পারলে মেয়েগুলোকে একটু দেখবেন।
---- সে নিয়ে তোমাকে কিছু ভাবতে হবে না। আমার দ্বারা যেটুকু সম্ভব তা তুমি না বলে দিলেও আমি করব মা।
শুরু হয় অন্নপূর্ণার নতুন জীবন। থালা হাতে গৃহস্থের বাড়ির দরজায় দাঁড়াতেই কেমন যেন বাধো বাধো ঠেকে। কিছুতেই আর ভিক্ষা চাইতে পারে না। তার বুক ফেটে যায়।কিন্তু কিছুতেই মুখ ফুটে ভিক্ষা আর চাইতে পারে না। চোখে জল চলে আসে।গৃহকর্ত্রী তার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। আর অন্নপূর্ণার মুখের সামনে ভেসে ওঠে ছেলেমেয়েদের ক্ষুধাতুর মুখ। সব দ্বিধা সংকোচ ভুলে সে কোনরকমে বলতে পারে -- হরিবোল, দুটি ভিক্ষা দাও মা।
--- ও , বলে গৃহকর্ত্রী একমুঠো চাল এনে তার থালাতে অবজ্ঞাভরে ফেলে দেয়। আর দু'চোখ জলে ভরে যায় তার। মনে পড়ে যায় সুদিনে সে নিজে কত ভিক্ষারীকে ভিক্ষা দিয়েছে। আর আজ তাকেই ভিক্ষাপাত্র হাতে তুলে নিতে হয়েছে। 'হরিবোল, একমুঠো ভিক্ষা দাও মা ' বলতে দিয়ে যেন নাড়ী ছিঁড়ে যায়। তবু বলতে হয়।না হলে যে তার অন্য উপায় নেই কিন্তু নিজের গ্রামে বেশিদিন তার ভিক্ষা করা সম্ভব হয় না। তাকে শুনিয়ে শুনিয়েই লোকেরা বলাবলি করে - পাপ -- পাপ , না হলে কি এই হয় ? দেখছো না ও জমিদারবাড়িতে পা দেওয়ার পর থেকেই একের পর এক বিপদ ঘনিয়ে আসে। জমিদারি গেল, শ্বশুর-শাশুড়ি গেল, ছেলে গেল। শেষে স্বামীকে হারিয়ে এখন ভিক্ষার থালাই হলো সম্বল। পাপ না হলে কি এমন হয় ? ওই তো আরও দুটো বউ তো আছে , কই তাদের তো এমন দুর্দশা হয় নি।
লোকের কথা শুনে শুনে অন্নপূর্ণার মনে হয় সে আসলে পাপী।কিন্তু কি পাপ যে করছে তা সে জানে না। জ্ঞানত এ জন্মে তো সে কোন পাপ করে নি। তাহলে কি সে গতজন্মের পাপের ফল ভোগ করছে ? লোকের মুখে বার বার ওই কথা শুনতে শুনতেই নিজের মনকে প্রশ্নটা করে অন্নপূর্ণা। কিন্তু একই কথা বার বার শুনতে শুনতে তিতিবিরক্ত হয়ে সে গ্রামে ভিক্ষা করাই ছেড়ে দেয়। ভোর ভোর উঠে স্নান সেরে সে ভিক্ষা করতে চলে যায় দূর গাঁয়ে। চুপিসাড়ে ফেরে সন্ধ্যার অন্ধকারে। কিছু চাল - মুড়ির সঙ্গে একরাশ অবসাদ আর ক্লান্তি নিয়ে ফেরে সে। কিন্তু তারই মাঝে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কথা বলে উজ্জীবিত হয়ে ওঠে তার মন। খুনের মামলাটা নিয়ে নাকি পুলিশ জোর তৎপড়তা শুরু করেছে। প্রথম দিকে তো প্রভাব খাটিয়ে মামলাটা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল ওরা।কিন্তু সন্দীপন তার পরিচিত বিধানসভার এক নেতাকে বিষয়টি জানানোর পর থেকেই পরিস্থিতিটা পুরো বদলে যায়। ছেলেমেয়েরা বলে, পুলিশ নাকি কয়েকদিন ধরেই ফেরার অভিযুক্তদের খোঁজে তিনআনিদের বাড়িতে হানা দিচ্ছে।
আর তাদের জিপের শব্দ শুনে গাঢাকা দিচ্ছে ওরা। তাদের না পেয়ে পুলিশ কোনদিন ওদের চাল- গমে এক করে ছড়িয়ে ফেলে দিচ্ছে , তো কোনদিন গরু-ছাগল ডাকিয়ে নিয়ে খোঁয়াড়ে দিয়ে আসছে।গ্রামের মানুষের কাছে এটাও একটা বিনা পয়সায় দেখার মতো মজার বিষয় হয়ে উঠেছে। এতকাল বাবুরাই সবাইকে তারে নাচিয়েছে , সেই বাবুদেরই এখন চরকি নাচন নাচতে দেখে বেশ মজা পাচ্ছে গ্রামবাসীরা।তিনআনিদের ওই চোর-পুলিশ খেলা আটকাতে শেষ পর্যন্ত দোকানের সামনে ক্যাম্প পর্যন্ত বসায় পুলিশ।পুলিশের এহেন তৎপরতায় ন্যায় বিচার সম্পর্কে আশান্বিত হয়ে ওঠে অন্নপূর্ণার মন।খেতে বসে তাই নিয়ে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে নানা রকম আলোচনাও করে সে। গৌরব বলে , বাবাকে ওরা যেমন ভাবে কষ্ট দিয়ে মেরেছে পুলিশও ওদের তেমনই ভাবে মারবে তাই না মা। ওরাও একটু জল একটু করবে বলো ?
গৌরবের প্রশ্নের কোন জবাব দেওয়া হয়না অন্নপূর্ণার। তার আগেই তাকে চমকে দেয় দোরগোড়ায় পরিচিত গলার বৌমা ডাক।
( ক্রমশ )


ভালো লাগলো
ReplyDeleteধন্যবাদ
Delete