ঠাকরুন মা
অর্ঘ্য ঘোষ
( ধারাবাহিক উপন্যাস )
মনে মনে কিছুটা হতাশ হয়ে পড়ে সে। এতদিন সায়ন্তনের খুনের মামলাটা নিয়ে একটা লড়াকু ভাব কাজ করত তার মধ্যে। সেই উদ্যোমী মনোভাবে একটা যেন চিঁড় ধরে যায়। ভাসুররা তিনআনিদের হয়ে স্বাক্ষী দেওয়ার পর থেকে তার মনে একটা হতাশা কাজ করে।তার লড়াইটা আরও তীব্রতর হয়ে পড়ে। একদিকে মামলা অন্যদিকে ছেলেমেয়ের নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় দিশাহারা হয়ে পড়ে অন্নপূর্ণা। দিন দিন গৌরবটাও কেমন যেন বেপরোয়া হয়ে ওঠে। মাথার উপর অভিভাবক না থাকলে যা হয় , গৌরবও সেই পথেই এগিয়ে যায়। স্কুল যাওয়া ছেড়ে দিয়ে একদল বন্ধু জুটিয়ে সব সময় আড্ডা দিয়ে বেড়ায়। সে ভিক্ষা করতে বেরিয়ে যায় , তাই টেরও পায় না ছেলেটার গতিবিধি। তবে তার চোখে কেমন যেন প্রতিশোধের আগুন জ্বলতে দেখে অন্নপূর্ণা। সব জায়গায় বলে বেড়ায় , তিনআনিদের সে ছেড়ে দেবে না।আদালতে সাজা না হলে সে নিজে ওদের সাজা দেবে। মিথ্যা স্বাক্ষী দেওয়ার কথা শোনার পর থেকে জ্যাঠাদেরও ছেড়ে কথা বলে না। অন্নপূর্ণা যত বলে ওরে ওসব কথা বলিস না , ওরা কোনদিন তোকেও খুন করে দেবে। গৌরব কানেই তোলে না সে সব কথা।ছেলেমেয়েদের নিয়ে সবসময় অজানা আশংকায় সিটিয়ে যায় অন্নপূর্না।সব থেকে আশংকা হয় তার হৈমন্তীকে নিয়ে। ভগবানকে তার বড়ো বিবেচনাহীন মনে হয়। হৈমন্তীকে এত রূপ যৌবন দিয়েছেন অথচ চলা ফেরার আর কথা বলার ক্ষমতা দেননি।
নিজেকে রক্ষা করতেও তো পারবে না। কেউ সর্বনাশ করে দিয়ে গেলে নিজে নিজে কণার মতো জ্বালা জুড়াতেও তো পারবে না। নিজের ভাবনায় চমকে যায় অন্নপূর্ণা। কি ভাবছে সে নিজের মেয়ের সম্পর্কে ! সে কি পাগল হয়ে গেল ? বড়ো মায়া হয় প্রতিবন্ধী মেয়েটির প্রতি।কাছে ডেকে বসায় তাকে। গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। হৈমন্তীও মায়ের গলা জড়িয়ে আও, আও করে উচ্ছাস প্রকাশ করে। অন্নপূর্ণা পরম যত্নে মেয়ের চুল বেঁধে ভালো করে সাজিয়ে দেয়। তারপর মেয়ের চিবুকটি তুলে ধরে চুমু খায়। মেয়েও আও আও করে চুমুয় চুমুয় মায়ের কপাল গাল ভিজিয়ে দেয়। অন্নপূর্ণা বলে , ওরে ছাড় ছাড় দম বন্ধ হয়ে মরে যাব যে। মেয়ে তত মাকে জড়িয়ে ধরে। এই মেয়ের জন্যই সে এতক্ষণ কি ভাবছিল ! পরিস্থিতি তাকে কোন জায়গায় নিয়ে গিয়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। মা হয়েও মেয়ের আত্মহত্যার কথা ভাবতে হচ্ছে তাকে।অন্নপূর্ণা ভাবে , তার ছেলেমেয়েদের চাহিদা কত কম। একটু স্নেহের স্পর্শ পেলেই কত খুশী হয় তারা।অথচ তার এমনই অবস্থা, সেইটুকুও দিতে পারে না।কণার মতো হৈমন্তীটাও কলাইবাঁটা মেখে পান্তাভাত খেতে খুব ভালোবাসে।সেটুকুও মেয়ের মুখে তুলে দিতে পারে না সে। মামলাটা চুকে গেলেই একদিন পেটে পুরে ছেলেমেয়েগুলোকে তাদের পছন্দের খাবার খাওয়াবে। গরীবদের এই ব্যাপার খুব বাঁচিয়ে দেয়।কোন একটা উপলক্ষ্য খাড়া করে দিব্যি পরিস্থিতির সামাল দেওয়ার সূযোগ মেলে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একটার পর একটা উপলক্ষ্য পেরিয়ে যায় , আশাটা আর পূরণ হয় না। অন্নপূর্ণার জীবনেই এমন কত ঘটনা ঘটেছে। ছেলেমেয়েরাও তা জানে। কিন্তু সেইসব প্রসঙ্গ তুলে মাকে আর অস্বস্তির মুখে ফেলতে চায় না তারা। কারণ মায়ের অবস্থা তারা এখন উপলব্ধি করে।
কয়েকদিন ধরেই চরম দোটানায় পড়েছে অন্নপূর্ণা। কি করবে কিছু ভেবে পায় না। সেদিন গোমস্তাকাকা একটা প্রস্তাব নিয়ে আসেন।কিছুটা আমতা আমতা করে বলেন , মা কিছু যদি মনে না করো তাহলে একটা কথা বলি।
--- বলুন , আপনার কথায় কিছু মনে করব কেন ? আপনি ছাড়া আমাদের পাশে এ দুর্দিনে আর কে আছে বলুন কাকা ?
কিছুটা ইতস্তত করে গোমস্তাকাকা বলেন , বালিয়ারার কান্তি চ্যাটার্জীর স্ত্রী মারা গিয়েছে। ফের বিয়ের জন্য মেয়ে খুঁজছে। একেবারে বিনা পণে ঠাকুর থানে বিয়ে করবে। বয়েস যদিও অনেক বেশি কিন্তু বাড়িতে খাওয়া পড়ার অভাব নেই। সাঁইথিয়ায় বাসে কন্ডাক্টারি করে। দুহাতে টাকা কামায়। গুমতা গ্রামে নিজের বাড়িও রয়েছে। যদি বলো মা তাহলে ছবি দিদির জন্য প্রস্তাব দিতাম।
--- কিন্তু কাকা , শুনেছি লোকটা নাকি ছবির বাবার বয়সী। ছবির বয়সী ছেলেমেয়েই নাকি রয়েছে ওর। তাছাড়া যাদের দুহাতে কাঁচা টাকা উপায়ের সুযোগ থাকে তাদের সেই টাকা ওড়ানোর নানা কুঅভ্যাসও থাকে।
----- সেটা অবশ্য তুমি ঠিকই বলেছো মা। তবে কি জানো , বিনা পয়সায় তো বিয়ে হবে না। তোমার তো মা এখন পয়সা-টাকা খরচ করে বিয়ে দেওয়ার সামর্থ্য নেই। মাঝখান থেকে যদি কণা দিদির মতো কিছু একটা ঘটে যায় ! তাই বলছিলাম আর কি ?
কণার কথা উঠতেই শিউরে ওঠে অন্নপূর্ণা। চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই আলতা রাঙা ফরসা দুটি পা। সে তো ওকে মরার কথা বলেছিল। না , সে আর মৃত্যু দেখতে পারবে না। যাই হোক, ছেলেমেয়েগুলো যেন বেঁচেবর্তে থাকে। তাই সে বলে - সেই তো কাকা , আপনি আমাকে বড়ো দোটানায় ফেললেন। কি করি বলুন তো ?
---- ঠিক আছে মা , আজকেই কিছু বলতে হবে না। তুমি বরং একটু ভেবেই বোলো। প্রয়োজনে একবার ছবি দিদির সঙ্গে কথা বলে নিও।
খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে যায় অন্নপূর্ণা। গোমস্তাকাকা ঠিকই বলেছেন , যতই রূপ থাকুক না কেন , বিনা পণে কে'ই বা তার মেয়েকে বিয়ে করবে ? যে সব ভিক্ষাজীবি বন্ধু তার মেয়েদের দেখেছে তারা সবাই বলেছে , অন্নপূর্ণা তোমার মতোই ভগবতীর রূপ তোমার মেয়েদের। যাদের ঘরে যাবে তাদের ঘর আলো করে রাখবে। কিন্তু কেউ তার মেয়েদের ঘর আলো করার জন্য হাত ধরে নিয়ে যেতে এগিয়ে আসে নি। বরং কুঅভিপ্রায়ে উঁকিঝুঁকি মেরেছে রাতবিরাতে।অধিকাংশই পরিস্থিতির সুযোগ খুঁজেছে। সেই সুযোগের ফাঁদে পড়ে নিজেকে বলি দিতে হয়েছে কণাকে। কুদৃষ্টি রেহাই দেয় না তার প্রতিবন্ধী মেয়েটিকেও। তাই বাপের বয়সী লোকটার সঙ্গে ছবির বিয়ের বিষয়টা এক কথায় উড়িয়ে দিতে পারে না।
আবার মন থেকে মেনেও নিতে পারে না। সেই মানসিক টানাপোড়নে মধ্যেই রঞ্জুকে নিয়ে আরও অস্থির হয়ে পড়ে তার মন। দেখতে দেখতে রঞ্জুর কলকাতা যাওয়া মাস তিনেক হয়ে গেল। কয়েকদিন পরেই পুজো। তার ফেরার অপেক্ষায় দিন গোনে অন্নপূর্ণা। কতদিন দেখে নি মেয়েটাকে। এবার তার বাড়ি আসার কথা। কিন্তু বাড়ি সে আসে না। তার লেখা চিঠি আর কিছু টাকা নিয়ে এসে পৌঁছোয় রাজহাটের বাবুদের বাড়ির লোক। তার মুখ থেকেই অন্নপূর্ণা জানতে পারে মাস খানেক আগেই কাউকে কিছু না বলে পাশের ফ্ল্যাটের কেয়ারটেকারের সঙ্গে নাকি কোথাই যেন চলে যায় রঞ্জু। বাবুরা অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তার কোন সন্ধান পায়নি। তাই দু'মাসের বেতন আর রঞ্জুর রেখে যাওয়া চিঠিটা পাঠিয়ে দিয়েছেন বাবুরা। টাকাটা নিতে কিছুতেই হাত উঠছিল না। যে মেয়েই তাকে ছেড়ে চলে গেল , তার রোজগারের টাকা নিতে মন চায় না। কিন্তু বাবুদের বাড়ির লোকটি তার হাতে টাকা ক'টা গুঁজে দিয়ে চলে যায়।
সে চলে যেতেই চিঠিটা চোখের সামনে মেলে ধরে অন্নপূর্না। চিঠির মধ্যেই যেন ভেসে ওঠে মেয়ের মুখ। চিঠিতেই সে অনুভব করে মেয়ের স্পর্শ। ট্যারা বাঁকা হরফে রঞ্জু লিখেছে , জানি মা তুমি কষ্ট পাবে। কিন্তু আমাদেরকে নিয়েও তো তোমার কষ্ট কম নয়। সব সময় দুঃশ্চিন্তায় থাকতে দেখছি তোমাকে। তাই আমি তোমাকে সে দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দিতে নিজের পথ নিজেই বেছে নিলাম। অজানা পথে পাড়ি দিলাম। জানি না কপালে কি লেখা আছে। পারলে ক্ষমা করো। চিঠিটা পড়তে পড়তেই চোখ ঝাপসা হয়ে আসে অন্নপূর্ণার। খুব দুশ্চিন্তা হয় রঞ্জুর জন্য। এমন তো কতই শুনেছে বাইরে কাজ করতে গিয়ে কারও সঙ্গে চলে যাওয়ার পর কত মেয়ের আর খোঁজখবর মেলে নি। এই তো পাশের ফুলিয়া গ্রামেই একটি ছেলে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে পরপর তিনটি মেয়েকে নিয়ে কোথাই যেন চলে যায়। কয়েক মাস পর ছেলেটি ফিরে এলেও মেয়েগুলি আর কোনদিন ফেরেনি। অন্নপূর্ণা শুনেছে মেয়েগুলিকে নাকি মোটা টাকায় বিক্রি করে দেওয়া হয়। ওইসব মেয়ের বাড়ির লোকেরা পুলিশের কাছেও গিয়েছিল। কিন্তু পুলিশ নাকি মেয়েগুলোকে উদ্ধারের চেষ্টা করার পরিবর্তে বাবা- মাকে মেয়ের চরিত্র নিয়ে নোংরা নোংরা কথা বলে।
লোকে বলাবলি করে মেয়ে বিক্রির টাকার একটা ভাগ পুলিশও নাকি পায়। তাই মেয়ে পাচার হয়ে গেলে আর কেউ শুধু শুধু পুলিশের নোংরা কথা শুনতে থানায় যায় না। আর সেই সুযোগটাই কাজে লাগায় পাচারকারীরা। গরিব ঘরের মেয়েগুলোকে বিয়ে কিম্বা কাজের প্রলোভন দেখিয়ে ফুঁসলে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দেয় পাচারকারীরা। মেয়ে মানে যেন মানুষ নয় , আর পাঁচটা সামগ্রীর মতো একটা ভোগ্য পণ্য। আর তার জন্যই কত না ফাঁদ। রঞ্জু সে রকম কোন ফাঁদে পা দিল না তো ? মনে মনে খুব দুশ্চিন্তা হয় মেয়েটার জন্য। বুকের ভিতর একটা কষ্ট যেন দলা পাকিয়ে ওঠে। ভগবান তার কথা কানে তোলে না। তবু অভ্যাস বসেই তার উদ্দেশ্যে হাত জোড় করে বলে , ঠাকুর মেয়েটাকে তুমি দেখো। ওকে তুমি সুখী কোর।
রঞ্জু ওইভাবে চলে যাওয়ায় মনে মনে খুব ভেঙে পড়ে সে। মেয়েগুলোর এই পরিনিতি তাকে ভাবিয়ে তোলে। তাই সে ঠিক করে ছবিকে ওইভাবে হারিয়ে যেতে দেবে না। ওই লোকটার সঙ্গেই বিয়ে দেবে তার।আর যাই হোক না কেন , একটা পরিচিত ঠিকানায় তো থাকবে মেয়েটা। ইচ্ছা হলে গিয়ে চোখের দেখা দেখে তো আসতে পারবে। আর কপালে সুখ না থাকলে তো কিছু হবে না। জমিদার বাড়িতে বিয়ে হয়ে তার কপালে তো ভালোই সুখ জুটেছে। অন্যদিকে বাসন্তীর বরটা একটু ন্যালাক্ষেপা হলেও তাকে নিয়ে তো ছেলেমেয়ের মা হয়ে দিব্যি বেঁচেবর্তে আছে সে। তাদের কাছে তো বেঁচে থাকাটাই বর্তে যাওয়ার সামিল। কপালে থাকলে এই বিয়েতেও ছবি সুখী হবে। তবু কোথাই যেন একটা খটকা থেকে যায়। কিছুতেই মন মানে না। মায়ের এই দোটানা ভাব চোখ এড়ায় না ছবির। কানাঘুষোয় বিয়ের ব্যাপারটা সেও শুনেছে। কেমন লোকের সঙ্গে বিয়ে হচ্ছে তাও আর অজানা নেই তার। ভিতরে ভিতরে সেও পুড়ছে কয়েকদিন ধরে। বিয়ে নিয়ে সব মেয়েরই একটা আবেগ , উচ্ছাস, রঙিন স্বপ্ন থাকে। কিন্তু কয়েকদিন ধরেই মেয়েটাকে কেমন যেন মনমরা দেখায়। পরিস্থিতিই তাকে বুঝিয়ে দেয় যাদের জীবনের সব রঙ হারিয়ে গিয়েছে তা
দের স্বপ্ন দেখা মানে শুধু শুধু মন খারাপ করা। মেয়ের মনের টানাপোড়েন চোখ এড়ায় না অন্নপূর্ণারও। মেয়েকে কাছে ডেকে পাশে বসায় সে। পরম মমতায় গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে , তোর মনের অবস্থা আমি জানি মা। হাত পা বেঁধে জলে ফেলে দিতে হচ্ছে তোকে। কষ্ট আমার কি কম হচ্ছে রে ! আমি তোদের অক্ষম মা। আমার যে আর কোন পথ নেই। আমাকে ক্ষমা কর মা , আমাকে ক্ষমা কর।তারপর মেয়েকে বুকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে অন্নপূর্ণা। মেয়েও মায়ের বুকে মুখ রেখে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। দীর্ঘক্ষণ পর ছবি বলে , তুমি অত ভাবছো কেন মা ? দিদির বিয়েটা যখন মেনে নিতে পেরেছো তখন আমাকে নিয়ে ভাবছো কেন ? আমার কপালে লেখা আছে বলেই না এই বিয়ে হচ্ছে। তারপর কান্না লুকোতে অন্যদিকে চলে যায় ছবি। অন্নপূর্ণার মনে পড়ে বাসন্তীর বিয়ের সময় বরকে দেখে কত কেঁদেছিল মেয়েগুলো। সেদিন কেউ কপালের লেখার কথা তোলে নি। বার বার বলেছিল , একি করলে তোমরা মা ? সে'ই বরং কপালের দোহাই দিয়ে মেয়েদের সান্ত্বনা দিয়েছিল। দুর্বল ,গরীব মানুষদের নিজের মনকে বোঝানোর এই এক হাতিয়ার আছে। কপালের দোহাই দিয়ে তারা মনের জ্বালা জুড়ায়। আজ সেই কপালের দোহাই দিয়েই তাকে সান্ত্বনা দিয়ে গেল ছবি। অন্নপূর্ণা তার দুর্দশার কথা ভাবে। ভেবে কোন কুলকিনারা পায় না। শেষপর্যন্ত গোমস্তাকাকার সঙ্গে কথা বলে ছবির বিয়েটা চূড়ান্ত করে ফেলে। ঠিক হয় লাভপুরের ফুল্লরা মন্দিরে বিয়েটা হবে। সেই মতো রঞ্জুর বেতনের দরুন পাওয়া টাকা থেকে ছবির জন্য একপ্রস্ত বিয়ের পোশাক কেনা হয়। গোমস্তাকাকাই ছবিকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে বিয়েটা দেবেন। সেইমতো একদিন ভোর ভোর , একটু অন্ধকার থাকতেই চুপি চুপি ফুল্লরা মন্দিরের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যায় ওরা। লোকের চোখে পড়লে তো হাজারও প্রশ্নের জবাবদিহি করতে হবে। সইতে হবে নানা টিকাটিপ্পনী। তাই খুব সন্তর্পণে ওদের গ্রামের রাস্তা পার করে দিয়ে আসে সে। বিয়ে নয়, যেন পাচার করছে মেয়েকে। সেই হিসাবে দেখতে গেলে এতো একধরনের পাচারই। না হলে সব জেনে শুনে ছোট মেয়েটাকে কেউ ওইরকম একটা বাপের বয়সী লোকের হাতে তুলে দেয় ? বিয়ের আসরে বরকে দেখে ছবির মনের অবস্থাটার কথা ভেবে খুব কষ্ট পায় সে। যখন হঠাৎ বাপের বয়সী লোকটাকে বর বেশে দেখবে তখন ছবির মনের অবস্থা কেমন হবে তা অনুমান করে অন্নপূর্ণা। কিছুতেই মন থেকে বিয়েটাকে মেনে নিতে পারবে না সে। কিন্তু তাদের মতো পবিবারের মেয়েদের ক'টা কাজই বা মনের মতো হয়। মেনে আর মানিয়েই তো নিতে হয় সবকিছু। তার থেকে এই বিষয়টা কে আর ভালো বুঝবে ? সেই বিয়ে হয়ে আসার পর থেকেই তো সে পরিস্থিতির সঙ্গে আপোষ করেই চলেছে। বিয়ে দিয়ে বিকালের দিকে ফেরেন গোমস্তাকাকা। কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে চলে যান তিনি। আর খুব মন খারাপ হয়ে যায় অন্নপূর্ণার। একে একে তার সংসার প্রায় শুন্য হয়ে পড়ে। গৌরব এখন বাড়ি থেকে কখন বেরোয় কখন ফেরে তার ঠিক নেই। হৈমন্তী তো সন্ধ্যা হলেই ঘুমিয়ে পড়ে। গভীর রাত্রি পর্যন্ত কেবল ঘুম আসে না তার। দুশ্চিন্তায় , নিঘুমে কেটে যায় রাতের পর রাত। ভিক্ষায় বেড়িয়ে গেলে হৈমন্তীকে কে দেখবে ? তাকে ঘিরে একটা আশংকা স্বস্তি দেয় না অন্নপূর্ণাকে । এক দিন সেই আশংকাটাই সত্যি হয়।
( ক্রমশ )


No comments:
Post a Comment