Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

ঠাকরুন মা -- ২৪ /


    


  ঠাকরুন মা 


           অর্ঘ্য ঘোষ 


  ( ধারাবাহিক উপন্যাস ) 


ছবি চলে যাওয়ার পর থেকে হৈমন্তীকে একা রেখে আর সবদিন ভিক্ষা করতে যায় না অন্নপূর্ণা। একদিন এনে তিনদিন খায়। কিন্তু সেদিন আর না বেরোলে কিছুতেই চলছিল না। বাড়িতে এক ছটাকও চাল-ডাল নেই। ভিক্ষায় না বেরোলে আর হাঁড়ি চড়বে না।তাই খুব দোটানায় পড়ে সে।সেদিন  সকাল থেকে খুব মেঘ করছে।দু'দিন ধরে গৌরবও বাড়িতে নেই। এই অবস্থায় হৈমন্তীকে বাড়িতে একা রেখে কিছুতেই ভিক্ষা করতে যেতে মন চাইছিল না তার। কিন্তু না গেলেও নয়। তাই হৈমন্তীর হাতের কাছে পান্তাভাত - জল সব গুছিয়ে রেখে মেঘ মাথায় করেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে। একটা গ্রাম ঘুরতেই অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামে। গ্রামের বিল্ববাসিনী তলার নাটমন্দিরে আটকে পড়ে অন্নপূর্ণা। হৈমন্তীকে ঘিরে খুব দুঃচিন্তা হয় তার।এই বৃষ্টি বাদলার দিনে মেয়েটা বাড়িতে একা কি করছে কে জানে ? কোন সমস্যায় পড়ল না তো? কতদিন তো হৈমন্তীকে একা রেখেই সে ভিক্ষা করতে বেরোয় , কিন্তু আজ হৈমন্তীর জন্য মনটা তার বেশিই অস্থির হচ্ছে। কোন প্রয়োজন হলে এই অবস্থায় বাইরেও বেরোতে পারবে না। ঘণ্টা খানেক পরও বৃষ্টি থামে না। নানা দুশ্চিন্তায় নাটমন্দিরেও আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না অন্নপূর্ণা। বৃষ্টি মাথায় করেই বেড়িয়ে পড়ে। কিন্তু বাড়ির দোরগোড়ায় পা রাখতেই যেন তার হৃদস্পন্দন থমকে যায়। অন্যদিন এসময় সাধারণত হৈমন্তী ঘুমিয়ে থাকে। কিন্ত আজ তার পায়ের শব্দ পেয়ে আও ,আও করে কেঁদে ওঠে। অব্যক্ত ভাষায় কি যেন বলার জন্য হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে আসার চেষ্টা করে। মেয়েকে দেখে ' থ ' হয়ে যায় অন্নপূর্ণা।মেয়েকে দেখেই সে বুঝে যায় এতদিন মনে মনে যা আশঙ্কা করেছিল তাই ঘটেছে। মেয়ের পোশাক ছেঁড়া , সারা শরীরে আচড়ানো- কামড়ানোর দাগ। কেউ যেন খুবলে খেয়েছে সারা শরীর। নিম্নাঙ্গের পোশাক ভেসে যাচ্ছে রক্তে। অন্নপূর্ণা বোঝে সর্বনাশ যা হওয়ার তা হয়ে গিয়েছে। মেয়েও আকারে ইঙ্গিতে মাকে সেই কথাই বুঝিয়ে দেয়।কিন্তু সেই সর্বনাশ তার কে করল সেই ইংগিত সে কিছুতেই দিতে পারে না।দেবেই বা কেমন করে? 
জন্মের পর থেকে প্রতিবন্ধকতার কারণে বাড়ি থেকে তো বিশেষ একটা বেরোয় নি। গ্রামের ক'টা মানুষকেই বা সে চেনে ? অন্নপূর্ণা ভাবে কে এমন পাষণ্ড , ওই রকম একটা মেয়েকে একা পেয়ে এভাবে সর্বনাশ করে গেল ? ছেলেছোকড়া - থেকে বুড়ো, অনেক মুখই তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তাদের চোখের ভাষা মনে মনে পড়ার চেষ্টা করে সে। কিন্তু কাউকে নিশ্চিত ভাবে চিহ্নিত করতে পারে না। আর নিশ্চিত করেই বা কি হবে ? বরং ঘটনা পাঁচকান হলেই বিপত্তি বাড়বে। থানা-পুলিশ করে কোন লাভ তো হবেই না ,  মাঝখান থেকে সবাই একটা আলোচনার খোরাক পেয়ে যাবে। আর জবাবদিহি করতে করতে সে ক্লান্ত হয়ে যাবে। সব কিছু শোনার পর  অধিকাংশই তো তাকেই দুষবে। সবাই বলবে , প্রতিবন্ধী মেয়েটাকেও ভাড়া খাটাচ্ছে। কম তো চেনা হলো না সমাজকে। কেউ কোন দায়িত্ব নেবে না , কিন্তু দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য করতে, সামাজিক অনুশাসনের দোহাই দিয়ে একঘরে করতে, কেউ পিছপা হয় না। বিষয়টি চেপে যাওয়াই যুক্তিযুক্ত মনে হয় তার। তাই মেয়ের গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করে সে। কিন্তু হৈমন্তী আও, আও করে আকারে ইংগিতে তার সঙ্গে  যে ভাবে পাশবিক অত্যাচার করেছে তা বোঝানোর চেষ্টা করে। জ্বালা , যন্ত্রনার ইংগিত দেয়। তীব্র রাগের সঙ্গে সঙ্গে চোখে জল চলে আসে অন্নপূর্ণার। তার মনে তখন শুধু একটাই আশঙ্কা  , কণার মতো যদি এই মেয়েটারও সেই সর্বনাশ হয়ে যায় ,  তাহলে কি হবে ? মেয়েকে নিয়ে কোথাই যাবে তখন ? কণার মতো হৈমন্তীর যে ------। 


                          
                            আর ভাবতে পারে না অন্নপূর্ণা। দুশ্চিন্তায় দুশ্চিন্তায় রাতের ঘুম হারিয়ে যায় তার। ভালো করে খেতে পারে না। মেয়েকে একা ফেলে ভিক্ষা করতেও যেতে পারে না। কোন রকমে একবেলা আধবেলা খেয়ে কাটিয়ে দেয়।  গৌরবকেও কিছু বলতে পারে না। যা মাথা গরম হয়েছে আজকাল। কি করতে কি করে বসবে তার ঠিক নেই। তখন বাবার মতো অবস্থা না হয় ! বাবার মতো অবস্থা ? কি ভাবছে সে ? এখন সব কিছুতেই তার মনে আগে খারাপটাই আসে। মনেরই বা দোষ কোথাই ? সব ক্ষেত্রে তো তার খারাপটাই হয়েছে। কাউকে কিছু বলতে না পেরে গুমরে গুমরে মরে। একবার ভাবে গোমস্তাকাকাকে কথাটা বলবে। পরক্ষণেই মত পাল্টায়। গোমস্তাকাকারও শরীর ভালো যাচ্ছে না। তাকে এই কথা বলে শুধু শুধু দুঃশ্চিন্তায় ফেলা হবে। গোমস্তাকাকার কথা ভাবতে ভাবতে তিনি এসে পৌঁচ্ছোন।তাকে দেখে মনে একটু স্বস্তি পায় অন্নপূর্ণা।সংস্কার বশেই সে বলে , আসুন কাকা , আপনি অনেকদিন বাঁচবেন। এখনই আপনার কথা ভাবছিলাম।
----- আর বাঁচতে বলো না মা। এবার তোমাদের রেখে এবার যেতে পারলে বাঁচি।
----- ও কথা বলবেন না কাকা। আপনি চলে গেলে আমার কি হবে বলুন ? আপনি ছাড়া আমার পাশে কে আছে ?তাছাড়া আপনি চাইলেই আপনাকে যেতে দিচ্ছে কে ?
------ বেশ মা ঘাট মানছি। এবার একটা কাজের কথা বলি শোন।
----- কি কথা ?
----- বিয়ে যেমন হোক, নিয়ম মতো দ্বিরাগমনে আসার জন্য ছবিদিদিদের তো বলতে যেতে হয়।
------ তা তো হয়ই। যাবার তো আর কেউ নেই। আপনিই বরং যান কাকা।
----- বেশ মা , আমি কালই গিয়ে ওদের একবারে সঙ্গে  করে নিয়ে আসব। 
কিন্তু পরদিন গোমস্তাকাকার সঙ্গে একা আসে ছবি। মেয়েকে দেখে চমকে যায় অন্নপূর্ণা। এই কয়েকদিনেই একি হাল হয়েছে চেহারার।উদ্বিগ্ন হয়ে মেয়েকে জিজ্ঞেস করে , হ্যারে জামাই এলো না কেন ? তোর অসুখ বিসুখ কিছু হয়েছে নাকি?
ম্লান হাসি ফুটে ওঠে মেয়ের মুখে। বলে, বারে অসুখ হতে যাবে কেন ? আর ও আসবে কি করে ?  ও না থাকলে যে বাস বন্ধ হয়ে যাবে। তখন মালিক ছেড়ে দেবে ?মেয়ের কথায় ফিরে আসে অতীত। অন্নপূর্ণার মনে পড়ে যায় সেও সায়ন্তনকে ছাড়াই দ্বিরাগমনে গিয়েছিল। তাকেও মা একই কথা জিজ্ঞেস করেছিলেন। সে'ও মাকে খুশী করতে ছবির মতোই মনগড়া উত্তর দিয়েছিল। আসলে শুধু  তারা মা--মেয়েই নয় , ধারাবাহিকভাবেই আবর্তিত হচ্ছে একই ঘটনা। তাই সে ছবিকে চেপে ধরে -- হ্যারে কান্তির সঙ্গে  তোর ভাবসাব হয়েছে তো ? তোকে তার মনে ধরেছে তো ? 
এই প্রশ্নও ধারাবাহিক ভাবে আবর্তিত হচ্ছে। যেন মেয়েটিকেই ছেলের পছন্দ হওয়াটাই সব। মেয়ের পছন্দের কোন মূল্যই নেই। তার মতো মেয়েও সেই একই উত্তর দেয়। লজ্জা লজ্জা মুখ করে ছবি বলে , মা তুমি না --। কথা শেষ না করেই পুকুর ঘাটের দিকে চলে যায় ছবি। চলে গিয়ে যেন পালিয়ে বাঁচে।


                 
                                                মেয়ের এই ভাব দেখে বাইরে থেকে স্বামী সোহাগিনী মনে হলেও ভিতরে চেপে রাখা যন্ত্রনাটা চোখ এড়ায় না মায়ের। তবে তা নিয়ে আর কোন উচ্চবাচ্য করে না সে। কারণ লাভ তো কিছু হবে না , মাঝখান থেকে মেয়েটা ভিতরে ভিতরে আরও রক্তাক্ত হয়ে পড়বে। ছবি বেশ কিছুদিন বাপের বাড়িতেই থাকবে। তার দ্বিরাগমনে আসার পরই আষাঢ় মাস পড়ে গিয়েছে। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী মাস শেষ না হলে মেয়েদের বাপের বাড়ি থেকে যেতে নেই। এক হিসাবে ভালোই হলো। হৈমন্তীকে আর একা বাড়িতে রেখে ভিক্ষা করতে যেতে সাহস হচ্ছিল না। ছবি যে ক'টা দিন আছে সেই ক'টা দিন সে নিশ্চিন্তে ভিক্ষায় বের হতে পারবে। এই কয়েক দিন সে বেশি বেশি করে গ্রাম ঘুরবে। যাতে ছবি চলে যাওয়ার পরও কিছুদিন ভিক্ষায় না বেরোলেও যেন  চলে যায়। হৈমন্তীকে ছবির দায়িত্বে রেখে বেশ নিশ্চিন্তেই কেটে যাচ্ছিল দিনগুলি। কেবল মাথার মধ্যে দিনরাত ঘুরপাক খাচ্ছিল অন্যরকম দুশ্চিন্তা। কবে মাস পূর্ণ হবে সেই  প্রতীক্ষায় উদগ্রীব হয়ে থাকে তার মন।মাস পূর্ণ হলেই কণার মতো হৈমন্তীও চরম সর্বনাশের শিকার হলো কিনা বোঝা যাবে।দেখতে দেখতে মাস পূর্ণ হয় , সত্যি হয় তার আশঙ্কাই। মেয়েদের প্রতি মাসের প্রকৃতিগত প্রকাশ ঘটে না হৈমন্তীর।আকাশ ভেঙে পড়ে অন্নপূর্ণার মাথায়। কি করবে সে এখন ? কিছু ভেবে পায় না অন্নপূর্ণা। তবু দিনরাত সে এই সর্বনাশের হাত থেকে পরিত্রাণের উপায় ভেবে চলে। কিন্তু বসে বসে ভাবারও তো অবকাশ নেই। যতদিন যাবে তত হৈমন্তীর শরীরে সর্বনাশের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠবে। তখন আর কিছু করার থাকবে না। যা করার তা দ্রুত  করতে হবে তাকে। কয়েকদিনের দীর্ঘ টানাপোড়নের পর শেষ পর্যন্ত মনের কোনে উঁকি দেওয়া সেই উপায়টাই কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেয় সে। আর দেরী করতে চায় না সে। সেদিন বাড়িতে গৌরব নেই। সকাল থেকে আকাশেরও মুখ ভার। তাই ওইদিন আর ভিক্ষায় বেরোয় না অন্নপূর্ণা। সকাল থেকেই হৈমন্তীকে নিয়ে পড়ে। স্নান করিয়ে সাজিয়ে গুজিয়ে দেয়। সারাদিনই হৈমন্তীকে নিয়ে কেটে যায় তার। হৈমন্তী পোস্তবাটা, মাছের টক দিয়ে পান্তাভাত খুব ভালোবাসে। তাই ছবিকে দিয়ে দোকান থেকে একটু বেশি করে পোস্ত আর জেলে পাড়া থেকে চুনোমাছ নিয়ে আসে। নিজে হাতে চুনোমাছের টক করে। আর ছবিকে দেয় পোস্ত বাটতে। পোস্তর সঙ্গে  দেয় দুটো বড়িও। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে ছবি। সে বলে , হাপিনার কবিরাজ দিয়েছে। ওই বড়ি খেলেই হৈমন্তী ভালো হয়ে যাবে। খুব গন্ধ তো , তাই কোন কিছুর সঙ্গে বেঁটে খাওয়াতে বলেছে। 
সনিগ্ধ মনে বড়ি দুটো পোস্তর সঙ্গে  বেঁটে দেয় ছবি। নিজের হাতে হৈমন্তীর থালায় বেড়ে দেয় ভাত। তারপর মেয়েকে কাছে বসিয়ে খাওয়াতে শুরু করে। থালায় তার পছন্দের খাবার দেখে মায়ের গলা জড়িয়ে উচ্ছাস প্রকাশ করে হৈমন্তী। মেয়ের আদরে , সোহাগে অন্নপূর্ণার চোখে জল আসে। মেয়েটাকে তো এইভাবে কোনদিন যত্ন করে খাওয়াতে পারে নি। তাই খুব ধীরে ধীরে খাওয়ায়। হৈমন্তী পোস্তবাটা মেখে খাওনোর জন্য পীড়াপীড়ি শুরু করে। কিন্তু কিছুতেই হাত ওঠে না তার। মায়ের মন তো , সময় যতক্ষণ দীর্ঘায়ত করা যায় সেইজন্য টক , ডিম ভাজা দিয়ে মেয়েকে খাওয়ায় সে। একসময় থালায় পোস্তববাঁটা আর কিছু ভাত ছাড়া কিছুই পড়ে থাকে না। তাই ভাতে পোস্তবাঁটা মাখে অন্নপূর্ণা। কিন্তু ভাতের গ্রাস মেয়ের মুখে তুলে দিতে গিয়েও বার কয়েক হাত সরিয়ে নিয়ে আসে। শেষ পর্যন্ত চোখ বন্ধ করে হৈমন্তীর মুখে তুলে দেয় পোস্ত মাখা ভাত। কয়েক গ্রাস ভাত খাওয়ার পরই যন্ত্রনায় ছটফট করতে শুরু করে হৈমন্তী। ছুটে আসে ছবি। মাকে বলে , একি করলে তুমি! মা হয়ে মেয়েকে বিষবড়ি খাইয়ে মারলে ? পাপ হবে না ?
---- চোপ , আমাদের আবার পাপ পুন্য কিসের ? আমি মরে গেলে কে দেখত ওকে ? শেয়াল কুকুরে ছিঁড়ে খেত। তখন লোকে কি বলত ? 
মায়ের ওই মূর্তি দেখে চুপ করে যায় ছবি। সে ছুটে গিয়ে দিদির পাশে বসে মাথায় হাত বোলাতে থাকে। আর যন্ত্রনায় ছটফট করতে করতে কিছুক্ষণের মধ্যেই নিস্তেজ হয়ে পড়ে হৈমন্তী। তখনও তার নীল হয়ে যাওয়া মুখে লেগে রয়েছে পোস্তমাখা ভাত। অন্নপূর্ণার হাতের মুঠোতেও তখন ভাতের গ্রাস। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না সে। মেয়ের বুকে আছড়ে পড়ে। চিৎকার করে কেঁদে ওঠে সে -- এ আমি কি করলাম। কতদিন পোস্তবাঁটা ভাত খেতে চেয়েছিলি , দিতে পারিনি।আজ শেষ খাওয়া খাইয়ে দিলাম রে। আমাকে ক্ষমা করিস মা। এছাড়া তোকে বাঁচানোর আর কোন পথ আমার জানা ছিল না রে। 


                                খবর পেয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পৌঁছোন গোমস্তাকাকা। সব শুনে তার চোখেও জল। সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য তিনি বলেন, তুমিই বা কি করবে মা , গরীবদের তো মরেই এভাবে বাঁচার পথ খুঁজে নিতে হয়। কণার মতোই হৈমন্তীকেও ডাউকি নদীঘাটের শ্মশানে দ্রুত সৎকারের তোড়জোড় শুরু করেন গোমস্তাকাকা। তখনও হৈমন্তীকে জড়িয়ে কেঁদে চলেছে ছবি আর অন্নপূর্ণা। একসময় দেওয়ালে মাথা ঠুকতে শুরু করে অন্নপূর্ণা। পাগলের মতো করতে থাকে সে। বলে , আমি মরলেই তো সব চুকে যেত। কারও কোন কষ্ট দেখতে হত না ? বলে পোস্তবাঁটা মাখা অবশিষ্ট ভাত মুখে তুলতে যায়।ছবি ছুটে গিয়ে মাকে আটকায়। বলে , মা তুমি কি পাগল হয়ে গেলে ?
---- পাগল হলে তো বেঁচে যেতাম রে। এই পাপ আমাকে করতে হত না। স্বামীকে খেয়েছি , সন্তানদের খেয়েছি , তবুও কেন পাগল হলাম না বলতে পারিস ? ভগবান এত নিষ্ঠুর আমাকে পাগলও করে দেয় না। 
সেই সময় সব যোগাড়পাতি করে গোমস্তাকাকা এসে দাঁড়ান হৈমন্তীর মৃতদেহের সামনে। অন্নপূর্ণার উদ্দেশ্যে বলেন , এবার হৈমীদিদিকে ছেড়ে দিতে হবে মা। আর দেরি করা ঠিক হবে না। কান্না সামলে মেয়েকে সুন্দর করে সাজিয়ে দেয় অন্নপূর্ণা। কপালে গালে চুমু খেতে খেতে আবার কান্নায় ভেঙে পড়ে। কাঁদতে কাঁদতেই বলে চলে , কত তুচ্ছ তাচ্ছিল্য , অবহেলা সয়ে মা আমার এককোনে সংসারের আর পাঁচটা জিনিসের মতো পড়ে থেকেছিস। কোনদিন তোর আদর যত্ন করতে পারিনি মা। যেখানে যাচ্ছিস সেখানে সুখে থাকিস মা।
তারই মাঝে হৈমন্তীকে নিয়ে বেরিয়ে যান গোমস্তাকাকারা। আর সেদিকে ছুটে যায় অন্নপূর্ণা। কাপড় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। কোনদিকে খেয়াল নেই তার। মনে মনে চরম আক্ষেপ হয় তার। এ কি করল সে ? হৈমন্তীর তো কোন দোষ ছিল না। তাহলে কেন সে তাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিল ? কেন সে অন্য কোন উপায় ভাবল না ?  কেন সে আইনের আশ্রয় নিয়ে সেই নরাধমের মুখোশ খুলে হৈমন্তীর দায়িত্ব নিতে বাধ্য করল না ? তা না করে সে কেন নিজের পেটের মেয়েকে খুন করল ? হাজারও প্রশ্ন ঘুরপাক খায় তার মাথার মধ্যে। আর তত কান্নার দমকে ফুলে ফুলে ওঠে। মরার আগে  হৈমন্তী বুঝতেও পারল না তার জ্বালা যন্ত্রণার কারণ। বার বার হৈমন্তীর যন্ত্রনায় কাতর মুখটা ভেসে উঠছিল। সেই মুখে ফুটে ওঠা ভাষাই যেন তাকে প্রশ্ন করছিল -- মা পোস্তবাঁটা দিয়ে পান্তাভাত খেতে চাইতাম বলে তুমি রাগ করে সরিয়ে দিলে মা ?  আমার বুক জ্বলে যাচ্ছে। তোমার মুখ হারিয়ে  যাচ্ছে মা। আর পোস্তবাটা খেতে চাইব না। আমাকে ভালো করে দাও। আর সইতে পারে না অন্নপূর্না। বলে ওঠে , আর বলিস না। আমি আর সইতে পারছি না রে। 
পরক্ষণেই ভুল ভাঙে তার। কার সঙ্গে  কথা বলছে সে ? হৈমন্তী তো আর নেই।সে সমানে বিড় বিড় করে চলে --- ওরে মায়ের উপর অভিমান করে যাস নে , ক্ষমা করে দিয়ে যা মা। আমি যে কত অসহায় তা তো তোদের অজানা নয়। লক্ষ্মী মা আমার আমাকে ক্ষমা করে দে। বলতে বলতে মেয়ের মৃতদেহের পিছনে পিছনে ছুটতে থাকে। আর বেসামাল হয়ে পায়ে কাপড় জড়িয়ে পড়ে গিয়ে জ্ঞান হারায় অন্নপূর্ণা।


           ( ক্রমশ ) 

No comments:

Post a Comment