Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

ঠাকরুন মা - ২৫ /



    ঠাকরুন মা 


      অর্ঘ্য ঘোষ 



      ( ধারাবাহিক উপন্যাস ) 



যখন জ্ঞান ফেরে চোখ মেলে দেখে সে ছবির কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে। আর ছবি পাখা করতে করতে চেয়ে আছে তার মুখের দিকে। ছবির চোখে মুখে উদ্বেগের ছাপ স্পষ্ট।একেই বোধ হয় বলে নাড়ীর টান। হৈমন্তীর ওই ঘটনাটার জন্য কিছুক্ষণ আগেই যে মেয়ের চোখে ঘৃণা আর রাগ দেখেছিল সেই চোখই এখন কেমন মায়া মমতায় ভরা। পরম মমতায় কেমন তার কপালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। সে চোখ খুলে চাইতেই ছবি উদ্বিগ্ন স্বরে জিজ্ঞাসা করে -- এখন কেমন লাগছে মা তোমার ?  যা ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে।
-- কেন রে কি হত ? মরে যেতাম বড়ো জোর , এই তো ? ভালোই হতো জ্বালা জুড়াত। আর কারও মাথা খেতে হত না। মাকে কথা শেষ করতে দেয় না মেয়ে। হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে। গলায়  অভিমান ঝড়িয়ে সে বলে , আবার সেই অলুক্ষণে কথা। আমি না হয় হৈমীদিদির ব্যাপারটা পুরোটা না জেনে তোমার উপর রাগ করেছিলাম। কিন্তু পরে ভেবে দেখলাম এছাড়া তো কোন পথও ছিল না আমাদের। বেশ আর কথা বলতে হবে না। তুমি শুয়ে থাকো , আমি তোমার জন্য একটু সরবত করে আনি।
বলে উঠে যায় ছবি। আর সে শুয়ে শুয়ে হৈমন্তীর কথা ভাবতে থাকে। সেই ভাবনার মাঝে ভীড় করে আসে সৌরভ, সায়ন্তন, কণা, রঞ্জুরা। এলোমেলো হয়ে যায় সব চিন্তাভাবনা। মাথার ভিতরটা কেমন যেন ঝিম ঝিম করে ওঠে। রাতে  হৈমন্তীকে দাহ করে ফেরেন গোমস্তাকাকারা। আর ফের ছবিকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে অন্নপূর্ণা।গোমস্তাকাকা সান্ত্বনা দিয়ে তাকে শান্ত করেন। শ্মশানবন্ধুরা একে একে চলে যেতেই শুন্যতায় ডুবে যায় বাড়িটা। রাতে মে য়ের পাশে শুয়ে অন্নপূর্ণা ভাবতে থাকে ছবি চলে গেলে বাড়িতে সে একা থাকবে কি করে ? গৌরব তো সবদিন বাড়িতে থাকে না। পাড়ারও কেউ তো তাদের সঙ্গে  মেশে না। ঘরে - বাইরে একঘরের মতো থাকতে থাকতে সে পাগল হয়ে যাবে না তো ? দেখতে দেখতে হৈমন্তীর শ্রাদ্ধ শান্তির কাজ পেরিয়ে যায়। কাজ আর কি? করতে হয় তাই নিয়ম রক্ষার্থে নমো নমো করে কাজটা করিয়ে দেন গোমস্তাকাকা। দেখতেদেখতেই মাস পেরিয়ে যায়। অন্নপূর্ণা ভাবে এবার তো ছবিকে স্বামীর ঘরে পাঠাতে হবে। কিন্তু কথাটা পাড়তেই বেঁকে বসে ছবি। মাকে জড়িয়ে সে বলে , আমাকে আর ওখানে পাঠিও না মা।আমি আর ওখানে যাব না। তোমার শরীরের এই অবস্থা , বাড়িতে কেউ নেই। আমি চলে গেলে তোমাকে কে দেখবে ?
 --- তাই কি হয় রে মা ? বিয়ের পর মেয়ে বাপের বাড়িতে পড়ে থাকলে লোকে কি বলবে ? 
---- ছাড়ো তো মা লোকের কথা। লোকে তো আমাদের সবকিছুই খারাপ বলে। আজ পর্যন্ত লোকে আমাদের কোন ভালোকে ভালো বলেছে ?
---- বেশ , লোকের কথা না হয় বাদই দিলাম। কিন্তু বিয়ের পর যে মেয়েদের স্বামীর ঘরই আসল ঘর। তাছাড়া আমি চোখ বুজলে তোকে দেখবে কে ?


                                                 আর কোন কথা বলে না ছবি। কেমন যেন গুম মেরে যায়। অন্নপূর্ণা ভাবে , হয়তো তাকে একা ফেলে যেতে হচ্ছে বলে ছবির মন খারাপ। তাই মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে , আমার জন্য চিন্তা করিস না। আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে। সামনেই তো পুজো। তখন আবার গোমস্তাকাকা গিয়ে তোকে নিয়ে আসবে। 
অগ্যতা বিকালের দিকে গোমস্তাকাকার সঙ্গে  স্বামীর ঘরের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয় ছবি। যাওয়ার আগে তার সে কি কান্না। যেন চিরদিনের জন্য ছেড়ে চলে যাচ্ছে। অন্নপূর্ণা যত মেয়েকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে মেয়ের কান্না তত তাকেও আকুল করে তোলে। দীর্ঘক্ষণ মা-মেয়ে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেই চলে। একসময় গোমস্তাকাকা তাড়া দেন -- দিদিভাই , এরপর দেরী করলে তো আর শেষ বাসটাও পাব না।সেই কথা শুনে মাকে ছেড়ে প্রথমে হরিতলায় তারপর মা আর গোমস্তাকাকাকে প্রণাম করে ছবি। অন্নপূর্ণা মেয়ের চিবুক ছুঁয়ে চুমু খায়। আস্তে আস্তে বাড়ির বাইরে পা রাখে মেয়ে। আর সে মিলিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত ঠায় সেদিকে চেয়ে থাকে অন্নপূর্ণা। ছবি কিন্তু একবারও পিছন ফিরে চায় না। অন্নপূর্ণার মনে হয় , জোর করে স্বামীর ঘরে পাঠানো হচ্ছে বলেই ছবি অভিমানে ওই রকম আচরণ করছে। কিন্তু পরদিন তার ভুল ভাঙে। কথা ছিল ছবিকে পৌঁচ্ছে দিয়ে রাতটুকু সেখানে কাটিয়ে ভোর ভোর ফিরে আসবেন গোমস্তাকাকা। কিন্তু তার পরিবর্তে উর্ধশ্বাসে সাইকেল হাঁকিয়ে দরজার সামনে এসে দাঁড়ায় একটি ছেলে। তাকে দেখেই বুকের ভিতরটা কেমন ধড়াস করে ওঠে অন্নপূর্ণার। ছেলেটির দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাইতেই সে বলে ওঠে , ঠাকরুনমা আমাকে আপনি চিনবেন না। আপনাদের গোমস্তাবাবু আমাকে পাঠালেন। খুব বড়ো বিপদ হয়ে গিয়েছে। আপনার মেয়ে ভোরবেলায় গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে।কথাটা শুনেই কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে অন্নপূর্ণা। কিছুতেই বিশ্বাস হয় না কথাটা। কোন রকমে বলতে পারে- কালই তো গেল,  কি এমন হয়েছিল যে ওকে আত্মহত্যা করতে হলো? 
 ----- তা তো আমি বলতে পারব না ঠাকরুনমা। গোমস্তাবাবু জানতে পাঠিয়েছেন ওখানেই সৎকার করে দেওয়া হবে , না মৃতদেহ এখানে আনার ব্যবস্থা করা হবে ?
অন্নপূর্ণা ভেবে পায় না কি বলবে সে। গৌরবও বাড়িতে নেই , যে ওকে পাঠাবে। নিজে কোন সিদ্ধান্তেও পৌঁছোতে পারে না। তাই বলে, গোমস্তাকাকা যা ভালো বুঝবেন তাই করতে বোলো। ছেলেটি চলে যেতেই কপাল চাপড়াতে থাকে সে। তার গলা থেকে ঝরে পড়ে তীব্র আক্ষেপ --- তোর মনে যে এই ছিল তা একটুও বুঝতে দিলিনা মা ? এমনি করে চলে যাবি জানলে কিছুতেই জোর করতাম না। অভিমানটাই বড়ো হলো ? একবার মায়ের কথা ভাবলি না ?  বিড়বিড় করে আর সমানে কেঁদেই চলে অন্নপূর্ণা। তার পাশে তখন সান্ত্বনা দেওয়ারও কেউ নেই।


                                 বিকালের দিকে দাহকাজ সেরে গোমস্তাকাকা ফেরেন। তাকে দেখে আবার শোকবিহ্বল হয়ে পড়ে অন্নপূর্ণা। আরও জোরে কেঁদে ওঠে। বলে , কাকা সবাই কি এভাবে আমাকে একা করে চলে যাবে ? 
কেঁদে ফেলেন গোমস্তাকাকাও। কাঁদতে কাঁদতেই বলেন , মা তুমি তো শেষ বেলাকার মুখখানি দেখোনি। মুখে সেই ছোটবেলাকার দুষ্টুমিভরা হাসিটা লেগে ছিল। ভাবখানা এমন , যেন বলতে চাইছে নাও এবার কই ধরো দেখি আমায়।
---- কাকা, আর বলেন না, আমি সইতে পারছি না।
---- সইতে কি আমি পারছি ? বুকের ভিতরটা ফেটে যাচ্ছে। নিজের তো কেউ নেই , ওদেরই কোলে পিঠে করে  মানুষ করেছি। ওদের মুখ দেখেই নিজের কেউ না থাকার অভাব ভুলেছি। সেই মুখেই আমাকে আগুন ছোঁওয়াতে হল। তার আগে আমি চলে গেলাম না কেন ?
---- কাকা সবই আমার কপাল। জানি না কোন পাপে আমার এই শাস্তি হচ্ছে ? 
--- মা গো , এ আমারই ভুল। আমিই তখন ভালো করে খোঁজখবর নিইনি। লোকটা শুধু মাতালই নয় , বিকৃত রুচির একটা জানোয়ার। বন্ধুদের জুটিয়ে এনে ফুর্তির আসর বসিয়ে টাকা রোজগার করত। জোর করে মদ খাওয়াত।তারপর বেহুশ শরীরটার ওপর পাশবিক অত্যাচার করত। কোন আপত্তি করলেই সিগারেট -- বিড়ির ছ্যাকা দিত। এর আগের বউ দুটোও একই কারণে গলায় দড়ি দিয়ে মরেছে।  ছবি মাও সেই অত্যাচার সইতে না পেরে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে। দোষ আমারই, এক বাড়িতে থেকেও কাল আমি কিছুই আঁচ করতে পারলাম না।
 --- আপনার আর ভুল কিসের ? আমার জীবনটাই যে ভুলে ভরা। তাই বোধ হয় একের পর এক মাসুল দিয়ে চলেছি। জানি না  আর কত মাসুল আমাকে দিতে হবে ? 
বেশ কিছুক্ষণ সান্ত্বনা দেওয়ার পর গোমস্তাকাকা বাড়ি ফিরে যান।আর বাড়িটা যেন গিলে খেতে আসে অন্নপূর্ণাকে।একা বসে বসে সে ভাবতে থাকে একদিন আগেও এইসময় এই বাড়িতেই ছিল ছবি। আজ সেই ছবিই ছবি হয়ে গেল। মনে মনে খুব আক্ষেপ হয় তার। মা হয়েও সে পড়তে পারল না মেয়ের চোখের ভাষা। মেয়ের মনে লুকিয়ে থাকা জ্বালা যন্ত্রণা উপলব্ধিই করতে পারল না। পারলে যে আজ ছবিকে হারাতে হত না। ছবির কথা ভাবতে ভাবতেই একসময় মাটিতেই ঘুমিয়ে পড়ে অন্নপূর্ণা।রাতের অন্ধকার মুছে আলোয় ভরে যায় দশদিক। কেবল অন্নপূর্ণাকে আচ্ছন্ন করে রাখে বিষাদের অন্ধকার। এখন আর সবদিন ভিক্ষা করতেও যায় না। গৌরব কোথায় খায় , কোথায় থাকে তার কোন ঠিক ঠিকানা নেই। ইচ্ছে হলে কোনদিন বাড়ি আসে , তো কোনদিন আসে না। আন্নপূর্ণা নিজেও একদিন খায় তো  দুদিন খায় না। খিদে তেষ্টার বোধটাই যেন হারিয়ে গিয়েছে। দ্রুত শরীর মন ভেঙে পড়ছে। সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপই নেই তার। বেশিরভাগ সময় বিছানাতেই পড়ে থাকে। বাঁচার ইচ্ছেটাই যেন হারিয়ে ফেলেছে। কেবল  সায়ন্তনের খুনের সুবিচারের আশা তাকে কোনরকমে বাঁচিয়ে রেখেছে। 


                   দেখতে দেখতে সেই দিনটা এসে পড়ে। সেদিন সায়ন্তনের মামলার রায় বেরনোর দিন। তাই সেদিন সকাল থেকেই কিছুটা উদ্বিগ্ন দেখায় অন্নপূর্ণাকে। রায় নিয়ে ভিতরে ভিতরে একটা চাপা উত্তেজনাও কাজ করে। ভাসুরদের স্বাক্ষ্যে খুনীরা শেষ পর্যন্ত রেহাই পেয়ে যাবে না তো ? শাস্তি হলে ওদের ফাসি না , যাবজ্জীবন সাজা হবে ? এমনই নানা প্রশ্ন ভীড় করে তার মনে। আর তিনআনিরা যদি বেকসুর খালাস পেয়ে ফিরে তাহলে কি আর তারা গ্রামে থাকতে পারবে ? গৌরবের সঙ্গে  সংঘাত বাঁধবে ওদের। তখন কি ওরা ছেড়ে কথা কইবে ? তিনআনিদের সঙ্গে যোগ দেবে ভাসুররাও। তখন কোথাই যাবে তারা ?  পরক্ষণেই মনকে সান্ত্বনা দেয় , সে রকম কিছু হবে না। দুই ভাসুর বিপক্ষে স্বাক্ষী দিলেও তাদের পক্ষেও তো স্বাক্ষী দিয়েছেন অনেকে। তাছাড়া জলজ্যান্ত একটা লোককে পিটিয়ে খুন করাটা তো আর মিথ্যা হয়ে যাবে না। বড়ো কিছু শাস্তি না হলেওএকেবারে বেকসুর খালাস নিশ্চয় পাবে না ওরা। সেই সাজা খেটে জেল থেকে বেরোনোর আগেই না হয় গ্রাম ছেড়ে চলেই যাবে তারা। আশা-নিরাশার দোলাচলের মধ্যেই দ্রুত স্নান সেরে আদালতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয় সে। কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পৌঁছোন গোমস্তাকাকা। তার সঙ্গেই রামপুরহাট মহকুমা আদালতের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়ে অন্নপূর্ণা। আদালতেও সেদিন চাপা উত্তেজনা। উকিল-মহুরী, বার কাউন্সিল সর্বত্র সেদিনের রায়ের বিষয় নিয়ে আলোচনা। নির্ধারিত সময়ে গোমস্তাকাকার সঙ্গে  আদালত কক্ষে গিয়ে বসে অন্নপূর্ণা। তার মনে তখন চরম টানাপোড়েন। মনে হচ্ছিল , রায় যাই হোক , সেটা যত তাড়াতাড়ি ঘোষিত হয় ততই ভাল। সে আর চাপ নিতে পারছে না। যথা সময়ে  আদালতে প্রবেশ করেন বিচারক। আদালতে তখন পিন পড়লেও শোনা যাওয়ার মতো নিঃস্তব্ধতা। আদালত কক্ষের খাঁচার ভিতরে ততক্ষণে এনে ঢোকানো হয়েছে অভিযুক্তদের। বিচারক একবার তাদের দিকে , একবার গোটা আদালত কক্ষে চোখ বুলিয়ে নেন। আর তখন থেকেই অন্নপূর্ণার বুকের ভিতরে কি হয় , কি হয় ভাবটা আরও বেড়ে যায়। হাতজোড় করে সে বিচারকের দিকে চেয়ে বসে থাকে। বিচারক প্রথমে অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসা করেন --- আপনাদের বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ রয়েছে। আপনাদের কিছু বলার আছে ? 
উত্তরে অভিযুক্তরা সমস্বরে বলে ওঠে -- হুজুর আমরা নির্দোষ। আমাদের মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসানো হয়েছে।
আদালতের প্রচলিত এই নিয়মগুলো কেমন বিষ্ময়কর মনে হয় অন্নপূর্ণার।অন্নপূর্ণা যতদুর জানে তাতে বিপ্লবী আর কিছু ব্যতিক্রমী ক্ষেত্র ছাড়া কোন অভিযুক্ত তার বিরুদ্ধে দায়ের করা অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করে না।স্বাক্ষ্যদানের ক্ষেত্রেও ধর্মগ্রন্থ ছুঁয়েও অনেকে মিথ্যা কথা বলেন। দুটি ক্ষেত্রেই তো সায়ন্তনের খুনের মামলাই জলজ্যান্ত প্রমাণ। তবু বছরের পর বছর ধরে ওই নিয়ম চলে আসছে। ওইসব ভাবনার মাঝেই বিচারকের গলার স্বরে সচকিত হয়ে ওঠে অন্নপূর্ণা। রায় পড়তে শুরু করেন বিচারক। খুব ধীরে ধীরে বিচারক বলেন , প্রাথমিক ভাবে পুলিশ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে খুনের মামলা রজু করেছিল। কিন্তু তার স্বপক্ষে কোন স্বাক্ষ্য প্রমাণ দাখিল করতে পারে নি। তাই স্বাক্ষ্য প্রমাণের অভাবে অভিযুক্তদের বেকসুর খালাস ঘোষণা করা হল।
বিচারকের কথা শেষ হয় না। অন্নপূর্ণা চিৎকার করে ওঠে -- না ----- আ। 
তার চিৎকারে আদালতের স্তব্ধতা খান খান হয়ে ভেঙে পড়ে , প্রতিধ্বনিত হয়ে ফেরে আদালত কক্ষে। সবার দৃষ্টি গিয়ে পড়ে অন্নপূর্ণার উপর। বিচারকও জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন। অন্নপূর্ণা তখন দাঁড়িয়ে বলতে থাকে -- হুজুর , পুলিশ স্বাক্ষ্য প্রমাণ দিতে না পারলে আমার স্বামীর খুনটা তো মিথ্যা হয়ে যেতে পারে না। কেউ তো খুনটা করেছে। তাহলে কেন আমি বিচার পাবো না ? কেন -- কেন হুজুর ?
বিধবার ওই মর্মস্পর্শী প্রশ্নে আলোড়ন পড়ে যায় আদালত কক্ষে। অস্বস্তির ছাপ ফুটে উঠে খোদ বিচারকের চোখে মুখেও। তাকে বড়ো কঠিন প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয় অন্নপূর্ণার আর্তি। কারণ পুলিশের নথিতেই খুনের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। অথচ প্রমাণের অভাবে সব জেনেও অভিযুক্তদের কোন সাজা দেওয়া সম্ভব হলো না। তাই অস্বস্তি এড়াতে তিনি বলেন, দেখুন মা এই বিচার যদি আপনার মনোপুত না হয় তাহলে আপনি উচ্চ আদালতে পুনঃবিচারের আর্জি জানাতে পারেন। আইনে সেই নিয়ম আছে। আপনার উকিল দেওয়ার ক্ষমতা না থাকলে আপনি  সরকারি সহয়তাও পেতে পারেন।বিচারকের কথা শেষ না হতেই ফের পাগলের মতো চিৎকার করে ওঠে অন্নপূর্ণা -- হ্যা , আমি পুনঃবিচার চাই , এখনি , এই মূহুর্তে। অনেক বছর ধরে এই মামলা লড়তে লড়তে আমি সব কিছু হারিয়ে ফেলেছি। অন্য জায়গায় পুনঃবিচার শেষ হতে হতে আমিই হয়তো মরেই যাব। যা করার আপনিই করুন হুজুর। আমি আমার স্বামীর হত্যাকারীদের সাজা দেখতে চাই। 
বিচারক বলেন -- তা কি করে হয় মা ? এ আদালতে তো আর তোমার ওই বিচার সম্ভব নয়। 
----- তাহলে আপনার সামনেই এই আদালতে আমি মাথা ঠুকে মরব।
বলে দেওয়ালে মাথা ঠুঁকতে শুরু করে অন্নপূর্ণা। আর ওই ঘটনায় হতচকিত হয়ে পড়ে গোটা আদালত। বিব্রত বোধ করেন বিচারক। বিচারকের বিব্রত ভাব লক্ষ্য করে সরকারি আইনজীবি বলে ওঠেন , হুজুর সম্ভবত ওই মহিলা পাগল। আপনি ওকে আদালতকক্ষ থেকে বের করে দেওয়ার জন্যপুলিশকে নির্দেশ দিন। নির্দেশ দিতে হয় না। আদালতের কর্তব্যরত পুলিশকর্মীরা এসে অন্নপূর্ণার দুই হাতে ধরে। আবার চিৎকার করে ওঠে সে ---- হুজুর, বিশ্বাস করুন আমি পাগল নই। বিশ্বাস করুন হুজুর, আপনি বিশ্বাস করুন -- ---। 
তার কথা কেউ কানেই তোলে না। পুলিশকর্মীরা টেনে হিঁচড়ে তাকে আদালত কক্ষের বাইরে এনে ফেলে দেয়। কান্নায় ভেঙে পড়ে অন্নপূর্ণা। তারই সঙ্গে যেন  'বিচারের বানী নীরবে নিভৃতে কাদে। '

            
           ( ক্রমশ ) 

No comments:

Post a Comment