Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

ঠাকরুন মা -- ২৬ /



   ঠাকরুন মা

         অর্ঘ্য ঘোষ


   ( ধারাবাহিক উপন্যাস )


আদালত চত্বরে পড়ে কাঁদতে থাকে সে। তখন তাকে দেখে সবাই পাগলিই ভাবে। আর তার আচরণ দেখে আদালতের মানুষজন যেন মজা দেখার খোরাক পেয়ে যায়। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নানা রকম মন্তব্য করতে থাকে তারা।একসময় তার দুপাশে এসে দাঁড়ায় গোমস্তাকাকা আর সন্দীপন। তারা অন্নপূর্ণাকে তুলে ধরে  আদালত চত্বরের বাইরে নিয়ে আসে। দুজনেই কোন কথা বলতে পারে না।কি'ই বা বলবে এই পরিস্থিতিতে ? সান্ত্বনা দেওয়ার কোন ভাষা খুঁজে পায় না তারা।অন্নপূর্ণা কেমন মানসিক বিকারগ্রস্ত রোগীর মতো আচরণ করতে থাকে।কোন রকমে তারা  অন্নপূর্ণাকে বাড়িতে নিয়ে আসে।কিন্তু এই অবস্থায় কি করে তাকে একাকী ফেলে রেখে নিজেরা বাড়ি ফিরবেন তা ভেবে পান না। খুব দুশ্চিন্তায় পড়েন তারা। হঠাৎ  অন্নপূর্ণা বলে ওঠে -- এই দিনটার জন্য আমি এতদিন আশায় আশায় বুকে বেঁধেছিলাম।সব শেষ হয়ে গেল। একটা মানুষকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে পিটিয়ে খুন করেও কিচ্ছু হল না ওদের। খেদ ঝড়ে পড়ে তার গলায়।গোমস্তাকাকা -সন্দীপনের চোখে মুখেও হতাশার ছাপ।সন্দীপন বলে , যথাসাধ্য লড়েওকিছুই করতে পারলাম না। একজন আইনজীবি হিসাবে এই ব্যর্থতার দায় আমারই।
গোমস্তাকাকা বলেন, তুমি এভাবে বলছো কেন ? তুমি না থাকলে তো এ মামলা আদালত পর্যন্ত গড়াতই না। সে যা হওয়ার তা তো হয়েছে ,  কিন্তু আর কি কিছুই করার নেই ?
---- করার আছে বলতে উচ্চ আদালতে পুনঃবিচারের আর্জি জানাতে পারি আমরা।  কিন্তু তাতে অনর্থক অর্থব্যয় ছাড়া কিছু লাভ হবে বলে আমার মনে হয় না।
---- কেন -- কেন ,  কোন লাভ হবে না বলে মনে হচ্ছে তোমার ? কত মামলায় তো শুনি পুনঃবিচারে অন্য রকম রায় হয়েছে।
 ---- তা হয়েছে ঠিকই। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তা হওয়ার সম্ভবনা নেই বললেই চলে।
---- কেন ?
---- উচ্চ আদালতে তো নতুন করে স্বাক্ষ্য প্রমাণ দাখিলের কোন সুযোগ নেই।সেখানে লড়াই চলে মূলত নিম্ন আদালতের বিচার প্রক্রিয়ার ফাঁকফোঁকর আর বিভিন্ন আদালতের রায় আর ধারা - উপধারাকে কেন্দ্র করে।  কিন্তু ওরা পুলিশের তদন্তকারী অফিসার , সরকারি আইনজীবি এবং স্বাক্ষীকে টাকা খাইয়ে সেইসব ফাঁকফোঁকর মেরে রেখেছে। আর তাই অন্যান্য বিষয়গুলিও আমরা খুব একটা কাজে লাগাতে পারব না।
---- বেশ , মানুষের আদালতে বিচার নাই বা হলো ? উপরে তো একজন রয়েছেন , তার কাছে নিশ্চয় সুবিচার হবে। গোমস্তাকাকার কথা শেষ হতে না হতেই হঠাৎ হো --হো শব্দ করে হেসে ওঠে অন্নপূর্ণা। টানা হাসির দমকে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলতে পারে না সে।গোমস্তাকাকা আর সন্দীপন অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে তার দিকে। অন্নপূর্ণাকে তখন কেমন অচেনা লাগে। তাদের মনে সংশয় উকি দেয় , সত্যি সত্যি পাগল হয়ে গেল না তো অন্নপূর্ণা! বেশ কিছুক্ষণ পর হাসি থামিয়ে সে বলে , সান্ত্বনা দিচ্ছেন কাকা ? উপরওয়ালার কথা বলছেন ? তিনি কি সত্যিই আছেন ? থাকলেও এত উপরে আছেন যে ,আমাদের মতো এত নীচে থাকা মানুষের কাছে তার বিচার পৌঁছোয় না।জীবনভর তো সেটাই দেখে আসছি। আপনারও তো তা অজানা নয় কাকা।
 --- সে তো জানি মা। কিন্তু আমাদের তো সেই উপরওয়ালার প্রতি ভরসা রাখা ছাড়া গতিও নেই।
আবার শব্দ করে হেসে ওঠে অন্নপূর্ণা। সেই হাসি আর থামতেই চায় না। একসময় হাসি থামিয়ে সুর করে বলে ওঠে - অগতির গতি তুমি ওগো দয়াময়। কোথায় তোমার দয়া খুঁজে নাহি পায়। কিছু বুঝলেন কাকা ? ছোটবেলায় মায়ের মুখে শুনেছিলাম। কেমন আমার জীবনে মিলে গেল দেখুন।
----- মা তুমি একটু মাথা ঠাণ্ডা করো। দেখ ঠাকুর ঠিক একদিন মুখ তুলে চাইবেন।
---- আপনি আমাকে ঠাকুরের কথা শুনিয়ে মাথা ঠান্ডা রাখতে বলছেন ? আপনি কি আমাকে বাচ্চা পেয়েছেন কাকা ? মাথা কি ঠান্ডা রাখা যায় ?
সন্দীপন আর গোমস্তাকাকা বিস্ময়ে চেয়ে থাকেন অন্নপূর্ণার মুখের দিকে। আর অন্নপূর্ণা আকাশের দিকে আঙুল তুলে বলে -- কাকা আপনাকে আমি মান্য করি , কিন্তু সাবধান করে দিচ্ছি আর কখনো ওই অন্ধ ঠাকুরের কথা তুলবেন না , আমার মাথায় আগুন জ্বলে যায়।
----- বেশ মা তাই হবে।
---- সবাই বলে যার কেউ নেই , তার ভববান আছে। সবাই ভুল বলে। যার কেউ নেই তার ভগবানও নেই।


              অন্নপূর্ণার যে মস্তিক বিকৃতি শুরু হয়ে গিয়েছে সে সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে যান গোমস্তাকাকারা। না হলে এভাবে অন্নপূর্ণাকে কোনদিন কথা  বলতে শোনে নি তারা। আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলার পর সেই ধারণাটাই বদ্ধমূল হয় তাদের।অন্নপূর্ণার প্রতিটি কথাই অসংলগ্ন হয়ে পড়ে। এবার আক্ষেপ শোনা যায় গোমস্তাকাকার গলায় -- সব শেষ হয়ে গেল সন্দীপনবাবু  , এবার কি যে হবে ভেবে পাচ্ছি না।
কথাটা কানে যেতেই আবার হেসে ওঠে অন্নপূর্ণা। হাসির দমকে সারা শরীর ফুলে ফুলে ওঠে। কিছুটা বিদ্রুপের সুরে সে বলে, কেন আপনার উপরওয়ালা আছে তো। তারপর কেটে কেটে উচ্চারণ করে --  উ--প --র --ও--য়া--লা! ভারি আমার উপরওয়ালা রে। তাকেই কে দেখে তার ঠিক নেই , উনি দেখবেন আমাকে। ওরে আমি তো সাগরে শুয়ে পড়েছি, শিশিরে গা ভেজার ভয় আর করি না। এবার যা পারিস কর।
এইসব কথাবার্তা যে মস্তিক বিকৃতির লক্ষণ তা আর বুঝতে বাকি থাকে না গোমস্তাকাকার। তাই তিনি বলেন , হ্যা মা তোমার কথাই ঠিক। বেশ এখানে তো এখন কেউ নেই।তুমি আমাদের বাড়িতে চলো। সেখানেই বরং থাকবে আমাদের কাছে।
---- কি ? আপনার আস্পর্ধা কম নয়। আমি জমিদারবাড়ির ঠাকরুন মা। আর আমাকে আপনার বাড়িতে গিয়ে থাকতে বলছেন ? আপনাকে সাবধান করে দিচ্ছি , আর কখনও ওইরকম কথা বলবেন না।
অন্নপূর্ণার কথা শুনে গোমস্তাকাকা পড়েন মহা বিড়ম্বনায়। অন্নপূর্ণা সুস্থ - স্বাভাবিক থাকলে সে কখনই ওই কথা বলতে পারত না।অবশ্য সুস্থ - স্বাভাবিক থাকলে অন্নপূর্ণা ওইরকম তীব্র প্রতিক্রিয়াও ব্যক্ত করত না।কিন্তু কি করে সে এখন? অন্নপূর্ণার মানসিক অসুস্থতা বেড়ে যাওয়ার আশংকায় তার বাড়ি যাওয়ার জন্য আর জোরাজুরি করতে পারে না। আবার একা অন্নপূর্ণাকে ফেলে রেখে বাড়িও চলে যেতে পারে না। সেইসময় সেখানে হাজির হয় যোগনাথ হাজরা। সায়ন্তনের খুব অনুগত ছিল যোগনাথ। পেটের দায়ে সায়ন্তন নিজে চুরি করলেও যোগনাথকে আপদে- বিপদে সাহায্য করত।তাই দাদাঠাকুরের নামে আজও কপালে হাত ঠেকিয়ে বলে , চুরিচামারি করলেও দাদাঠাকুর আমাদের ভগবান ছিল গো। পেটে ভাত না থাকলেও দিলটা ছিল খুব বড়ো। আজও সায়ন্তনের পরিবারের প্রতি যোগনাথের অনুগত্যের অভাব নেই।তাকে পাশে ডেকে নিয়ে ঘটনার সব খুলে বলেন গোমস্তাকাকা।শোনার পর যোগনাথ বলে , বাবু আপনারা নিশ্চিন্তে বাড়ি চলে যান। আমি ঠাকরুন মায়ের পাহারায় রইলাম।


                          যোগনাথের কথা শুনে স্বস্তি ফেরে গোমস্তাকাকাদের মনে। যোগনাথকে দায়িত্ব দিয়ে সেদিনের মতো সন্দীপন আর গোমস্তাকাকা বাড়ি উদ্দেশ্যে রওনা দেন। তারা চলে যেতেই আবার অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে অন্নপূর্ণা। সেই হাসির শব্দে বাড়ির ঘুলঘুলিতে বাসা বেঁধে থাকা পায়রাগুলো ডানা ঝাপটে ওঠে। বাড়ির সামনে মুখ গুঁজে পড়ে থাকা কুকুরটা আচমকা ভয় পেয়ে ডেকে ওঠে। যোগনাথ তার পায়ের কাছে বসে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু কোন সান্ত্বনাই শান্ত করতে পারে না  অন্নপূর্ণাকে। সেই সময় হাতে গামছায় বাঁধা খোরায় খাবার ঝুলিয়ে  আসে শ্রীমতী।
স্ত্রীকে দেখে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে যোগনাথ।শ্রীমতী বলে , গোমস্তাবাবু যাওয়ার সময় বলে গেলেন তুমি আজ ঠাকুরুনমাকে পাহারা দেবে। তাই তোমার জন্য খাবার নিয়ে এসেছি।
---- খুব ভালো করেছিস।কিন্তু ঠাকরুনমাও সারাদিন নাকি কিছু খান নি।ওনাকে ফেলে আমি খায় কি করে বল দিকি? ওনার জন্যও চাট্টি আনলে পারতিস তো ?
---- সে আমি এনেছি গো। কিন্তু আমাদের হাতের রান্না কি ওনাকে দেওয়া উচিত হবে ? 
---- কেন , উচিত হবে না কেন ?
---- আমরা হলাম জল অচল হাঁড়ির মেয়ে। উনি ব্রাহ্মণের বিধবা। আমাদের হাতের রান্না খাওয়ালে পাপ হবে না ?
---- রাখ তো তোর পাপ। আর পাপ-পুন্যি বলে কিছু আছে ? থাকলে কি ঠাকরুনমায়ের এই দশা হয় ? তাছাড়া বাহ্মণের বিধবা হলেও উনি আমাদের মায়ের মতো। যখন সুদিন ছিল তখন পাশে বসে একসঙ্গে মায়ের মতো কত খাইয়েছেন। মায়ের কাছে আবার পাপ কি রে ? যা তুই  নিজে হাতে খাইয়ে দে।
---- পাপ হবে না বলছ ? 
---- হ্যারে হ্যা, দে তুই খাইয়ে।
স্বামীর কথা শুনে নিয়ে আসা খাবার দু'ভাগ করে নেয় শ্রীমতী।একভাগ স্বামীকে দিয়ে বাকিটা ঠাকুরন মা'কে খাওয়াতে বসে সে। মুখের সামনে ভাতের গ্রাস তুলে ধরে বলে , অপরাধ নিও না মাগো।আমরা জল অচল হাঁড়ির মেয়ে।কিন্তু আমি তো মা তোমার মেয়েরই মতো।ক্ষমা ঘেন্না করে খেয়ে নাও মা।অন্নপূর্ণা কিছুক্ষণ তার দিকে জুলজুল করে চেয়ে থাকে।তারপর হাঁ করে।শ্রীমতী তার মুখে তুলে দেয় ভাতের গ্রাস।অদুরে বসে খেতে খেতে সেই দৃশ্য দেখে যোগনাথের মুখে ফুটে ওঠে স্বর্গীয় হাসি।ছোটবেলায় বাবা-মাকে হারিয়েছে সে।ঠাকুরুন মায়ের মধ্যেই সে মায়ের মুখছবি দেখতে পায়।শ্রীমতীও যেন নিজের মাকেই খুঁজে পায়। সেও মা হারিয়েছে বহুদিন আগে।সেই মাকেই যেন পরম যত্নে ভাত মেখে সে তুলে দেয় সে।খেতে খেতে পরিতৃপ্তির ছাপ ফুটে ওঠে ঠাকুরুন মায়ের মুখে। খাওয়া শেষে মুখ ধুইয়ে দিয়ে বাসনপত্র গুটিয়ে নিয়ে বাড়ির পথ ধরে শ্রীমতী।


                       তারপরই যেন নিঝুম হয়ে পড়ে চারিদিক। অন্ধকারে ঢেকে যায় বাড়িটা।তিনআনিদের বাড়িতে তখন আলোর রোশনাই।বিচার চলাকালীন যে দু-চারজন সহানুভূতিশীল হয়ে অন্নপূর্ণার দিকে ঝুঁকেছিলেন তারাও রাতারাতি তিনআনিদের দলে গিয়ে ভীড়েছেন। তারাও উৎসবের আমেজে মাতোয়ারা। যেন রাজারা যুদ্ধ জয় করে ফিরেছেন।তাই প্রজারা নিবেদিত প্রাণ হয়ে আনুগত্য প্রদর্শন করছে। পাশের গ্রাম থেকে নিয়ে আসা হয়েছে ঢাক-ঢোল। বিস্তর খানাপিনা , আমোদ- ফুর্তির আয়োজন। অন্নপূর্ণার ভাসুর-জা'রাও ভিড়েছেন সেই দলে। তাদের তো নিমন্ত্রণ থাকবেই। এই যুদ্ধ জয়ে তারাও তো সৈনিক। সেই সময় উদভ্রান্ত হয়ে বাড়ি ফেরে গৌরব। তার দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে
অন্নপূর্ণা। মায়ের ওই অবস্থা দেখে সে বুঝে যায় তার বাবার খুনের মামলার পরিনতি। মুহুর্তে তার মনের পর্দায় ভেসে ওঠে বীভৎস সেই দিনটার ছবি। মৃত্যু যন্ত্রনায় একটু জল, জল করে ছটফট করছে বাবা , আর ওরা বাবার মুখে প্রস্রাব করে দিচ্ছে।  চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে তার। চোখে জ্বলে ওঠে প্রতিশোধের আগুন। ঘরের ভিতর থেকে মোটা লাঠিটা নিয়ে সে তিনআনিদের বাড়ির দিকে ছুটে যায়। ছেলেকে ওইভাবে মারমুখী হয়ে বেড়িয়ে যেতে দেখে একটা কথাও বলে না অন্নপূর্ণা।আগে হলে মাথার দিব্যি দিয়েও ছেলেকে আটকাত।কিন্তু এখন তো ঘটনার গুরুত্ব উপলব্ধি করার বোধটাই সে হারিয়ে ফেলেছে। অন্নপূর্ণা ঘটনার গুরুত্ব অনুধাবন করতে না পারলেও যোগনাথ বিপদের আঁচ পায়।  ছোটবাবু যে তিনআনিদের বাড়িই যাচ্ছে তা অনুমান করতে অসুবিধা হয় না তার। সেখানে গেলে যে ছোটবাবু  সমূহ বিপদে পড়বে তা'ও সে ভালোই জানে। তাই সে ছুটে গিয়ে তার পথ আগলে দাঁড়ায়। তাকে দেখে ভ্রু কু্ঁচকে তাকায় গৌরব। যোগনাথ বলে , গোমস্তাবাবু আমাকে তোমাদের বাড়ি পাহারা দিতে বলে গিয়েছেন। তোমার পায়ে ধরছি ছোটবাবু , তুমি এভাবে ওদের বাড়ি যেও না। ওরা খুনে , সব পারে। ওরা তোমাকে মেরে ফেলবে।
---- বার বার মারলেই হল ?  আমাকে মারতে এলে আমি ওদেরকে কাউকে না মেরে মরব না।
যোগনাথকে সরিয়ে দিয়ে তিনআনিদের বাড়ির দিকে ছুটে যায় গৌরব। আর দোটানায় পড়ে যায় যোগনাথ। সে জানে এই বিপদের হাত থেকে ছোটবাবুকে উদ্ধার করতে পারলে একমাত্র গোমস্তাবাবুই পারবেন। তাই তাকে একটা খবর দেওয়া বড়ো প্রয়োজন বলে মনে হয় তার। কিন্তু ঠাকুরুনমাকে ফেলে যেতেও পারে না। তাই মনে মনে ঠাকুরের নাম জপ করে চলে সে। গৌরব বেরিয়ে যাওয়ার পরই প্রচন্ড হই-হট্টগোল শোনা যায় তিনআনিদের বাড়িতে। আর তার কিছুক্ষণের মধ্যেই কয়েকজন লোক ধরাধরি করে রক্তাক্ত অবস্থায় বেহুশ গৌরবকে ফেলে দিয়ে যায় অন্নপূর্ণার পায়ের কাছে।ছোটবাবুর ওই দশা দেখে আর স্থির থাকতে পারে না যোগনাথ। সে গোমস্তাবাবুকে খবর দিতে ছোটে।গৌরবের  মাথা ফেটে তখন গলগল করে রক্ত ঝড়ছে। ছেলেকে ওই অবস্থায় দেখে কেমন যেন বিহ্বল হয়ে পড়ে অন্নপূর্ণা। বেশ কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে চেয়ে থাকার পর দুহাতে মাথা চেপে ধরে বসে পড়ে। মনে হয় যেন তীব্র যন্ত্রণায় মাথার শিরা ছিঁড়ে যাচ্ছে। আস্তে আস্তে যেন তার ঝাপসা হয়ে যাওয়া মনের পর্দাটা সরে যায়।  দৃশ্যমান হয়ে ওঠে অতীত। মনে পড়ে যায় সেই দিনটার কথা। সেদিনও এই ভাবেই তিনআনিদের দোকান ঘরের সামনে পড়ে ছিল সায়ন্তনের রক্তাক্ত নিথর দেহ। সে সেদিন সায়ন্তের বুকের উপর আছড়ে পড়েছিল। সেই কথা মনে পড়তেই একটু স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরে অন্নপূর্ণা।আর সেদিনের মতোই ছেলের রক্তাক্ত দেহ আঁকড়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে।পরম যত্নে শাড়ির আঁচলে ছেলের রক্ত
মুছিয়ে দিতে দিতে বলে -- কেন গেলি বাবা ? কত রক্ত ঝরছে ,  একটি বার চোখ মেলে দেখ। কোনদিন তো পেট ভরে খেতেই পাস নি , রক্ত হবে কি করে ? যেটুকু ছিল সেটুকুও এভাবে ঝড়ে গেলে তুই বাঁচবি কি করে বাবা ?
তারপর ছেলের মাথাটা কোলে তুলে পাগলিনীর মতো  চিৎকার করে ওঠে। যে ঠাকুরকে নিয়ে কিছুক্ষণ আগেই তীব্র শ্লেষ ঝড়ে পড়েছিল তার গলায়। সেই গলাতেই এবার তীব্র আকুতি ঝড়ে পড়ে -- ঠাকুর তুমি একটি বারের জন্য চোখ খোল।একবার শুধু চেয়ে দেখ , যারা একদিন আমার দুধের শিশুকে একমুঠো ভাত খেতে দেয় নি , খাবারের থালা থেকে মেরেতুলে দিয়েছিলো।তারাই আজ আবার কেমন রক্ত ঝড়াচ্ছে দেখ।ঠাকুর আমাদের রক্তের কিকোন দাম নেই ? বলো ঠাকুর বলো বলো ? ছেলেকে আঁকড়ে সমানে একই কথা বলেই চলেঅন্নপূর্ণা। তার ওই আর্তি জমিদার বাড়ির দেওয়ালে দেওয়ালে যেন ঠোক্কর খেয়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফেরে।

         
        (   ক্রমশ   )

No comments:

Post a Comment