Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

ঠাকরুন মা -- ২৭ /


      


    ঠাকরুন মা 


            অর্ঘ্য ঘোষ 



   ( ধারাবাহিক উপন্যাস ) 


যোগনাথের কাছে খবর পেয়েই অল্পক্ষণের মধ্যে দুজন লোক নিয়ে ছুটতে ছুটতে এসে পৌঁছোন গোমস্তাকাকা। তারাই কাঁধাকাঁধি করে গৌরবকে হাসপাতালে নিয়ে যান। আর তারপরই ফের অন্নপূর্ণার মস্তিক বিকৃতির লক্ষণ আরও প্রকট হয়ে পড়ে।কখনও আপন মনে হো - হো করে হেসে ওঠে।কখনও বা কেঁদে ভাসায়।বাকি সময় অবোধ্য ভাষায় বিড়বিড় করে।নাওয়া -- খাওয়া সব শিকেয় ওঠে। বার বার তাকে নিজের বাড়ি নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেও বিফল হয়েছেন গোমস্তাকাকা।আর জল অচল বলে নিজের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার সাহস হয় নি যোগনাথের।তাই পালা করে দুবেলাই তার জন্যখাবার নিয়ে আসেন তারা। তবে যেদিন শ্রীমতী নিজে হাতে খাইয়ে দিয়ে যায় সেদিন খাওয়া হয় অন্নপূর্ণার। বাকি দিন সেই খাবার মুখেও তোলে না। ঢাকা দেওয়া পড়েই থাকে , কুকুর বিড়ালে খায়। নিঃশব্দে চোখের জল ফেলেন গোমস্তাকাকা আর যোগনাথ। অন্নপূর্ণাকে তো প্রথম থেকেই নিজের মেয়ের মতোই দেখে এসেছেন গোমস্তাকাকা। তাই যেদিকে জল পড়েছে সেদিকেই তিনি ছাতা হয়ে রক্ষা করেছেন তাকে। আর ঠাকরুনমাকে নিজের মায়ের মতোই ভালোবেসে ফেলেছে যোগনাথ।কিন্তু এখন অন্নপূর্ণাকে সান্ত্বনাটুকুও দিতে পারেন না তারা।কারণ ওই প্রসঙ্গ ধরেই সমানে বকা শুরু করে দেয় অন্নপূর্ণা। বেশি বকলেই অন্নপূর্ণার মাথার গোলমাল আরও বেড়ে যায়। এ যে কি যন্ত্রণার তা কাউকে বলে বোঝানোর নয়। গ্রামের অনেক মানুষ অবশ্য অন্নপূর্ণার এই বকবকানিতে বেশ মজাই পায়। নাগালের মধ্যে পেলে উল্টোপাল্টা কথা বলে তাকে উত্তেজিত করে তোলে।তখন অন্নপূর্ণাও সমানে বকে যায়।আর ততই মাথার অসুখটা বেড়ে যায় তার।বহরমপুর থেকে অন্নপূর্ণার জন্য মাথার গন্ডগোল সারানোর ওষুধ আনার কথা ভেবে রেখেছে গোমস্তাকাকা।হাসপাতাল থেকে গৌরব বাড়ি ফিরলেই ওষুধ আনতে যাবেন তিনি।এখন তো দুবেলাই তাকে হাসপাতাল ছুটতে হয়। বেশ কিছুদিন যমে মানুষে টানাটানির পর বাড়ি ফেরে গৌরব। কিন্তু ফেরে না তার মানসিক সুস্থতা।মায়ের মতো সেও পাগল হয়ে যায়।  ডাক্তাররা জানিয়েছেন , আঘাত জনিত কারণে মাথার স্পর্শকাতর স্নায়ু , শিরা-- উপশিরা ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ায় তার মানসিক সুস্থতা ফেরনো খুব দুঃসাধ্য। ওই কারণেই সে  সমস্ত পুরনো স্মৃতি হারিয়ে ফেলে। নিজের মাকেও পর্যন্ত চিনতে পারে না।মাও প্রায়শই ছেলেকে চিনতে পারে না।দুজনে শুধু পরস্পরের দিকে ভাবলেশহীন চোখে চেয়ে থাকে। ধীরে ধীরে দুজনের পরিচয় হারিয়ে যায়। গ্রামের মানুষের মুখে মুখে মা--ছেলের পরিচয় হয়ে দাঁড়ায় পাগলি আর পাগল। লোকের মুখে শুনে শুনে মা ছেলেকে বলে -- তুই তো একটা পাগল রে। ছেলেও মাকে ছেড়ে কথা বলে না। সে বলে, তুই পাগলি। তোদের সাত গুষ্টি পাগল।আর সেই দৃশ্য তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করে একদল মানুষ। দুজনকে নিরস্ত করার পরিবর্তে উসকে দিয়ে মজা দেখে তারা। খাবারের লোভ দেখিয়ে নানা কথা বলে দুজনকেই পরস্পরের বিরুদ্ধে তাতিয়ে তোলে। আর তাতেই মা--ছেলের চুলোচুলি বেঁধে যায়। হাততালি দিয়ে উঠে মানুষজন।কিন্তু খাবার দেয় না কেউ। মজা দেখা হলে একে একে গুটি গুটি পায়ে সরে যায় সবাই। 


                                     গোমস্তাকাকার কানে সব পৌঁছোয়। মা--ছেলের মধ্যে ওইভাবে ঝামেলা বাঁধিয়ে মজা দেখাটা কিছুতেই সহ্য করতে পারেন না তিনি। ইচ্ছে হয় গিয়ে আচ্ছা করে দু'কথা শুনিয়ে দিয়ে আসেন লোকগুলোকে। কিন্তু তা আর সম্ভব হয় না। জমিদার বাড়ির চলে যাওয়ার পর থেকে তার আর সেই মান্যতা নেই। তাই যোগনাথ যখন ওইসব দেখে উতলা হয়ে ছুটে আসে তখন খুব উদ্বেগ হয় তার। মা- ছেলের ওই তো অবস্থা।বিপদ আপদ একটা কিছু হয়ে গেলে কে দেখবে ওদের ?  গ্রামের মানুষ মজা দেখতেই জানে , সহানুভূতিশীল হয়ে পাশে দাঁড়াতে জানে না। সব পশুর অধম , না হলে কি মায়ের বিরুদ্ধে ছেলেকে তাতিয়ে দিয়ে মজা দেখে ? অন্নপূর্ণা আর গৌরব অবশ্য ওসবের ধার ধারে না। এক অর্থে মস্তিষ্ক বিকৃত হয়ে তাদের ভালোই হয়েছে। জগতের কোন কিছুতেই তাদের আর কিছু এসে যায় না। খাবার নিয়ে গিয়ে অধিকাংশ দিনই বাড়িতে মা-ছেলের দেখা মেলে না। তাই খাবার ঢাকা দিয়ে রেখে আসতে হয় গোমস্তাকাকা আর যোগনাথদের।মা -ছেলে তখন হয়তো বাসতলা মোড়ে মজার খোরাক যোগায়। তখন কেউ খাবার দিলে খায় , নিজের মনে গান গায় , হাসে। আবার কখনও খালি পেটেও দিব্যি থেকে যায়। থাকারও কোন ঠাই- ঠিকানা নেই। যে যেখানে পারে পড়ে থাকে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বাড়িটিও ভগ্নপ্রায় হয়ে পড়েছে। সেটি করায়ত্ত করার জন্য শেণ্য দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে অন্নপূর্ণার ভাসুররা। কিন্তু গোমস্তাকাকার জন্যই সেটা এখনও পেরে ওঠে নি। কিন্তু বাড়িটা ওইভাবে আর কতদিন আটকে রাখা সম্ভব হবে তা নিয়ে গোমস্তাকাকারই রীতিমতো সংশয় রয়েছে। অন্নপূর্ণার ভাসুররা বাড়িটা দখল করে নিতে পারেন বলে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি। কারণ বাড়িতে তো আর অন্নপূর্ণা থাকেই না। অধিকাংশ সময় বাসতলাতেই পড়ে থাকে তারা। যখন খিদেটা খুব চাগাড় দিয়ে ওঠে তখন বাসতলা মোড়ের খাবারের দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে মা আর ছেলে। দোকানদাররা সামান্য চাট্টি মুড়ি আর অবিক্রীত একটা বাসি চপের লোভ দেখিয়ে দু'জনকে দিয়ে বাসন মাজা -- দোকানঘর ঝাঁট দেওয়ার কাজ করিয়ে নেয়।একই দোকানে ওইভাবে কাজ করতে করতেও মা--ছেলের চুলোচুলি বেঁধে যায়। খাবারের ভাগ চলে যাওয়ার আশঙ্কায় এক--একদিন মাকে দোকানের দিকে ঘেঁষতেই দেয় না ছেলে। সেইসব দিন দূর থেকে দাঁড়িয়ে জুল জুল করে ছেলের খাওয়া দেখে মা। ওইভাবেই দিন কাটে মা - ছেলের। দোকানদারও সামান্য কিছু খাবারের বিনিময়ে হাজার কাজ করার বিনা পয়সার লোক পেয়ে চরম খুশী। তাই কাজ করিয়ে নেওয়ার জন্য মাঝেমধ্যে তারা  তোয়াজের করে ওদের। সেই কথা শুনে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে চলে অন্নপূর্ণা আর গৌরব। তার মাঝেই একদিন হঠাৎ করে উধাও হয়ে যায় গৌরব। বিভিন্ন জায়গায় খোঁজখবর করেও তার সন্ধান মেলে না।মনের সঙ্গে খুব দ্রুত শরীর ভাঙতে শুরু করে অন্নপূর্ণার।তার শরীর আর অত ধকল সয় না। তাই সবদিন কাজ করতে পারে না। কাজ না করলে দোকানদারা খাবারও দেয় না। কিন্তু পেট তো বাগ মানে না। তাই এক -এক দিন পেটের জ্বালায় দোকানে সাজিয়ে রাখা খাবার তুলে মুখে পুরে দেন। আর যাই কোথায় ? গরম খুন্তি নিয়ে শরীরে চেপে ধরে দোকানদার। যন্ত্রনায় ককিয়ে ওঠেন অন্নপূর্ণা। পৌশাচিক উল্লাসে ফেটে পড়ে দোকানদার আর তার কর্মীরা।এইরকম উল্লাস তাদের আগে হয়নি। ওইভাবে খাবারে মুখ দেওয়ার জন্য কুকুর-- বিড়ালের গায়ে  অনেক সময় গরম জল , ছ্যাঁকা দিয়েছে তারা।অবোধ প্রাণীগুলো যখন যন্ত্রনায় ককিয়েছে তখন মজা পেয়েছে। মানুষের যন্ত্রনাটা তাদের আরও মজা দেয়। অন্নপূর্ণাকে ওইভাবে যন্ত্রনায় কাতরাতে দেখে দোকানদার কর্মীদের উদ্দেশ্যে বলে ওঠে -- খবরদার , হারামজাদী মাগীকে আর দোকানের ধারে পাশে ঘেষতে দিবি না। মাগীর কাজ না করে বসে বসে খাওয়ার ধান্ধা।


                          অন্নপূর্ণা  অবশ্য সব ভুলে যায়। পরদিনই খাবারের লোভে ফের দোকানে হাজির হয়।শরীরের জ্বালা -- যন্ত্রণার চেয়ে পেটের জ্বালা যে অনেক বেশী। যেদিন কাজ করতে পারে সেদিন খাওয়া জোটে। যেদিন জোটে না সেদিন চুরি করে খেতে গিয়ে জোটে খুন্তি পোড়ার ছ্যাঁকা। দিনের পর দিন ওইভাবে ছ্যাঁকা খেতে খেতে সারা শরীরে দগদগে ঘা হয়ে যায়। এক ফোটাও ওষুধ জোটে না। তাই ঘা বেড়েই চলে। মশা-মাছির জ্বালায় যখন অসহ্য হয়ে পড়ে তখন বাসন মাজার ছাই ক্ষতস্থানে লেপে দেয়। একসময় জ্বালা যন্ত্রণার বোধও হারিয়ে যায়। বেশিরভাগ সময় বেঁহুশ হয়ে রাধারমণতলা কিম্বা কালী মন্দিরে পড়ে থাকে সে। জ্বরের ঘোরে দিনের পর দিন কেটে যায় অচেতন অবস্থায়। ঘোরের মধ্যে কখনও স্বামী কখনও বা ছেলেমেয়েদের সঙ্গে বিড় বিড় করে কথা বলে অন্নপূর্ণা। তার জ্বরতপ্ত কপাল যেন একটু মমতার স্পর্শ চায়। তাই কখনও বলে ওঠে, কণা মা এলি , একটু পাশে বস। হৈমন্তী লক্ষ্মী মা আমার কপালে একটু হাত বুলিয়ে দে। পরক্ষণেই সে চিৎকার করে বলে ওঠে, ঠাকুর তুমি বিচার করো। আমি বিচার চাই। চেতনা লুপ্ত হওয়ার আগে পর্যন্ত সে একই কথা বার বার বলেই যায়। তার সেই আর্তি যেন ঠাকুর মন্দিরে মাথা কুটে মরে। কোন আদালতেই বিচার মেলে না। শুধু বিচারের প্রতীক্ষায় কেটে যায় কত দুঃসহ দিন , কত বিনিদ্র রাত। কালের বিচার সভায় যেন গুমরে গুমরে ওঠে অন্নপূর্ণার আর্তি। অন্নপূর্ণার কষ্ট আর সইতে পারে না যোগনাথ।জাতপাতের ছুৎমার্গের কথা ভুলে ঠাকরুন মাকে একরকম জোর করেই নিজের বাড়িতে তুলে আনে সে। তার নিজেরই অভাবের সংসার। দিনমজুরীর আয়ে সবদিক সংকুলান হয় না বলে শ্রীমতীকেও একটা বাড়িতে ঝিগিরি করতে হয়।কিন্তু ঠাকুরুন মায়ের উদ্বৃত্ত চাপটা তাদের কাছে কোন চাপই মনে হয় না। শ্রীমতীও বলে , আমাদের নিজের বাবা-মা হলে কি ফেলে দিতে পারতাম ? আমাদের যদি জোটে, ঠাকরুন মায়েরও জুটবে। 
স্ত্রীর কথা শুনে স্বস্তি পায় যোগনাথ। এমনিতে অনেক বৌ'মা নিজের শ্বশুর শাশুড়িই দায় নিতে চায় না বলে শুনেছে সে। তাই শ্রীমতীকে কিছু না জানিয়েই ঠাকুরুনমাকে ঘরে আনার সময় তার মনে একটু দোলচল ছিল। সেটাই সে ব্যক্ত করে স্ত্রীর কাছে -- জানিস তো তুই কিছু বলবি বলে একটু ভয়ে ভয়েই ছিলাম। যে কষ্ট করে সংসার চালাতে হয় তোকে তা তো জানি।
--- তুমি কি গো ? সেদিন ঠাকরুনমাকে ভাত খাইয়ে দিতে দেখেও বোঝ নি , আমিও যে মনে মনে ওনার সেবা করতেই চাইছিলাম। 
--- সেই ভরসাতেই তো ওনাকে আনতে সাহস পেলাম রে।
সেই থেকেই জল অচল হাঁড়ির বাড়িতেই ঠাঁই হয় অন্নপূর্ণার। শ্রীমতী মায়ের মতোই তার সেবাযত্নের ভার তুলে নেয় নিজের কাঁধে। প্রতিদিন স্নান করানো , খাওয়ানো থেকে শুরু করে নারকেল তেল দিয়ে পরিপাটি করে চুল বেঁধে দেয় সে। যোগনাথের ছেলেমেয়েরাও ঠাকুমা-ঠাকুমা করে অস্থির করে তোলে ঠাকরুন মা'কে।বেশ সুখেই কেটে যাচ্ছিল দিনগুলো। আস্তে আস্তে স্বাভাবিকতা ফিরে পাচ্ছিল অন্নপূর্ণা। যোগনাথ--শ্রীমতীর সংসারে পরিবারেরই একজন হয়ে উঠেছিল সে। কিন্তু সেটা যেন সহ্য হয় না তার ভাসুরদের। স্বেচ্ছায় যোগনাথের ওইভাবে অন্নপূর্ণার দায়ভার নিজের কাঁধে তুলে নেওয়ার পিছনে অভিসন্ধির গন্ধ পায় তারা। তাই একদিন চড়াও হয় যোগনাথের বাড়িতে।


            ( ক্রমশ ) 

No comments:

Post a Comment