অন্তরালে
অর্ঘ্য ঘোষ
( ধারাবাহিক উপন্যাস )
সেই কথা ভাবতে ভাবতে বাড়ি পৌঁছোয়। মোটরবাইক থেকে নামতেই ফের অরুণদার ফোন। ফোনটা অন করতেই কথা নয় , যেন শ্লেষের তির তার কানের পর্দা ফুটো করে দেয়। অত্যন্ত কদর্য ভাষায় অরুণদা বলেন , তুমি তো দিনকে দিন মহা তালেবর হয়ে যাচ্ছ দেখছি। একটা খবরের জন্য কতবার ফোন করতে হয় তোমাকে ?
শ্লেষটা গায়ে মাখে না আর্য। বিনীত ভাবেই সে বলে , এই তো দাদা বাড়ি ফিরলাম। এবার লিখেই পাঠাচ্ছি।
----- দশ মিনিটের মধ্যেই যেন খবরটা এসে পৌঁছোয়। দেখো আর যেন আমাকে ফোন করতে হয় না।
---- ঠিক আছে দাদা আর ফোন করতে হবে না আপনাকে।
কথা শেষ করে সোমনাথকে ডেকে নিয়ে বসার ঘরে গিয়ে বসে আর্য। কাগজ পেন টেনে নিয়ে লিখতে বসার উপক্রম করতেই সোমনাথ জিজ্ঞেস করে --- দাদা , তখন যে বললে খবরটা করবে না ?
---- বলেছিলাম বটে , কিন্তু এখন কি করব ভেবে পাচ্ছি না। রহস্য করে বলে আর্য।
সেটা ধরতে পারে না সোমনাথ। তাই সে বলে ---- তবে যে অরুণদাকে বললে দশ মিনিটের মধ্যেই খবরটা পাঠাচ্ছ। লিখতেও বসলে। অথচ বলছ কি করব ভেবে পাচ্ছ না, কি ব্যাপার বলো তো তোমার ?
---- ওই যে বললাম কি করব ভেবে পাচ্ছি না।
---- ভেবে পাচ্ছি না বললে হবে ? তুমি খবরটা পাঠিয়ে দিলেই তো অফিস আমাকে ছবির জন্য তাড়া লাগাবে। তখন আমি তো আর দুম করে পাঠিয়ে দিতে পারব না । সব কিছু রেডি করার ব্যাপার আছে।
---- তা তুমি সব রেডি করে রাখই না। তারপর না হয় অফিস ফোন করলে ছবি পাঠিয়ে দেবে।
----- মানে ? খবরটা তাহলে করছ ?
---- আরে দেখই না কি হয় ?
তারপর আর সোমনাথকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে মন দিয়ে লিখতে শুরু করে আর্য। আর তা দেখে তার মুখের দিকে অবাক হয়ে চেয়ে থাকে সোমনাথ। মনে মনে ভাবে আচ্ছা লোক বটে। এই বলল খবর করব না , চাকরি ছেড়ে দেব। এখন বসের ধাঁতানি খেয়ে খবর লিখতে বসে গেল। অগত্যা সে'ও ছবি রেডি করতে শুরু করে দেয়।
দশ মিনিটের জায়গায় কুড়ি মিনিট অতিক্রান্ত হয়ে যায়। আর্যর ফোন বেজে ওঠে। অরুণদার নম্বর দেখে ফোন কেটে দেয় আর্য। নিজের দুঃসাহস দেখে নিজেই অবাক হয়ে যায় সে।দীর্ঘদিনের চাকরি জীবনে অরুণদা দুরের কথা , অফিসের কারও ফোন কেটে দেওয়ার কথা চরম সিদ্ধান্তটা নেওয়ার আগে ভাবতেও পারত না। আসলে মানুষ মরীয়া হয়ে গেলে বোধহয় এইরকমই হয়। তারপর থেকে ঘন ঘন ফোন আসতেই থাকে।
আর্য কখনও ফোন রিসিভ করে শুনতে পাচ্ছে না সেইরকম ভাব করে ' হ্যালো - হ্যালো ' বলে ফোন কেটে দেয়। আর তা দেখে অবাক হয়ে চেয়ে থাকে সোমনাথ। শেষে আর কৌতুহল চাপতে না পেরে সে বলেই ফেলে -- কি ব্যাপার দাদা , বারে বারে অফিসের ফোন কেটে দিচ্ছ কেন ? লেখা হয়ে গেলে খবরটা এবার পাঠিয়ে দাও। নাহলে তো আজ আর ছাপা হবে না।
--- হ্যা , এই যে দিই।
বলে লেখা কাগজটা ফ্যাক্স করে দেয়।সেটা দেখে সোমনাথ বলে , দাদা এত বড়ো খবরটা তুমি এক পাতায় সেরে দিলে?
---- লেখাটা পাঠাতে মন চাইছিল না। কিন্তু অফিসের চাপে পাঠাতেই হল। তাই এক পাতাতেই লিখে দিলাম।
---- কিন্তু দাদা লেখাটা তো তোমার অনেক আগেই হয়ে গিয়েছিল, তাহলে পাঠাতে এত দেরি করলে কেন?
আর্য কোন কথা বলে না। কাগজটা সোমনাথের দিকে এগিয়ে দেয়। সোমনাথ সেটা পড়তে থাকে। সেই সময় আবার ফোন আসে অরুণদার। এবারে ফোনটা ধরে আর্য বলে -- হ্যা দাদা , একটু দেরি হয়ে গেল। এবার পাঠিয়ে দিয়েছি দেখুন।
---- কই , ডেস্কে তো আসে নি বলল।
---- ডেস্কে নয় দাদা , আপনার নম্বরে পাঠিয়ে দিয়েছি।
--- আমার নম্বরে পাঠাতে গেলে কেন আবার ?
---- এটা একটা বিশেষ খবর তো , তাই সরাসরি আপনাকেই পাঠালাম।
---- খবরের বিশেষত্ব শেষ পর্যন্ত উপলব্ধি করতে পেরেছো তাহলে ? বেশ ধরো দেখি।
কিছুক্ষণ পরেই বাজখাঁই গলায় বলে ওঠেন -- হোয়ার্ট , এসবের মানে কি ?
---- দাদা কিছু মনে করবেন না। এছাড়া আমার আর কোন উপায় ছিল না। মিথ্যা খবর করে আর একজন নিরপরাধ মানুষকে বিচারের আগেই আমি সামাজিক শাস্তি দিতে পারব না। ক্ষমা করবেন।
ফোনটা কেটে দেয় আর্য। চাকরি জীবনে নিজের কথা বলা হয়ে যাওয়ার পর অন্যপক্ষকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ফোন কেটে দেওয়ার দুঃসাহসও এই প্রথম দেখাতে পারল সে। এতদিন তো সেই অধিকারটা একচেটিয়া ' বসদেরই 'ছিল। কথা বলতে বলতেই তারা হঠাৎ করে ফোন কেটে দিতেন। সৌজন্য বশত রাখছি বলার প্রয়োজনও মনে করতেন না। আর তারা ' হ্যালো - হ্যালো ' করে চেঁচিয়ে মরত। অথচ তাদের বিনীত ভাবে অনুমতি নেওয়ার মতো ' রাখছি ' বলে ফোন কাটতে হয়েছে।
এতক্ষণ অবাক হয়ে আর্যর কান্ড দেখছিল সোমনাথ। সেই সময় তারও ফোন বেজে ওঠে। সে
ফোনটা ধরে বলে --- হ্যা বলুন দাদা ?
ও প্রান্ত থেকে অরুণদা বলেন -- তুমি তো আর্যর সঙ্গে মনোহরপুর গিয়েছিলে ?
--- হ্যা দাদা গিয়েছিলাম।
--- খবরটা বিস্তারিত বলতে পারবে ?
--- পারব দাদা , কিন্তু আর্যদা না বললে তো কিছু বলতে পারব না। আপনি আর্যদাকে ফোন করে আমাকে বলতে বলুন তাহলে সব বলে দিচ্ছি।
ওই কথা শুনেই অরুণদা যেন হুংকার ছাড়েন --- হোয়ার্ট ? তোমাকে কে খাওয়ায় ? আর্য না আমরা ? আমাদের কথা না শুনে তুমি আর্যকে দেখাচ্ছ ? তোমার চাকরিটা আর থাকবে ?
--- কিছু মনে করবেন না দাদা , আপনারা আমাদের দয়া করে খাওয়ান না। আমরা খাটি খায়। আর আপনারাও আমাকে চাকরি দেন নি আর্যদাই আমাকে এ লাইনে নিয়ে এসেছেন। হাত ধরে কাজ শিখিয়েছেন। সেই আর্যদাই যেখানে থাকছে না , আপনি ভাবলেন কি করে সেখানে আমি চাকরি করব ? আমিও এখনই পদত্যাগ পত্র পাঠিয়ে দিচ্ছি।
ফোন কেটে দেয় সোমনাথও।
এতক্ষণ অবাক হয়ে সোমনাথের কথাবার্তা শুনছিল আর্য।
তার পদত্যাগপত্র পাওয়ার পর যে সোমনাথের কাছে অরুণদার ফোন আসবে সে সম্পর্কে সে নিশ্চিত ছিল। কিন্তু সে ভাবতে পারেনি সোমনাথ অরুণ মুখের উপর ওইসব কথা বলে দেবে। ভাবতে পারে নি তার দেখাদেখি সে'ও কাজে ইস্তফা দিয়ে দেবে। তবে এতে হাউসের যে কিছুই এসে যাবে না , কাল সকালেই তাদের জায়গায় ঢোকার জন্য অনেকেই হামলে পড়বে তা ভালো করেই জানে আর্য। কিন্তু নিজেদের বিবেকের কাছে তারা যে আপোষ করে নি সেই বার্তা দিতে পেরে মনে এক ধরণের প্রশান্তি লাভ করে সে। সোমনাথের জন্য গর্বে তার বুকটা ভরে যায়। সোমনাথকে সে'ই এই লাইনে এনেছিল। শুধুমাত্র সেই কৃতজ্ঞতা বশে আজকের দিনে কে অন্যের সেন্টিমেণ্টের কথা ভেবে চাকরি থেকে ইস্তফা দিতে পারে ?
সেই কথা ভেবেই মনোবল বেড়ে যায় তার। সে যখন ইস্তফাপত্রটা পাঠায় তখন লড়াইটা একা লড়তে হবে ভেবে কিছুটা হতাশ লেগেছিল। সোমনাথ তার সেই হতাশা কাটিয়ে দিল। তার লড়াইয়ে একজনকে অন্তত পাশে পাবে ভেবে মনটা খুশীতে ভরে ওঠে তার। সে তার দুই করতল পেতে ধরে , সোমনাথ এসে মিলিয়ে দেয় তার হাত। দু'জনেই আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ে। একে অন্যের হাত ধরেই কেটে যায় কয়েকটা নির্বাক মুহুর্ত। একসময় সেই নীরবতা ভেঙে সোমনাথ বলে , সবই তো বুঝলাম বস কিন্তু একটা ব্যাপার কিছুতেই মাথায় ঢুকছে না।
---- কি ব্যাপার ?
---- পদত্যাগপত্র লেখা তো তোমার অনেক আগেই হয়ে গিয়েছিল , তাহলে পাঠাতে এত দেরি করলে কেন? মনোহরপুরে তুমি যা রেগেছিলে আমি তো ভেবেছিলাম বাড়ি ফিরেই তুমি পদত্যাগপত্র লিখে পাঠিয়ে দেবে।
---- বাড়ি ফিরেই যদি পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দিতাম তাহলে হয়তো পদত্যাগ করাটাই বৃথা হয়ে যেত।
--- কেন দাদা ?
--- তাহলে হয়তো খবরটাই আটকাতে পারতাম না। শুধু শুধু আমাদের চাকরি ছাড়াই হত।
---- মানেটা ঠিক বুঝলাম না।
---- ধরো , আমি যদি বাড়ি ফিরেই খবর না পাঠিয়ে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দিতাম তাহলে হাউস অনেকটা সময় পেয়ে যেত। সংবাদ সংস্থা কিম্বা কোন ফ্রিলান্সারকে পাঠিয়ে ঠিক খবরটা সংগ্রহ করে নিত। কিন্তু যে সময় বিষয়টা ওরা জানতে পারল তখন ওদের মাথার চুল ছেঁড়া ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না। শেষ ভরসা ছিলে তুমি। কিন্তু তোমার কাছেও না শুনে হাল ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় ওরা।
আর্যর কথা শেষ হয় না। সোমনাথ টপাটপ তার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বলে -- জিও বস জিও। তোমার তুলনা হয় না।
আর্য সোমনাথকে বুকে জড়িয়ে ধরে। সে রাতে আর সোমনাথকে ছাড়ে না আর্য। পরদিন সকালেই মনোহরপুর যেতে হবে। তাছাড়া ভবিষৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনাও রয়েছে। তাদের হঠাৎ করে চাকরি ছাড়ার ব্যাপারটা কোন পরিবারই এখনও জানে না। আর্যর একমাত্র মেয়ে চৈতী আর স্ত্রী বৈশাখীকে নিয়ে ছোট্ট সংসার। চৈতী কলেজে পড়ে। বৈশাখী একটা নামী বেসরকারি স্কুলে পড়ায়। যা বেতন পায় তাতে হেসে খেলে চলে যাবে। তাই চাকরি ছেড়ে দিলেও তার পরিবার জলে পড়বে না।
সোমনাথের পরিবারও জলে পড়বে না।দুই ভাই আর বাবা-মাকে নিয়ে তাদেরও সম্পন্ন চাষি পরিবার। দাদা একা চাষবাস দেখাশোনা করতে হিমসিম খেয়ে যায়। তাই সোমনাথের চাকরি করাটা দাদার ছিল একেবারে না পচ্ছন্দের। সোমনাথ বলতে গেলে একরকম শখে পড়ে এই লাইনে এসেছিল। একটা খবর তুলতে গিয়ে সোমনাথের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল তার।
সেই থেকে ওই এলাকায় কোন কিছু হলে সোমনাথই তাকে জানাত। তারপর সোমনাথকে সে এই লাইনে টেনে আনে।
সেই হিসাবে চাকরি ছাড়ার খবরে তার পরিবারের লোকেরা খুশীই হবেন।বৈশাখীকে পরে একসময় বললেও কোন সমস্যা হবে না। তার মানসিক চাপ দেখে বৈশাখী নিজে থেকে কতদিন চাকরি ছেড়ে স্বাধীন ভাবে কিছু করার জন্য বলেছে।স্বাধীনভাবেই এবার কিছু করবে। ঠিক হয় ' দায়বদ্ধ ' নামে সাপ্তাহিক পত্রিকা বের করবে তারা। সে হবে সম্পাদক, আর প্রকাশক হবে সোমনাথ। সেই কাগজে তারা লিখবে মনোহপুরের খবরের অন্তরালে থাকা খবর। কথাটা ভাবতেই চাপ মুক্ত লাগে দু'জনের। অনেকদিন পর দু'জনের চোখে নেমে আসে নিটোল ঘুম।
( ক্রমশ )



No comments:
Post a Comment