অন্তরালে
অর্ঘ্য ঘোষ
( ধারাবাহিক উপন্যাস )
আর্যর উদ্বেগটা চোখ এড়ায় না সোমনাথের। তাই সে জিজ্ঞেস করে ---- অরুণদা কি বললেন ?
---- বলবেন আর কি ? বলার তো সেই একটাই কথা। খবরটা ডিটেলে কর , কাল তোমার নাম দিয়ে প্রথম পাতায় বেরোবে।
---- তুমি কি ঠিক করলে ?
---- খবরটা করব না।
---- তাহলে অফিস তোমাকে ছেড়ে দেবে ?
---- আমিই অফিস ছেড়ে দেব।
---- মানে , কি বলছ তুমি ?
---- দেখ , আমাদের এই কাজের কোন নিশ্চয়তা নেই। অনেকটা ভালোবাসার বিনি সুতোর মালার মতো। স্বীকার করলে আছে , না করলে নেই। যতদিন তোমাকে অফিসের প্রয়োজন হবে ততদিন সমস্ত কর্মক্ষমতা আর জীবনীশক্তি নিংড়ে নেবে , তারপর বিনা নোটিশে শুন্য হাতে বাড়ি পাঠিয়ে দেবে। তুমি কি করবে , কি খাবে তা নিয়ে বিন্দুমাত্রও মাথা ঘামাবে না। তুমি জানো ওইভাবে ছাঁটাই হয়ে কতজন মানসিক অবসাদের শিকার হয়ে গিয়েছেন ? কেউ বা আত্মহত্যা করছেন , কেউ বা মদে নিজেকে ডুবিয়ে দিয়েছেন।
---- কি বলছো তুমি দাদা ?
---- ঠিকই বলছি। অথচ একদিন ওইসব সাংবাদিক , চিত্র সাংবাদিকরা অফিসের জন্য জান লড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু তাদের কাজের কোন মুল্যায়নই হয় নি।
গ্রামাঞ্চলে 'লাগিরে মুনিস ' বলে একটা কথা চালু আছে। ' লাগিরে মুনিসে'রা নির্ধারিত মালিকের বাড়ি ছাড়া অন্য কোথাও কাজ করতে পারে না। কিন্তু মালিক ইচ্ছা করলে তাকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে নিয়োগ করতে পারে। আমরা আসলে সেই ' লাগিরে মুনিসে'রই সামিল।
---- তা যা বলেছো দাদা। সব সময় একটা আশঙ্কায় থাকি। এই বুঝি কাজ গেল , ভেবে ভেবে রাতে ঘুমোতে পারি না।
---- অধিকাংশ মিডিয়া হাউসেই অফিসে যারা কাজ করেন তাদের তুলনায় জেলাতে যারা কাজ করেন তাদের বেতনই শুধু নয় , কাজের স্থায়িত্বও অনেক কম। সব থেকে বিড়ম্বনার ব্যাপার কি জানো ?
---- কি দাদা ?
---- এত কিছু করার পরেও জেলায় যখন প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী বা কোন ভি,আই, পি আসেন তখন আর সারা বছর জেলায় কাজ করা সাংবাদিক এবং চিত্র সাংবাদিকদের কোন গুরুত্বই থাকে না। তখন অফিস থেকে লোক আসে ওইসব খবর কভার করার জন্য। আর তাদের মোসাহেবি করা কিম্বা ঠেকে বসে মাইকে ওইসব অনুষ্ঠানের ধারাভাষ্য শুনতে হয় জেলার সাংবাদিক কিম্বা চিত্রসাংবাদিকদের। অফিস থেকে আসা ওইসব লোকেদের আসা-যাওয়ার পিছনে একদিনে যা খরচ হয় তা জেলার অনেক সাংবাদিক চিত্র সাংবাদিকরা এক মাস কাজ করেও পান কিনা সন্দেহ আছে। তারপরে তো ঘাড় ধাক্কার ব্যাপারটা আছেই।
--- একদম খাঁটি কথা।
---- তাই আমি ঠিক করেছি অফিস তাড়ানোর আগেই আমি কাজে ইস্তফা দেব। তাহলে অন্তত মনে একটু সান্ত্বনা পাব। আমার সিদ্ধান্ত আমি তোমার উপরে চাপিয়ে দিতে চাই না।
তোমার কাছে শুধু একটাই অনুরোধ , তুমি আজকের খবরটার বিষয়ে অফিসকে কোন তথ্য দেবে না। ফোন করলে বলবে , তুমি কোন তথ্য নাও নি। আমি অন্তত একটা মিথ্যা খরব প্রকাশ রুখতে চাই। আমরা না দিলে এই খবর আর অফিসের পক্ষে পাওয়া সম্ভব নয়। কারণ সংবাদ সংস্থা বা অন্য কোন সংবাদ মাধ্যম খবরটা জানেই না।
---- তা নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। আমাকে অফিস ফোন করলে সে যা বলার আমি বলে দেব। কিন্তু এই বয়সে কাজ ছেড়ে করবে কি ?
--- দেখ এতদিন ওই চিন্তাটার জন্যই কিছু করতে পারি নি। কিন্তু বিশ্বাস কর আমি আর মানসিক চাপ নিতে পারছি না। তাই ওই চক্কর থেকে বেড়িয়ে আসতে চাই। যাই করি না কেন , গোলামির সাংবাদিকতা আর করব না। যদি পারি নিজে স্বাধীনভাবে সাপ্তাহিক কাগজ বের করব।জানি তাতে পেট ভরানোর কোন নিশ্চয়তা নেই।তবে মন তো ভরবে। বেশ এনিয়ে পরে কথা হবে। এখন চলো আরতির সঙ্গে একটু কথা বলে আসি। তুমি কিন্তু তার সঙ্গে যা
কথাবার্তা হবে তা ভিডিও রেকর্ডিং করে নেবে।
--- বেশ দাদা চলো।
খুঁজে খুঁজে তারা যখন আরতির বাড়িতে পৌঁছোয় তখন সে খেতে বসেছে। তাদের দেখে শশব্যস্ত হয়ে খাওয়া ছেড়ে ওঠার উপক্রম করতেই আর্য বলে , ব্যস্ত হতে হবে না , আপনি খেয়ে নিন তারপর কথা হবে। বলেই ইশারায় সোমনাথকে ভিডিও ক্যামেরা অন করতে বলে আর্য। সোমনাথও ইশারায় বুঝিয়ে দেয় সে ইতিমধ্যেই তা করে ফেলেছে। আরতি খাওয়া শেষ করে উঠতেই আর্য প্রশ্ন শুরু করে -- আচ্ছা আসল ব্যাপারটা কি বলুন তো ?
---- কি আসল ব্যাপার ?
---- এই যে একের পর এক আপনি শ্লীলতাহানি আর ধর্ষণের অভিযোগ করে চলেছেন সেই ব্যাপার ---।
---- সে যা বলার পুলিশকে বলে দিয়েছি। আপনারা পুলিশের কাছে থেকেই জেনে নিন।
আর্য বুঝতে পারে আরতির গলাতে আসলে প্রসাদ মোড়লরা কথা বলছে। তাই সে মোলায়েম করে
বলে -- দেখুন অভিযোগটা সত্যি না মিথ্যা তা কিন্তু উপর থেকে একজন দেখছেন। তার কাছে ফাঁকি চলে না। আপনার মিথ্যা অভিযোগে কোন নিরপরাধ লোক যদি শাস্তি পায় তাহলে ভগবান আপনাকে ক্ষমা করবে না।
কিন্তু যদি অপরাধ স্বীকার করেন তাহলে তার ক্ষমা পেলেও পেতে পারেন।সেই কথা শুনে কিছুক্ষণ গুম মেরে থাকে আরতি।ভাবভঙ্গি দেখে মনে হয় তার মনের মধ্যে পাপ পুণ্যের টানাপোড়ন শুরু হয়েছে। সেই সুযোগটা কাজে লাগাতে তৎপর হয় আর্য।গলাটা একটু নামিয়ে সে বলে , কেউ জানবে না। আপনি নির্ভয়ে সত্যিটা বলতে পারেন।আমরা সব রকম ভাবে আপনার পাশে থাকব।
সেই কথা শোনার পর নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না আরতি।কান্নায় ভেঙে পড়ে সে।কাঁদতে কাঁদতেই বলে , মিথ্যা বলার শাস্তি আমার শুরু হয়ে গিয়েছে। বুকের ছবি করাতে গিয়ে প্রিয়কে মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসানোর শাস্তি ভগবান আমাকে দিয়ে দিয়েছেন। বুকে রাজরোগ বাসা বেঁধেছে। প্রতিদিন মুখ দিয়ে রক্ত ওঠে। মরে তো যেতেই হবে , আর আমি কাউকে ভয় করি না। যাওয়ার আগে সব কথা জানিয়ে দিয়ে যাব।
--- কাকে ভয় করার কথা বলেছেন আপনি ?
---- কাকে আবার ? ওই যে আমার শনি ভবানী ডাক্তার আবার কে ? বিধবা হয়ে এসে পেটের দায়ে ওর বাড়িতে ঝিগিরি করতে ঢুকেছিলাম। সেটাই আমার কাল হয়। জেলে তো ওর যাওয়ার কথা। ও'ই তো আমার সব লুটেপুটে নিয়েছে। পেটের দায়ে সব মুখ বুজে সয়ে নিয়েছি। পেটের দায়েই ওর কথা মতো ভগবানের মতো মানুষকে মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসিয়েছি। আমার নরকেও ঠাঁই হবে না।
দু'হাত দিয়ে কপাল চাপড়াতে থাকে আরতি। তাকে সামলে ওঠার জন্য কিছুক্ষণ সময় দিয়ে আর্য ফের প্রশ্ন করে --- ডাক্তারবাবুকেও কি সেই একই কারণে মিথ্যা অভিযোগ ফাঁসিয়েছ ?
--- সেই কারণ তো বটেই। ওরা ভয় দেখাচ্ছিল ওদের কথা মতো না চললে প্রিয়র নামে মিথ্যা অভিযোগের কথাটা পুলিশকে বলে দেবে। তখন আমাকে সারাজীবন জেলে পচে মরতে হবে। সেই ভয়েই তো দেবতুল্য ডাক্তারবাবুর বিরুদ্ধেও মিথ্যা অভিযোগ করতে হল।
---- এখন বুঝতে পারছেন কত বড়ো অন্যায় কাজ আপনি করেছেন।
---- কি পাপ যে করেছি তা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। রাতে ঘুমোতে পারি না। মনে হচ্ছে এ পাপের প্রায়চিত্তও হয় না।
---- প্রায়চিত্তের সুযোগ পেলে করবেন ?
----- নিশ্চয়। বলুন কি করতে হবে ? কি করলে আমার পাপমোচন হবে ?
---- পুলিশের কাছে , আদালত দাঁড়িয়ে সত্যিটা বলতে পারবেন ?
--- হ্যা পারব। আমাকে সেই সুযোগটা করে দিন। আমি মরার আগে প্রায়চিত্ত করে যেতে চাই।
---- তাহলে যে ভবানী ডাক্তারের বাড়িতে আর আপনার কাজ থাকবে না।
---- আমি এমনিতেই কাল থেকে আর ওদের বাড়িতে কাজ করব না ঠিক করেছি।
---- তাহলে আপনার চলবে কি করে ?
---- অন্য কোথাও কাজ খুঁজব। তবে এরপর কেউ আর আমাকে বিশ্বাস করে কাজ দেবে বলে মনে হয় না। না দিলে ভিক্ষা করব , কিন্তু ভবানীডাক্তারের বাড়ি আর যাব না। তাহলে ও আবার কাউকে ফাঁসাতে আমাকে টোপ হিসাবে ব্যবহার করবে।
----- মিথ্যা অভিযোগ করার জন্য যদি আপনার জেল হয়ে যায়।
----- খাটব জেল। তবু তো জানব পাপ করেছিলাম, তার প্রায়চিত্ত করছি। আর আমি বিবেক দংশন সহ্য করতে পারছি না।
---- বেশ আমরা সব কথা থানার বড়বাবুকে গিয়ে বলব। উনিই আপনার প্রায়চিত্তের ব্যবস্থা করবেন।
বলে পকেট থেকে একটা পাঁচাশো টাকার নোট বের করে ধরে আর্য বলে , এটা আপাতত রাখুন। তারপর বড়বাবুকে বলে থানা ব্যারাকেই কোন একটা কাজের ব্যবস্থা হয় কিনা দেখছি। কাজ চলে গেলে পেট তো মানবে না।
টাকাটা হাতে নিয়েই কেঁদে ফেলে আরতি। কাঁদতে কাঁদতেই সে বলে , এতদিন যাদের বাড়িতে কাজ করেছি তারা আপদ বিপদে মাথা খুঁড়লেও একসঙ্গে এতটাকা আমার হাতে তুলে দিতে পারে নি। আর আপনারা শুধু শুধু এতগুলো টাকা আমার হাতে তুলে দিলেন ? এতদিন আমি শয়তানের সঙ্গে ছিলাম। আজ সত্যিকারের মানুষের দেখা পেলাম। বলে টাকাটা কপালে ঠেকিয়ে বলে , দেখবেন ভগবান আপনাদের মঙ্গল করবেন।
---- ঠিক আছে আজ আমরা আসি। পরে আবার আসব।
আরতির বাড়ি থেকে আসে ওরা। সোমনাথ জিজ্ঞেস করে -- এবার কোথাই যাবে দাদা ?
---- চলো আজকের মতো ফেরা যাক। বাড়িতে গিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করি।
--- সেই ভালো।
বাড়ি অভিমুখে রওনা দেয় তারা। আসতে আসতে আরতির কথাই ভাবছিল আর্য। আরতির মুখে বিবেক দংশনের কথা শুনে তখন কিছুটা আশ্চর্যই হয়েছিল সে।বিবেকের দংশনও তো তারও হচ্ছে। একজন গৃহপরিচারিকা হয়েও আরতি যদি বিবেক দংশনের তাড়নায় প্রায়চিত্তের কথা ভাবতে পারে তাহলে সে'ই বা কেন পারবে না ? সে'ও তো ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও প্রিয় এবং তার পরিবারের সঙ্গে যা করছে তা'ও পাপেরই নামান্তর। তাই সে'ও মনে মনে প্রায়চিত্ত করার প্রতিজ্ঞা করে।



No comments:
Post a Comment