অন্তরালে
অর্ঘ্য ঘোষ
( ধারাবাহিক উপন্যাস )
একটু আড়ালে সরে গিয়ে দাঁড়ায়। সেখানে গিয়ে মানুষের কৌতুহল থেকে পালাতে পারলেও নিজের কাছে থেকে পালাতে পারে না সে।প্রিয়র কথাগুলো তার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে। প্রিয়র ওই অবস্থার জন্য পরোক্ষে নিজেকেই দায়ি মনে হয় তার। কারণ ডাক্তার নিয়োগের দাবির আন্দোলনকে কেন্দ্র করে তার হাত ধরে এই গ্রামে প্রথম মিডিয়ার পদার্পণ ঘটে। তার আগে অন্যান্য গ্রামের মতো এই গ্রামেও মিডিয়ার তেমন গুরুত্ব ছিল না। ডাক্তার নিয়োগের আন্দোলনে গ্রামবাসীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সেই তো সংবাদ মাধ্যমকে নিয়ে এসেছিল গ্রামে।
না হলে হয়তো প্রিয়র ঘটনাটার কথা সংবাদ মাধ্যমের কানেই পৌঁচ্ছোত না। তাহলে সামাজিক শাস্তিটা অন্তত তাকে ভোগ করতে হত না। ওইসব কথা ভাবতে গিয়েই আর্যর নিজেরই কেমন যেন পাগল-পাগল লাগে। তার আচরণ দেখে অবাক হয়ে যায় সোমনাথ। প্রিয়র ঘটনার সময় সে ছিল না। পরে কাজে এসেছে। তাই চায়ের দোকান থেকে আর্যর ওইভাবে পালিয়ে আসার কোন ব্যাখ্যা খুঁজে পায় না সে। আর্যকে জিজ্ঞাসা করে , কি ব্যাপার দাদা লোকটাকে এড়িয়ে পালিয়ে এলে কেন ? তুমি তো পালিয়ে আসার লোক নও।
---- শুধু আজই নয় আর লোকটার কাছ থেকেও নয়। গত একবছর থেকে আমি নিজের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়ানোর চেষ্টা করছি। কিন্তু কিছুতেই পালাতে পারছি না।
--- কে দাদা লোকটা ?
--- ওরই নাম প্রিয়। ওর কথা তো তোমাকে বলেছি।
--- ওঃ দাদা , কি প্যাথেটিক ব্যাপার। দেখে তো মনে হচ্ছে লোকটা পুরোপুরি পাগল হয়ে গিয়েছে।
--- হ্যা। তার জন্য আমরা সংবাদ মাধ্যম কিছুটাও হলেও দায়ি। সেই অপরাধ বোধের জন্যই আমি পালিয়ে বেড়াই।
---- এতে তোমার কি অপরাধ দাদা ?
--- অপরাধ নেই ? দেখ লোকটা সেই সময়ই নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করে ছিল। আমাদের কাছে হাতজোড় করে দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত খবর করা থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানিয়েছিল। আমরা কেউ তার কথা কানে তুলি নি। তার গায়ে কলমের খোঁচায় দাগ কেটে দিয়েছিলাম। আজ লোকটা বেকসুর খালাস হয়ে ফিরে এসেছে। আমরা কি আর সেই দাগটা মুছে দিতে পারব ? লোকটার মনে তো সেই দাগটাই দিনরাত আঁচড় কেটে চলেছে।
--- দাদা, বেকসুর খালাস পাওয়াকে কেন্দ্র করে পাল্টা একটা খবর করা যায় না ?
--- তা হয়তো যায়। তবে সে খবর অফিস ছাপবে কিনা সন্দেহ আছে। কারণ সে ক্ষেত্রে তাদেরও তো মুখ পুড়বে।সচেতন পাঠক প্রশ্ন তুলতে পারে তাহলে দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত খবরটা করা হল কেন ? তাছাড়া ধর্ষণ - শ্লীলতাহানির খবর যতটা গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হয় , বেকসুর খালাস পাওয়ার খবর তত গুরুত্ব পাবে না। বেশিরভাগ পাঠক ধর্ষণ - শ্লীলতাহানি খরব গিলে খায়। কিন্তু কে কোথাই খালাস পেল তার খবরে তেমন কোন আগ্রহই থাকে না।
--- যা বলেছ দাদা , ওইসব খবর যেদিন থাকে সেদিন অন্যদিনের তুলনায় কাগজের বিক্রি অনেক বেড়ে যায়।
---- এক শ্রেণীর পাঠকের রুচি বিকৃতির সুযোগ নিয়ে মিডিয়া হাউসগুলি ভালো রকম ব্যবসা চালিয়ে যাছে। এই রুচি বিকৃতি ঘটানোর দায়ও আমরা অস্বীকার করতে পারি না।
--- ঠিক বলেছো দাদা।
---- আসলে আমরা এখন পাঠকদের খবর পড়ায় না , খবর খাওয়ায়। বড়ো বড়ো কোম্পানীগুলো তাদের সংস্থার উৎপাদিত পণ্য যেমন রংচঙে মোড়কে বাজারে ছাড়ে , আমরাও তেমনি রংচঙে হেডিং দিয়ে খবর ছাপি। কি সব হেডিং! ' শিশুর যৌনাঙ্গ ব্লেড দিয়ে চিঁড়ে ধর্ষণ' কিম্বা ' যুবতীর যৌনাঙ্গে বাঁশ'। যৌনগন্ধী ওইসব খবর পড়ার জন্য পাঠক হামলে পড়ে। তাই আমরাও ওই ধরণের খবর খুঁজি। অনায়াসেই লিখে দিই ' দু'বছরের শিশুকে ধর্ষণ, প্রৌঢ় শিক্ষকের ' কিম্বা 'পড়শি কিশোরীকে ফুঁসলে উধাও কিশোর। ' থানায় একটা অভিযোগ হলেই হল।
দু'বছরের শিশুকে আদৌ কোন প্রৌঢ়ের দ্বারা ধর্ষণ সম্ভবপর কিনা তা খতিয়ে দেখি না। খতিয়ে দেখি না কিশোরীকে ফুঁসলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে না , দু'জনে স্বেচ্ছায় ভালোবেসে ঘর ছেড়েছে। পরিস্থিতির চাপে আমাকেও ওইসব খবর করতে হয়। কিন্তু বিশ্বাস কর , খুব বিবেক দংশন হয়।
---- দাদা সবাই যদি তোমার মতো ভাবত তাহলে হয়তো সংবাদ মাধ্যম এত দেউলিয়া হয়ে পড়ত না।
আর্যর আর কোন প্রত্যুত্তর দেওয়া হয় না। সেই সময় হাসপাতালে এসে পৌঁছোয় পুলিশের জীপ। কিছুক্ষণের মধ্যেই ডাক্তারবাবু আর আরতিকে তুলে নিয়ে থানার দিকে রওনা দেয় তারা। জীপের পিছনে পিছনে প্রসাদ মোড়লরাও মোটরবাইক হাঁকায়। সেটা লক্ষ্য করেই আর্য সোমনাথকে বলে , এখানে দাঁড়িয়ে থেকে আর লাভ নেই , চলো আমরাও থানায় যায়।
তারাও মোটরবাইকে থানা অভিমুখে রওনা দেয়। তারা থানায় পৌঁছোতে না পৌঁছোতেই অভিযোগ লিখিয়ে আরতিকে নিয়ে বেরিয়ে যায় প্রসাদ মোড়লরা।
আর অনুমতি নিয়ে ওসির ঘরে ঢোকে তারা। পরিচয় দিতেই ওসি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলেন , আরে আসুন আসুন। বসুন, কি বলব চা না কফি?
প্রথম দর্শনেই ওসিকে ভালোমানুষ বলেই মনে হয় আর্যর। নতুন এসেছেন থানায়। নাম প্রণব সেন। ইয়াং আর স্মার্ট ছেলে। আলাপ - পরিচয়ের পর চা খেতে খেতে আর্য জিজ্ঞেস করে -- ডাক্তারবাবুকে গ্রেফতার দেখাচ্ছেন আপনারা ?
--- হ্যা , কেন বলুন তো ?
--- আমার মনে হয় ডাক্তারবাবুকে পরিকল্পিত ভাবে ফাঁসানো হচ্ছে। কারণ ওই মহিলা এর আগেও হাসপাতালের এক কর্মীর বিরুদ্ধে একই অভিযোগ এনেছিলেন। সেই কর্মী বেকসুর খালাস পেয়েছেন। কিন্তু মস্তিক বিকৃতির শিকার হয়ে চাকরি খুঁইয়েছেন।
---- তাই ? এ কথা তো জানা ছিল না।
---- আমার মনে হয় কারও পেশাগত স্বার্থে ঘা লাগছে বলেই এইভাবে একই অভিযোগে একের পর এক হাসপাতালের ডাক্তার এবং কর্মীকে ফাঁসানো হয়েছে।
---- অদ্ভুত ব্যাপার তো ?
---- সেই জন্যই বলছি যদি কোনও ভাবে ডাক্তারবাবুর গ্রেফতারিটা এড়ানো যেত তাহলে খুব ভালো হত।
---- বিশ্বাস করুন তাহলে আমিও খুব খুশী হতাম। কিন্তু অভিযোগ লেখা হয়ে গিয়েছে। বোঝেনই তো সব , এরপর যদি গ্রেফতার না করি তাহলে নানা মহল থেকে চাপ আসতে শুরু করবে। এসব ক্ষেত্রে খুব পলিটিকাল প্রেসার থাকে। তার উপরে শুনলাম অভিযোগ লেখাতে প্রসাদ মন্ডল নামে যিনি ওই মহিলার সঙ্গে এসেছিলেন তিনি নাকি শাসক দলের নেতা।
--- তাহলে কিছুই করার নেই বলছেন ?
--- প্লিজ কিছু মনে করবেন না। বুঝতেই তো পারছেন সব। তবে আপনাকে কথা দিচ্ছি , আমি নিজে এই অভিযোগের তদন্ত করব। যদি দেখি অভিযোগ মিথ্যা তাহলে যত শীঘ্র সম্ভব ডাক্তারবাবু যাতে জামিন পান তার ব্যবস্থা করব।
---- আর আমিও যদি সেই তদন্তে আপনাকে সাহায্য করি ?
---- তা হলে তো খুব ভালো হয়।
---- বেশ আমি চেষ্টা করব। এখন আমরা আসি।
ওসিকে নমস্কার জানিয়ে থানা থেকে বেরিয়ে আসে তারা। আর্যর মনে হয় ওসি ঠিক কথাই বলেছেন। এইসব ক্ষেত্রে অভিযোগ লেখানো হয়ে গেলে অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা ছাড়া কোন গত্যন্তর থাকে না। তারাই তো কত সময় অভিযোগ লেখার পর অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা নাহলে ওসিকে ফোন করে তিতিবিরক্ত করে তোলে।থানা থেকে বেরোতেই ফোন বেজে ওঠে আর্যর। স্কিনেই দেখতে পায় অরুণদার ফোন। ফোনটা যে আসতে পারে সেই আন্দাজ তার ছিল।সন্ধ্যা গড়াতে চলল, অথচ খবর পৌঁছোল না দেখেই যে অরুণদা ফোন করেছেন তা বুঝতে অসুবিধা হয় না তার। তাই ফোনটা অন করে বলে --- হ্যা, দাদা বলুন।
ফোনের অন্য প্রান্ত থেকে ভেসে আসে অরুণদার ভারিক্কী গলা - বলছি খবরটা কি এখনও তোলা হয় নি ? কই পাঠালে না তো ?
---- দাদা অভিযোগটা মনে হচ্ছে সাজানো।
---- সে তো তোমার আগেও মনে হয়েছিল।
---- হ্যা দাদা , সেই ধারণাটা আমার ভুল ছিল না। সেই অভিযুক্ত বেকসুর খালাস পেয়েছে।
---- তো ! কি হয়েছে ? দিনে এ রকম কত অভিযুক্ত খালাস হয় , তা দেখে আমাদের কি লাভ ?
---- বলছি দাদা ডাক্তারবাবুর খবরটা না করে যদি বেকসুর খালাস পাওয়ার খবরটা করি তাহলে কেমন হয় ?
----- একদম বাজে হবে।
----- কি বলছেন দাদা ? খবরটা হলে ওর পরিবারের লোকেরা একটু সান্ত্বনা পায়। মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসানোর কথাটা লোকে জানতে পারে।
---- তুমি এতদিন কাগজে কাজ করছ কিন্তু তোমার এখনও নাবালকত্ব ঘোচে নি। তোমার ওই বেকসুর খালাস পাওয়ার খবর পড়া দূরে থাক, কেউ চোখ বুলিয়েও দেখবে না। কিন্তু 'রোগিণীর শ্লীলতাহানির অভিযোগে ডাক্তার গ্রেফতার ' হেডিং দেখেই পাঠক হামলে পড়বে, সেই খেয়াল আছে ? তাই উল্টোপাল্টা চিন্তা ছেড়ে ওই খবরটা তাড়াতাড়ি করে পাঠাও। প্রথম পাতায় তোমার নামে খবরটা ছাপা হবে। প্রথম পাতায় নাম দিয়ে খরব বেরনোটা কম কথা নয়।
তারপরই আর্যকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে আচমকা ফোন কেটে দেন অরুণদা। আর ফোন হাতে ধরে চরম দোলাচলে পড়ে যায় আর্য। কি করবে সে ? ডাক্তারবাবুকে খবর না করার কথা দিয়েছে। শুধুই কি আশ্বাস ? আর একজন নিরপরাধ মানুষের গায়ে ওইভাবে কালি লেপে দিতে সে কিছুতেই পারবে না। কিন্তু অফিসও তাকে ছাড়বে না। চাপ দিয়ে খবরটা করাতে বাধ্য করবে। অরুণদা তো বলেই দিলেন খবরটা তার নাম দিয়ে প্রথম পাতায় ছাপা হবে।
যেহেতু সে খবরটা না করার স্বপক্ষে যুক্তি খাড়া করেছে তাই অরুণদা তাকে সবক শেখাতেই জেদের বসে কাজটা করবেন। তারই জেরে আরও একটা অপরাধ বোধ তার ঘাড়ে চেপে বসবে। তাই শেষ পর্যন্ত চরম সিদ্ধান্তটাই নিতে হয় আর্যকে।
( ক্রমশ )



No comments:
Post a Comment