Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

অন্তরালে -- ৬৩





         অন্তরালে 



                    অর্ঘ্য ঘোষ 



     ( ধারাবাহিক উপন্যাস ) 





প্রিয়র মতোই ময়ূখকেও টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে সেই গাছে বেঁধে ফেলে। শুরু হয়ে যায় মারধোর। রক্তাক্ত হয়ে ওঠে ময়ূখের সারা শরীর।দাঁতে দাঁত চেপে যন্ত্রণা সয়ে দুহাতে মুখ ঢেকে বসে থাকেন তিনি।মুহুর্তের মধ্যে খবরটা ছড়িয়ে পড়ে।দলে দলে লোকজন ভীড় জমায় হাসপাতাল চত্বরে। লোকজন দেখে আরতি সমানে আগের মতোই ছেঁড়া ব্লাউজ দেখিয়ে মরা কান্না জুড়ে দেয়। কান্নার বহর দেখে তার অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে মানুষের মনে সন্দেহ দেখা দেয়। বার বার একই অভিযোগ বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না তাদের।কিন্তু মুখ ফুটে কেউ কিছু বলতেও পারে না। কারণ ঘটনার পিছনে অনুঘটক হয়ে কে কলকাঠি নাড়ছে তা আন্দাজ করতে অসুবিধা হয় না তাদের। প্রসাদ মোড়লরাই যে নাটের গুরু তা তাদের হাবভাবই প্রমাণ করে দেয়। একের পর এক ওই তো পুলিশকে ফোন করছে। ফোন করছে স্বাস্থ্য দফতরে। সব চেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হল , আরতির চিৎকার শুনে দুটি ক্ষেত্রেই প্রসাদ মোড়লরাই সবার আগে ছুটে আসে। তা থেকেই অনেকেরই মনে হয় ঘটনাটা যে ঘটবে সেটা ওদের জানাই ছিল।কিন্তু রাজনৈতিক আক্রোশের বলি হওয়ার আশঙ্কায় কেউ মুখ ফুটে কিছু বলতে পারে না। সবাই নিরাপদ দুরত্বে দাঁড়িয়ে আরও একজন নিরপরাধ মানুষের হেনস্থা প্রত্যক্ষ করে। চড় থাপ্পড় চলতেই থাকে। মারের চোটে মুখ চোখ ফুলে যায় ময়ূখেরও।সেইসময় অন্যান্য দিনের মতো সেখানে এসে পৌঁছোয় প্রিয়। ডাক্তারবাবুকে ওই অবস্থায় দেখে তার মাথার মধ্যে যেন বিদ্যুৎ খেলে যায়। দু'হাত দিয়ে মাথা চেপে সেখানেই বসে পড়ে সে। কিছুক্ষণ পরআস্তে আস্তে ময়ূখের কাছে উঠে গিয়ে তার রক্তাক্ত কপালে আঙুল ছুঁইয়ে বলে ওঠে -- ডাক্তারবাবু আপনারও তো দেখছি কপালে দাগ লেগে গেল। এবার কি করে মুছবেন মুছুন। দাগ বড়ো সাংঘাতিক জিনিস। একবার লাগলে আর সহজে ওঠে না। আমারও সেই সময় নেই যে মুছে দেব। এখনও কত দাগ তোলা বাকি পড়ে রয়েছে ,  যাই দেখি। 
বলে সরে গিয়ে কাগজ কুড়িয়ে নিয়ে দেওয়ালে ঘষে ঘষে দাগ তুলতে শুরু করে দেয়। সেটা দেখে প্রসাদ মোড়ল টিপ্পনী ছুড়ে দেয় -- পাগল আর কাকে বলে। 
ভবানী ডাক্তার বলে ,  যা বলছেন মাইরি। স্বাস্থ্য দফতর একটা বিনা পয়সার ঝাড়ুদার পেয়েছে ভালো।
খবরটা আর্যর কাছেও পৌঁছোয়। আর্য তখন সবে প্রেসকর্ণার থেকে ফিরে হাত মুখ ধুয়ে ঘরে ঢুকেছে কি ঢোকে নি , সেই সময় ফটোগ্রাফার সোমনাথের ফোন। ফোনটা ' অন ' করতেই সোমনাথ বলে ওঠে -- দাদা  ' কেটে খা ' ফোন করেছিলেন। তোমাকে নাকি ফোনে পাচ্ছেন না।




                    সোমনাথের কথা শুনে হাসি পায় আর্যর। জেলার সাংবাদিক মহলে একটা কথা খুব চালু আছে। কথাটা হল 'খেটে খাওয়া ,  আর 'কেটে খাওয়া। ' জেলার যেসব সাংবাদিক, চিত্র সাংবাদিক হাজারও ঝক্কি পুইয়ে, কিম্বা নানান প্রতিকুলতার সঙ্গে লড়ে খবর সংগ্রহ করে কিম্বা ছবি তোলে তাদের বলা হয় 'খেটে খা। ' আর তাদের পাঠানো ওইসব খবর কিম্বা ছবি অফিসের যেসব লোকেরা কাটাকুটি করে তাদের তারা বলে 'কেটে খা'য়ের দল। কারণ তাদের কাজই হলো কাটা। প্রথমেই তারা ' খেটে খাওয়া 'দের কষ্ট করে সংগৃহিত ছবি কিম্বা সংবাদ থেকে তাদের নামটা কেটে দিয়ে ' নিজস্ব ' লিখে দেন। তাদের মর্জি হলে তবেই দয়ার দানের মতো খবরে কিম্বা ছবিতে নামটা কখনও সখনও দেন।তারপরই কাটেন খবর কিম্বা ছবির ক্যাপশন। কাটতে কাটতে এমনই অবস্থা করেন যে পরদিন প্রকাশিত খবর বা ছবি দেখে তাদেরই কান্না পায়। হামেশাই দেখা যায় খবর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পদবি বদলে গিয়েছে , নয়তো শাসক দলের নেতার বক্তব্য বিরোধী দলের নেতার মুখে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। কখনও বা কোন শোকমিছিলের ছবিতে বিজয় মিছিলের ক্যাপশান লিখে দেওয়া হয়েছে। আর তার অবধারিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া যা হয় তা হলো , কাগজ হাতে পাওয়ার পর নেতা কিম্বা জনপ্রতিনিধিরা সাতসকাল ফোন করে 'খেটে খা'দের চৌদ্দোগুষ্ঠি উদ্ধার করে ছাড়েন।তখন কাকুতি মিনতি করে 'কেটে খাওয়াদের' ভুলের দায় 'খেটে খাওয়া 'দের মাথা পেতে নিতে হয়। শুধু কি তাই ?  বিলের ক্ষেত্রেও ' কেটে খাওয়া'দের সমান খরবদারি চলে। টি,এ, টেলিফোন বিল কম বেশি যাই পাঠোনো হোক না কেন তা কাটতেই হবে 'কেটে খাওয়া'দের। সে একবার মজা করে এক বছর আগের বিলই তারিখ বদলে জেরক্স করে পাঠিয়ে দিয়েছিল। আশ্চর্যজনক ভাবে সেই বিলই আগের বারের চেয়ে ২০০ টাকা বেশি  মঞ্জুর হয়ে চলে এসেছিল। সেই থেকে সে বুঝেছিল বিলও কেউ খতিয়ে দেখে না। কাটতে হয় তাই ইচ্ছে খুশি একটা কেটে ছেড়ে দেয়।তাদের অফিসে কাটাকাটির বিষয়টি দেখেন মূলত কেদারনাথ খাসনবীশ।সংক্ষেপে কে, কে। তারা বলে, ' কেটে খা।' খাসনবীশ সম্পাদকের খাস লোক।তার ফোন করার কথা শুনে আশ্চর্য হয় আর্য। তাই সোমনাথকে জিজ্ঞেস করে -- কেন কি বললেন উনি ? 
---- অরুণদা নাকি তোমাকে ফোনে পাচ্ছেন না। তাই ওনাকে ফোন করে জানিয়ে দিতে বলেছেন  মনোহরপুর হাসপাতালে একটা শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটেছে। আমরা যেন গিয়ে খবরটা কভার করি।মনোহরপুর হাসপাতালের নাম শুনে চোখের সামনে ছবির মতো ভেসে ওঠে বছর খানেক আগের সেই ঘটনাটা। প্রিয়র জোড় হাত করে সেই আকুতি ভরা মুখ। কেমন আছে প্রিয় কে জানে ? লজ্জায় ফোন করে খবরটুকু পর্যন্ত নিতে পারে নি সে। আজও একটা অপরাধ বোধ কুঁড়ে কু্ঁড়ে খায় তাকে। 




                             খবরটা কভার করার চেয়েও প্রিয়র খবর পাওয়ার ব্যাকুলতায় মনোহরপুর যেন চুম্বকের মতো তাকে টানতে থাকে। পরক্ষণেই তার মনে প্রশ্ন জাগে জেলার সংবাদ মাধ্যমের কেউ জানল না অথচ অরুণদা খবরটা হাউসে বসে পেলেন কি করে ? প্রশ্নটা সোমনাথকে করে সে। সোমনাথ জানায় , প্রসাদ মন্ডল না কে একজন নাকি খবরের কাগজের ফোন নং দেখে অফিসে ফোন করেছিলেন।
---- খবরটা জেলার কোন মিডিয়া জানে ?  
---- জানে না বলেই মনে হয়।
---- ঠিক আছে কাউকে কিছু বলার দরকার নেই। তুমি চুপিচুপি বেরিয়ে এস। আমিও বেরোচ্ছি।
চটপট রেডি হয়ে মনোহরপুরের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে সে। প্রসাদ মোড়লের নামটা শুনেই তার কেমন ধন্ধ লাগে।একটা ষড়যন্ত্রের আভাস পায়। তাই মনে মনে নিজের কর্মপদ্ধতিও স্থির করে নেয় সে। যথাসময়ে হাসপাতাল চত্বরে পৌঁচ্ছে যায়। আর তখনই বুকটা ধ্বক করে ওঠে তার। সেই প্রিয়র মতো একই গাছে  বাঁধা রয়েছেন রক্তাক্ত এক যুবক। উপস্থিত লোকজনের কথায় সে জানতে পারে উনিই এই হাসপাতালের ডাক্তার ময়ূখবাবু। অদুরে তখন সোমনাথের কামেরার সামনে কান্না কান্না মুখ করে পোজ দিচ্ছেন এক মহিলা। ডাক্তারবাবুকে চেনা না থাকলেও ওই মহিলাকে চিনতে তার কোন কষ্ট হয় না।প্রিয়র সময়ও ওই মহিলাই ঠিক একই ভাবে কান্নার অভিনয় করেছিলেন।তার ধারণা মতোই ঘটনার পারস্পর্য এক আর একে যে দুইয়ের পথেই এগোচ্ছে সে সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে যায় আর্য। সেটা যাচাই করে নেওয়ার জন্য ডাক্তারবাবুর কাছে এগিয়ে যায়। নিজের পরিচয় দিতেই ডাক্তারবাবু হাতজোড় করে বলেন , বিশ্বাস করুন প্রিয়র মতো আমিও চক্রান্তের শিকার হয়েছি। আমাকে ফাঁসানো হচ্ছে। প্লিজ আপনারা খবরটা করবেন না। বাড়িতে আমার বৃদ্ধ বাবা - মা রয়েছেন। তাদের কানে গেলে সইতে পারবেন না। হয়তো হার্টফেল করবেন। যে গাঁয়ের লোকেরা আমাকে চাঁদা করে ডাক্তারি পড়িয়েছেন তাদের কাছেও আমি মুখ দেখাতে পারব না। সব শেষ হয়ে যাবে। 
আর্যর চোখর সামনে ফের ভেসে ওঠে একবছর আগের সেই ঘটনা। এভাবেই খবর না করার আকুতি করেছিল প্রিয়। সে চেষ্টা করেও খবর রুখতে পারে নি। তবে এক্ষেত্রে খবর রোখার মরীয়া চেষ্টা করবে সে। ডাক্তারবাবুকে আশ্বস্ত করে আলোচনার জন্য সোমনাথকে গেটের বাইরে ডেকে নেয় সে।চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে চায়ের অর্ডার দিয়ে কথা শুরু করতে যাবে এমন সময় গেটের সামনের দেওয়ালে চোখ চলে যায় তার। দেখতে পায় একটি লোক কলের জলে কাগজ ভিজিয়ে একমনে ঘষে ঘষে দেওয়ালে দাগ মুছে চলেছে। পিছন থেকে দেখেও প্রিয়কে চিনতে কষ্ট হয় না তার। কিন্তু প্রিয়  ওভাবে কি করছে ?
প্রশ্নটা করতেই দোকানদার বলে , আর বলবেন না , বছর খানেক আগে ওকে নিয়েও এইরকম একটা ঘটনা ঘটেছিল। জেল থেকে ফেরার পর মাথাটা পুরো চলে গিয়েছে। দিনের বেশিরভাগ সময়ই হাসপাতালে পড়ে থাকে। আর ওইভাবে দাগ মোছে।কথা বলতে বলতেই দু'গ্লাস চা তাদের দিকে এগিয়ে দেয় দোকানী। তারা চায়ের গ্লাস হাতে নিয়েছে কি নেয় নি , কাগজ ভেজাতে গিয়ে প্রিয়র নজর পড়ে যায় তার উপর। কিছুক্ষণ তার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সে। তারপর একরকম ছুটেই দোকানের সামনে চলে আসে। আর্যর মুখের সামনে এসে বলে ওঠে , কি দাদা চিনতে পারছেন ? সেই যে দাগিয়ে দিয়ে গেলেন , সেই দাগ তো আর মুছল না। এই দেখুন কপালে সেই দাগ জনমদাগ হয়ে গিয়েছে। শুধু দাগিয়ে দিলে হবে না। নিন , এবার মুছে দিন দেখি।
বলে তার একটা  হাত ধরে ঝাঁকতে থাকে প্রিয়। আর তা দেখে তাদের ঘিরে এক - দুই , এক - দুই করে মজা দেখা লোক জমতে থাকে। দোকানদার আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করেন -- কি দাদা আপনার চেনা নাকি?
--- না,  চেনা ঠিক নয়। ওই মুখ চেনা আর কি।
চুমুক না দেওয়া চায়ের গ্লাসটা প্রিয়র হাতে ধরিয়ে সেখান থেকে পালিয়ে বাঁচে আর্য।





             ( ক্রমশ )  







     নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


শীঘ্রই দেশ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হতে চলেছে আমার তৃতীয় উপন্যাস ------
  
                                  


                       ----০---




No comments:

Post a Comment