অন্তরালে
অর্ঘ্য ঘোষ
( ধারাবাহিক উপন্যাস )
রোজ সকালে নিয়ম করে সে হাসপাতালে হাজির হয়। তারপর কাগজ ভিজিয়ে দেওয়ালের দাগ মুছতে শুরু করে। দাগ মুছতে মুছতে নাওয়া-খাওয়ার কথা ভুলে যায়। ডাক্তারবাবু কিম্বা নার্সরাই তাকে ডেকে ডেকে খাওয়ান। কখনও বা রোগীর আত্মীয়-পরিজনেরা চা-বিস্কুট কিনে দেয় তাকে। তার ওই অবস্থা দেখে অনেকেই হাহুতাশ করেন। তারা বলাবলি করেন , লোকটা সুস্থ থাকলে মানুষের খুব উপকার হত। কিন্তু প্রিয়র সুস্থতা ফেরে না। ডাক্তারবাবুই মনোরোগ বিশেষজ্ঞকে দিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।
নিয়মিত ওষুধ খাওয়ানো হচ্ছে। কিন্তু অবস্থার কোন পরিবর্তন হচ্ছে না। এমনিতে কোন অসুবিধা নেই। কিন্তু মাথার মধ্যে সব সময় দাগ মোছার চিন্তা ঘুরপাক খায়। আর দাগ মোছার জন্যই প্রতিদিন তার হাসপাতালে যাওয়া চাই। কিন্তু নিজে থেকে আর বাড়ি ফেরার নাম করে না। মালা কিম্বা শঙ্খ গিয়ে বাচ্চা ছেলের মতো তাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে বাড়ি নিয়ে আসে। কিন্তু বাড়ি ফিরেও তার দাগের বাতিক যায় না।স্নান করে চুল আঁচড়াতে গিয়ে প্রতিদিন মালাকে ডেকে বলেন , হ্যা রে ডাক্তারবাবু যে বললেন সময়ে দাগ মিলিয়ে যায়। কই আজও তো দাগ মেলালো না।
মালা পরম মমতায় বাবার কপালের দাগে মলম লাগিয়ে দিতে দিতে বলে , অত চিন্তা করছ কেন ? দাগ মেলানোর সময়টা হোক, দেখবে আস্তে আস্তে ঠিক মিলিয়ে যাবে।
সময় বয়ে যায় , দাগ কিন্তু আর মেলায় না। প্রিয়র মন থেকে দাগ মোছার বাতিকও দূর হয় না। দেখতে দেখতে বছর ঘুরে যায়। বার তিনেক কোর্টে সওয়াল - জবাবের পর প্রমাণ অভাবে বেকসুর খালাস পায় প্রিয়। প্রিয়র অবশ্য তা নিয়ে ভাবান্তর হয় না।কারণ তার তখন সেই বোধই নেই। বেকসুর খালাস পাওয়ার খবর পেয়ে আসে না কোন সংবাদ মাধ্যম। গ্রামের লোকেরা ছাড়া কেউ জানতেও পারে না তার বেকসুর খালাস পাওয়ার কথা। তাই লোক সমাজে কলঙ্কের দাগ আর মোছে না।বরং উল্টো বিপত্তি দেখা দেয়।
বেকসুর খালাস পাওয়ার পরই প্রিয়কে কাজে ফেরার চিঠি পাঠায় স্বাস্থ্য দফতর। সেটাই নিয়ম। কিন্তু মস্তিক বিকৃতির কারণে সে আর কাজে যোগ দিতে পারে না। ডাক্তারবাবুও জোর করতে পারেন না। কারণ প্রিয়র কাজের উপরেই মানুষের জীবণের মরণের প্রশ্ন জড়িয়ে রয়েছে। পরীক্ষায় ভুলত্রুটির কারণে যদি খারাপ কিছু ঘটে যায় তাহলে জনরোষ শিকার থেকে প্রিয়কে তিনি বাঁচাতে পারবেন না। সর্বোপরি নিজের বিবেকের কাছে জবাব দেওয়ারও কিছু থাকবে না।তাই সেই মর্মেই স্বাস্থ্য দফতরের কাছে চিঠি পাঠাতে হয় তাকে।তবু প্রিয়র চাকরিটা যাতে না যায় তার জন্য স্বাস্থ্য দফতরের কাছে সুপারিশ জানায় ময়ূখ। কিন্তু শেষ রক্ষা হয় না।
কারণ প্রসাদ মোড়লরাও হাত গুটিয়ে বসে থাকে না। প্রিয়র চাকরিতে বহাল থাকা রুখতে তারা ঝাপিয়ে পড়ে। এক মনোবিদের কাছ থেকে প্রিয়র মস্তিক বিকৃতির সার্টিফিকেট যোগাড় করে। তারপর সেই সার্টিফিকেট সহ প্রিয়কে বরখাস্তের দাবিতে গণ স্বাক্ষরিত দরখাস্ত বলে নিজেরাই দুই হাতে সই করে পাঠিয়ে দেয় স্বাস্থ্য দফতরে। তাই ময়ূখের সুপারিশ গ্রাহ্য হয় না। শাসক দলের প্রভাবে গুরুত্ব পায় প্রসাদ মোড়লদের দাবি। তারই প্রেক্ষিতে ১৫ দিনের মাথায় প্রিয়র বরখাস্তের চিঠি এসে পৌঁছোয়। তাতেও প্রিয়র কোন হোলদোল হয় না।কিন্তু বিপর্যয় নেমে আসে তার পরিবারে।
এতদিন তবু নিয়মিত বেতনের অর্ধেক টাকা মিলছিল। তাতে প্রিয়র চিকিৎসা সহ অন্যান্য খরচ চলছিল। কিন্তু বরখাস্ত হওয়ার পর থেকে সেই টাকাটাও বন্ধ হয়ে যায়। তাই চরম দুশ্চিন্তায় পড়ে মালা। বাড়িতে এক পয়সা সঞ্চয় নেই। জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই মালা দেখে এসেছে বাবা কোনদিনই তেমন হিসেবী ছিল না। যে যখন যা চেয়েছে নির্দ্দিধায় দিয়ে দিয়েছে। কাউকে না করতে পারে না। তারই মধ্যে মা কিছু কিছু করে যা সঞ্চয় করেছিল তা বাবার কেসেই খরচ হয়ে গিয়েছে। এখন কি করে সংসার চলবে , কি করেই বা বাবার চিকিৎসা হবে তা ভেবে পায় না সে। তাই একদিন শঙ্খকে বলে , হ্যারে দাদা এবার কি হবে ? পিসিমনিদের জানালে অবশ্য সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে। কিন্তু ওদেরই বা কত বলা যায়। না বলতেই ওরা অনেকদিন থেকে আমাদের জন্য অনেক করেছে। এরপরও ওদের ঘাড়ে আমাদের দায় চাপানোটা ঠিক হবে না। ওদের তো ঘর সংসার আছে।
--- ঠিক বলেছিস। তাতে হয়তো একদিন সম্পর্কে চিড় ধরতে হবে। দেখি একটা কাজ-টাজ কিছু পাওয়া যায় কিনা।
---- সে দেখ। কিন্তু কাজ তো আর সঙ্গে সঙ্গে পাবি না। আমি বলি কি বাবার প্রাপ্য টাকাগুলো পাওয়া যায় কিনা দেখ। ওই টাকাগুলো পেলে আপাতত আমাদের চলে যাবে। তার মধ্যে তুই একটা কাজ খুঁজে নিবি। আমিও কাঁথাস্টিচের কাজ করব ভাবছি।
মালার কথা শুনে কান্না পায় শঙ্খর। কোন কাজকেই সে ছোট মনে করে না। কিন্তু তাদেরকে ঘিরে বাবা-মায়ের কত স্বপ্ন ছিল। সুখের চাদরে মোড়া ছিল তাদের সংসার। আর আজ পেটের দায়ে মালাকে কাঁথাস্টিচের কাজ করার কথা ভাবতে হচ্ছে। একেই বোধহয় বলে ললাট লিখন। কিন্তু তার মনের ভাব বোনকে আঁচ করতে দিতে চায় না শঙ্খ।নিজেকে সামলে নিয়ে বলে , তা মন্দ বলিস নি। বাবা নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছে। তাহলে সাসপেন্ডের দরুন কেটে রাখা অর্ধেক টাকা, পি এফের দরুন বাবার জমানো টাকাগুলো পেলে এখন আমাদের দিব্যি চলে যাবে। তারপর পেনশন চালু হলে আর সমস্যা থাকবে না। ততদিনে আমি একটা কাজ জুটিয়ে ফেলব।
--- তবে আর বলছি কি। তুই ডাক্তারবাবুকে গিয়ে বকেয়া টাকাগুলো পাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে বল।
শঙ্খ আশ্চর্য হয়ে যায় মালার কথায়। পরিস্থিতি মানুষকে কত বদলে দেয়! মা যখন ছিল তখন মালার ক্ষেত্রে এইসব বৈষয়িক ভাবনার কথা ভাবনার অতীত ছিল। সেই মালাই আজ পাকা গৃহিণীর মতো কি সুন্দর পরামর্শটাই না দিল। সেই পরামর্শ মতোই পরদিনই সে গিয়ে ডাক্তারবাবুকে কথাগুলো বলে। সব কিছু শোনার পর ডাক্তারবাবু বলেন , আমি ইতিমধ্যেই তোমার বাবার বকেয়া সমস্ত পাওনার জন্য স্বাস্থ্য দফতরে চিঠি পাঠিয়ে দিয়ে লেগে রয়েছি। তোমাদের অবস্থাটাও বুঝতে পারছি।।বলে কিছু টাকা পকেট থেকে বের করে শঙ্খর দিকে বাড়িয়ে ধরে বলেন - এটা রাখো। যতদিন কিছু ব্যবস্থা না হয় ততদিন যখন যা দরকার হবে জানাতে সংকোচ কোর না।
শঙ্খ দ্রুত হাতটা সরিয়ে নিয়ে বলে , না না এখন কিছু লাগবে না। সে যখন দরকার হবে চেয়ে নেব। আপনি যত তাড়াতাড়ি বাবার প্রাপ্য টাকাগুলো পাওয়া যায় দেখুন।
কোয়ার্টার ছেড়ে বেরিয়ে যায় প্রিয়। প্রিয়র ধাত তো ময়ূখের অজানা নেই। প্রিয়র রক্ত যার শরীরে বইছে সে যে সহজে কারও কাছে হাত পেতে টাকা নেবে না তাও সে ভালো করেই জানে। তাই টাকা ক'টা পকেটে ঢুকিয়ে রেখে শঙ্খর গমন পথের দিকে চেয়ে থাকে সে। কোয়ার্টারের জানলা গিয়েই দেখতে পায় বাবার হাত ধরে হাসপাতালের গেট পার হচ্ছে শঙ্খ। একটা ভালোমানুষের এইরকম করুণ পরিনতির কথা ভেবে মনটা খারাপ হয়ে যায় ময়ূখের। সেই কথাই ভাবতে থাকে ময়ূখ। সে
ই সময় খোলা দরজা দিয়ে ' ডাক্তারবাবু আছেন ' বলে বাইরের ঘরটাকে ঢুকে আসেন এক মহিলা। আউটডোর বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর যদি কোন রোগী আসে তাহলে ওই ঘরেই দেখেন তিনি। সেই রকমই কেউ দেখাতে এসেছে ভেবে ভিতরের ঘর থেকে বলেন , বসুন আসছি। তারপর টেথোস্কোপটা নিয়ে বাইরের ঘরে ঢুকতেই তার হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। ভিতরের ঘর থেকে এতক্ষণ মহিলাকে দেখতে পান নি তিনি। কিন্তু দেখার পর তার আত্মারাম খাঁচা ছাড়া হওয়ার যোগাড়।কারণ ততদিনে তার জানা হয়ে গিয়েছে ওই মহিলাই প্রিয়র আজকের এই দুর্দশার অন্যতম কারণ। তাই তিনি দ্রুত বলেন , চলুন চলুন। আউটডোরে চলুন। ওখানে দেখে দিচ্ছি। যাওয়ার সময় পাশের কোয়ার্টারে সিস্টারদেরও আমার নাম করে আউটডোরে যেতে বলুন।
কিন্তু তার কথা কানেই তোলে না সে। আচমকা নিজের ব্লাউজ ছিঁড়ে 'কে কোথাই আছ , বাঁচাও বাঁচাও ' বলে চিৎকার শুরু করে দেয় আরতি। আচমকা ওই পরিস্থিতির মুখে পড়ে ঘেমে ওঠেন ময়ূখ। তিনি আরতিকে বলেন , এ রকম ভাবে চিৎকার করছেন কেন ? আপনাকে আউটডোরে যেতে বললাম না।
কিন্তু ময়ূখের কথা কানে না তুলে সমানে চিৎকার করে চলে আরতি। তার চিৎকার শুনে নার্সরা ছুটে আসেন।তারা ময়ূখকে জিজ্ঞেস করেন -- কি হল স্যার ?
--- দেখুন না এই মহিলা আমার কোয়ার্টারে এসেছিলেন। আমি ওনাকে আপনাদের খবর দিয়ে আউটডোরে যেতে বললাম। তা উনি ব্লাউজ ছিঁড়ে কিসব বলছেন দেখুন।
নার্সরা কিছু বলার আগেই আরতি বললেন , হ্যা তাই বটে ? বুকে কল বসিয়ে পরীক্ষা করতে গিয়ে আমার কি হাল করেছে আপনারা নিজের চোখেই দেখুন।
তারপর ছেঁড়া ব্লাউজে ঢাকা অর্ধ অনাবৃত বুক নার্সদের সামনে মেলে ধরে। নার্সরা লজ্জায় মুখ নামিয়ে নেন। নিজেকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টায় ময়ূখ বলে , কাদের কথা শুনে বার বার আপনি এমন করছেন তা আমি জানি। আপনার জন্যই একটা পরিবার শেষ হয়ে গেল।মনে রাখবেন উপরে একজন আছেন। তিনি কিন্তু সব দেখছেন। তার কাছে কি জবাব দেবেন ?
ওইকথা শুনে আরতি যেন কিছুটা দপকে যায়। সে আর 'বাঁচাও - বাঁচাও ' বলে চিৎকার করে না। কিন্তু ততক্ষণে হই- হই করে প্রসাদ মোড়লরা সদলবলে কোয়ার্টার ঘিরে ফেলেছে।
( ক্রমশ )



No comments:
Post a Comment