অন্তরালে
অর্ঘ্য ঘোষ
( ধারাবাহিক উপন্যাস )
গাড়ি থেকে নামতেই বাবাকে জড়িয়ে ধরে বাচ্চা মেয়ের মতো কেঁদে ওঠে সে।কাঁদতে কাঁদতেই বলে , তুমি এসে দেখে যাও মা। বাবা ফিরে এসেছে। তুমি ভুলে বুঝে চলে গেলে মা গো।
প্রিয় মেয়ের কথা শুনে তার মুখের দিকে কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। মেয়ের কথাটার মানে বোঝার চেষ্টা করে। শঙ্খ এই ভয়টাই পাচ্ছিল। হঠাৎ করে মায়ের চলে যাওয়ার খবরটা বাবা কেমন ভাবে নেবে ভেবে পাচ্ছিল না। তাই বাবাকে মায়ের মৃত্যু সংবাদটা তারা এতক্ষণ দিতে পারে নি। কিন্তু মালা কাঁদতে কাঁদতে হঠাৎ মায়ের চলে যাওয়ার কথাটা বলে ফেলে বাবার মানসিক চাপটা বাড়িয়ে দিল। পরক্ষণেই মনে হয় বলে এক হিসাবে ভালোই করছে মালা।
একসময় বাবাকে তো বলতেই হোত। এখন বাড়িতে অনেকে আছেন। সবার সান্ত্বনা বাবাকে শোক সইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা দেবে।কিন্তু বাবার বোধহয় বিষয়টি পুরোপুরি বোধগম্য হয় নি। তাই মালার দিকে চেয়ে থাকে বাবা। সেটা লক্ষ্য করে এগিয়ে যায় পিসেমশাই। বাবার কাছে গিয়ে বলে , তুমি ঠিকই শুনেছ। স্বাতী আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছে। তুমি এখন ক্লান্ত, তোমার বিশ্রামের দরকার। তুমি পরে সব শুনো।
প্রিয় খুব ক্ষীণ স্বরে বলে -- স্বাতী চলে গেল ! তোমরা আমাকে জানালে না ?
---- অপরাধ নিও না। প্রথমে আমরা তোমাকে জানানোর কথা ভেবেছিলাম। কিন্তু তুমি জেলের মধ্যে একা একা কষ্ট পাবে ভেবেই বলতে নি।
--- ওঃ।
বলে চুপ করে যায় প্রিয়। তার চোখ দিয়ে জলের ধারা গড়িয়ে পড়ে।প্রিয়র মুখ দেখেই সবাই বুঝতে পারে স্ত্রীকে হারোনোর যন্ত্রণায় তার বুকের ভিতরটা ফেটে যাচ্ছে। কিন্তু শব্দ করে কাঁদতে পারছে না। আসলে দুঃখে বুক ফেটে গেলেও স্ত্রীর মৃত্যুতে প্রকাশ্যে স্বামীরা কাঁদতে পারেন না। আস্তে আস্তে শোওয়ার ঘরে যায় প্রিয়। দেওয়ালে টাঙানো স্ত্রী'র ছবির সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ বিড় বিড় করে। তারপর বাইরে বেরিয়ে এসে অদ্ভুত শান্ত হয়ে যায়।মৃদু স্বরে অস্ফুটে বলে ওঠে - তুমি চলে গিয়ে ভালোই করেছো। তোমাকে আর কোন লজ্জা - অপমান সইতে হবে না। কিন্তু আমাকে মিথ্যা কলঙ্কের দাগ কপালে নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে। এ জীবনে আর তো দাগ মুছবে না। লজ্জার মাথা খেয়ে দাগী মুখ সবাইকে দেখিয়ে বেড়াতে হবে। সবাইকে বলতে হবে দাগের কারণ। বলে কান্নায় ভেঙে পড়ে সে।
শঙ্খ - মালা ছুটে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে নিজেরাও কেঁদে ভাসায়। তারাঅন্ধকারে এতক্ষণ লক্ষ্য করে নি। কথাটা শোনার পর লক্ষ্য করে দেখতে পায় বাবার কপালে দড়ির মতো কালো হয়ে রয়েছে সেদিন গণপ্রহারের চিহ্ন। পরম মমতায় বাবার কপালে হাত বুলিয়ে দেয় মালা। মেয়ের মুখের দিকে চেয়ে প্রিয় বলে, দাগ নিয়ে বেঁচে থাকা
বড়ো কষ্টের রে মা , বড়ো কষ্টের।
---- এক দিন সব দাগ মিলিয়ে যাবে।
গলাটা শুনে সবাই চমকে তাকায়। কখন হাসপাতালের ডাক্তারবাবু আর নার্সরা এসেছেন তা টের পায় নি তারা। ডাক্তারবাবুর কথা শুনে প্রিয় বলে , দাগ মিলিয়ে যাবে বলছেন ?
--- নিশ্চয়। সময় এক আশ্চর্য মলম। সময়ে সব কিছু মিলিয়ে যায়। কাল হাসপাতালে আসুন, কথা হবে ।
ডাক্তারবাবুর কথা শুনে প্রিয় কপালে হাত বোলাতে থাকে।তখন বাড়িতে লোক ভেঙে পড়ছে। সবাই প্রিয়কে সান্ত্বনা দেয়। সুরোপিসি , অতসীকাকীরা প্রিয়র গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলেন , মনকে শক্ত করো, তুমি ভেঙে পড়লে চলে। বৌমা চলে গিয়েছে। ছেলেমেয়ে দুটো এখনও ছেলেমানুষ। তোমাকেই ওদের বাবা-মা হয়ে সংসারের হাল ধরতে হবে।প্রিয় কোন কথা বলে না।
ভাবলেশহীন চোখে অতসীকাকীদের মুখের দিকে চেয়ে থাকে সে।
খবর পেয়ে মাজীকে নিয়ে এসে পড়েন গঙ্গাধরবাবাজী। তিনিও প্রিয়কে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন , প্রিয়জন চলে গেলে কষ্ট হয়। কিন্তু ছেলেমেয়ে দুটোর মুখ চেয়েই তোমাকে সেই কষ্ট জয় করতে হবে।
সেই কথা শুনে গঙ্গাধরবাবাজীর হাত ধরে কেঁদে ফেলে প্রিয়। কাঁদতে কাঁদতে বলে , বড়ো যন্ত্রণা হচ্ছে কাকা। স্বাতীর এভাবে চলে যাওয়াটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। নিজেরই আর বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করছে না। স্বাতীর মতোই চলে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে।
--- তা বললে কি আর হয় বাবা ? তাহলে এত বড়ো নিষ্ঠুর সমাজে ছেলেমেয়ে দুটোকে দেখবে কে ?
গঙ্গাধর বাবাজীর কথা শেষ হতে শঙ্খ আর মালাকে বুকে জড়িয়ে ধরে প্রিয়। তারপর বলে , হ্যা এদের জন্যই আমাকে বেঁচে থাকতে হবে।
সবাই বলে , হ্যা এদের মুখ চেয়েই তোমাকে সব যন্ত্রণা ভুলে আবার আগের মতো হয়ে উঠতে হবে।
প্রিয় কোন কথা বলে না। ছোটছেলের মতো সে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। মালা আর শঙ্খ বাবার চোখের জল মুছিয়ে দেয়। তাদের চোখও জলে ভরে ওঠে। কিছুক্ষণ পর ডাক্তারবাবুরা হাসপাতালে ফেরার জন্য প্রিয়র কাছে বিদায় নিয়ে যান। যাওয়ার আগে শঙ্খকে পাশে ডেকে বলেন , কাল বাবাকে নিয়ে একবার হাসপাতালে এসো। টাকাটা আটকে আছে। সেটা পেতে বাবার সই লাগবে। তাছাড়া বাবার মনটাও একটু ভালো হবে। এতদিন বন্দী থেকে উনি মানসিক অবসাদের শিকার হয়ে পড়েছেন। সেটা কাটানো খুব দরকার।
ডাক্তারবাবুর কথা মতো পরদিন বাবাকে নিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্য রওনা দেয় শঙ্খ। যাওয়ার পথে মাচানতলায় মায়ের শহীদবেদীটা দেখে থমকে দাঁড়ায় প্রিয়। কাছে গিয়ে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করে। তারপর বেদিটা দেখিয়ে শঙ্খের দিকে চেয়ে বিড়বিড় করে বলে কত দাগ পড়ে গিয়েছে দেখেছিস। দাগ থাকাটা মোটেই ভালো নয়। দাগটা মোছা দরকার।
বলেই একটা কাগজ কুড়িয়ে কলের জলে ভিজিয়ে নিয়ে ঘষে ঘষে দাগ মুছতে শুরু করে দেয়। বাবার দেখাদেখি শঙ্খও কাগজ ভিজিয়ে দাগ মুছতে শুরু করতেই প্রিয় বলে ওঠে -- তুই হাত দিস নে। দাগ বড়ো মারাত্মক জিনিস। একবার গায়ে লাগলে সহজে ওঠে না। আমার গায়ে লেগে আছে, আমারই থাক।
শঙ্খকে কিছুতেই হাত লাগাতে দেয় না প্রিয়। ঘন্টা খানেক ধরে দাগ মোছার পর তবেই বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যেতে সক্ষম হয় শঙ্খ। নিজেদের ওষুধের দোকান থেকে প্রিয়কে হাসপাতালের গেটে দেখে ভ্রুকুচকে যায় প্রসাদ মোড়লের। সে ভবানীডাক্তারকে জিজ্ঞেস করে --- কি ব্যাপার বলো দেখি ? জামিনের পরদিনই ব্যাটা দেখছি হাসপাতালে এসে হাজির হয়েছে। আজ থেকেই কি আবার ডায়্যাগনস্টিক্ সেন্টারটা চালু করে দেবে নাকি ?তাহলে তো আমাদের বাড়া ভাতে ছাই পড়ে যাবে। আবার সেই মাছি তাড়াতে হবে আমাদের।
--- চালু করলেই হল ? সাসপেন্ড থাকা অবস্থায় কোনভাবেই কেউ সরকারি কাজে যোগ দিতে পারে না।
ওকে দিয়ে যদি সেই রকম কিছু করানো হয় তাহলে স্বাস্থ্য দফতরে একটা নালিশ ঠু্ঁকে দেব। তখন ডাক্তার ব্যাটারও চাকরি নিয়ে টানাটানি পড়ে যাবে। ও ব্যাটারও বড়ো তেল হয়েছে।
---- সেই জন্যই তো বলছি। প্রিয়কে খুব সুনজরে দেখে ব্যাটা। নাহলে দেখলে না আমরা এত করে বললাম হাসপাতালে নিয়ম রক্ষার্থে ডিউটি করে দুবেলা আমাদের চেম্বারে বসুন। এক বছরের মধ্যেই আপনার গাড়ি বাড়ি হয়ে যাবে। কিন্তু কানেই তুলল না কথা।
--- সোজা আঙুলে ঘি উঠবে না। আঙুল বাঁকিয়ে ও ব্যাটাকেও কড়কে দিতে হবে। নাহলে তো আঙুল চুষতে হবে আমাদের।
---- তা যাতে না হয়, সেই রকম একটা প্ল্যান ভাঁজো দেখি। তোমার তো এসব ব্যাপারে বুদ্ধিসুদ্ধি ভালোই খেলে।
--- প্ল্যান আমার ভাঁজাই আছে। সে খেল যথাসময়ে দেখতে পাবেন। এখন সামনে চেয়ে প্রিয় ব্যাটার খেল দেখুন।
সই সাবুদের পর বাবাকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে গিয়ে শঙ্খ তখন চরম সমস্যায় পড়েছে। বাবা কিছুতেই হাসপাতাল ছেড়ে যেতে চায় না। সে যত বলে , বাবা তাড়াতাড়ি বাড়ি চলো। মালা একা আছে চিন্তা করবে। বাবা তত বলে , দাঁড়া না , আমার এখন যাওয়া চলে ? দেখছিস না সব জায়গায় দাগ। এই সব দাগ না মুছে আমি যায় কি করে ? তুই বরং চলে যা।
বলেই বাবা কাগজ ভিজিয়ে নিয়ে বেদীর মতোই হাসপাতালের দেওয়ালে যেখানে যত দাগ ছিল ঘষে ঘষে মুছতে শুরু করে দেয়। বাবার ওই কান্ড দেখে লোক জমে যায়। অনেকেই মজার খোরাক খুঁজে পায়। নানা টিকাটিপ্পনীও চলতে থাকে। চোখ ফেটে জল আসে শঙ্খর। সেই সময় পিঠে হাতের স্পর্শ পেয়ে পিছন ফিরে দেখে দাঁড়িয়ে রয়েছেন ডাক্তারবাবু। তাকে আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, শক্ত হও। ওনার মাথার মধ্যে এখন দাগের বিষয়টি ঢুকে গিয়েছে। সেটা বের করা প্রয়োজন।
---- তাহলে কি হবে ডাক্তারবাবু ? বাবা কি আর ভালো হবে না ?
---- কে বলল ভালো হবে না ? ওনার মানসিক চিকিৎসার প্রয়োজন। আমি দেখছি কি করা যায়।
---- তাহলে এখন আমি কি করব ডাক্তারবাবু ?
----- আমি বলি কি তুমি বাড়ি চলে যাও। ওনাকে নিজের মতো থাকতে দাও। আমরা তো রইলাম। এখন জোর করে বাড়ি নিয়ে যাওয়া হলে উনি শক পেতে পারেন। তুমি পরে একসময় এসে বরং নিয়ে যেও।
অগত্যা বাবাকে রেখেই দুশ্চিন্তাগ্রস্থ মন নিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে হয় শঙ্খকে। মালাকেও সে আসল কথা বলতে পারে না। বলে , ডাক্তারবাবু বললেন এখানেই থাক এখন। কাজের মধ্যে থাকলে ভালো থাকবে।
মালা বলে, তা অবশ্য ঠিক। বাড়িতে থাকলেই মন খারাপ করে চুপচাপ বসে থাকবে।
হাসপাতালে প্রিয় তখন দাগ মোছার কাজ করেই চলে। দোকান থেকে তা দেখে হাসি ফুটে ওঠে প্রসাদ মোড়লের মুখে। ভবানীডাক্তারের দিকে চেয়ে বলে -- কি ডাক্তার কেমন বুঝছো ?
---- কি বলব দাদা মনে মনে তো এটাই চাইছিলাম। বিচারে বেকসুর খালাস পেলেও ব্যাটা আর কাজে ফিরতে পারবে না। মস্তিক বিকৃতির জন্য চাকরিটাই চলে যাবে।একদিক থেকে নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। এবার ডাক্তার ব্যাটাকে দেখতে হবে।
--- হ্যা হ্যা। এবার সেটাই দেখ।
মনের আনন্দে ভিতরের ঘরে মদের বোতল খুলে বসে দু'জনে। মনে ফুর্তি হলে এখন এখানে বসেই একটু খানাপিনা করে তারা। এতবড়ো একটা ঘটনায় সেটা হবে না তাই কখনও হয় ?
একসময় নেশায় চুর হয়ে দু'জনে চটুল সুরে গান গাইতে শুরু করে। বাবাকে নিতে এসে সেই গান কানে যায় শঙ্খরও। তীব্র রাগে হাত নিশপিশ করে ওঠে তার। ঘুষি মেরে শয়তান দুটোর নাক ফাটিয়ে দিতে ইচ্ছে হয় । কিন্তু বাবাকে দেখে রাগ ভুলে বিষন্ন হয়ে যায় তার মন। দেখতে পায় বাবা তখনও দাগ মুছেই চলেছে। সে কাছে গিয়ে বাবার হাত ধরে। বাবা তার দিকে চেয়ে বলে , এরই মধ্যে চলে এলি ? এখনও যে অনেক দাগ মোছা বাকি রয়েছে রে।
চোখের জল সামলে শঙ্খ বলে , ঠিক আছে আজ বাড়ি চলো। কাল আবার এসে মুছবে।
সেই থেকেই দাগ মোছাই যেন প্রিয়র রোজনামচা হয়ে ওঠে।



No comments:
Post a Comment