অন্তরালে
অর্ঘ্য ঘোষ
( ধারাবাহিক উপন্যাস )
মানসিক চাপের জন্য আজ আর আদালত কক্ষের ভিতর যেতে পারে নি শঙ্খ। প্রশান্তদাদু আর পিসেমশাই ভিতরে রয়েছেন। জীতেনদাদুদের সঙ্গে সে বটতলাতেই বসে রয়েছে। কিন্তু বাইরেও কি দু:শ্চিন্তা মুক্ত হতে পারছে সে ? এক একটা মুহুর্ত যেন একটা যুগ মনে হচ্ছে। তারই প্রসাদ মোড়লদের চুপিচুপি আদালতের সরকারি আইনজীবির ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়। ভাবভঙ্গি দেখে তাদের আশাহত বলেই মনে হয় শঙ্খর। তাই বাবার জামিন নিয়ে তার মনে একটা আশার সঞ্চার হয়। কিন্তু পরক্ষণেই সেই আশার আলো নিভে যায়। তাদের চোখের সামনে দিয়ে আগের দিনগুলির মতোই বাবাকে কোমরে দড়ি বেঁধে আদালতের লকআপ থেকে সংশোধনাগারের দিকে নিয়ে যায় পুলিশ। সেটা দেখেই জামিনের আশা ছেড়ে দিয়ে বাবার দিকে জলভরা চোখে চেয়ে থাকে শঙ্খ। বাবাও করুণ চোখে চেয়ে থাকে তাদের দিকে। বাবার সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে য়ায় তার। পিছন ফিরে তাকাতে গিয়ে বাবার চলার গতি শ্লথ হয়ে যায়। তখন যে পুলিশটা দড়িটা ধরে ছিল সে হ্যাঁচকা টান মারে। বাবা টালসামলাতে না পেরে হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়। সেটা দেখে রাগে আপনা থেকেই হাত মুঠো হয়ে যায় শঙ্খর। ইচ্ছে করে পুলিশটার নাকে গিয়ে একটা ঘুসি বসিয়ে দেয়।সে ভেবে পায় না পুলিশ কি করে এত অমানবিক হয়।
কি করে পশুর মতো দড়িতে বাঁধা মানুষের সঙ্গে এমন আচরণ করে ? ওদেরও তো বাড়িতে বাবা - মা , ভাইবোন আছে। কেউ যদি ওদের পরিবারের লোকেদের সঙ্গে ওই রকম অমানবিক আচরণ করে তাহলে কেমন লাগবে ?ওইসব কথা ভাবতে ভাবতে শঙ্খ দেখতে পায় বাবা তবু যেতে যেতেই পিছন ফিরে তাদের দিকে তাকাচ্ছে। সেই দৃষ্টিতে যেন মুক্তির আকুলতা। খুব ইচ্ছা করে ছুটে গিয়ে পুলিশের কাছে থেকে বাবাকে ছিনিয়ে নিয়ে চলে আসে। কিন্তু সেটা যে সম্ভব নয় তাও সে জানে। তাই তার চোখ জলে ভরে ওঠে। পুলিশটা অশ্লীল গালাগালি দিয়ে ফের বাবাকে হ্যাঁচকা টানে সংশোধনাগারের দিকে নিয়ে চলে যায়। তখনই হন্তদন্ত হয়ে আদালত থেকে বেড়িয়ে আসে সৌরভরা। শঙ্খ তাদের কাছে ছুটে যায়। তাকে দেখে প্রশান্তদাদু বলেন , চিন্তা নেই জামিন হয়ে গিয়েছে। প্রথম দিকে সরকারি আইনজীবি আপত্তি তুলেছিলেন। কিন্তু বিচারক তা শোনেন নি। আমাদের কাগজপত্রের জন্য কিছুটা দেরি হয়ে গেল।বেশ ওইসব কথা পরে হবে। চলো আগে সংশোধনাগারে গিয়ে তাড়াতাড়ি প্রিয়কে ছাড়াতে হবে। নাহলে ফেরার বাস পাব না।
প্রশান্তদাদুর কথা শুনে বহুদিন পর বুক ভরে শ্বাস নেয় শঙ্খ। বাবাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারবে ভেবে তার খুব ভালো লাগে। তাই উৎসাহের সঙ্গে বলে , হ্যা -হ্যা তাই চলুন।
কিন্তু সংশোধনাগারে গিয়ে হতাশ হয়ে পড়ে তারা।সংশোধনাগারের কর্তব্যরত পুলিশ অফিসারের হাতে জামিনের কাগজটা তুলে দেন প্রশান্তদাদু। অফিসার সেই কাগজে চোখ বুলিয়ে দেখে ঠোঁট উল্টে বলেন , জেলার সাহেব বাড়ি চলে গিয়েছেন। আজ তো আর রিলিজ দেওয়া যাবে না। আপনারা বরং কাল আসুন।
সেই কথা শোনার পরই মুষড়ে পড়ে সবাই। প্রশান্তদাদু অফিসারকে অনুনয় করে বলেন , স্যার আমাদের লোক তিন মাস ধরে জেলে বন্দী আছে।বাড়ির সবাই তার ফেরার প্রতীক্ষায় রয়েছে। আমরাও আজ তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাব বলে বড়ো আশা নিয়ে এসেছি। দয়া করে আমাদের ব্যাপারটা বিবেচনা করা যায় কিনা একটু দেখুন না স্যার।
ওই কথা শুনে অফিসারটি চরম বিরক্তির সঙ্গে বলেন , মহা মুসকিল তো।আমি কি আপনাদের আশা দিয়েছিলাম নাকি? আপনারা কি বাংলা কথাও বোঝেন না ? বললাম না জেলার সাহেব বাড়ি চলে গিয়েছেন। রিলিজ অর্ডারে তার সই ছাড়া কাউকে রিলিজ করা যায় না। এবার যান তো , আর জ্বালাতন করবেন না।
সেই সময় তারা দেখতে পায় সেইদিনই জামিন হওয়া দু'জনকে রিলিজ দেওয়া হল।
প্রশান্তদাদু সেই কথা বলতেই অফিসার বলেন , ওগুলো স্পেশাল কেস। স্পেশাল কেস বোঝেন ?
---- স্পেশাল কেস মানেটা ঠিক বুঝলাম না। ওদের তো আজই জামিন হয়েছে। তাহলে স্পেশাল কেস হয় কি করে ?
---- স্পেশাল কেস মানে হলো , স্পেশাল ভাবে জেলারের সই করানো। আসলে জেলার তো আজ বাড়ি চলে গিয়েছেন। উনি বাড়িতে বসে কোন অফিসিয়াল কাজ করেন না। কারণ তার জন্য সরকার ওনাকে আলাদা কোন টাকা দেয় না। তাই বাড়িতে কোন কাজ হলে ওনাকে আলাদা টাকা দিতে হয়। তারপর ধরুন যিনি কষ্ট করে যাবেন তারও তো কষ্টের একটা মুল্য আছে। আপনারা যদি স্পেশাল কেস করান তাহলে অবশ্য আজকে আপনাদের লোক রিলিজ হয়ে যাবে।
করাবেন নাকি স্পেশাল কেস ?
--- কি রকম খরচ পড়বে স্পেশাল কেস করাতে ?
---- এমনিতে সব মিলিয়ে ৭০০ টাকা পড়ে। তা আপনারা যখন এত আশা নিয়ে এসেছেন তখন আমি না হয় সেটা ৬০০ টাকায় করে দেব। এবার চটপট বলুন দেখি কি করবেন ?
পুলিশ অফিসারের গলাটা পাড়ার মোড়ে জড়িবুটি বিক্রেতার মতো লাগে শঙ্খর।প্রশান্তদাদু তাদের কাছে ফিরে এসে মতামত জানতে চান।পিসেমশাই বলেন , দিয়ে দেওয়াই ভালো। আজ বাড়ি ফিরে গিয়ে কাল আসতে গেলে কিম্বা এখানে থাকলেও প্রায় একই খরচ হয়ে যাবে।
শঙ্খরও কথাটা যুক্তিযুক্ত মনে হয়। তাই সে বলে , টাকা লাগে লাগুক। বাবাকে আর একদিনও এখানে ফেলে রাখা যাবে না। আজই বাবাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাব।
সেইমতো প্রশান্তদাদু অফিসারের হাতে ৬০০ টাকা তুলে দেন। অফিসার বলেন, আপনারা সামনের মাঠে গিয়ে বসুন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আপনাদের লোককে রিলিজ করে দেওয়া হচ্ছে।
সেইমতো সবাই সংশোধনাগারের সামনের মাঠে গিয়ে বসে। সেখান বসেই তারা দেখতে পায় কেউ কোথাও সই করাতে যায় না। আসলে জেলার সংশোধনাগারেই ছিলেন। ওইভাবে টাকা আদায়ের জন্য গ্যাঁড়াকল পেতে বসে আছে ওরা। কারণ ওরা তো ভালো করেই জানে পরের দিন আসতে বললে সবাই হয়রানি আর সমান খরচের কথা ভেবেই ওদের পাতা স্পেশাল কেসের ফাঁদে পা দেবেই।
শঙ্খ মনে মনে ভাবে , কি বিচিত্র ব্যবস্থা। সরকারি বেতনভুক কর্মীকে টাকা দিয়ে সরকারি কাজ করাতে হচ্ছে। এর থেকে নৈতিক অবক্ষয় আর কিছু হয় কিনা তার জানা নেই। সেই সময় রিলিজ হওয়া দু'জনকে নিয়ে বাড়ির লোকেরা তাদের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন। প্রশান্তদাদু তাদের জিজ্ঞেস করেন - দাদা আপনাদের স্পেশাল কেস করতে কত করে পড়ল।
লোকগুলোর মধ্যে একজন এগিয়ে এসে বলেন , আর বলবেন না দাদা। ব্যাটারা এক - একটা কসাই। প্রথমে তো ৫০০ টাকা করে লাগবে বলেছিল। শেষে একসঙ্গে দু'জন আছে বলে ৮০০ টাকায় রফা করে।
লোকগুলোর কথা শুনে শঙ্খর মনে হয় , পুলিশগুলো রিলিজ পাওয়া অভিযুক্তদের মানুষ নয় , আলু - বেগুন ভাবে। তাই পাইকারি বিক্রির মতো কিছুটা ছাড় দেওয়ার ব্যবস্থা চালু রেখেছে।
প্রশান্তদাদু তো লোকগুলোর কথা শুনে রেগে কাঁই।রেগেমেগেই বলেন, এক্ষুনি গিয়ে অফিসারকে ধরব। ৫০০ টাকা রেট। অথচ ১০০ টাকা বেশি নিয়ে আবার বলে কিনা ১০০ টাকা কম নিলাম।
পিসেমশাই তার হাত ধরে আটকে বলেন , ছেড়ে দিন কাকা। ওদের লম্বা হাত কি করতে কি করে দেবে তার ঠিক নেই।
লোকগুলো পিসেমশাইয়ের কথায় সমর্থন জানিয়ে বলেন , হ্যা দাদা এটা নিয়ে আর বাড়াবাড়ি না করাই ভালো। টাকা তো ফেরত পাবেনই না , হিতে বিপরীত হয়ে যেতে পারে।বিশেষ করে আমরা খুব সমস্যায় পড়ে যাব। আমরা ছা'পোষা লোক। গাঁয়ে গাঁয়ে ভাঙা লোহালক্কড় কিনে বেড়ায়। পুলিশ যখন কোথাও কিছু না পায় তখন কেসের কোটা পূর্ণ করতে আমাদের ধরে ' আয় একটা কেস খা ' বলে মিথ্যা অভিযোগে কোর্টে পাঠিয়ে দেয়। তাই আমাদের মাঝে মধ্যে এই কসাইদের হাতে পড়তে হয়। পরে যখন পাবে তখন আমাদের উপরে ঝাল মিটিয়ে নেবে। বলে লোকগুলো চলে যায়।
তাদের পায়ের শব্দ মিলিয়ে যেতেই জায়গাটা সুনসান হয়ে পড়ে। সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে ক্যাঁচকোঁচ শব্দে সংশোধনাগারের বড় গেটের মাঝে ছোট গেটটা খুলে যায়। সেই পুলিশ অফিসারের পিছনে মাথা নিচু করে গেট পেরিয়ে যে মানুষটা সংশোধনাগারের বাইরে আসে সন্ধ্যার আধো অন্ধকারে তাকে চিনতে কষ্ট হয় না শঙ্খর। কিন্তু খুব কষ্ট হয় মানুষটা দেখে। গাল ভর্তি দাঁড়ি, এক মাথা রুখু চুল আর ছোট্ট কাপড়ের একটা পুটলি হাতে মানুষটাকে ভিক্ষারীর মতো দেখাচ্ছিল। মানুষটা তাদের দেখতে পায় নি। খুব ধীর পায়ে মাঠ পেরিয়ে হেঁটে আসছিল সে। তার ভাবভঙ্গী দেখে মনে হচ্ছিল , সে বুঝি ভাবছে এই বিরাট পৃথিবীতে সে একা।
নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না শঙ্খ। বাবা - বাবা বলে ছুটে গিয়ে পাগলপারা মানুষটিকে জড়িয়ে ধরে প্রবল কান্নায় ভেঙে পড়ে সে। হঠাৎ শঙ্খকে ওইভাবে জড়িয়ে ধরতে দেখে প্রথমে যেন হতভম্ভ হয়ে পড়ে প্রিয়। ফ্যালফ্যাল করে তার দিকে চেয়ে থাকে। তার মুখচোখের ভাব দেখে মনে হচ্ছিল যেন অপরিচিত কাউকে দেখেছে সে। তাই কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মতো দেখায় তাকে। পরক্ষণেই অবশ্য তার আচরণ বদলে যায়। সেও ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে। তার দু'চোখেও আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়ে। সংশোধনাগারের নির্জন মাঠে বাবা-ছেলের মিলন মুহুর্ত যেন স্বর্গীয় দৃশ্যের সূচনা করে। ততক্ষণে বাকিরাও সেখানে এসে পড়েন। পারস্পরিক কুশল বিনিময়ের পর প্রশান্তদাদু বলেন , আর দেরি করা ঠিক হবে না। ফেরার আর বাস পাওয়া যাবে কিনা কে জানে ?
সৌরভ বলে , আজ আর বাসে যেতে হবে না। গাড়ি করেই ফিরব।
প্রস্তাবটা শঙ্খরও মনোঃপুত হয়। বাসে গেলে অনেকে বাবাকে চেয়ে চেয়ে দেখবে। চেনাশোনা কেউ থাকলে বাবাকে নিয়ে আলোচনা জুড়ে দেবে।অস্বস্তিকর প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে। তাতে বাবার মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হতে পারে। সেই মতো গাড়ি ভাড়া করে বাড়ি অভিমুখে রওনা দেয় তারা। প্রিয়কে সঙ্গে নিয়ে ফিরতে পারছে বলে সবার মনের মধ্যে একটা খুশী খুশী ভাব। খুশীর মাঝেও শঙ্খর মনে যেন একটা বিষাদের সুর বাজে। জামিনটা আর কয়েকদিন আগে হলে মাকে চলে যেত হত না। সেই আক্ষেপের মধ্যেও তার মনে একটা দুশ্চিন্তা জমাট বেঁধে ওঠে।বাবাকে এখনও মায়ের বিষয়টি জানানো হয় নি। কিভাবে কথাটা বলা হবে সেটাই ভেবে উঠতে পারছে না তারা। এমনিতেই বাবাকে কিছুটা অপ্রকৃতস্থ লাগছে। মায়ের কথাটা শোনার পর সেটা আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় কেউ বিষয়টি জানাতে সাহস করে না।কিন্তু বলতে তো হবেই।
কিন্তু কি করে মায়ের মৃত্যু সংবাদটা বাবাকে শোনানো হবে সেটাই ভেবে পায় না শঙ্খ। ওই টানাপোড়নের মধ্যে বাড়ি ফেরে তারা। সেখানে তখন শুধুমাত্র যারা আদালতে গিয়েছিলেন তাদের কারও কারও বাড়ির লোকজন অপেক্ষায় ছিলেন।কিন্তু তারা কেউ তখনও পর্যন্ত জামিনের খরবটা পর্যন্ত জানতেন না। রিলিজের ব্যস্ততায় তাদেরও আর খবর দেওয়া হয়ে ওঠে নি। জামিন হয়ে যাওয়ার পর আজ আর সংবাদিকরা সংবাদ সংগ্রহ করতে আসেন নি। অথচ জামিন বাতিলের খবরটা এতদিন অনেক আগেই তাদের মাধ্যমেই সবাই বাড়ি বসে পেয়ে গিয়েছেন। আগাম খবর না পেলেও বাড়ির দরজায় গাড়ি থামতে দেখে অবশ্য সবাই জামিনের বিষয়টি আন্দাজ করতে পারে। তাই তারা গাড়ির দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। সবার আগে ছুটে আসে মালা।



No comments:
Post a Comment