অন্তরালে
অর্ঘ্য ঘোষ
( ধারাবাহিক উপন্যাস )
সেদিন আর বাড়ি ফেরা হয় না মধুরিমার। এই অবস্থায় ফেরা যে হবে না তা ধরেই রেখছিল সে। সেইজন্য গ্রাম সম্পর্কিত এক বৌ'দিকে শ্বশুর- শাশুড়িকে দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়ে এসেছিল। অভিজিৎকে অবশ্য সন্ধ্যের মুখেই বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। অভিজিৎ ছোট থেকেই দাদু-ঠাকুরমার খুব ন্যাওটা। সে বাড়িতে থাকলেও তাদের কিছুটা দেখাশোনা করতে পারবে। তার সমস্যার কথা ভেবে অতসীকাকীরা তাকে অভিজিতের সঙ্গেই বাড়ি ফিরে যেতে বলেছিলেন।অতসীকাকীরা বলেছিলেন , তেমন বুঝলে তুমিও ছেলের সঙ্গে যেতে পার। তারপর কাল না হয় আবার আসবে।আমরা তো আছিই। কোন অসুবিধা হবে না।কিন্তু মালাকে ফেলে যেতে মন চায় নি তার। ভাইঝিকে বুকে চেপে রাতটা কেটে যায় তার।সৌরভরা না ফিরলে সে কিছুতেই বাড়ি যেতে পারবে না। ছেলেমেয়ে দুটোকে নিয়ে খুব দুশ্চিন্তা হয় তার।
শ্বশুর-শাশুড়িকে ফেলে রেখে বেশিদিন এখানে পড়ে থাকা তো তার পক্ষে সম্ভব হবে না। একদিন তাকে বাড়ি ফিরে যেতেই হবে। তখন কি হবে ? মাথার উপরে অভিভাবক বলতে কেউ নেই। কি করে একা থাকবে ছেলেমেয়ে দুটো ? দুশ্চিন্তায় দু'চোখের পাতা এক করতে পারে না সে। পরদিন সৎকার করে ফিরতে ওদের বিকেল গড়িয়ে যায়। তারা ফিরতেই ফের কান্নার রোল ওঠে বাড়িতে। মালাকে সামলে রাখা যায় না। সে ছুটে গিয়ে দাদার দু'হাত ধরে ঝাঁকুনি দিতে দিতে বলে -- দাদা তুই মাকে কোথায় রেখে এলি? তুই মাকে ফিরিয়ে এনে দে - ফিরিয়ে এনে দে।
বলতে বলতে অজ্ঞান হয়ে যায় সে। তাকে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দেওয়া হয় ঘরে। চোখে মুখে জল ছিটিয়ে জ্ঞান ফেরানো হলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ে সে। কেঁদে কেঁদে কাল সারা রাত ঘুমোয় নি। নানা ভাবে সান্ত্বনা দিয়েও তাকে ঘুম পাড়াতে পারে নি মধুরিমা। তাই এখন সে ঘুমিয়ে পড়ায় কিছুটা স্বস্তি পায় মধুরিমা। এই ঘুমটা খুব দরকার ছিল মালার।পরম মমতায় ভাইঝির কপালে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে সে।ভাইপো - ভাইঝিকে ফেলে কাজের আগে আর বাড়ি ফিরে যাওয়া হয় না মধুরিমার। এই কয়েকদিন সৌরভই দুই বাড়ির যোগসূত্র রক্ষা করে চলেছে। শ্বশুর - শাশুড়ি সৌরভের কাছে তার বাড়ি না ফেরার কারণ জানতে চেয়েছিলেন। সৌরভ তাদের স্বাতীর অসুখের কথা বলে কোন রকমে সামাল দিয়েছে। কিন্তু কি ভাবে তাদের আসল কথাটা বলবে তা ভেবে পায় না মধুরিমা।সেই হিসাবে স্বাতীর অসুখের কথাটা বলে সৌরভ ভালই করেছে বলে মনে হয় তার।
কারণ অসুখ বাড়াবাড়ির পর্যায়ে না হলে সে যে এতদিন এখানে আটকে থাকত না , সেই আন্দাজ করতে শ্বশুর-শাশুড়ির নিশ্চয় অসুবিধা হবে না। সেক্ষেত্রে চূড়ান্ত কিছু সহ্য করার মতো তাদের মানসিক প্রস্তুতি একটা গড়ে উঠতে পারে বলেই তার মনে হয়।কিন্তু দাদা ? দাদাকে কি ভাবে বলা হবে কথাটা ? কিভাবে নেবে দাদা ? দু'জনে দুজনকে যে খুব ভালোবাসত সে কথা তো আর তার অজানা নয়। সে আর কিছু ভাবতে পারে না। মাথাটা যেন টনটন করে ওঠে তার। তাই সময়ের হাতেই সব ছেড়ে দেয় সে। সময়ই সবাইকে সব কিছু সইয়ে দেয়। এক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয় না। শঙ্খ - মালাও আস্তে আস্তে মায়ের শোক কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করে। তারা কিছুটা স্বাভাবিক হতেই বাড়ি ফিরে যায় মধুরিমা। যাওয়ার আগে সৌরভকে বলে হাট-বাজার সব করিয়ে দিয়ে যায় সে।ঠিক হয় সৌরভ দুবেলা আসা-যাওয়া করবে।প্রিয় না ফেরা পর্যন্ত রাতে এ বাড়িতেই থাকবে সে।
ওইভাবেই দিন কাটে দুই ভাইবোনের। জীবনে ঘটনা-দুঘর্টনা পুকুরের জলে ঢিল পড়ার মতো। যখন ঢিল পড়ে তখন আলোড়ন ওঠে। তারপর আস্তে আস্তে সব থিমিয়ে যায়। গতানুগতিকতায় নিজস্ব ছন্দে ফেরে জগত। শুধু সেই জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে দুই ভাইবোন। পরিস্থিতির চাপে কার্যত নিজেদের স্বেচ্ছাবন্দী করে ফেলে তারা। বাবা জেলে যাওয়ার পর তারা সেই যে আলোচনার খোরাক হয়ে উঠেছিল তা আজও তাদের পিছু ছাড়ে না। স্কুল- কলেজ যাওয়া আগেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। মায়ের মৃত্যুর পর তাদের বাড়ি থেকে বেরনোও বন্ধ হয়ে যায়। তাদের দেখেই প্রসাদ মোড়লের অনুগামীরা শুনিয়ে শুনিয়ে বলে -- মিলল তো এবার ? নিজের স্ত্রীকেও লজ্জায় গলায় দড়ি দিতে হল ?
ওইসব কথা শুনে চোখ ফেটে জল আসে ওদের। কিন্তু কাউকে কিছু বলতে পারে না। নিজেদের মধ্যেই সেই দুঃখ ভাগ করে নেয়।
মালা বলে , দাদা আমরা তো কোন অপরাধ করি নি কিন্তু আমাদের কেন এ ভাবে শাস্তি ভোগ করতে হচ্ছে বলতে পারিস ? সবাই আমাদের বাবাকে এভাবে কালি মাখিয়ে কি সুখ পাচ্ছে বলতো ?
বোনের কথার কোন জবাব দিতে পারে না শঙ্খ। কেবল বলে , দেখ না তিন মাস পূর্ণ হতে আর তো মোটে কয়েকটা দিন মাত্র বাকি।
উকিলবাবু বলেছেন ওইদিন বাবার জামিন হয়ে যাবে। তারপর সবার মুখ বন্ধ হয়ে যাবে। হতাশার মধ্যে একমাত্র আশার আলো জ্বালিয়ে রাখে বাবার জামিনের সম্ভাবনা। তাই সেই দিনটির প্রতীক্ষায় দিন কাটে দুই ভাইবোনের।প্রতীক্ষায় থাকে প্রসাদ মোড়লরাও। প্রিয় জেলে যাওয়ার পর হাসপাতালের ডায়্যাগনস্টিক্ সেন্টারে আর কোন কর্মী আসে নি। অনেকের ধারণা প্রসাদ মোড়লরাই প্রভাব খাটিয়ে কাউকে আসতে দেন নি। তাই সেই থেকেই হাসপাতালের ডায়্যাগনস্টিক্ সেন্টার তালাবন্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে। আর সেই সুযোগে ভবানীডাক্তারদের সেন্টারে ভীড়
উপছে পড়ছে। একতরফা ভাবে রোগীদের গলা কেটে লালে লাল হয়ে উঠছে প্রসাদ মোড়ল আর ভবানীডাক্তার। তাদের যাঁতাকলে পড়ে গ্রামের গরীব মানুষের নাভিশ্বাস দেখা দিয়েছে। তারা প্রকাশ্যেই বলাবলি করতে শুরু করেছেন -- আর তো ক'টা দিন। তারপর প্রিয় জামিন পেয়ে ফিরে এলে কসাইয়ের মতো গলা কাটা ঘুচে যাবে।
তাই প্রসাদ মোড়লরাও খুব উদ্বেগে রয়েছে। সবে ব্যবসাটা জমে উঠেছে। এইসময় প্রিয় ফিরে এলে যে তাদের বাড়া ভাতে ছাই পড়ে যাবে তা তারা ভালোই জানে। তাই সে যাতে সহজে ফিরে আসতে না পারে তার জন্য তারা অবশ্য চেষ্টার কসুর কিছু কম করে নি। আরতিকে দিয়ে প্রথমে শ্লীলতাহানি অভিযোগ দায়ের করলেও পরে আবার বিচারকের কাছে গোপন জবানবন্দী দিয়ে ধর্ষণের ধারা যোগ করিয়ে দিয়েছে। নাহলে তো এতদিন জামিনে ছাড়া পেয়ে যেত প্রিয়।
দুজনে সেই কথাই আলোচনা করে। প্রসাদ মোড়ল বলে , ভাগ্যিস তখন সদানন্দ উকিল ধর্ষণের ধারা যোগ করার বুদ্ধিটা বাতলে দিয়েছিলেন। নাহলে তো বাছাধন এতদিন জামিন পেয়ে ফিরে চলে আসত। তবে যতই যা করুক , বাছাধনকে আর সাজা না খেটে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে না।
---- সে কথা একবার না একশোবার। ওসি তো বলেই গিয়েছেন জামিন হওয়ার আগেই আদালতে চার্জশিট পাঠিয়ে দেব। তাহলে আর বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাড়ি ফিরতে হবে না বাছাধনকে।
---- কিন্তু সেই ওসি তো আর নেই। নতুন যে এসেছে সে কেমন যেন বেসুরো গাইছে। এখন যদি আগের ওসি চার্জশিট পাঠিয়ে না দিয়ে যায় তাহলে তো মহা মুশকিল। প্রিয় ব্যাটা ফিরে এসে কাজ শুরু করে দিলে তো আমাদের ব্যবসা লাটে উঠবে। ওসিকে এক কাঁড়ি টাকা দিতে হয়েছে। সেই টাকা এখনও ওঠেনি। তারপর ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলে তো যাকে বলে ধনেপ্রাণে মারা পড়ব।
---- না- না, টাকা যখন নিয়েছেন তখন ওসি কাজ করেই গিয়েছেন। তাছাড়া অত ভাবনারও কিছু নেই।
---- ভাবনার কিছু নেই মানে, কি বলছ তুমি ?
----- ঠিকই বলছি। বাছাধন যদি ওইদিন জামিন পেয়েও যায় তাহলে তো আর এসেই কাজে যোগ দিতে পারবে না।
---- কেন ?
---- যতদিন না ও নির্দোষ প্রমাণিত হচ্ছে ততদিন তো ওকে সাসপেন্ড থাকতে হবে। তারপরেও যদি বেগোরবাই করে তাহলে ফের কোন ফন্দি এঁটে শ্রীঘরে পাঠিয়ে দিলেই হলো।
--- ওঃ সদ্য হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। এদিকটা আমার মাথায় আসে নি। তোমার তো দেখছি রাজনীতি করা মাথার চেয়ে ব্রেন বুদ্ধি বেশি।
প্রশংসায় আত্মপ্রসাদ লাভ করে ভবানীডাক্তার।শুরু হয়ে যায় নির্ধারিত দিনের প্রতীক্ষা। অবশেষে এসে পড়ে সেই নির্ধারিত দিন। সৌরভ, প্রশান্তকাকাদের সঙ্গে সেদিনও আদালতে যায় শঙ্খ। জামিনের ব্যাপারে সেদিন সবাই খুব আশাবাদী। তার উপরে উকিলবাবুও ভরসা দিয়ে বলেছেন , যে ভয়টা পাচ্ছিলাম সেটা কেটে গেছে। ভেবেছিলাম ওরা পুলিশকে টাকা খাইয়ে চার্জশীটটা পাঠিয়ে দেবে। তাহলে বিচার প্রক্রিয়া শেষ না হলে আর জামিন মিলত না। কিন্তু সেটা ওরা পারে নি চবলেই মনে হচ্ছে। এরপরেও জামিন না হলেও বুঝতে হবে আমাদের কপাল মন্দ।
কপাল যে তাদের মন্দ তা তো আর অজানা নয় শঙ্খর। তাই ভগবানকে ডাকে সে। তার মধ্যেই তারা দুর্যোগের ছায়া দেখতে পায়। প্রসাদ মোড়ল আর ভবানীডাক্তারকে উৎফুল্ল ভাবে সরকারি আইনজীবির চেম্বার থেকে বেরোতে দেখে তাদের মনে কু ডাকে। জামিন সম্পর্কে তাদের মনে যেটুকু আশার সঞ্চার হয়েছিল তা এক নিমেষেই উবে যায়। প্রশান্তদাদু বলেন , শয়তান দুটো দেখছি এখানেও এসে পৌঁচ্ছেছে। নিশ্চয় কোন কুমতলব আছে। হয়তো খবর পেয়েছে আজ প্রিয়র জামিন হওয়ার সম্ভাবনা আছে , তাই সরকারি উকিলকে টাকা খাইয়ে বাগড়া দেওয়ার জন্য হাজির হয়েছে।
প্রশান্তদাদুর কথা শুনে শঙ্খর মনে দুশ্চিন্তা শুরু হয়ে যায়। আজ সে বাবাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারবে বলে বড়ো আশা নিয়ে এসেছে। মালাকেও সেই কথা বলে এসেছে সে। কিন্তু প্রসাদ মোড়লদের চক্রান্তে আজও যদি বাবার জামিন বাতিল হয়ে যায় তাহলে মালাকে গিয়ে কি বলবে সে ? নিজেই বা সইবে কি করে ? উদ্বেগে যেন তার দম বন্ধ হয়ে আসে। চূড়ান্ত খবরটা না পাওয়া পর্যন্ত কিছুতেই স্বস্তি পায় না। তাই দুরু , দুরু বুকে আদালতের দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে সে।



No comments:
Post a Comment