অন্তরালে
অর্ঘ্য ঘোষ
( ধারাবাহিক উপন্যাস )
আবছা আলোতেই দেখতে পায় কড়িকাঠ থেকে গলায় কাপড়ের ফাঁস দিয়ে ঝুলছে মা। পায়ের নিচে উল্টে পড়ে রয়েছে একটা টুল। কি ঘটেছে তা অনুধাবন করতে এক মুহূর্তও সময় লাগে না তার। তবুও দ্রুত মায়ের পা দুটো নিজের কাঁধে নিয়ে উপর দিকে তুলে ধরার চেষ্টা করে সে। তারপর চিৎকার করে ওঠে। সেই চিৎকার শুনে একে একে ছুটে আসেন পাড়াপ্রতিবেশীরা। তারাই কাপড় কেটে নামিয়ে স্বাতীকে বিছানায় শুইয়ে দেন। মালা ছুটে গিয়ে মায়ের বুকে কান লাগিয়ে হৃদস্পন্দন শোনার চেষ্টা করে।
কিন্তু মায়ের বুকে কোন স্পন্দনই টের পায় না। তাই মাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে সে। ততক্ষণে একে একে প্রশান্তদাদু , সুরোঠাকুমারা সহ আরও অনেকে এসে পড়েন। তারা মালাকে নানাভাবে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন। অতসীঠাকুমা বলেন , এখনই খারাপটা ধরছিস কেন ? এইসব ক্ষেত্রে অনেক সময় শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে গেলেও কিছুক্ষণ পর আবার চালু হয়ে যায়। ডাক্তারকে খবর পাঠোনো হয়েছে। তিনি এসে আগে দেখুন।
কিন্তু কোন সান্ত্বনাই মালাকে শান্ত করতে পারে না। কারণ সে বোঝে অতসীঠাকুমাদের কথা আসলে সান্ত্বনা বাক্য ছাড়া কিছু নয়। কারণ সে তো বুঝেই গিয়েছে সর্বনাশ যা হওয়ার তা হতে আর বাকি নেই। তবু অতসীঠাকুমাদের কথা বিশ্বাস করতে খুব ইচ্ছা হয় তার। সে মনে মনে বলে, ভগবান ওই কথাই যেন সত্যি হয়।সেই সময়ই এসে পৌঁছোন ডাক্তারবাবু। তিনি স্বাতীর হাতটা তুলে ধরে নাড়ী পরীক্ষা করতে শুরু করেন।ডাক্তারবাবুর মুখের দিকে আকুল দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে মালা। কিন্তু ডাক্তারবাবু মাথা নেড়ে মায়ের হাতটা নামিয়ে রেখে বলেন , স্যরি অনেকক্ষণ আগেই উনি চলে গিয়েছেন। ডাক্তারবাবুর কথা শেষ হতেই মালাকে আর সামলাতে পারে না কেউ। সে পাগলের মতো করতে থাকে। চিৎকার করে বলতে থাকে , এই সমাজই আমার মাকে বাঁচতে দিল না। খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করা হল।
সেই সময় কাঁদতে কাঁদতে আদালত থেকে ফেরে শঙ্খরা। গ্রামে ঢোকার মুখেই খবর পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে আসছে তারা।
বাড়িতে ঢুকেই মালার মতোই মায়ের বুকে আছড়ে পড়ে শঙ্খ। দুই ভাইবোন একে অন্যকে ধরে কেঁদেই চলে।কান্না থামিয়ে একসময় অভিমানহত গলায় শঙ্খ বলে , মাগো কে কি বলল সেটাই তোমার কাছে বড়ো হল মা ? আমাদের কথা ভাবলে না মা ? এ তুমি কি করলে মা ? বাবা জেলে , তুমিও আমাদের ফেলে চলে গেলে। আমরা যে অনাথ হয়ে গেলাম মা। এবার কার কাছে থাকব আমরা ?
সেই সময় কাঁদতে কাঁদতে এসে পৌচ্ছোয় মধুরিমা। ভাইপো - ভাইঝিকে বুকে টেনে নিয়ে সে বলে , নিজেদের অনাথ ভাবছিস কেন তোরা ? আমি আছি না ? অত ভেঙে পড়লে চলে ? মা একটা ভুল ধারণা নিয়ে চলে গিয়েছেন। তোদের এখন বাবাকে নির্দোষ প্রমাণ করে ফিরিয়ে আনতে হবে। তবেই মা উপর থেকে শান্তি পাবেন।ভাইপো - ভাইঝিকে স্বান্ত্বনা দিতে গিয়ে নিজেকেই ধরে রাখতে পারে না মধুরিমা। স্বাতী তো শুধু তার ননদ ছিল না , ছিল প্রিয় সখী। সে'ই তো তাকে এ বাড়ির বউ করে আনার ব্যাপারে উদ্যোগী হয়েছিল। সেই প্রিয় সখী চোখের সামনে চিরশয্যায় শুয়ে আছে , চোখের জল কি আর বাঁধ মানে! তার দুচোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু ধারা। পিছনে ফেলে আসা কত সুখ স্মৃতি ভীড় করে আসে মনে।
সেই মাঠপালুনি , সেই নবান্ন উৎসবে দাদাকে মাঝে রেখে স্বাতীকে অপ্রস্তুতে ফেলার কথা মনে পড়ে যায় তার। চোখের সামনে ভেসে ওঠে স্বাতীর সেদিনকার সেই লজ্জা রাঙা মুখ। ফেলে আসা সেইসব দিনের কথা ভাবতে ভাবতেই কখন একটু আনমনা হয়ে পড়ে মধুরিমা। মালার কথায় সম্বিৎ ফেরে তার। মালা তার হাত ধরে বলে, জানো তো পিসিমনি মা ধরে নিয়েছিল বাবা আজ ফিরে আসবে। তাই কত বার যে ঘর বার করেছে তার ঠিক নেই। তারপর যখন সাংবাদিকরা এসে মাকে বার বার বলছিল, বলুন এর পরেও কি আপনি আপনার স্বামীকে নির্দোষ বলে মনে করেন , তখনই মা যেন কেমন হয়ে যায়। মনে হয় তখনই মা সব কিছু ঠিক করে ফেলেছিল। কিন্তু আমাকে টেরটি পর্যন্ত পেতে দেয় নি। সকাল থেকে পেটে কিছু পড়ে নি বলে রান্না করলাম। মা আমার রান্না করা খাবারটাও খেয়ে গেল না পিসিমনি।
ফের কেঁদে ওঠে সে। মধুরিমা তাকে বুকে টেনে নিয়ে বলে, ওরে তোরা আর কাঁদিস নে। আমি যে আর সইতে পারছি না।
সেই সময় ছোট ছেলের মতো কাঁদতে কাঁদতে ছুটে আসেন গঙ্গাধর বাবাজী। স্বাতীর মৃতদেহের সামনে দাঁড়িয়ে বলেন , ফাঁকি দিয়ে চলে গেলি মা ? চলে যাবি বলেই বুঝি কারও কাছে ঋণী থাকতে চাস নি। আমি তো তোর ছেলে রে মা।ছেলের সবই তো মায়ের। ছেলের কাছে কিছু নিলে মায়ের কি ঋণ হয় ?
তারপর সবার দিকে চেয়ে ফের কান্না জড়ানো গলায় বলেন , জানো সেদিন কিছু টাকা মাকে দিতে গিয়েছিলাম।বলেছিলাম , মা আমি তো ভিক্ষারী মানুষ।আমার আর সামার্থ্য কতটুকু ? এই দুর্দিনে তুমি মা সামান্য টাকা ক'টা রাখো। তা মা কি বলল জানো ? বলল, টাকাটা আপনার কাছেই রাখুন। সময় মত চেয়ে নেব। আর তো সেই সময় হলো না মা।
আক্ষেপ তার গলায় কান্না হয়ে ঝড়ে পড়ে। আক্ষেপ ঝড়ে পড়ে অতসীদের গলাতেও। তারা বলেন , আমরা তো সেই সময় চিৎকার চেঁচামিচি শুনেই ছুটে এসেছিলাম। কত সাস্ত্বনা দিয়ে গেলাম। বৌমা যে এরকম কিছু করতে পারে সে আভাস আমরাও পায় নি গো। নাহলে কি আর ছেড়ে যায়। মা আমাদের সতীলক্ষী ছিল। তাই তো পতীনিন্দা সহ্য করতে না পেরে চলে গেল।
সেই সময় বাইরে একটা গাড়ি এসে থামে। ভিতরে ঢুকে আসেন কয়েকজন পুলিশ। পুলিশ দেখে সবার মধ্যে একটা চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। সেটা লক্ষ্য করেই একজন অফিসার গোছের পুলিশকর্মী হাতজোড় করে এগিয়ে এসে বলেন , ডাক্তারবাবুর কাছে খবর পেয়ে আমরা আসছি। মাফ করবেন, আপনাদের মানসিক অবস্থা আমি জানি। তবুও কর্তব্যের খাতিরে আমাদের কিছু জিজ্ঞাস্য আছে। যদি আপনারা কেউ একজন দয়া করে সাহায্য করেন তাহলে খুব ভাল হয়। আপনারাও বডি নিয়ে পোষ্টমর্টের জন্য রওনা দিতে পারবেন।
সেই কথা শুনে সৌরভ নিজের পরিচয় দিয়ে পুলিশ অফিসারকে পাশের ঘরে নিয়ে যায়। অফিসার প্রথমেই জানতে চান, মৃত্যুর আগে উনি কি কোন চিঠি লিখে রেখে গিয়েছেন ?
সৌরভ বলে , না সেই রকম কোন চিঠি পাওয়া যায় নি। মনে হয় সবার নজর এড়িয়ে চিঠি লিখে রেখে যাওয়ার সময় উনি পান নি।
---- চিঠিটা থাকলে আইনী জটিলতার আশঙ্কা থাকত না। তবে এক্ষেত্রে নিশ্চয় অন্যরকম অভিযোগ উঠবে না। ইটস ওকে। হতেই পারে, হঠাৎ আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিলে চিঠি লিখে রেখে যাওয়া সবার ক্ষেত্রে সম্ভব নাও হতে পারে।
আরও কিছু তথ্য জেনে নিয়ে একটা কাগজ লিখে দিয়ে অফিসার বলেন , আপনাদের আর থানায় যেতে হবে না। একটা গাড়ি ডেকে নিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সরাসরি বডি নিয়ে হাসপাতালে চলে যান। মর্গে এই কাগজটা দেখালেই পোষ্টমর্টের ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
একজন পুলিশ কর্মীকে রেখে অফিসার অন্যান্যদের নিয়ে চলে যান। ওই পুলিশ কর্মী তাদের সঙ্গে মর্গে যাবেন। এমন ব্যবস্থা হতে পারে সেই আন্দাজ করেই ঋজু পাশের গ্রামের বাপির গাড়ি বলে রেখেছিল। পুলিশের জিপের শব্দ মিলিয়ে যেতে না যেতেই এসে পৌঁচ্ছে যায় সেই গাড়ি। তারপরই শুরু হয়ে যায় বেরনোর তোড়জোড়। কিন্তু শ্মশানবন্ধুরা যখন স্বাতীর মৃতদেহ শেষ যাত্রার খাটে শোওয়ানোর উপক্রম করেন, তখন আর নিজেকে সামলে রাখতে পারে না সৌরভ। এতক্ষণ ভাগ্নে-ভাগ্নীর কথা ভেবে সে নিজেকে কোনরকমে ধরে রেখেছিল।কিন্তু এবার সে কান্নায় ভেঙে পড়ে। কাঁদতে কাঁদতে সে বলে ওঠে , তোর ভিতরে এত অভিমান জমা হয়েছিল তা একটিবারের জন্যও আমাদের টের পেতে দিলি না। নিজেই একা সব হজম করে চলে গেলি ? কেন তুই এমন করলি ? ছোট থেকে তো দুই ভাইবোন সব ভাগ করে নিয়েছি। কিন্তু এই অভিমানের ভাগটা তুই আমাকে দিলি না। একাই সব নিয়ে চলে গেলি ? বাবা-মাকে আমি কি বলব তুই একটিবার বলে দিয়ে যা। আমার তো আর বোন নেই, এবার থেকে আমি কার কাছে ভাইফোঁটা নেব তুই বলে দিয়ে যা, তুই বলে দিয়ে যা ?
স্বাতীর মৃতদেহ ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলেই চলে সে। মধুরিমা এসে তাকে সরিয়ে নিয়ে যায়। সেই সুযোগে শ্মশানবন্ধুরা মৃতদেহ নিয়ে গিয়ে গাড়িতে তোলে। ঠিক হয় পোষ্টমর্টের পর কংকালীতলা শ্মশানেই মৃতদেহ সৎকার করা হবে।সেখানেই মায়ের মুখাগ্নি করবে শঙ্খ। এজন্য শ্মশানবন্ধুদের সঙ্গে শঙ্খকে নিয়ে সৌরভও যাবে।প্রথমে ঠিক ছিল যাওয়ার পথে স্বাতীর বাবা-মা এবং জেলে প্রিয়কে একবার দেখানো হবে। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে উপস্থিত মানুষজনের মধ্যে দ্বিমত তৈরি হয়। কেউ কেউ বলেন , আর তো কোনদিন দেখা হবে না। শেষববারের মতো চোখের দেখাটাও অন্তত দেখানো উচিত। অন্য অংশের মতে , এতে ওদের কষ্টই বাড়ানো হবে। দুপক্ষের মধ্যে টানাপোড়েন শুরু হয়ে যায়। পরিস্থিতির সামাল দিতে হাল ধরতে হয় মধুরিমাকে। এ পরিবারের অভিভাবক বলতে তো আর কেউ নেই। সৌরভ আর তাকেই যা করার করতে হবে। কিন্তু একমাত্র বোনকে হারিয়ে একেবারে ভেঙে পড়েছে সৌরভ। তাই সিদ্ধান্তটা মধুরিমাকেই নিতে হয়। কোন পক্ষের যুক্তিই উড়িয়ে দিতে পারে না সে। কিন্তু স্বাতীর মরা মুখ দেখলে কাউকেই আর সামলে রাখা যাবে না তা সে ভালোই জানে। হঠাৎ করে মেয়ের মৃত্যু সংবাদ পেলে শ্বশুর-শাশুড়ি হয়তো হার্টফেল করেই বসবেন।
আর জেলের ভিতর দাদার কি অবস্থা হবে তা তো তারা জানতেও পারবে না। সেই কথাটিই সে বুঝিয়ে বলে সবাইকে। সবাই তার যুক্তি মেনে নেয়। তারপরই একে একে সবাই গাড়িতে গিয়ে উঠে বসে। বেজে ওঠে খোল - করতাল। গঙ্গাধর বাবাজী গেয়ে ওঠেন শেষ যাত্রার গান ' বোল হরিবোল, পথেরই সম্বল বল ভাই '। কিন্তু গাড়ির চাকা গড়াতেই মা-মা বলে সেদিকে ছূটে যায় মালা। মধুরিমা তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে। পিসিমনির বুকে কান্নায় ভেঙে পড়ে মালা। মালাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ওঠে মধুরিমা। গাড়ির উপর শুয়ে গাঁ মুখো পা করে চলে যায় স্বাতী। ক্ষীণ হয়ে আসে শেষ যাত্রার গানের সুর। ভাইঝিদের নিয়ে বাড়ির অভিমুখে রওনা দেয় মধুরিমা।
( ক্রমশ )



No comments:
Post a Comment