Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

অন্তরালে -- ৫৭




     অন্তরালে


         অর্ঘ্য ঘোষ 



( ধারাবাহিক উপন্যাস ) 




চাকরি পাওয়ার পর বাবাকে আর মাঠে যেতে দেয় নি প্রিয়। তাই সেই থেকেই অনাবাদী হয়েই পড়ে আছে জমি। প্রিয়র বেতনের টাকাতেই ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া, সংসার খরচ সহ সব দিক সামলেছে স্বাতী। এতদিন কোন সমস্যা হয় নি। কিন্তু আর চলছে না। দু'মাসের উপরে জেলে রয়েছে প্রিয়। যখন জেলে যায় তখন মাসের শেষ। সব মিলিয়ে তিন মাস বেতন আসে নি। এতদিন সংসার খরচ থেকে যে ক'টা টাকা বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছিল তা দিয়ে কোন রকমে সংসার আর আইনী লড়াইটা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে। কিন্তু সেই সম্বলও নিঃশেষ হয়ে পড়েছে। এরপর কি ভাবে চলবে তা ভেবে পায় না স্বাতী। এইসময় জেলে যাওয়ার আগে যে মাসটা প্রিয় কাজ করেছিল সেই মাসের বেতনটা পেলেও ধাত রক্ষা হত। কিন্তু প্রিয় জেলে থেকে না ফেরা পর্যন্ত সেটাও পাওয়া সম্ভব নয় বলে হাসপাতালের ডাক্তারবাবু জানিয়েছেন। সেদিন ডাক্তারবাবু আর নার্সরা এসেছিলেন দেখা করতে। স্বাতী তাদের সমস্যার কথা কিছু বলতে পারে নি।ডাক্তারবাবু নিজে থেকেই জানিয়েছিলেন , সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রিয়কে নাকি সাসপেন্ড করা হয়েছে। যতদিন না সে নির্দোষ প্রমাণিত হচ্ছে ততদিন তাকে সাসপেন্ডই থাকতে হবে। সাসপেন্ড থাকাকালীন অর্ধেক বেতন পাবে সে।নির্দোষ প্রমাণিত হলে অবশ্য চাকরি এবং সুদ সহ বাকি অর্ধেক বেতনের টাকা সে ফিরে পাবে। একমাসের পুরো আর দু'মাসের অর্ধেক বেতনও এসে পড়ে রয়েছে। কিন্তু প্রিয়র সই ছাড়া তো সেই টাকা অন্য কাউকে দেওয়াও যাবে না।
সেই কথা শুনে খুব মুসড়ে পড়ে স্বাতী। সামনেই ফের জামিনের আবেদনের দিন রয়েছে। চাল- ডাল সব ফুরিয়েছে , কি করে সবদিক সামাল দেবে তা ভেবে পায় না সে। ডাক্তারবাবু অবশ্য টাকার প্রয়োজন হলে তাকে জানাতে বলেছিলেন। কিন্তু মুখ ফুটে সে তাদের আর্থিক সংকটের কথা বলতে পারে নি। গঙ্গাধর বাবাজি একদিন দেখা করতে এসে কিছু টাকা তার দিকে এগিয়ে ধরে বলেছিলেন ,  মা এসময় টাকা পয়সার খুব দরকার হয় তা জানি। আমি তো ভিক্ষারী মানুষ। খুব সামান্যই সামর্থ্য আমার। তবু এই টাকা ক'টা তুমি রাখো মা।
স্বাতী সবিনয়ে তাকে বলে , কাকা আপনি যে হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন তাতেই আমি অনেকখানি মনের জোর ফিরে পেয়েছি। এখন টাকা লাগবে না। আপনার কাছেই রাখুন। দরকারে চেয়ে নেব।
---- নেবে তো মা ? ভিক্ষারীর টাকা বলে নিতে সংকোচ করবে না বলো --।
একরকম দিব্যি করিয়ে নিয়ে সেদিন বাড়ি ফিরেছিলেন গঙ্গাধরকাকা।প্রশান্তকাকাদেরও কাছে সে মুখ ফুটে টাকার সমস্যার কথা বলতে পারে নি। প্রশান্তকাকারাও নিজে থেকেই সাহায্যের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু স্বাতী নিতে পারে নি। কারণ তার তো আর প্রশান্তকাকাদের অর্থনৈতিক অবস্থার কথা অজানা নয়। সবাই ছা'পোষা মানুষ। যৎসামান্য জমিজিরেত চাষ করে কোনরকমে দু'বেলা দু'মুঠোর সংস্থান হয়। ওইসমস্ত মানুষদের কাছে নিজের সমস্যার কথা বলা মানেই তাদের বিড়ম্বনায় ফেলা। তাই সমস্যার কথা কাউকেই কিছু বলতে পারে না সে। তাই ভেবে পায় না কি করে সামনের দিনে উকিলের টাকা যোগাড় হবে। দুদিন পরেই আদালতে প্রিয়র জামিনের ডেট রয়েছে। সে শুধু কি করে টাকার সংস্থান হবে সেই কথাই ভাবছিল। 



                                         সেই সময় মধুরিমা যেন তার ভাবনার ভগবান হয়ে আসে।এমনিতে সৌরভ আদালতে যাওয়া আসা করলেও শয্যাশায়ী শ্বশুর - শাশুড়িকে ফেলে মধুরিমার আসা হয় না বললেই চলে। সেদিন ছেলেকে নিয়ে কিছুক্ষণের জন্য আসে সে। সম্পর্কে তারা পরস্পর বৌদি-ননদ। কিন্তু সম্পর্কটা আসলে তাদের বন্ধুর মতো। তাই অনেকদিন পর একে অন্যকে পেয়ে কেঁদে ভাসায়। দু'জনে যন্ত্রণাটা ভাগ করে নেয়। মনটা হালকা হয় দুজনের। যাওয়ার আগে মধুরিমা কিছু টাকা স্বাতীর দিকে এগিয়ে ধরে। 
স্বাতী দ্রুত হাত সরিয়ে নিয়ে বলে --- না , না টাকা কেন ?
 ---- না কেন ? এইসময় টাকাটাই বেশি দরকার। টাকা না হলে দাদার কেসের খরচ , তোদের সংসার চলবে কি করে শুনি ?
---- সে আমি এক রকম করে চালিয়ে নেব।
---- আমরা থাকতে তোরা একরকম করে চালিয়ে নিবি কেন ,  আমরা কি পর ? 
--- না , তা নয়। তবে ----।
--- তবে আবার কি ? শোন যে মানুষটা তোর বর , সে আগে আমার দাদা। আর সেই মানুষটা জেলে থাকলে , তোর যেমন গলা দিয়ে খাবার নামবে না , চোখে ঘুম আসবে না , আমারও যে তাই হবে বুঝিস না কেন ? আর সেই মানুষটার স্ত্রী - ছেলেমেয়ে কষ্টে থাকলে আমি কি শান্তিতে থাকতে পারব ?  তাছাড়া ও বাড়ির সব কিছুতেই যে তোরও সমান অধিকার আছে রে। তাতেও যদি মন না মানে তাহলে নাহয় যে সুদিন আসবে সেদিন ফিরিয়ে দিস।
আর কোন আপত্তি করতে পারে না স্বাতী। মধুরিমা তার হাতটা টেনে নিয়ে মুঠোর মধ্যে টাকা ক'টা গুঁজে দিয়ে এক রকম পালিয়ে যায়। প্রথমে আপত্তি জানালেও টাকাটা হাতে পাওয়ার পর অবশ্য নিজেকে অনেকটাই দুশ্চিন্তা মুক্ত লাগে স্বাতীর। সে ভেবেই রেখেছিল যে কোন একটা গয়না খুলে দেবে সৌরভের হাতে। গয়নাতে হাত দিতে তার মন চাইছিল না। গয়নাগুলো মালার বিয়ের জন্য তুলে রেখেছিল। হাজার অনটনেও সেই গয়নায় কখনও হাত দেয় নি। কিন্তু মালার বিয়ে নিয়েই সংশয় সৃষ্টি হয়েছে।সৌমিকের বাবা তো সাফ জানিয়ে দিয়েছেন মালার সঙ্গে আর ছেলের বিয়ে দেবেন না। অথচ এতদিন ধরে ছেলেটা বাড়িতে আসা যাওয়া করেছে , তার উপরে বিয়ে ফাইন্যাল হয়ে যাওয়ার কথা জানাজানি হয়ে গিয়েছে , এই অবস্থায় অন্য কোথাও বিয়ে দেওয়াও তো সমস্যা হবে।



                                    আর ভাবতে পারে না স্বাতী। স্বামী জেলে , মেয়ের বিয়ে ভেস্তে গিয়েছে , আঙুল উঁচিয়ে কেউ কিছু বলবে বলে পথে ঘাটে বেরনোও বন্ধ হয়ে গিয়েছে। সেইসব কথা ভাবতে গিয়েই যেন দম বন্ধ হয়ে আসে তার। সব ভুলে সে ভগবানের কাছে শুধু স্বামীর জামিনের প্রার্থনা করে। স্বামী না ফেরা পর্যন্ত সে মনে স্বস্তি পাচ্ছে না। সন্দেহের কাঁটাটা তাকে রক্তাক্ত করে তুলছে। তাই সেদিন প্রিয়র জামিনের জন্য দক্ষিণাকালীর পুজো দেয় সে। অতসীকাকী ,  সুরোপিসি, ভানুমতীজ্যেঠিরাই তাকে দক্ষিণাকালীর পুজো দেওয়ার পরামর্শ দেন।  দক্ষিণাকালীকে গ্রামের মানুষ গ্রামদেবী বলে মান্য করেন। দেবী খুব জাগ্রত। তিনি নাকি দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালন করেন। সেই বিশ্বাসে পুজো দেওয়ার পর সেদিন প্রিয়র জামিন সম্পর্কে খুব আশাবাদী হয়ে পড়ে স্বাতী।কারণ প্রিয় তো আর দুষ্ট নয় ,  সত্যি সত্যি কাজটা করে নি সে।সুরোপিসিরাও একই কথা বলেন। মন্দিরে পুজো দিয়ে ফেরার পথে তারা বলেন , দেখ আজ জামিন হবেই। মা বিনা দোষে কাউকে শাস্তি পেতে দেন না।তাদের কথায় বুক বাঁধে স্বাতী।মনে মনে বলে , তাই যেন হয় মা , তাই যেন হয়।পুজো দিয়ে ফেরার পর থেকেই তাই ভাল খবর পাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকে স্বাতী। দুপুর গড়াতেই আদালত থেকে শঙ্খদের ফেরার প্রতীক্ষায় ঘর বার করতে থাকে সে। সেই সময় তাদের বাড়িতে হাজির হয় একদল সাংবাদিক। তাদের দেখে ভালো খবরের  সম্ভাবনায় আত্মহারা হয়ে ওঠে স্বাতী। সাংবাদিকদের দেখেই সে প্রিয়র জামিন মঞ্জুর হওয়া সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে যায়। সেই জন্যই সাংবাদিকরা তার সঙ্গে কথা বলতে এসেছেন ভেবে সে তাদের সামনে এগিয়ে গিয়ে বলে -- কি হলো তো ? আপনাদের বলেছিলাম না আমার স্বামী নির্দোষ। মিলল তো আমার কথা ?  কিন্তু আমি আর আজ কিছু বলব না। উনি তো ফিরে আসছেন। যা বলার আজ উনিই বলবেন।
তার কথা শুনে সাংবাদিকরা প্রথমে কিছু  কথা বলতে পারেন না। কিছুক্ষণ পর একজন এগিয়ে এসে বলেন, দুঃখিত, কিছু মনে করবেন না।খারাপ খবরটাই আপনাকে শোনাতে হচ্ছে। আজও আপনার স্বামীর জামিন বাতিল হয়ে গিয়েছে। এরপরেও কি আপনি বলবেন আপনার স্বামী নির্দোষ ? 
সাংবাদিকের কথা শুনে নিজের কানকেও যেন বিশ্বাস করতে পারে না স্বাতী। সে ঠিক শুনেছে তো ? হতভম্ভের মতো সে সাংবাদিকদের মুখের দিকে চেয়ে থাকে। সাংবাদিকরা অবশ্য সেসব লক্ষ্য করেন না। তারা সমানে মুখের সামনে বুম ধরে প্রশ্ন করেই চলেন -- কি হলো বলুন , এরপরেও কি আপনি আপনার স্বামীকে নির্দোষ মনে করেন ? 
বার বার একই প্রশ্নের মুখে সেদিন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না স্বাতী। মেজাজ হারিয়ে ফেলে সে। সামনে পড়ে থাকা ঝাঁটাটা তুলে নিয়ে বলে , আপনারা মানুষ না কি ?  আমরা মরছি নিজের জ্বালায় আর আপনারা এসেছেন মজা দেখতে ? মানে মানে চলে যান বলছি , না হলে কিন্তু ঝেঁটিয়ে বিষ ঝেড়ে দেব।




                             স্বাতীর ওই রণচণ্ডী মূর্তি দেখে রণে ভঙ্গ দিয়ে সাংবাদিকেরা পালাতে বাধ্য হন। মায়ের ওই মূর্তি দেখে অবাক হয়ে যায় মালা। সাংবাদিকদের সঙ্গে ওই রকম আচরণ করার জন্য তার খুব খারাপ লাগে। তবে মায়ের একতরফা দোষও দিতে পারে না সে। আসলে তিতিবিরক্ত হয়েই মা ওই আচরণ করে ফেলেছ। সাংবাদিকরা আড়াই মাস ধরে তাদের পিছনে পড়ে রয়েছেন। একটা সাজানো ঘটনাকে প্রায় সত্যি করে তুলেছেন তারা। সংবাদ মাধ্যমের জন্য তারা আজ সর্বত্র আলোচনার খোরাক হয়ে উঠেছে।তাদের বাড়ি থেকে বেরনো বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তাছাড়া বাবার একের পর এক জামিনের আবেদন বাতিল হয়ে যাওয়ায় মা যেন কেমন অন্যরকম হয়ে পড়েছে। অল্পেই রেগে ওঠে , আবার কখনও গুম মেরে বসে থাকে। তখন মুখ দেখেই বোঝা যায় মনের মধ্যে ঝড় বয়ে যাচ্ছে। মালা সাংবাদিকদের সেই কথা বুঝিয়ে বলে মার্জনা চেয়ে নেবে ভেবেছিল। কিন্তু মায়ের চেঁচামেচি শুনে তারা ততক্ষণে চম্পট দিয়েছেন।আর মায়ের গলা শুনে একে একে সুরোঠাকুমা, অতসী ঠাকুরমারা এসে পৌঁছোন। জামিন বাতিল হয়ে যাওয়ার খবরটা সংবাদ মাধ্যমের দৌলতে ততক্ষণে তাদেরও আর অজানা নেই। তারা মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার সুরে বলেন , কি আর কববে বলো ? মনে হচ্ছে তোমাদের কপালই মন্দ। নাহলে মা দক্ষিণাকালী তো নিরপরাধ মানুষকে এভাবে কষ্ট দেন না। মনকে শক্ত কর। ভাবো যেদিন যা হওয়ার সেদিন ছাড়া কিছু হবে না।স্বাতী কোন কথা বলে না। গুম মেরে বসে থাকে। মালা বুঝতে পারে মায়ের মনে আলোড়ন চলছে। সুরোঠাকুমাদের সান্ত্বনাটা বাবাকে অপরাধী প্রতিপন্ন করার মতো শুনতে লাগে। সুরোঠাকুমারা অবশ্য অত ভেবে কিছু বলেন নি। সাধারণভাবেই বলেছেন। কিন্তু সেই কথাই মায়ের মনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। সম্ভবত সেটা আঁচ করেই সুরোঠাকুরমারা ' পরে আসব ' বলে তখনকার মতো বাড়ি ফিরে যান। আর মা শোবার ঘরে বিছানা নেয়। মালাও আর মাকে কিছু বলে না। তার মনে হয় সামলে ওঠার জন্য মায়ের এসময় কিছুক্ষণ একা থাকা দরকার। তাই সে কিছুক্ষণ মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে রান্নাঘরে ঢোকে। পুজোর জন্য উপোষ করে সারাদিন মায়ের পেটে কিছু পড়ে নি। মাকে কিছু খাওয়ানো দরকার। তাই দ্রুত হাতে ভাত-ডাল চাট্টি ফুটিয়ে নিয়ে মাকে ডাকতে যায়। কিন্তু দরজা খুলেই অাঁতকে ওঠে সে।




        (  ক্রমশ ) 






     নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


শীঘ্রই দেশ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হতে চলেছে আমার তৃতীয় উপন্যাস ------
  
                                  


                       ----০---



No comments:

Post a Comment