Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

অন্তরালে -- ৫৬







          অন্তরালে 



                 অর্ঘ্য ঘোষ 




    ( ধারাবাহিক উপন্যাস ) 




মাকে গিয়ে  কি বলবে তা ভেবে পায় না সে। কিন্তু তাকে কিছু বলতে হয় না। সংবাদ মাধ্যমের সৌজন্যে শুধু মা নয় , গোটা গ্রামের লোক তারা গ্রামে ফেরার আগেই বাবার জামিন বাতিল হয়ে যাওয়ার খবরটা জেনে যায়। জামিন বাতিল হয়ে যাওয়ার খবর পেয়েই কয়েকজন সাংবাদিক আর চিত্রসাংবাদিক তাদের বাড়িতে এসেছিল। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই ধরণের প্রশ্ন করে মা আর মালাকে তিতিবিরক্ত করে দিয়েছে তারা। তারপর আরও কয়েকজন নাকি ধাওয়া করেছিল। শেষপর্যন্ত তাদের হাত থেকে বাঁচতে দরজায় খিল দিয়ে  বসে থাকতে হয়েছে মা আর মালাকে। ওইসব সাংবাদিকদের আনাগোনাতেই জামিন বাতিল হয়ে যাওয়ার খবরটা ছড়িয়ে পড়ে গ্রামে। সেই খবর জানার পরই মা আরও মুসড়ে পড়ে। শঙ্খ মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে। মায়ের কাছে বসে বলে ,  দেখো ১৪ দিন পর বাবা ঠিক জামিন পেয়ে যাবে। ১৪টা তো মোটে দিন। দেখতে দেখতে দিন ক'টা কেটে যাবে। 
ছেলের কথায় আশায় বুক বাঁধে  স্বাতী। কিন্তু সেই আশা তার পূরণ হয় না।  ১৪ দিন পরেও জামিন হয় না প্রিয়র। শুধু ১৪ দিন পরেই নয় , আরও তিন দিন জামিনের আবেদন বাতিল হয়ে যায়। উকিলবাবু  বলেছেন , যে ভাবে মামলা সাজানো হয়েছে তাতে তিনমাসের আগে জামিন হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কেউ কেউ উচ্চ আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল। কিন্তু উকিলবাবু বলে দিয়েছেন , উচ্চ আদালতে জামিন হলে ভালো। নাহলে তখন নিম্ন আদালতে জামিনে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।সেই আশঙ্কায় আর উচ্চ আদালতে যাওয়া হয় নি। একের পর এক জামিন বাতিল হয়ে যাওয়ায় ধৈর্যহারা হয়ে পড়ে  স্বাতী। কেমন যেন হয়ে পড়ে সে। তার মনে একটা সংশয় দেখা দেয়। তাহলে কি লোকটার সত্যি সত্যি মতিভ্রম হয়েছিল ?  নির্দোষ হলে তাকে জেলে থাকতে হবে কেন ? আদালতে তো ন্যায় বিচার হয় বলেই সে জানে। অপরাধ না করলে তাকে শুধু শুধু আটকে রাখবে কেন ?
স্বামীর চরিত্র নিয়ে তার মনে একটা সন্দেহ দানা বেঁধে বসে। সন্দেহটা তার মনের মধ্যে সব সময় ঘুরপাক খায়। লোকটাকে চিনতে তার এত বড়ো ভুল হল ?  তার ভালোবাসার কোন মুল্যই নেই ? তীব্র একটা মানসিক যন্ত্রণা তাকে কু্ঁড়ে কুঁড়ে খায়। সেই যন্ত্রণার কথা কাউকে খুলে বলতেও পারে না। শুধু নিজের মনের মধ্য গুমরে গুমরে মরে। ক্রমশ একটা মানসিক অবসাদ গ্রাস করে নেয় তাকে। মায়ের এই পরিবর্তন চোখ এড়ায় না ছেলেমেয়েদের। তারা মাকে নানা ভাবে ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু কিছু লোক ভুলে থাকতে দেয় না। যন্ত্রণার জায়গাটাতেই খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করে দেয় তারা। একদিন মালার সামনেই ঘটে যায় সেই ঘটনা।



                                 সেদিন মায়ের সঙ্গে পুকুরঘাটে গিয়েছিল মালা। তাদের ঘাটে তখন প্রসাদ মোড়ল আর তার সাগরেদদের বাড়ির মেয়ে -বৌ'রা স্নান করছিল। তাই তারা উল্টোদিকের ঘাটে নামে। তাদের নিয়ে অস্বস্তিকর আলোচনা হতে পারে ভেবেই পাশে ঘাট থাকা স্বত্ত্বেও তারা সেখানে যায় নি। কিন্তু অস্বস্তির হাত থেকে রক্ষা পায় না তারা। তাদের দেখেই ফিসফিসানি শুরু হয়ে যায় পুকুরঘাটে। গলা নামিয়ে কথা  বলার ভান  করে শুনিয়ে শুনিয়েই প্রসাদ মোড়লের স্ত্রী পূর্ণিমা বলে -- শুনেছো চুমকির মা , ঢ্যামনাটার আবার জামিন বাতিল হয়ে গিয়েছে।
চুমকির মা সুরেন মোড়লের স্ত্রী ছায়া বলে , হবে না ? চামেলির বাবাই বলেছি 'পাপ বাপকেও ছাড়ে না'। ওর পাপ ষোলকলা পূর্ণ হয়েছিল গো।
---- তা যা বলেছো ভাই। খুব গুমোর হয়েছিল ওর বৌয়ের। স্বামীর গরবে মাটিতে যেন পা পড়ত না। ওরকম স্বামী যেন আর কারও নেই। সেই স্বামীই শেষ পর্যন্ত বিধবা মেয়ের সঙ্গে লীলা করে জেলের ঘানি টানছে।
---- নাও বাবা এবার গুমোর ছুটি। সেই জন্যই বলে অতি বাড় বেড় না। এখন বৌটাও তো মুখ লুকিয়ে বেড়ানোর পথ পাচ্ছে না গো দিদি। আমরা আছি তাই ওই পাড়ের ঘাটে গিয়েছে।
--- মুখ দেখানোর মতো মুখ কি আর আছে। যে বৌ' স্বামীকে ধরে রাখতে পারে না তার অত গুমোর কিসের ? 
---- আমাদের বাড়িতেও তো পুরুষ মানুষ আছে। কই বলুক তো কেউ ' ফলোনা ' ওমুক মেয়ের দিকে কুনজরে চেয়েছে। তার আগে গলায় কলসি বেঁধে ডুবে মরব গো দিদি। কিন্তু পোড়ামুখ কাউকে দেখাতে আসব না।
---- কিন্তু সবার আর তা নয়। তারা তো দিব্যি মুখ দেখিয়ে বেড়াচ্ছে ভাই। 
হুল ফোটানো কথা আর সইতে পারে না মালা।ইচ্ছে করে  দু'কথা শুনিয়ে দেয়। ইচ্ছে হয় মুখের উপর বলে দেয় , কারও হাঁড়ির খবর জানতে আমাদেরও বাকি নেই। কাদের বাড়ির পুরুষ মানুষেরা কোন পাড়া থেকে কত রাতে বাড়ি ফেরে , রাজনৈতিক ক্ষমতায় থাকার সুবাদে বিভিন্ন সরকারি সুযোগ সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নাম করে সহায় সম্বলহীন মেয়েদের নিয়ে কাদের পত্নীঅন্ত প্রাণ স্বামীরা কি করে বেড়ায় তাও জানতে বাকি নেই। কিন্তু কিছু বলা হয়না তার। বাবার কথা মনে পড়ে যায়। বাবা তাদের বলতেন , যে কথার প্রত্যুত্তরে কোন সমাধান মেলে না , বরং কথা বেড়ে যায় সেখানে কথার পিঠে কথা না বলাই ভালো। তাই বাদানুবাদের আশঙ্কায় সে মুখ খোলে না। তার উপরে বাবা নেই। এইসময় প্রসাদ মোড়লরা যদি ঝামেলা পাকায় তাহলে কি করবে তারা ?
সেই কথা ভেবেই মাকে নিয়ে চুপচাপ পুকুরঘাট থেকে উঠে আসে মালা। তখন মেয়ের কাছে মনে দানা বেঁধে থাকা সন্দেহের কথাটা পাড়ে স্বাতী।
---- হ্যা রে তোর বাবা কি সত্যি সত্যি কাজটা করেছিল নাকি ? 
মায়ের প্রশ্নে যেন হোঁচট খায় মালা। একি বলছে মা ? বাবা- মায়ের পারস্পরিক বোঝাপড়া এ গ্রামে অন্য কোন দম্পতির মধ্যে আছে বলে মনে হয় না তার। অথচ সেই মায়ের মনেই প্রসাদ মোড়লের স্ত্রীরা কেমন কায়দা করে সন্দেহের বীজ বপন করে দিল। এখনই মায়ের মন থেকে সন্দেহের কাঁটাটা উপড়ে ফেলা প্রয়োজন। নাহলে সন্দেহটাই মায়ের মনের মধ্যে বদ্ধমূল হয়ে বসবে। তখন সেই মাকে সন্দেহের বেড়াজাল থেকে বের করে আনা কঠিন হবে। কথায় আছে , সন্দেহের বিষ একবার মনে ঢুকলে তার হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়া দুস্কর। তাই সে দ্রুত বলে , সব মিথ্যা কথা মা। আমাদের বাবা কোনদিন ওইরকম করতেই পারেন না।
---- তবে যে ওরা বলছে ?  আদালত যে তোর বাবাকে আটকে রেখেছে ? 
---- ওরা তো বলবেই। ওরাই তো বাবাকে ফাঁসিয়েছে। ওদের কথা কানে তুলো না তো। আর বাবার জামিন পাওয়াটা আইনি প্রক্রিয়া। দেখবে বাবা যে নির্দোষ তা একদিন প্রমাণ হয়ে যাবে। 



                        মা কোন জবাব দেয় না। কিন্তু প্রসাদ মোড়লের স্ত্রীদের কথাগুলো নিয়ে মায়ের মনে যে দোলাচল শুরু হয়ে গিয়েছে তা বুঝতে অসুবিধা হয় না মালার। প্রসাদ মোড়লের স্ত্রীদের উপর খুব রাগ হয় তার। বাড়ি ফিরে রাগে রাগেই দাদাকে কথাটা বলে সে। মালার মুখে কথাটা শুনে মায়ের জন্য দুশ্চিন্তা শুরু হয় শঙ্খর। সে বলে , আচ্ছা মানুষগুলো কি যন্ত্রণাটা আমাদের একটু ভুলেও থাকতে দেবে না ? কি ক্ষতি করেছি আমরা ওদের ?
--- যা বলেছিস দাদা। সব জায়গায় একই ব্যাপার। স্কুলেও আমাকে দেখলেই গুজগুজ - ফুসফুস শুরু হয়ে যায়। আমি কাছাকাছি গেলেই চুপ করে যায় সবাই। যেসব বান্ধবীদের সঙ্গে পুতুল খেলেছি তারাও যেন কেমন চোখে তাকিয়ে থাকে। শিক্ষকমশাইরাও  একই দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। কেউ কেউ অস্বস্তিকর প্রশ্নও করেন জানিস। অনেকে আমাকে শুনিয়ে শুনিয়েই বাবাকে জড়িয়ে নোংরা নোংরা সব কথা বলে।  আমার নিজেরই খুব অস্বস্তি হয়। তাই স্কুল যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি।
---- আমিও একই কারণে কলেজ যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। সবাই কেমন এড়িয়ে এড়িয়ে যায়। এমনকি সৌমিকটাও এই দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানোর পরিবর্তে, দেখলেই মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে চলে যায়।
সৌমিকের প্রসঙ্গ ওঠায় অস্বস্তির মধ্যে পড়ে যায় মালা। দাদা বাড়িতে থাক বা না থাক, যে সৌমিক আগে প্রায়ই এসেছে সেই সৌমিকই ঘটনার পর থেকে একবারও এ বাড়ি মুখো হয় নি। এমন কি একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে সৌমিক তার সামনাসামনি পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু কোন কথা না বলে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল সে। সেদিন তার ওই আচরণের কোন ব্যাখ্যা খুঁজে পায় নি মালা। তাই তীব্র অভিমান হয় তার। সৌমিক দাদার বন্ধু হতে পারে , কিন্তু তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠা এবং বিয়ে ফাইন্যাল হয়ে যাওয়ার পরও সে তো তারই আরও কাছের মানুষ হয়ে গিয়েছে। তাই এই দুর্দিনে তার পাশে এসে না দাঁড়ানোর দায়টা যেন অনেকখানি মালার উপরেই বর্তায়। সেই দায় অবশ্য আর তাকে বইতে হবে না। সেদিন পিসিমনি এসে বলছিলেন , সৌমিকের বাবা নাকি  বলেছেন ভগবান বাঁচিয়ে দিয়েছেন। বিয়ের পর ঘটনাটা ঘটলে আমরাও লোকসমাজে মুখ দেখাতে পারতাম না। আর ওই রকম একটা চরিত্রহীনের মেয়ের সঙ্গে কিছুতেই ছেলের বিয়ে দেব না। কথাটা শুনেই সৌমিকের সেদিনের সেই আচরণের কারণটা স্পষ্ট হয়ে যায় মালার কাছে। তার বুকের ভিতরটা কেমন যেন করে ওঠে। একাকী ঘরে গিয়ে অনেকক্ষণ কেঁদেছিল সে। পরক্ষণেই মনকে শক্ত করে। সৌমিককে ভুলতে তার কষ্ট হবে ঠিকই , কিন্তু যে বাড়িতে তার বাবার সম্মান নেই , সেই বাড়ির বৌ হয়ে সে'ও যেতে চায় না। তাহলে সারাজীবন তো তাকে বাবার সম্পর্কে কটুক্তি শুনতে হবে। তা সে কিছুতেই সইতে পারবে না। যে বাবার স্নেহ - আদরে মানুষ হয়েছে , যে বাবা তাদের গায়ে কুটোর আঁচড়টিও লাগতে দেয় নি , সেই বাবার অপমান সয়ে ওই বাড়িতে সে পড়ে থাকতে পারবে না। সেই কথা ভেবেই সে বলে , ছাড় তো দাদা। কে আমাদের পাশে এসে দাঁড়াল , আর না দাঁড়াল তা দেখার দরকার নেই। নিজেদের লড়াইটা আমাদের নিজেদেরই লড়তে হবে। যে করেই হোক বাবাকে ছাড়িয়ে আনতেই হবে। মালা যে সৌমিকের ওপর তীব্র অভিমান বোধ থেকে কথাগুলো বলছে তা বুঝতে অসুবিধা হয় না শঙ্খর। কিন্তু সেই প্রসঙ্গ তুলে বোনের জ্বালাটা আর বাড়াতে চায় না সে। তাই মালার সুরে সুর মিলিয়ে সে বলে , ঠিক বলেছিস। নিজেদের লড়াইটা আমাদেরই লড়তে হবে।কিন্তু লড়াইটা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ে।



           
                      ( ক্রমশ ) 








     নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


শীঘ্রই দেশ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হতে চলেছে আমার তৃতীয় উপন্যাস ------
  
                                  


                       ----০---


No comments:

Post a Comment