অন্তরালে
অর্ঘ্য ঘোষ
( ধারাবাহিক উপন্যাস )
কিন্তু ভুলে থাকতে পারে না, অফিসই তাকে ভুলে থাকতে দেয় না। সেদিন আর বাড়ি থেকে বেরোয় না সে। স্নান করে বিছানায় শুয়েছিল। সেইসময় সুদীনদার ফোন। ফোনটা রিসিভ করতেই সুদীনদা বলেন , আজও কালকের খবরটা নিয়ে 'ফলো আপ ' স্টোরি করতে হবে। বসের নির্দেশ।
কথাটা শুনেই যেন দপ করে মাথার ভিতর আগুন জ্বলে ওঠে আর্যর। সারাদিনে ভায়া হয়ে এইরকম অফিসের কত বস , কত দাদা-দিদির নির্দেশ যে এসে পৌঁছোয় তার কোন কুলকিনারা নেই। একমাত্র রোবট কিম্বা কম্পিউটার ছাড়া ওইসব নির্দেশ পালন করা একজন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।কিন্তু কে'ই বা সে কথা ভাবে ? যারা নির্দেশ দেন তাদের তো আর পালন করতে হয় না। তাই জ্বালাটা তারা বুঝতে পারেন না। এতদিন অবশ্য সে মুখ বুজেই ওইসব নির্দেশ পালন করে এসেছে।
কিন্তু আজ মনটা যেন বিদ্রোহ করে ওঠে।প্রিয়র খবরটা ওইভাবে বিকৃত করে তার নামে ছেপে দেওয়ায় সকাল থেকেই মেজাজটা খিঁচড়ে ছিল। ফোনে সেটাই সুদীনদার উপরে আছড়ে পড়ে -- আচ্ছা একটা লোককে ওইভাবে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে না মারলে কি আপনাদের শান্তি হচ্ছে না ? ওই বিষয়ে নতুন করে আর কি লেখার আছে ? আমি বানিয়ে বানিয়ে গল্প লিখতে পারব না।
---- বি প্র্যাক্টিক্যাল। খরব করতে গিয়ে মানসিকভাবে জড়িয়ে পড়াটা পেশাদারিত্বের পরিচয় বহন করে না। তুমি জান এর আগে কোন খবর রাজ্যের পাতায় প্রকাশিত হলে পরদিন আমরা তার ' ফলো আপ ' খবর করেছি। কারণ প্রথম দিনের খবর পড়ে পাঠকদের মধ্যে একটা আগ্রহ সৃষ্টি হয়। পরবর্তী পরিস্থিতি কি হল তা জানতে চান তারা। তাই পরের দিনও তারা কাগজ কেনেন। তুমি জান সার্কুলেশন বিভাগ জানিয়েছে আজ শুধু ওই এলাকায় সাতশো কপি বেশি কাগজ বিক্রি হয়েছে। গোটা জেলায় ওই সংখ্যা কুড়ি হাজারেরও বেশি। একটা খবরের জন্য শুধুমাত্র একটি জেলায় অতিরিক্ত কুড়ি হাজার কাগজ বিক্রি হওয়াটা কম কথা নয়। সার্কুলেশন মনে করছে ভাল করে ' ফলো আপ ' করতে পারলে কালও সমসংখ্যক কাগজ বিক্রি হবে।
---- শুধু কাগজ বিক্রি হবে বলেই ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে খবর করতে হবে ? সেই খবর করতে গিয়ে একজন নিরপরাধ মানুষের নামধাম লিখে তাকে প্রকাশ্যে উলঙ্গ করে দিতে হবে ? আর মিথ্যা অভিযোগকারিণী অন্তরালেই থেকে যাবেন ?
--- কিছু করার নেই , ওটাই যে দস্তুর।
---- আপনি জানেন অভিযুক্তের পরিবারের লোকেরা আমাদের খবরটা অন্তত ঠিক হবে বলে বড়ো আশা নিয়ে কাগজ কিনেছিল। তারপর খবর পড়ে ক্ষোভে দুঃখে কাগজটা কুটিকুটি করে ছিঁড়ে ফেলেছেন।
---- এ রকম তো কতই হতে পারে। হয়েছেও হয়তো।আমরা কতজনের খবর রাখতে পেরেছি ? তাছাড়া কাগজ ছেঁড়ার দলে ক'জনই বা থাকে ? অন্যরাই বরং দলে ভারি। সব থেকে বড়ো কথা কি জানো ? তোমার আমার চাওয়া না চাওয়ার উপরে কিছু যায় আসে না।বস যখন চেয়েছেন তখন তুমি না করলেও যে করেই হোক খবরটা কাল বেরবোই। মাঝখান থেকে নিজের পায়ে তুমি কেন কুড়ুল মারবে ?
ফের সামনে চলে আসে জীবন-জীবিকার প্রশ্ন। মনের মধ্যে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয় তার। তাই শেষ চেষ্টা হিসাবে সে সুদীনদাকে বলে , আচ্ছা নতুন করে আর কি লেখার আছে বলুন তো ?
---- এই প্রশ্নটা তোমার ঠিক হল না। এতদিন কাজ করছ , এইসব খবরের ক্ষেত্রে কি করে ' ফলো আপ ' করতে হয় তা তোমার অজানা থাকার কথা নয়। আসলে তুমি এই খবরের সঙ্গে মানসিক ভাবে জড়িয়ে পড়েছ। ওই অভ্যাস দূর কর। নাহলে হয় কষ্ট পেতে হবে , নয়তো কাজ খোয়াতে হবে।
ফোন কেটে দেন সুদিনদা। আর্যর আর বলা হয় না , হ্যা আমিও মানসিকভাবে জড়িয়ে পড়েছি। কারণ আমিও মানুষ। তাই মানবিক দায়বদ্ধতা অস্বীকার করতে পারছি না। সেইজন্য সত্যিই খুব কষ্ট পাচ্ছি। চরম দ্বন্দ্ব শুরু হয় তার মনে। কি করে সে এখন ? সুদীনদার কথা অনুযায়ী সে না লিখলেও খবর হবে। সেই খবরে তার কোন নিয়ন্ত্রণই থাকবে না। কিন্তু সবাই জানবে খবরটা সেই করেছে।
তার চেয়ে খবরটা করা শ্রেয় বলেই মনে হয় তার।সেই ভেবেই সে ফোনে ধরে সরকারি আইনজীবি কেশব ভান্ডারীকে। তার অবশ্য জানাই ছিল এইসব অভিযোগে সাধারণত জামিন হয় না। তবু নিশ্চিত হওয়ার জন্যই ফোনটা করে সে। তার প্রশ্ন শুনে কেশববাবু বলেন , জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা হয়েছে তার উপরে আবার শাসক দলের হস্তক্ষেপ আছে বলে মনে হচ্ছে। তিন মাসের আগে জামিন হবে বলে তো মনে হচ্ছে না।
কথাটা শুনেই ফের মন খারাপ হয়ে যায় তার। মন খারাপ নিয়েই কোন রকমে খবরটা লিখে পাঠিয়ে দিয়ে বিছানা নেয় সে। শুয়ে শুয়ে শুধু প্রিয় আর তার পরিবারের কথা ভাবতে থাকে। জামিন বাতিল হয়ে যাওয়ার খবরটা পাওয়ার পর মুসড়ে পড়া প্রিয়র স্ত্রী আর ছেলেমেয়ের আশাহত মুখগুলো বার বার তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সান্ত্বনা দিতেও সে তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে পারবে না। আর কোনদিন কি ওই বাড়ির চৌকাঠ পার হতে পারবে সে ? চিরকালের জন্য ওই বাড়ির দরজাটা যে বন্ধ করে দিয়েছে অফিস।মনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে আর্য। গত রাতে কার্যত দু'চোখের পাতা এক করতে পারে নি। তাই এক সময় ঘুমে জড়িয়ে আসে তার দু'চোখ। কিন্তু ঘুম হারিয়ে যায় প্রিয়র স্ত্রী আর ছেলেমেয়ের। তারা বড়ো আশা করেছিল পরদিন জামিনে ছাড়া পাবে প্রিয়। সেই আশাতেই সৌরভদের সঙ্গে কোর্টে গিয়েছিল শঙ্খও।
বাবাকে সঙ্গে নিয়ে ফিরবে বলেই কোর্টে গিয়েছিল সে। কিন্তু বাবাকে দেখেই আর কান্না ধরে রাখতে পারে না।পুলিশগুলো যখন বাবাকে কোমরে দড়ি বেঁধে লকআপে নিয়ে যাচ্ছিল তখন ওদের ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল মানুষ নয় , যেন গরু ছাগল নিয়ে যাচ্ছে খোঁয়াড়ে।একরাতেই বাবা যেন অনেকখানি রোগা হয়ে গিয়েছে। কপালে মারের ক্ষতে তখনও জমাট বেঁধে রয়েছে কালো হয়ে যাওয়া রক্ত। মারের চোটে ফালাফালা হয়ে যাওয়া ময়লা পোশাকে বাবাকে ভিক্ষারীদের মতো দেখাচ্ছিল। ছুটে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরতে খুব ইচ্ছা করছিল তার। কিন্তু পুলিশগুলো বাবাকে টানতে টানতে নিয়ে গিয়ে লকআপে ভরে দেয়।লকআপের সামনে দাঁড়িয়ে সে দেখতে পায় বাবার মুখে ম্লান হাসি ফুটে উঠেছে। সে কষ্ট পাবে ভেবেই বাবা যে জোর করে মুখে হাসি ফুটিয়ে রেখেছেন তা বুঝতে পারে শঙ্খ। কারণ ওই হাসির আড়ালে বাবার চোখের জলের আভাস পায় সে। তারও চোখ ফেটে জল আসে। বাবা কষ্ট পাবে ভেবে সেও কান্না লুকোতে লকআপের সামনে থেকে সরে আসে। আশা - নিরাশার দোলাচলে আদালত চত্বরের বটতলায় বসে কেটে যায় সারাদিন। শেষবেলায় প্রশান্তদাদু যখন জামিন বাতিল হয়ে যাওয়ার খবরটা আনেন তখন আর নিজেকে সামলে
রাখতে পারে না শঙ্খ। প্রবল কান্নায় ভেঙে পড়ে। ততক্ষণে আদালত থেকে প্রিয়কে নিয়ে জেলের পথে রওনা দিয়েছে পুলিশকর্মীরা।সেও বাবার পিছু পিছু যেতে শুরু করে। তাকে ওই ভাবে যেতে দেখে করুণ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে প্রিয় ।
বাবার চোখ দিয়েও গড়িয়ে পড়ে জলের ধারা। বাবার চোখের জল মুছিয়ে দিতে ইচ্ছা করে শঙ্খর। কিন্তু সে ইচ্ছা পূরণ হয় না। আইনের বেড়াজাল একরাতেই বাবাকে তার কাছে থেকে কেড়ে নিয়েছে। হঠাৎ করে জেলের বড়ো গেটটা খুলে যায়। আদালত থেকে নিয়ে আসা অন্যান্য লোকেদের সঙ্গে বাবাকেও সেই গেটের ভিতর দিয়ে জেলে ঢোকানোর উপক্রম করে পুলিশকর্মীরা। সেটা দেখেই ছুটে বাবার কাছে চলে যায় শঙ্খ। বাবা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে , বাবু ভালো থাকিস। মা - বোনকে দেখিস।
শঙ্খ কিছু বলার সুযোগ পায় না। বিরাট গেটটা বন্ধ হয়ে যায়। গেটের রেলিংয়ের ফাঁক দিয়ে সে দেখতে পায় বাবা হাতের চোটোয় চোখ মুছতে মুছতে ক্রমশ দূরে চলে যাচ্ছেন। গেটের রেলিং ধরে ফের কান্নায় ভেঙে পড়ে সে। প্রশান্তদাদুরা তাকে সরিয়ে নিয়ে যান। বাড়ি ফেরার পথে শুধুই বাবার কথা মনে হয় শঙ্খর। তার মনের মধ্যে ভীড় করে আসে নানা প্রশ্ন। সে ভালো করেই জানে বাবা কোন দোষের দোষী নয়। তাহলে শুধুমাত্র একজনের মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে কেন বাবাকে ঘরবাড়ি আর তাদের ছেড়ে অজানা অচেনা লোকেদের সঙ্গে জেলে কাটাতে হবে ? বাবা তো একদিন না একদিন নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে বাড়ি ফিরবেন। তখন তাদের বাবাকে ছেড়ে থাকার কিম্বা বাবার তাদেরকে ছেড়ে থাকার দিনগুলি কে ফিরিয়ে দেবে ? কে এত লাঞ্ছনা, অপমান , লজ্জা মুছিয়ে দেবে ? শঙ্খ ভালো করেই জানে তা কেউ পারবে না।
সে কেবল জানে নাফিরিয়েই যখন দেওয়া যাবে না তাহলে কেন তবে অভিযোগ হলেই অভিযুক্তকে জেলে যেতে হবে ? অভিযুক্তকে বিচারাধীন বন্দি হিসাবে জেলে পাঠানোর আগে কেন আগে দোষ প্রমাণের ব্যবস্থা কিম্বা অভিযোগের সঙ্গে সঙ্গে বিচারের নিস্পত্তি করা হবে না ? তাহলে তো তারই মতো বহু হতভাগ্য সন্তানকে এভাবে বাবাকে জেলে ফেলে রেখে একা একা ফিরতে হয় না।কতদিন পরে বাবাকে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারবে কে জানে ? প্রশান্তদাদুকে উকিল নাকি বলেছেন ১৪ দিনের আগে আর কিছু করা যাবে না। ১৪ দিন পর আবার বাবাকে কোর্টে তোলা হবে। সেদিনই আবার জামিনের আবেদন করা হবে। সেদিন বাবাকে নিয়ে ফিরতে পারবে তো ? বাড়ির কাছাকাছি হতেই আরও একটি প্রশ্ন শঙ্খর দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে ওঠে।



No comments:
Post a Comment