Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

অন্তরালে -- ৫৪




     

       অন্তরালে 



                 অর্ঘ্য ঘোষ 



     ( ধারাবাহিক উপন্যাস ) 



কোর্টে যাবে বলেই সে তাড়াতাড়ি তৈরি হচ্ছিল। সেই সময়ই ফোনটা আসে। মোবাইল  স্কীনে ভেসে ওঠে ঋজুর নম্বর। প্রিয়ই এতদিন ওই নম্বর থেকে ফোন করত। কিন্তু প্রিয় তো এখন নেই। তাহলে ঋজুই করছে ফোনটা। নিশ্চয় প্রিয়র ব্যাপারেই কিছু বলবে। তারই ফোন করা উচিত ছিল। কিন্তু প্রিয়র খবর না করার অনুরোধ সে রাখতে পারে নি বলে অনুতাপে ফোন করতে পারে নি। বারবার প্রিয়র স্ত্রী ছেলেমেয়েদের খবর নিতে খুব ইচ্ছা হচ্ছিল তার। ঋজুর কাছেই সেই খবর জানা যাবে ভেবে সে আগ্রহের সঙ্গে ফোনটা অন করে। কিন্তু  'হ্যালো ' বলতেই ফোনের ওপার থেকে একরাশ ক্ষোভ উগড়ে দেয় ঋজু। তীব্র ঝাঁজের সঙ্গে সে বলে ,  সাংবাদিকরা চমক সৃষ্টি করতে উল্টোপাল্টা খবর লেখে আমরা জানি। কিন্তু আপনাকে আমরা অন্যরকম ভাবতাম। সেই আপনিও একই দলে ভিড়ে গেলেন ? আপনি তো প্রিয়কে অনেকদিন ধরেই চেনেন। নিজে এসে দেখেও গেলেন। তা স্বত্ত্বেও আপনি এসব লিখতে পারলেন ?
--- কি বলছেন আপনি ?  আমি তো ঠিকঠাকই লিখেছি।
---- এক হিসাবে ঠিকই লিখেছেন বইকি। না হলে লোকে পড়বেই বা কেন। আপনার লেখা খবর পাবলিক ভালোই খেয়েছে। এজেন্ট অন্যান্য দিনের তুলনায় তিনগুণ বেশি কাগজ নামিয়েছিল। তাও পড়তে পায় নি। ধুলো ওড়ার মতো উড়ে গিয়েছে। প্রসাদ মোড়লরা জেরস্ক করে দেওয়ালে দেওয়ালে সাঁটিয়ে দিয়েছে আপনার লেখা সংবাদ।
 ---- কেন , এত চাহিদা কেন ? 
আর্য মনে মনে ভাবে তাহলে কি সে নিরপেক্ষ ভাবে খবর লিখেছে বলেই পাঠকেরা তাদের কাগজ বেশি কিনেছেন ? কিন্তু তার ভুল ভেঙে যায় ঋজুর কথাতে।বিদ্রুপ মিশ্রিত গলায় ঋজু বলে , এত চাহিদা কেন আপনি জানেন না ?  নিজে লিখে এখন ন্যাকামি করছেন। আসলে আপনারা সবাই সমান। কাগজের বিক্রি বাড়ানোর জন্য খবর লেখেন। তাতে কার কি এল গেল তা নিয়ে আপনাদের কোন মাথাব্যাথাই নেই। কিন্তু মর্মান্তিক ঘটনা কি জানেন , প্রিয়র ছেলেমেয়ে দুটো ভেবেছিল আপনার কাগজে অন্তত ঠিক খবরটা বেরোবে। তাই তারাও আগ্রহ নিয়ে কাগজ কেনে। কিন্তু খবরটা পড়েই তাদের মুখ কালো হয়ে যায়। আর প্রিয়র স্ত্রী কল্পনাও করতে পারে নি তার স্বামীর সম্পর্কে আপনি ওইরকম ভাবে লিখতে পারেন। তাই ক্ষোভে দুঃখে কাগজটাই  ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছে। তারপরেও কাঁদতে কাঁদতে বলেছে , উনি এমনটা লিখতেই পারেন না। আমি বিশ্বাস করি না। শঙ্খ - মালার বাবা ওনার কত সুখ্যাতি করতেন। ভাবুন এখনও প্রিয়র পরিবারের লোক আপনাকে কত বিশ্বাস করে। আর আপনি সেই বিশ্বাসকে গলা টিপে খুন করলেন। 
বলেই ফোন কেটে দেয় ঋজু।ঋজুর কথা শুনেই মুখ কালো হয়ে যায় আর্যরও। কিন্তু প্রিয়র ছেলেমেয়েদের মুখ কালো হয়ে যাওয়ার মতো কিছু তো সে লেখে নি। বরং প্রিয়কে যে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হচ্ছে সেটাই সে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। তাহলে ঋজু এমন কথা বলল কেন তা সে ভেবে পায় না।




                                     কোর্টে যাওয়ার তাড়াহুড়োতে এতক্ষণ তার কাগজে চোখ বোলানোর সময় হয় নি। টেবিলের উপরে পড়ে থাকা কাগজটা তুলে নিয়ে দ্রুত পাতা উল্টোতে থাকে সে।খুঁজতে খুজতে রাজ্যের পাতায় চোখ আটকে যায় তার। বিরাট হেডিং করে আট কলাম জুড়ে ছবি সহ বেড়িয়েছে খবরটা। সেটা দেখেই তার ভ্রু কুঁচকে যায়।এতবড়ো খবর তো সে লেখে নি , তাহলে অফিস কি এমন বাড়তি তথ্য পেল , যার জন্য খবরটা এত বড়ো হয়ে গেল ? সে রুদ্ধশ্বাসে খবরটা পড়তে শুরু করে। পড়া শেষ হতেই তার যেন দম বন্ধ হয়ে আসে।তার পাঠানো খবরের আগাপাশতলা পাল্টে দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদ  সংস্থার কাছে পাওয়া খবরের ভিত্তেতেই ওই কান্ড করেছে অফিস। যেহেতু সে খবরটা প্রথমে করতে চাই নি তাই তাকে চাপে রাখতে ইচ্ছাকৃতভাবেই ওই কাজ করা হয়েছে। ঋজুদের রাগের কারণটা সে এখন অনুমান করতে পারছে। রাগ হওয়টাই স্বাভাবিক। সে হলেও একই ভাবে প্রতিক্রিয়া জানাত।  সংবাদটা পুরোপুরি সে না লিখলেও বেড়িয়েছে তো তার নামে। তাই সেই দায় সে অস্বীকার করবে কেমন করে ? প্রিয়র ছেলেমেয়েদের কথা ভেবে খুব কষ্ট হয় তার। এইভাবে তাকে অপরাধী করে তোলার জন্য নিউজ ডেস্কের উপর খুব রাগ হয়ে যায় তার। যদি তার থেকে সংবাদ সংস্থার খবরই বেশি ভরসাযোগ্য মনে হয় তাহলে সেই খবর তার নামে ছেপে তাকে অপরাধী প্রতিপন্ন করার কি প্রয়োজন ছিল ? রেগে রেগেই সে ফোন করে অরুণদাকে। ফোন বেজেই যায় , কিন্তু কেউ ফোন রিসিভ করে না। অফিসের বসদের এই এক কায়দা হয়েছে ভালো। প্রয়োজনের সময় কিছুতেই তাদের ফোনে পাওয়া যায় না। হয় ' কল ডায়ভার্ট ' নয়তো ' সাউন্ড লেস ' করা থাকে। পরে কখনও কি দরকারে ফোন করা হয়েছিল তা জানতেও চান না। কিন্তু তাদেরকে সে গভীর রাত কি সাত সকালই হোক না কেন , ফোনে কেউ না পেলে নানা জবাবদিহি করতে হয়। অগত্যা বার্তা সম্পাদক সুদীনদাকে ফোনে ধরে সে। ঋজুর মতো সেও ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে বলে , এটা কি রকম হল ? আমি যা লিখিনিই তা আমার নামে ছাপা হয়ে গেল কেন ? 
সুদীনদা খুব ঠান্ডা মাথার মানুষ। বেশ কিছুক্ষণ আর্যর ক্ষোভটাকে প্রশমিত হওয়ার সময় দেন। তারপরে শান্ত স্বরে বলেন ,  ওই খবরটা অরুণদা নিজে দেখেছেন। তুমি খবরটা করতে চাও নি বলে অরুণদার মনে হয়েছিল কোনও ভাবে তুমি বিক্রি হয়ে গিয়েছো। তাই অরুণদা রেগে গিয়ে সংবাদ সংস্থার কাছে খবর নিয়ে তোমার নামে ছেপে দিয়েছেন।
---- খুব অন্যায় করেছেন উনি। ঠিক আছে আমি ওনাকেই ধরছি।
---- আমি বলি কি মাথা গরম কোর না। যা হওয়ার তা তো হয়ে গিয়েছে। এখন আর ধরাধরি করে সেটা ফেরাতে পারবে ? মাঝখান থেকে তুমি প্রতিবাদী হিসাবে চিহ্নিত হয়ে যাবে। মালিকপক্ষ কখনই একজন প্রতিবাদী কর্মীকে ঘাড়ের উপর বসিয়ে রাখতে চায় না। আর এই বয়সে চাকরি গেলে কি করবে তুমি ? অন্য কোন মিডিয়াও প্রতিবাদী বলেই তোমাকে কাজে নেবে না। কিন্তু তোমার জায়গায় ঢোকার জন্য অনেক কম বেতনে হাজারটা ছেলে ঝাঁপিয়ে পড়বে।




                              সুদীনদার কথার কোন জবাব দিতে পারে না আর্য। সত্যি কথাই বলেছেন সুদীনদা।সাংবাদিকদের সংগঠন একটা আছে বটে , কিন্তু তা ক্ষয়িষ্ণু বিরোধী দলের সামিল। মাসে মাসে কিছু চাঁদা নেওয়া , বছরে একবার পিকনিকে যাওয়া আর মুল্যহীন কিছু ইস্যু নিয়ে মাঝে মধ্যে ফ্ল্যাগ-ফেস্টুন হাতে মিছিল করে অস্তিত্ব জানান দেওয়ার মধ্যেই ওই সংগঠনের কর্মসূচি সীমাবদ্ধ। তাদের বিপন্ন সাংবাদিকের পাশে দাঁড়ানোর স্বদিচ্ছা নিয়ে রীতিমতো সংশয় রয়েছে আর্যর। কখনও অন্যায় ভাবে ছাঁটাই হয়ে যাওয়া কোন সাংবাদিকের পুনঃবহালের দাবিতে সরব হতে দেখা যায় না সংগঠনের কর্তাদের। ছাঁটাই হয়ে যাওয়া সাংবাদিকের স্থলে জেলা এবং বহিরাগত কাউকে কাজ করতে দেওয়া হবে 
না বলে কোনদিন সংগঠন গর্জেও ওঠে না। পুনঃবহাল না হওয়া পর্যন্ত সবাই একযোগে কর্মবিরতি পালনের কর্মসূচিও নেওয়া হয় না। তাহলে মিডিয়া হাউসগুলি কিছুটা চাপে থাকে। কিন্তু সেই উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয় না। বরং তলায় তলায় অনেকেই ছাঁটাই হয়ে যাওয়া সাংবাদিকের জায়গায় কাজ করার জন্য তদ্বির শুরু করে দেয়। আর মিডিয়া হাউসগুলি পুরোপুরি সেই সুযোগ নেয়। কাজ কেড়ে নেওয়ার জুজু দেখিয়ে সাংবাদিকদের দাবিয়ে রাখে। কার্যত তাদের বলির পাঁঠা করে কাবাব চিবোন।  আর্যর মাঝে মধ্যে মনে খুব তিতিক্ষা হয়। মনে হয় হাউস বিনা নোটিশে ছাঁটাই করার আগেই সে ইস্তাফার চিঠি হাউসের মুখে ছুড়ে মারে। তারপর বলে, ভালোবেসে  লিখতে এসেছিলাম। খুব শিক্ষা হয়েছে। এবার আমায় রেহাই দিন। কিন্তু বলতে পারে না। তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে স্ত্রী আর বিবাহযোগ্যা মেয়ের মুখ। তাদের মুখ চেয়েই ইচ্ছাটা তাকে গিলে ফেলতে হয়। মাঝে মধ্যে  হাসিও আসে তার। ' চাল বাড়ুইয়ের ঘর উদ্যোম ' বলে গ্রাম বাংলায় একটা কথা চালু রয়েছে। কথাটির মর্মাথ হলো যিনি অন্যের বাড়ির চাল ছাওয়ান তার নিজের বাড়ির চালই ফাঁকা। তাদের মতো সাংবাদিকদের অবস্থা অনেকটা সেই রকম। সব শ্রেণীর মানুষের বঞ্চনা, শোষণলাঞ্ছনার খবর লেখে তারা। যথাসাধ্য পাশে থাকার চেষ্টাও করে। কিন্তু তাদের কথা কেউ ভাবে না। অর্থাভাবে তাদের বাবা-মায়ের চিকিৎসা হয় না। স্ত্রী'র ছোটখাটো আবদার রাখা সম্ভব হয় না। এমন কি যখন যে রাজনৈতিক দল  ক্ষমতায় থাকে তাদের দুর্নীতির খবর লিখতে লিখতে তারা সব দলেরই চক্ষুশুল হয়ে পড়ে। তাই যোগ্যতা থাকা স্বত্ত্বেও তাদের ছেলেমেয়েরা কোনও কাজ পায় না। অথচ নিজেদের বঞ্চনার কথা কাউকে মুখ ফুটে  বলতে পারে না তারা। ওইসব ভাবনা ছাপিয়েও প্রিয়র জন্য মনটা অশান্ত হয়ে ওঠে তার। এতদিনের পরিচিত একটা ভালোমানুষ কতগুলো স্বার্থান্বেষীর চক্রান্তের  বলি হয়ে গেল। অথচ সব জেনেও সে কিছুই করতে পারল না। নিজেকে বড়ো অক্ষম মনে হয় তার। কোন কাজেই মন লাগাতে পারে না। তবু কাজের মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে রেখে অক্ষমতার জ্বালা ভুলে থাকার চেষ্টা করে সে।



            ( ক্রমশ ) 






     নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


শীঘ্রই দেশ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হতে চলেছে আমার তৃতীয় উপন্যাস ------
  
                                  


                       ----০---



No comments:

Post a Comment