অন্তরালে
অর্ঘ্য ঘোষ
( ধারাবাহিক উপন্যাস )
সবে বাড়িতে পা রেখেছে কি রাখে নি , সেই সময় মোবাইল বেজে ওঠে। স্কিনে ভেসে ওঠে পত্রিকা সম্পাদক অরুণ সরকারের ফোন। ভ্রু কুঁচকে যায় প্রিয়র। এ সময় অরুণদার ফোন কেন ভেবে পায় না সে। কোথাও কি বড়সড় অঘটন কিছু ঘটে গেল নাকি ? তাহলে তো অবধারিত ঝাড় খেতে হবে।সেই আশঙ্কাতেই ফোন ধরে' হ্যালো ' বলে সে।
সে যা আশঙ্কা করেছিল, ঘটে ঠিক তাই। ওদিক থেকে অরুণদা গম্ভীর গলায় বলেন , মনোহরপুর হাসপাতালের ডায়্যাগনস্টিক্ সেণ্টারে এক রোগিণীর শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটেছে। ঘটনাটা ঘটেছে সকালের দিকে। খবরটা এখনও আমাদের কাছে এল না কেন ?
আর্য বলে , দাদা আমি নিজে ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম। সব কিছু শুনে মনে হল অভিযোগটা সাজানো। উদ্দেশ্য প্রণোদিত কারণে এক মহিলাকে সামনে রেখে ওই কর্মীকে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। ওই কর্মীও হাতজোড় করে সে দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত খবরটা না করার অনুরোধ করেছেন।
---- এফ, আই , আর হয়েছে তো ?
--- হ্যা দাদা , তা হয়েছে।
--- তবে ? তুমি আটকাতে পারবে খবরটা ? আমরা খবরটা না করলেও অন্য মিডিয়া ছাড়বে ? কেউ না কেউ তো করবেই। তখন তো আমরা ফ্লপ খেয়ে যাব। একেই এইসব খবর পাবলিক ভালো খায়। অন্য কাগজে যখন খবরটা ছাপবে তখন আমরা যদি না ছাপি তাহলে আমাদের কাগজ কেউ কিনবে ? তাছাড়া ' তোমার উপরে তো নেই ভুবনের ভার। '
---- না , দাদা অন্য মিডিয়ার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তারাও কেউ খবরটা করছে না।
---- এই জন্যই তো তোমরা গালাগালি খাও।তুমি কি কোন খবর ছাপা হবে , না হবে তার ঠিকে নিয়ে বসে আছো নাকি? মনে রেখ তুমি কাগজের একজন কর্মী মাত্র।
কোন যুক্তি শুনতে চাই না। তুমি এখনই ডিটেলসে খবরটা পাঠাও।
অত্যন্ত বিরক্তির সঙ্গে কথাগুলো বলে ফোন কেটে দেন অরুণদা। আর্য ভেবে পায় না খবরটা অরুণদার কাছে পৌছোল কি করে ? তাহলে কি কেউ কথা রাখে নি ? প্রশ্নটা মনে জাগতেই টিভি খোলে সে। সে যা ভেবেছিল ঠিক তাইই ঘটেছে। সব চ্যানেলেই তখন খবরটা সম্প্রচার হচ্ছে। অরুণদা যে ওইসব চ্যানেলের খবর দেখেই বিষয়টা জেনেছেন তা পরিস্কার হয়ে যায় তার কাছে।খুব রাগ হয়ে যায় প্রিয়র। ফোনে শৌভিককে ধরে সে। ঝাঁঝের সঙ্গে বলে , খবরটা করতেই হোল শেষ পর্যন্ত ? এই খবরটা না করলে কি চাকরি চলে যেত ?
--- দাদা কিছু মনে কোর না। খবরটা কোনও ভাবে হাউসে পৌঁচ্ছে গিয়েছিল। তাই বাধ্য হয়ে করতে হল খবরটা।
রাগে রাগেই ফোন কেটে দেয় আর্য। বেশ কিছুক্ষণ গুম মেরে বসে থাকে সে। তার মনে হয় এই পরিস্থিতির জন্য শুধু সাংবাদিকরাই নয় , মূলত মিডিয়া হাউসগুলিই দায়ি। বহু ছেলেমেয়ে ভালোবেসে এই পেশায় আসে। সেই সুযোগ নেয় মিডিয়া হাউসের কর্তারা। কোথাও নামে মাত্র বেতনে, কোথাও বা বিনা বেতনে ওইসব সাংবাদিকদের কাজ করিয়ে নেয় তারা। কোন কোন হাউস আবার ছবি কিম্বা খবর প্রকাশিত হলে তবেই নুন্যতম কিছু টাকা দেয়। তাই বেশিরভাগ সাংবাদিক বা ফটোগ্রাফার একবার কোন জায়গায় পৌঁছোলেই যে করেই হোক খবর কিম্বা ছবি করে তবেই ফেরে। নাহলে যে তাদের যাতায়াতের খরচটুকুও ওঠে না। তাই অধিকাংশ সাংবাদিকদের বিচার বিবেচনা বোধটাই হারিয়ে যায়।
আর্য নিজে কানেই অনেক সময় বেশ কিছু সাংবাদিককে বলতে শুনেছে , এসেছিই যখন তখন নাহয় একটা কিছু করেই যায়। বলে রংচঙ দিয়ে পাবলিককে খাওয়ানোর উপযুক্ত অর্থাৎ মিডিয়া হাউসের পচ্ছন্দ সই খবর তৈরি করে নিয়ে যায়। শুধু কি তাই ? কেউ কেউ তো ওই ধরণের খবর তৈরির জন্য প্ররোচনাও সৃষ্টি করে। বেশ কিছু জায়গায় তার সামনেই তো সেই ঘটনা ঘটেছে। সে আপত্তি জানিয়েও কিছু করতে পারে নি। বেশ কিছু সাংবাদিক তার মুখের সামনেই বলে দিয়েছে , তুমি বকো না তো দাদা। মাস গেলে তোমার অ্যাকাউন্টে নাহয় বেতনের টাকা ঢুকে যায়। কিন্তু আমাদের তো সেই সৌভাগ্য নয়। ছবি কিম্বা লেখা না বেরোলে তো আমরা পয়সা পাব না। আমাদের চলবে কি করে বলো? এই বয়সে আর নতুন করে তো কিছু করতে পারব না।
সেই কথা শোনার পর আর কিছু বলতে পারে না আর্য। অসহায়ের মতো তাকেও ঠায় দাঁড়িয়ে প্রত্যক্ষ করতে হয় সহকর্মীদের সংবাদ তৈরির অমানবিক কৌশল। এই তো সেবার বাবার অসুখের সময় সে সদর হাসপাতলে ছিল , এক ডাক্তারের গাফিলতির অভিযোগে বিক্ষোভ দেখানোর জন্য সাংবাদিকদের ডেকে এনেছিলেন রোগীর বাড়ির লোকেরা। চিত্র সাংবাদিকদের তাক করা ক্যামেরার সামনে ডাক্তারের সঙ্গে বচসা চলছে রোগীর বাড়ির লোকেদের। সেই সময় একজন চিত্রসাংবাদিক রোগীর বাড়ির এক মাতব্বরেরকে কিছুটা নিচু স্বরে বলে , দাদা খবরটা ঠিক জমছে না। আর যাই কোথায় ? ততদিনে সংবাদ মাধ্যমের পরিভাষায় খবর জমানো কাকে বলে তা সাধারণ মানুষও ভালোভাবেই জেনে গিয়েছেন। তারই বর্হ্বিপ্রকাশ ঘটে যায় সঙ্গে সঙ্গে। ডাক্তার কিছু বোঝার আগেই আচমকা চড়-থাপ্পড় শুরু হয়ে যায়। পটাপট সেই ছবি তুলে মাতব্বর দাদার পিঠ চাপড়ে হাসপাতাল ছেড়ে বেরিয়ে যান সাংবাদিক - চিত্র সাংবাদিকের দল।পরদিন সমস্ত কাগজে বড়ো বড়ো করে সেই ছবি সহ খবর ছাপা হয়। ডাক্তারের ছেলেমেয়েরা কলেজে পড়ত। স্ত্রী একটি স্কুলে পড়াতেন। লজ্জায় অপমানে পরদিন কাজে ইস্তাফা দিয়ে শহর ছেড়ে চলে যান সেই ডাক্তারবাবু। চোখের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেটা প্রত্যক্ষ করার অপরাধবোধ আজও তাকে কুঁড়ে কু্ঁড়ে খায়।
বছর দুয়েক আগেএকই ঘটনা ঘটেছিল একটি প্রাইমারি স্কুলেও। স্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন একটু একগুঁয়ে টাইপের। শাসকদলের নেতাদের খুব একটা পাত্তা টাত্তা দিতেন না। সেটাই গাত্রদাহের কারণ হয়ে উঠেছিল নেতাদের। হেডমাস্টারকে সবক শেখানোর জন্য তারাও সংবাদমাধ্যমকে ব্যবহার করেছিলেন। নিম্নমানের মিডডে মিলের অভিযোগ তুলে পরিকল্পিত ভাবে মহিলাদের দিয়ে বিক্ষোভ সংঘটিত করে সংবাদমাধ্যমকে খবর দিয়েছিলেন ওইসব নেতারা।সেই এলাকারই এক চিত্রসাংবাদিকের কাছে খবর পেয়ে সেও গিয়েছিল ওই স্কুলে।সেখানেও প্রথম দিকে বচসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল বিক্ষোভ কর্মসূচী। সেই সময় ওই চিত্র সাংবাদিক দূরে দাঁড়িয়ে থাকা নেতা গোছের একজনের কানে কানে কি বলে আসে। নেতা আবার মহিলাদের কানে কানে কিছু বলে দিয়ে সরে যান।তারপরই ওইসব মহিলারা ঝাঁটা পেটা করেন ওই শিক্ষককে। ছবি সহ সেই খবরও বেরিয়েছিল সংবাদ মাধ্যমে। লজ্জায় সেই শিক্ষক ঘুমের ওষুধ খেয়ে নেন। প্রানে বেঁচে যান। কিন্তু মস্তিক বিকৃতির শিকার হয়ে চাকরি খোঁয়ান তিনি। ওই পরিণতির দায় অস্বীকার করতে পারে না সে। আজ চোখের সামনে একের পর পর ভেসে ওঠে আরও অনেক ছবি। একে একে সব মনে পড়ে যায়। মনে পড়ে যায় রেশন রোষের সেই হাড়হিম করা ঘটনার কথাও।দাবানলের মতো গ্রামের পর গ্রাম ছড়িয়ে পড়েছিল রেশন রোষ। দীর্ঘদিনের বঞ্চনার পুঞ্জিভূত ক্ষোভ আছড়ে পড়েছিল রেশন ডিলারদের উপরে। কিছু কিছু জায়গায় সংবাদমাধ্যম ইন্ধন যুগিয়েছিল তাতে। একটি ঘটনা তো তার চোখের সামনেই ঘটেছিল। প্রত্যন্ত গ্রামের এক রেশন ডিলারকে টানা ১০ ঘন্টা ঘরের ভিতরে তালা লাগিয়ে বন্দী করে রেখেছিল উত্তেজিত জনতা।
সেই ফটোগ্রাফারও সেদিন সেখানে ছিল। সে'ই উত্তেজিত গ্রামবাসীদের আরও উত্তেজিত করে তোলে। একসময় তারই ইন্ধনে গ্রামবাসীরা ডিলারের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুনের লেলিহান শিখা একতলা ছাড়িয়ে দোতলার দিকে এগোচ্ছিল। আর বাচ্চা ছেলেমেয়েরা প্রাণের আকুলিতে আর্তনাদ করতে শুরু করছিল। সেদিন সে আর চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে নি। সেই ফটোগ্রাফারকে একটা চড় কসিয়ে বেরিয়ে এসে ফোন করেছিল পুলিশ আর দমকলকে। পুলিশ আর দমকল সময়মতো পৌঁচ্ছে যাওয়ায় সে যাত্রা রক্ষা পেয়েছিলেন ওই রেশন ডিলার। তাই সেদিন সংবাদ মাধ্যমের কিছুটা পাপস্খালণ হয়েছিল বলে প্রিয়র মনে হয়। ওই ধরণের প্ররোচনা সৃষ্টির দায় মিডিয়া হাউস অস্বীকার করতে পারে না। সাংবাদিক - চিত্রসাংবাদিকেরাও তো কোন ভিন্নগ্রহের জীব নয়। তাদেরও খিদে-তেষ্টা, জ্বর-জ্বালা আছে। বাড়িতে বাবা-মা, স্ত্রী-সন্তান আছে। কিন্তু ওই যদি জীবিকা অর্জনের পথ হয় তাহলে তো হয় প্ররোচনা সৃষ্টি করে পাবলিককে খাওয়ার উপযোগী সংবাদ কিম্বা ছবি তৈরি করে নিতে হয় তাদের। নয়তো দুনীতিগ্রস্ত নেতা , আমলা, তোলাবাজ, মাফিয়াদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে করেকম্মে খেতে হয়। আর মিডিয়া হাউসের ঠান্ডা ঘরে বসে থাকা কর্তারা সাংবাদিক - চিত্র সাংবাদিকদের শোষণ করে ফুলে ফেঁপে ওঠেন।
আর্য অবশ্য কোন অবস্থাতেই প্ররোচণা দিয়ে সংবাদ সৃষ্টি কিম্বা দুনীতিগ্রস্থদের সঙ্গে হাত মেলানোর ব্যাপারটা মন থেকে মেনে নিতে পারে না। কিন্তু তার মেনে নেওয়া না নেওয়ার উপরে তো কিছু নির্ভরও করে না। ওইসব কথা ভাবতে ভাবতেই খবর লেখার কথা ভুলে যায় আর্য। ফের অফিস থেকে বার্তা সম্পাদকের তাড়া আসে। অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও খবরটা লিখে পাঠাতে হয় তাকে। অন্যরা করছে তাই তাকেও সংবাদ করতে হচ্ছে বলে মনকে স্তোকবাক্য দিয়ে সান্ত্বনা খোঁজার চেষ্টা করে সে। সে আসল ঘটনাটিই তুলে ধরার চেষ্টা করে। তবু সে রাতে সে দু'চোখের পাতা এক করতে পারে না। বারবার তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে প্রিয়র ছেলেমেয়েদের দুটোর মুখ। একদিকে কোমরে দড়ি বেঁধে প্রিয়কে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ, অন্যদিকে ছেলেমেয়েদুটো বাবাকে ধরে আটকে রাখার চেষ্টা করছে।মর্মান্তিক সেই দৃশ্যটি কিছুতেই মন থেকে মুছে ফেলতে পারে আর্য। পুলিশের ওই হেনস্থা তার চূড়ান্ত অমানবিক আর আইনবিরুদ্ধ বলে মন হয়। কারণ কাউকে কোন অভিযোগে ধরা হলে সে অভিযুক্ত হতে পারে , কিন্তু অভিযোগ প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত কোনক্রমেই আসামী নয়।
অথচ পুলিশ একজন অভিযুক্তের সঙ্গে ফেরারী আসামী মতোই আচরণ করে।আবলীলায় ধৃত ব্যক্তিকে আসামী বলা হয়। শুধু তাই নয় , ফেরারী আসামীর মতোই সবাইকে কোমরে দড়ি বেঁধে কিম্বা হাতকড়া পড়িয়ে নিয়ে যায় পুলিশ। সে যতদুর জানে ভারতীয় দন্ডবিধি অনুযায়ী এমনটা করা আইন বিরুদ্ধ।অথচ খোদ আইনালয়েই সেই আইনের অবমাননা হয়। পুলিশ সবার সামনে দিয়েই ধৃতকে কোমরে দড়ি বেঁধে কিম্বা হাতকড়া পড়িয়ে ধৃতদের আদালতের লকআপে হাজির করে। অথচ আইনই বলছে অপরাধ প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্তের সম্পূর্ণ নির্দোষ হিসাবে বিবেচিত হওয়ার কথা। বহু ক্ষেত্রে অভিযুক্ত বিচারে বেকসুর খালাস পায়। কিন্তু সেই কথা কেউ জানতেও পারে না। লোক সমাজে অভিযুক্তের সেই কোমরে দড়ি বাঁধা হাতকড়া লাগোনো ছবিটাই ধরা থাকে। সারাজীবন ধরে তার মুল্য চোকাতে হয় অভিযুক্ত আর তার পরিবারকে। বুকের ভিতরটা আনচান করে ওঠে আর্যর। মাঝে মধ্যে দমবন্ধ হয়ে আসছে মনে হয়। তাই রাতে আর ঘুমোতে পারে না সে। পরদিন প্রিয়কে কোর্টে দেখতে যাবে বলে ঠিক করে সে। কিন্তু সেটা আর হয়ে ওঠে না। তার পা আটকে ধরে সাত সকালের একটা ফোন।
( ক্রমশ )



No comments:
Post a Comment