অজুহাত
অর্ঘ্য ঘোষ
চৌহাট্টা বাসস্ট্যান্ডের প্রতীক্ষালয়ে একই থালা থেকে পান্তা খাচ্ছিল ওরা দুজনে। সেদিকে চেয়েছিল সন্দীপন। কিন্তু খাওয়া শেষে হাটুর নিচে থেকে দু'পা কাটা লোকটাকে ছেলেটা বাবা বলে সম্বোধন করতেই সম্বিত ফেরে তার। আরে কাছা পড়া ছেলেটাই তো সেদিন লাভপুরের বাসে বাবার শ্রাদ্ধের কথা বলে ১০ টাকা ভিক্ষে নিয়েছে।
সেকথা মনে পড়তেই খপ করে ছেলেটার হাত চেপে ধরে সন্দীপন। বলে, আচ্ছা ছেলে তো তুই বাপ বেঁচে থাকতেও তার শ্রাদ্ধ দিচ্ছিস। ছেলেটার চেয়েও অস্বস্তিতে পড়ে যায় লোকটি।বলে ওঠে , বাবু একটু ওদিকে চলুন।সব বলছি। তারপর চাইলে আপনার দেওয়া টাকাটা ফেরত নেবেন। অগ্যতা বাপ ছেলের সঙ্গে একটু আড়ালে যায় সে। সব শুনে কথা হারিয়ে যায় তার।
লোকটির বাড়ি বিবিডাঙা। দিনমজুরী করে দুই ছেলে মেয়ে আর স্ত্রীকে নিয়ে কোন রকমে চলত সংসার। একদিন ছোটলাইনের ট্রেন থেকে ঘাসের বোঝা নিয়ে নামতে গিয়ে পা দুটি চলে যায়। তার কিছুদিন পরই ছোট ছেলে মেয়ে দুটোকে ফেলে চলে যায় স্ত্রীও। তারপর থেকেই মেয়েটিকে বাড়িতে রেখে ছেলেকে নিয়ে ছেঁচড়ে ছেঁচড়ে নিকটবর্তী বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছোয় সে। ছেলেকে কোন বাসে তুলে দিয়ে পান্তা নিয়ে প্রতীক্ষায় থাকে।
বাসে বাসে ভিক্ষা করে দিনান্তে ছেলে যা আনে তাতে পেট ভরে না। তার উপরে ছোট লাইন ভেঙ্গে বড়ো লাইন তৈরি হচ্ছে বলে ট্রেন থাকায় বেশিদুর যাওয়াও যায়। ভাড়া না পেয়ে বাসকর্মীরা মাঝপথে নামিয়ে দেয়। নাগাড়ে জীবনের ইতিবৃত্ত আউড়ে এবার লোকটিই প্রশ্ন ছুড়ে দেয় , আচ্ছা বলুন তো বাবু আমাদের অজুহাতটা মিথ্যা হতে পারে , অভাবটা কি মিথ্যা ? ভেক ছাড়া কি ভিক্ষা মেলে ? এই যে আপনি শ্রাদ্ধের কথা শুনে ১০ টাকা দিয়েছেন , শুধু ভিক্ষা চাইলে কত আর দিতেন চার আনা কিম্বা আট আনা। তাছাড়া আমি তো মরারই সামিল। না হলে নিজের শ্রাদ্ধের ভিক্ষান্ন কেউ খাই। নিন বাবু , আপনার দেওয়া টাকাটা ফেরত নিন।
সন্দীপন চেয়ে দেখে ছেলেটির পরণে তখনও কাছা। গলায় ঝুলছে চাবি। হাতে ধরা ১০ টাকার নোট। দিনান্তের সঞ্চয়। পালাবার পথ পায় না সমাজ কল্যাণ দফতরের পদস্থ আধিকারিক সন্দীপন হাজরা।
-----০----
আক্ষেপ
কি কুক্ষণেই যে স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে সেদিন থানায় গিয়েছিল সেই আক্ষেপ আজও যায় নি মনিমালার। সে প্রায় বছর দশেক আগের কথা। ভালোবাসা করেই গ্রামেরই ভ্যান চালক বীরেন ভুঁইমালীর সংগে বিয়ে হয়েছিল মনিমালার। দুজনেরই ভালোবাসার কোন খামতি ছিল না। বরং একে অন্যকে চোখেই হারাতো।
কিন্তু রাতের পর রাত মদ খেয়ে স্বামীর পাড়া মাথায় করাটা আর সহ্য করতে পারছিল না। বিস্তর ওঝা, তাবিজ, কবজ এমন কি বর্ধমানের খোসবাগ থেকে গোপনে মদ ছাড়ানোর ওষুধ আনিয়ে খাওয়েও স্বামীকে বশে আনতে পারেনি মনিমালা। পাড়ারই সুলতা বৌদি বলেছিলেন, থানায় নতুন বড়োবাবু এসেছে। খুউব রাগী। যা গিয়ে সব খুলে বল, দেখ তুলে নিয়ে গিয়ে ঘা কতক দেবে। দেখবি সব ঠান্ডা হয়ে যাবে। পরামর্শটা মনে ধরলেও স্বামীর ঘা কতক খাওয়াটা মনোপুত হয়নি মনিমালার। হাজার হোক ভালোবাসার মানুষ তো। সুলতা বৌদি বুঝিয়েছিলেন, একদিন বই তো নয়।
অগ্যতা নিমরাজি হয়ে সেদিন থানায় যায় মনিমালা। সব বৃত্তান্ত শুনে বড়বাবু কনেষ্টবল পাঠিয়ে থানায় উঠিয়ে আনেন বীরেনকে। ঘা কতক দেওয়ার পর গোঁফ মুচড়ে বড়বাবু বলেন, বুঝলি বাড়ি গেলেই এ ব্যাটা ফের মদ খাবে। কিছুতেই বাগে আনা যাবে না। তার চেয়ে তোরা দুজনেই বরং আমার কোয়ার্টারেই থেকে যা। প্রস্তাবটা খারাপ লাগে না মনিমালার। তাদের আশ্রয় হয় বড়বাবুর কোয়ার্টারের বাইরের ঘরে। বাড়ির কাজ সহ বড়বাবুর রান্নার দায়িত্ব বর্তায় মনিমালার উপরে। আর বীরেনকে দেওয়া হয় ফুলগাছ পরিচর্চার কাজ। সেদিন মনিমালা ভেবেছিল, যাক এতদিনে একটা হিল্লে হলো। কিন্তু অচিরেই সেই ভুল ভাঙে মনিমালার।
একদিন রাতে মনিমালা দেখে বীরেনকে মদ আনতে টাকা দিচ্ছেন খোদ বড়বাবু। সেই মদ খেয়ে বাইরের ঘরে বেহেড হয়ে পড়ে বীরেন। আর সেই সুযোগে মনিমালাকে নিজের বেডরুমে ডেকে নেন বড়োবাবু। আচমকা তার উপরে জন্তুর মতো ঝাপিয়ে পড়ে বাপের বয়সী লোকটা। কোন প্রতিরোধই করতে পারে না মনিমালা। বাইরের ঘরে তখন মদে গ্রাস করে নিয়েছে বীরেনকে। স্ত্রীর ইজ্জত হারানোর আর্ত চিৎকার পৌঁছোয় না তার কানে। তারপর থেকে সেই একই রোজ নামচা। বড়বাবু যখনই যেখানে বদলি হন তখন বীরেন-মনিমালাকেও সেখানে যেতে হয়। আপত্তি তুললেই বড়বাবুর হুমকি, এমন কেস দিয়ে তোর স্বামীকে জেলে পাঠিয়ে দেব সারা জীবন পচে মরবে। আর তোকে শিয়াল কুকুরে ছিঁড়ে খাবে।
অগত্যা মুখ বুঝে সব মেনে নিতে হয় মনিমালাকে। রাতের পর রাত মদে বেহুঁশ স্বামীকে নিয়ে বরাদ্দ ঘরে ফেরে ক্লান্ত বিধ্বস্ত মনিমালা। একদিন সহ্যের বাঁধ ভেঙে যায় তার। পেটে তখন তাদের ভালোবাসার সন্তান। এর আগেরটা বড়বাবুর লালসার জন্য নষ্ট হয়ে গিয়েছে। তাই সেদিন বড়বাবু ফের ঝাপিয়ে পড়ার উপক্রম করতেই মনিমালা বলে ওঠে, বাবু দেশের বাড়িতে তো আপনার স্ত্রী রয়েছে। কেউ যদি আপনারই মতো তাকে এইভাবে দিনের পর দিন ভোগ করে ? কেমন লাগবেআপনার? বলা বাহুল্য ওই প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। মিলেছিল গালে সপাটে একটি চড়। একটু ব্যাথা লাগলেও মনিমালা বুঝেছিল, চড়টা আসলে বড়বাবু নিজের গালেই মেরেছিলেন। কারণ মাস খানেকের মধ্যে বদলি নিয়ে পাততাড়ি গুটিয়ে বড়োবাবু গ্রামের বাড়িতে ফিরে গিয়েছিলেন। বড়বাবুর গালে এমন একটা চড় কেন আরও আগে মারে নি সেই আক্ষেপ মনিমালা এখন মনে মনে করে।
-------- ০ -------
বিলাপ
সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত নলহাটি অবর বিদ্যালয় পরিদর্শকের চত্বরের গাছ তলায় পড়ে থাকে বছর পঁয়ত্রিশের ছেলেটি। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। ময়লা জামা প্যান্ট।খিদে তৃষ্ণা নেই। কেউ কিছু দিলে ইচ্ছে হলে খায় , বাকিটা কুকুরে কেড়ে খায়। বিড়বিড় করে জীবনানন্দ থেকে জয় গোস্বামী আওড়ায়। কখনও চলে যায় সেক্সপিয়ার থেকেশেলি। আর মাঝে মাঝে শুধু চিৎকার করে উঠে , কই স্যার চাকরি দিন।
বাপ-মা আদর করে ছেলেটির নাম রেখেছিল খোকন। নলহাটির প্রত্যন্ত গ্রামে তাদের বাড়ি। বাবা সদাশিববাবু ছিলেন সত্যিই শিবতুল্য মানুষ। শিক্ষকতা করতেন স্থানীয় একটিপ্রাইমারী স্কুলে। যে যখন যে কাজ নিয়েই আসুক না কেন গুরুত্ব দিয়ে তা সমাধানেরচেষ্টা করেছেন। ছেলে খোকন, মেয়ে খুকী আর স্ত্রী সুলতাকে নিয়ে ছিল তার সাজানোসংসার। নিজে হাতে ছেলে মেয়েদের পড়িয়েছেন। ছেলে ইংরাজীতে এম,এ পাশ। মেয়েবাংলার স্নাত্মক। শুধু লেখা পড়াই নয় , সাহিত্য সংস্কৃতি সব বিষয়েই যথার্থঅর্থেই ছেলেমেয়েদের মানুষ করেছেন তিনি। কিন্তু সেই মানুষ করার মুল্য যেবর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় কানাকড়িও নয় তা বাপ-- ছেলে পদে পদে টের পাচ্ছে।
বাবাকে সাইকেলে স্কুল থেকে আনতে গিয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় ছেলেকে।বাবাকেও কুঁকড়ে যেতে হয়। শুভানুধায়ীরা অযাচিতভাবে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়, কই গো মাষ্টারমশাই ছেলে তো শুনি বড়ো বড়ো পাশ দিয়েছে। এখনও তো কোন কাজ জোটাতে পারলনা। সরকারি চাকরির বয়েস তো পেরোতে চলল। এরপর কি সারাজীবন বাপের ঘাড়ে বসে বসেইখাবে ? ওইসব প্রশ্নের মুখে কুকড়ে যায় বাপ--ছেলে। বাড়ি ফেরার মুখে বাবা ছেলেকে স্বান্তনা দেন, ওসব কথা কানে তুলিস না। শিক্ষার একমাত্র উদ্দ্যেশ্য চাকরি পাওয়া নয়। সবাইকে চাকরি পেতেই হবে এমনটাও নয়। চেষ্টা করে দেখ হলে ভালো, নাহলেআমি তো আছি। বাবার কথা শুনে কিছু বলে না খোকন।
কিন্তু অক্ষমতার জ্বালা কুঁড়ে্কুঁড়ে খায় তাকে। নিত্যদিন শুভানুধ্যায়ীদের ওইসব কথার জবাবে অনেক কথা মুখে আসে।মুখের উপর বলে দিতে ইচ্ছে করে, লেখাপড়া করে নিজেকে যোগ্য করে তোলাটাই ছাত্রছাত্রীদের কাজ। তাদের কর্মসংস্থানের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্রের ব্যর্থতার দায় কেন বেকারদেরই বইতে হবে ? কিন্তু একটাও কথা বলতে পারে না কাউকে।কারণ বাবা বলেছেন, কেউ তোমাকে আঘাত করলে তুমি প্রত্যাঘাত করবে না। বাবার দেওয়া সেই শিক্ষাই সংযত রাখে খোকনকে। কিন্তু ধারাবাহিকভাবে শুভানুধ্যায়ীদের খোঁচা হজম করতে করতে মানসিক অবসাদগ্রস্থ হয়ে পড়ে খোকন। চাকরীর খোঁজে উদভ্রান্তের মতো সরকারি দফতরে ঘুরতে থাকে। শেষ একদিন পৌঁছোয় বাবা যে সার্কেলের অধীনস্থ স্কুলে চাকরি করেন সেই সার্কেলের অবর বিদ্যালয় পরিদর্শকের দফতরেও।পরিদর্শককে বলে,স্যার বাবার তো বয়েস হয়ে গিয়েছে। কয়েকমাস পরেই অবসর নেবেন। বাবার চাকরিটা আমায় দিন না স্যার। সব শুনে পরিদর্শক বলেন, সেরকম তো কোন নিয়ম নেই। তবে কর্মরত
অবস্থায় বাবার মৃত্যু হলে ছেলে বা পরিবারের কেউ চাকরি পেতে পারে।
কথাগুলো শুনে কেমন যেন গুম মেরে যায় খোকন। তারপর থেকে হাতের কাছে যাকেই পায় তাকে ধরে ধরে বলে, জানো তো এসময় বাবা মারা গেলেই চাকরিটা আমি পেয়ে যাব। এস, আই বলেছে জানো।এমন কি বাবাকেও বলে, জানো তুমি মরে গেলে আমি আর বেকার থাকব না। শুনে বাবা হেসে সস্নেহে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলেন, সেটা হলে তো ভালোই হয় রে। মা শুনে বলেন, খোকন ওকি অলুক্ষণে কথা।ছিঃ বাবা ওরকম বলতে নেই। সদাশিববাবু বলেন,ওর কথা বাদ দাও সুলতা। ও কি জানে কি বলছে ও। লোকেই ওর মাথাটা খারাপ করে দিল।তারপর ছেলে- মেয়েকে কাছে বসিয়ে বলেন. আয় সেই গানটা করি। সমবেত কন্ঠে তুমি নির্মল করো মঙ্গল করো গানে এক অদ্ভুত আবেশ ভুলিয়ে দেয় সব কিছু।
তারপর সেই
অভিশপ্ত দিনটা এল। বাবাকে সাইকেলে চাপিয়ে নির্জন রাস্তায় ফিরছিল খোকন। হঠাৎ সে বাবাকে ফেলে দেয়। রাস্তা থেকে একটা পাথর কুড়িয়ে নিয়ে সজোরে মারে বাবার মাথায়।সদাশিববাবুর আর্ত চিৎকারে ভারী হয়ে ওঠে বাতাস। লোকজন ছুটে আসে। ততক্ষণে সবশেষ। বাবার রক্তাক্ত মৃতদেহ ঘিরে পাগলের মতো ঘুরতে থাকে খোকন। আর উপস্থিত জনতাকে উদ্দেশ্য করে বলতে থাকে, আর তো তোমরা কেউ আমাকে বেকার বলতে পারবে না।এস, আই বলছে কর্মরত অবস্থায় বাবা মরলে চাকরিটা আমি পাবো।
তিন বছর পর জেল থেকে ছাড়া পায় খোকন। কিন্তু তখন সে পুরোপুরি পাগল। সেই থেকে তার ঠিকানা নলহাটির এস ,আই অফিস। পরিদর্শকের পর পরিদর্শক বদলে যায়। খোকন শুধু বলে যায়, কই স্যারচাকরিটা দিন। সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে মরে আসে আলো। একই কথা বলতে বলতে
কান্ত অবসন্ন হয়ে পড়ে খোকন।
অদুরে দাঁড়িয়ে মা ডাকেন, আয় খোকন বাবা বাড়ি চল।হঠাৎ হাউ হাউ করে কেঁদে উঠে খোকন। বলে উঠে, বাবা তুমি ফিরে এসো। আর আমার চাকরি চাই না বাবা। চলো আমরা এমন কোথাও চলে যাব যেখানে যোগ্যতার মাপকাঠি চাকরিতে নয়,শিক্ষাতে বিচার্য্য হবে যেখানে কেউ আমাকে বেকার বলবে না। তোমাকে শুনতে হবেনা অমুকের ছেলে চাকরি পেল, তোমার ছেলে কেন পেল না। কিন্তু কারো কথা কেউ শুনতেপায় না। গেট বন্ধের ঘড় ঘড় শব্দ ঢেকে দেয় যাবতীয় বিলাপ।
অবস্থায় বাবার মৃত্যু হলে ছেলে বা পরিবারের কেউ চাকরি পেতে পারে।
অভিশপ্ত দিনটা এল। বাবাকে সাইকেলে চাপিয়ে নির্জন রাস্তায় ফিরছিল খোকন। হঠাৎ সে বাবাকে ফেলে দেয়। রাস্তা থেকে একটা পাথর কুড়িয়ে নিয়ে সজোরে মারে বাবার মাথায়।সদাশিববাবুর আর্ত চিৎকারে ভারী হয়ে ওঠে বাতাস। লোকজন ছুটে আসে। ততক্ষণে সবশেষ। বাবার রক্তাক্ত মৃতদেহ ঘিরে পাগলের মতো ঘুরতে থাকে খোকন। আর উপস্থিত জনতাকে উদ্দেশ্য করে বলতে থাকে, আর তো তোমরা কেউ আমাকে বেকার বলতে পারবে না।এস, আই বলছে কর্মরত অবস্থায় বাবা মরলে চাকরিটা আমি পাবো।
তিন বছর পর জেল থেকে ছাড়া পায় খোকন। কিন্তু তখন সে পুরোপুরি পাগল। সেই থেকে তার ঠিকানা নলহাটির এস ,আই অফিস। পরিদর্শকের পর পরিদর্শক বদলে যায়। খোকন শুধু বলে যায়, কই স্যারচাকরিটা দিন। সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে মরে আসে আলো। একই কথা বলতে বলতে
কান্ত অবসন্ন হয়ে পড়ে খোকন।
-------০-------
শেষ কেরামতি
চিতায় তোলার সময় আদরের নাতনির মৃতদেহ জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন ধন্যত্বরী।ধন্যত্বরী অবশ্য তার আসল নাম নয়। তবু এলাকার লোক তাকে ওই নামেই চেনে। আমোদপুরলাগোয়া জুইতা গ্রাম ঢোকার মুখে বটগাছে লটকানো পোষ্টারেও হারান দেবাংশীর নামেরআগে লেখা রয়েছে শব্দটা।
আর থাকবেই না বা কেন ? আশপাশের লোক তাকে ভুত ছাড়ানো,সাপের বিষ নামানোর ডাকসাইডে ওঝা হিসাবেই চেনেন। সেই ওঝার আদরের প্রিয় নাতনীমনিকে খড়ের পালুইয়ের ফাঁকে লুকোচুরি খেলার সময় জাত সাপে কামড়ায়। গ্রামের লোকেরা পায়ে বাঁধন দিয়ে একদল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার উপক্রম করতেই আরএকদল বলে, দাদু অত বড়ো ওঝা থাকতে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে কেন ? লংকা পোড়ারঝাঁঝ আর ঝাটার বাড়ি মেরে কতজনের ভুত ছাড়িয়েছেন, কতজনের সাপের বিষ নামিয়েছেন তার ঠিক নেই।
চলো চলো ওকে বাড়িতেই নিয়ে চলো। নাতনিকে ওই অবস্থায় দেখে পা আরসরে না হারানের। কথা বেরোয় না মুখ থেকে। প্রতিবেশীরাই তাড়া লাগায় , কই গোধন্যত্বরী জড়িবুটি কি আছে সব নিয়ে এসো। কতজনের বিষ নামিয়েছো, আর নিজের নাতনিবিষের জ্বালায় ছটফট করছে দেখতে পাচ্ছো না। প্রতিবেশীদের তাড়া খেয়ে কেমন যেনমোহচ্ছন্নের মতো নাতনির কাছে পৌঁছোয় হারান। শুরু করে ঝাড়ফুঁক। সময় যত গড়ায় ততইনিস্তেজ হয়ে পড়ে ছোট্ট মেয়েটি।
যন্ত্রনায় নীল হয়ে যাওয়া নাতনির মুখের দিকেতাকিয়ে মাঝেমধ্যেই হাত থেমে যায় হারানের। টানা ৫ ঘন্টা যন্ত্রনায় কাতরাতেকাতরাতে একসময় নেতিয়ে পড়ে মনি। কান্নার রোল ওঠে বাড়িতে। কেবল নির্বাক হয়ে যান হারান ওঝা। শ্মশানযাত্রীদের সংগে পায়ে পায়ে পৌঁছোন শ্মশানে। চিতায় তোলার পরঅব্যক্ত কান্নায় ভেংগে পড়েন। শ্মশানযাত্রীরা স্বান্তনা দেন, বুক তো ফেটেযাওয়ারই কথা। নিজে এত বড়ো ওঝা হয়ে নাতনিকে বাঁচাতে না পারার যন্ত্রনা কি কম!যন্ত্রনায় বুক ফেটে যায় হারানের। কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারেন না, ওঝা না ছাই।
সব মানুষকে বোকা বানানোর ছল। বিষ নাহলে ওঝার কেরামতি বাড়ে। বিষ হলে বাবামায়েদের চোখে জল ঝড়ে।বলতে পারেন না, হাসপাতালে নিয়ে গেলে মনি বেঁচে যেত। কারণ এই রকম বহু মনিকে তারইবাড়িতে বিষ নামাতে নিয়ে এসে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি যেতে হয়েছে তাদের বাবা-মাকে।গ্রামবাসীরাও বুঝতে পারেন না কিছু। তাদের মনে প্রশ্ন জাগে, এতবড়ো ওঝারনাতনিকেও মরতে হয় সাপে কেটে? কোন উত্তর মেলে না। তারা শুধু প্রত্যক্ষ করেন,পরদিনই গাছ থেকে ধন্যত্বরী লেখা সাইনবোর্ডটা নামিয়ে নেওয়া হয়েছে।
আর থাকবেই না বা কেন ? আশপাশের লোক তাকে ভুত ছাড়ানো,সাপের বিষ নামানোর ডাকসাইডে ওঝা হিসাবেই চেনেন। সেই ওঝার আদরের প্রিয় নাতনীমনিকে খড়ের পালুইয়ের ফাঁকে লুকোচুরি খেলার সময় জাত সাপে কামড়ায়। গ্রামের লোকেরা পায়ে বাঁধন দিয়ে একদল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার উপক্রম করতেই আরএকদল বলে, দাদু অত বড়ো ওঝা থাকতে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে কেন ? লংকা পোড়ারঝাঁঝ আর ঝাটার বাড়ি মেরে কতজনের ভুত ছাড়িয়েছেন, কতজনের সাপের বিষ নামিয়েছেন তার ঠিক নেই।
চলো চলো ওকে বাড়িতেই নিয়ে চলো। নাতনিকে ওই অবস্থায় দেখে পা আরসরে না হারানের। কথা বেরোয় না মুখ থেকে। প্রতিবেশীরাই তাড়া লাগায় , কই গোধন্যত্বরী জড়িবুটি কি আছে সব নিয়ে এসো। কতজনের বিষ নামিয়েছো, আর নিজের নাতনিবিষের জ্বালায় ছটফট করছে দেখতে পাচ্ছো না। প্রতিবেশীদের তাড়া খেয়ে কেমন যেনমোহচ্ছন্নের মতো নাতনির কাছে পৌঁছোয় হারান। শুরু করে ঝাড়ফুঁক। সময় যত গড়ায় ততইনিস্তেজ হয়ে পড়ে ছোট্ট মেয়েটি।
যন্ত্রনায় নীল হয়ে যাওয়া নাতনির মুখের দিকেতাকিয়ে মাঝেমধ্যেই হাত থেমে যায় হারানের। টানা ৫ ঘন্টা যন্ত্রনায় কাতরাতেকাতরাতে একসময় নেতিয়ে পড়ে মনি। কান্নার রোল ওঠে বাড়িতে। কেবল নির্বাক হয়ে যান হারান ওঝা। শ্মশানযাত্রীদের সংগে পায়ে পায়ে পৌঁছোন শ্মশানে। চিতায় তোলার পরঅব্যক্ত কান্নায় ভেংগে পড়েন। শ্মশানযাত্রীরা স্বান্তনা দেন, বুক তো ফেটেযাওয়ারই কথা। নিজে এত বড়ো ওঝা হয়ে নাতনিকে বাঁচাতে না পারার যন্ত্রনা কি কম!যন্ত্রনায় বুক ফেটে যায় হারানের। কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারেন না, ওঝা না ছাই।
সব মানুষকে বোকা বানানোর ছল। বিষ নাহলে ওঝার কেরামতি বাড়ে। বিষ হলে বাবামায়েদের চোখে জল ঝড়ে।বলতে পারেন না, হাসপাতালে নিয়ে গেলে মনি বেঁচে যেত। কারণ এই রকম বহু মনিকে তারইবাড়িতে বিষ নামাতে নিয়ে এসে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি যেতে হয়েছে তাদের বাবা-মাকে।গ্রামবাসীরাও বুঝতে পারেন না কিছু। তাদের মনে প্রশ্ন জাগে, এতবড়ো ওঝারনাতনিকেও মরতে হয় সাপে কেটে? কোন উত্তর মেলে না। তারা শুধু প্রত্যক্ষ করেন,পরদিনই গাছ থেকে ধন্যত্বরী লেখা সাইনবোর্ডটা নামিয়ে নেওয়া হয়েছে।
--------০-------

No comments:
Post a Comment