ভিক্ষাজীবিদের সঙ্গে
পায়ে হাতের ছোঁওয়া পেতেই নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না যোগমায়া মেটে , আদর বিত্তার , অঞ্জলি থান্দাররা । তাদের পায়ে এর আগে নিজের ছেলেমেয়ে ছাড়া তো হাত বড় একটা কেউ হাত ছোঁওয়ায় নি । বরং তারাই সবার পায়ে হাত দিয়ে প্রনাম করছেন । তাই পায়ে হাতের ছোঁওয়া পেতেই গয়ানাথ রুদ্র এবং তার স্ত্রী আগমনী রুদ্রকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ভাসালেন তারা । আবেগ আপ্লুত গলায় বললেন , বাবাগো, এর আগে কেউ তো এই সম্মান আমাদের দেয় নি । আমরাই বরং প্রতিবার পেটের তাগিদে ছেলে-মেয়ের বয়েসীদের পায়ে হাত রেখে প্রনাম করেছি । অনেকে প্রত্যুত্তরটুকুও দেয় নি । ভগবান তোমাদের মঙ্গল করুক বাবা ।
শুধু যোগমায়া মেটেরাই নন , প্রায় শতাধিক ভিক্ষাজীবির মুখেই শোনা গেল একই প্রতিক্রিয়া । এদিন নিজের বাড়িতে ওইসব ভিক্ষাজীবিদের নিয়ে বিজয়া সম্মিলনীর আয়োজন করেছিলেন বীরভূমের নানুরের থানা পাড়ার বাসিন্দা মনোহারীর দোকানদার গয়ানাথ রুদ্র । গত বছর থেকেই একক প্রচেষ্টায় ওই সম্মিলনীর আয়োজন করছেন তিনি।এক ভিক্ষাজীবির মর্মস্পর্শী আর্তিই তাকে এই আয়োজনে উদ্বুদ্ধ করে । সেদিনও ছিল শুক্রবার। সপ্তাহের ওই দিনতেই নানুর বাজার এলাকায় ভিক্ষারীদের ভিক্ষা দেওয়ার নিয়ম । সেদিন তার দোকানে স্থানীয় মোতিপুরের ৬৬ বছরের ভিক্ষাজীবি হারাধন দাস ভিক্ষা নেওয়ার পর প্রশ্ন তুলেছিলেন , ‘ আচ্ছা বলতে পারো বাবা আমরা কি এমন পাপ করে এসেছি যে বিজয়ার দিনটাও মানুষের বিরক্তির শিকার হতে হয় । অথচ বাড়িতে অন্য কেউ এলে কত আদর-আপ্যায়ন হয়। আমাদের কেউ কি একটা দিন ভালোবেসে একটু মিষ্টিমুখ করাতে পারে না ?
ভিক্ষাজীবির ওই প্রশ্নই নাড়িয়ে দেয় তাকে । নানুর থানার মোড়ের ছোট্ট দোকানের আয়েই কোন রকমে জোড়াতালি দিয়ে চলে দুই ছেলে এবং স্ত্রীকে নিয়ে চার সদস্যের সংসার । কিন্তু সাতপাঁচ না ভেবেই গয়ানাথবাবু পরের শুক্রবার নিজের দোকানের সামনে চেয়ার পেতে বিজয়া সম্মিলনীর আয়োজন করেছিলেন । শতাধিক ভিক্ষাজীবিকে ভরপেট টিফিনে আপ্যায়িত করেন তিনি। এবারও তার অন্যথা হয়নি ।এবারে অবশ্য আয়োজন করেছেন নিজের বাড়িতেই । টিফিনের পাশাপাশি ছিল মধ্যাহ্ন ভোজে খিচুড়ি, তরকারি, টক, পায়েস , মিষ্টি আর আইসক্রীম । খাওয়া দাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে চলল গান ,গল্প , আড্ডা , বিজয়ার প্রীতি সম্ভাষণ । কীর্ণাহারের চণ্ডীচরণ মুখোপাধ্যায়কে বুকে জড়িয়ে ধরলেন বর্ধমানের কাঁদরার সমর দাস , কেতুগ্রামের খাসপুরের যোগমায়া মেটের হাত জড়িয়ে ধরলেন চন্ডীপুরের অঞ্জলি থান্দাররা । তাদের কথা আর ফুরোয় না । আনন্দোচ্ছল গলায় তারা জানান , কি ভালো যে লাগছে বলে বোঝাতে পারব না । সম্মানের সঙ্গে কেউ তো খাওয়ায় না। বিনা নিমন্ত্রণে ভোজবাড়িতে কুকুরের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে হয় । সবার শেষে হতশ্রদ্ধার খাওয়া জোটে ।
বিদায় নেওয়ার সময় কেউ আর নিজেকে ধরে রাখতে
পারলেন না । রুদ্র দম্পতি যাওয়া আসার ভাড়া বাবদ ভোজনদক্ষিণা হিসাবে প্রত্যেকের
হাতে ১১ টাকা করে তুলে দেওয়ার পাশাপাশি যখন পায়ে হাত ছুঁয়ে প্রনাম করতে শুরু
করেছেন তখন সকলের চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে শুধুই আনন্দাশ্রু। কেউ করছেন মাথায় হাত রেখে
আর্শিবাদ , কেউ বা আবার দুজনকে জড়িয়ে ধরে কথা হারিয়ে ফেলছেন । ছবি চিত্রকর , আদর
বিত্তাররা জানান , এতদিন পেটের তাগিদে ছোটবড়ো অনেকেই শুধু প্রণাম করে এসেছি।কিন্তু
আমরাও যে কারো প্রনাম পেতে পারি তা ভাবতে পারিনি। আর রুদ্র দম্পতি জানিয়েছেন , আমাদের অভাবের
সংসারে এই আয়োজনে অভাব একটু বাড়ল ঠিকই কিন্তু ওইসব মানুষের মুখের হাসি আমাদের অনেক
শুন্যতাও ভরিয়ে দিল।
----০----
পংক্তিভোজে
আন্তরিকতার ছোঁওয়ায় পংক্তিভোজ হয়ে উঠল বিজয়া
সম্মিলনী । শুরুটা ছিল অবশ্য মন্দির সংস্কারের অভিষেক উপলক্ষ্যে খাওয়া দাওয়ার
অনুষ্ঠান । এবারে সেই অনুষ্ঠানই কার্যত বিজয়া সম্মিলনীর রূপ নিল । বিজয়ার শুভেচ্ছা
বিনিময়ের পাশাপাশি একাসনে পাতে পাত ঠেকিয়ে খেলেন পাঁচ হাজারেরও বেশি মানুষ ।গত বছর
ময়ূরেশ্বরের কুণ্ডলা সর্বমঙ্গলা মন্দিরের সংস্কার এবং অভিষেক উপলক্ষ্যে
পঙক্তিভোজের আয়োজন করে কুণ্ডলা স্বেচ্ছাসেবী গ্রামীণ পরিকল্পনা ও উন্নয়ন সংস্থা ।
এবারেও সেই আয়োজন করে তারা । কিন্তু এবারের পঙক্তিভোজ কার্যত বিজয়া সম্মিলনীতে
পরিণত হল।
গতবছর
যারা পঙক্তিভোজে যোগ দিয়েছিলেন এবারও তাদের অনেকেই সামিল হন । বিজয়ার পর এই প্রথম
দেখা। স্বভাবতই পঙক্তিভোজে বসার আগে নিজেদের মধ্যে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে দেখা গেল
অনেককেই।তাদের কেউ দিনমজুর , কেউ
গৃহ পরিচারিকা, কেউ
বা সম্পন্ন পরিবারের গৃহবধু ।বিজয়ার পাশাপাশি সমস্ত ব্যবধান ঘুচিয়ে পঙক্তিভোজে
সামিল হলেন তারা।
পরিচারিকা সখী বাদ্যকর , মিনতি
মাহারাদের পাশাপাশি দেখা গেল সম্পন্ন পরিবারের গৃহবধু মুনমুন মুখোপাধ্যায় , দূর্বা
মুখোপাধ্যায়দের । আহা মরি কিছু মেনু নয় , খিঁচুড়ি
, আলুর দম , চাটনি
আর পায়েস । তাই খেয়ে পরিতৃপ্তির ঢেকুর তুলতে তুলতে ডলি মুখোপাধ্যায় , ক্যামেলিয়া
মুখোপাধ্যায় , জ্যোস্না
ডোম , মানসী চুনারীরা জানান , একসঙ্গে
খাওয়ার আনন্দটাই আলাদা। তাই এই দিনটার জন্য প্রতীক্ষায় ছিলাম ।
একই প্রতিক্রিয়া নির্মল
মন্ডল , সুবীর বাগদিদেরও । তারা
জানান , গতবছর পঙক্তিভোজে যারা
বাইরের গ্রাম থেকে এসেছিলেন তাদের অনেকের সঙ্গেই একবছর পর দেখা হল। তাই একসঙ্গে
পঙক্তিভোজের পাশাপাশি বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময়টাও হয়ে গেল । আয়োজক সংস্থার পক্ষে দিলীপ
মুখোপাধ্যায়,বিপদতারণ মণ্ডলরা জানান , এলাকার ১০ /১২ টি গ্রামের মানুষের
অংশগ্রহণে এবারের পঙক্তিভোজে বিজয়াসম্মিলনীর ছোঁওয়া লেগেছিল।
------০-----
( সর্বধর্মে )
কেউ হিন্দু , কেউ বা মুসলিম । যাবতীয় ছুতমার্গ দুরে সরিয়ে ওরা পরস্পরকে বুকে জড়িয়ে কেউ জানালেন বিজয়ার শুভেচ্ছা , কেউ বা জানালেন মহরমের সম্ভাষণ । সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এই মেলবন্ধনটি ঘটিয়েছে বীরভূমের কীর্ণাহারের স্নেহলতা পাবলিক স্কুল। গত ৫ বছর ধরে এলাকার প্রবীণ-প্রবীণাদের নিয়ে ওই স্কুলে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পালিত হয় বিশ্ব প্রবীণ দিবস । এবার বিজয়া এবং মহরম একই দিনে পড়েছে । তাই ওই সম্প্রীতির অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন স্কুল কর্তৃপক্ষ। সেই অনুষ্ঠানে যোগ দেন উভয় সম্প্রদায়ের শতাধিক প্রবীণ প্রবীণা ।
সেই
অনুষ্ঠানেই গড়ে উঠল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাতাবরণ । সরডাঙ্গার ৬৮ বছরের
কামালউদ্দিন সেখ , কীর্ণাহার
পূর্বপট্টির ৬৫ বছরের সুকুল সেখদের বুকে জড়িয়ে ধরলেন ভাটরার ৭২ বছরের ত্রিলোচন পাল
, জামনার ৬৭ বছরের
মানিক মুখোপাধ্যায়রা । একে অন্যকে জানালেন বিজয়ার শুভেচ্ছা আর মহরমের শুভ
কামনা ।হাতে হাত রেখে নষ্টালজিক হয়ে পড়লেন তারা । নুরুল হোদা , সুকুল
সেখরা জানালেন , ছোটবেলায়
বন্ধুদের সঙ্গে পুজো মন্ডপে ঘুরেছি । বিজয়ায় নারু মিষ্টিও খেয়েছি।মনে হল ছেলেবেলার
সেই দিনটাকেই আবার ফিরে পেলাম। একই অভিব্যক্তি প্রফুল্ল দাস বৈরাগ্য , অঞ্জলি
মন্ডলদেরও । তারা জানান , আমরাও
ছোটবেলায় মহরমের তাজিয়ার পিছনে পিছনে ঘুরে কত লাঠিখেলা দেখেছি তার ঠিক নেই ।
ছেলেবেলা ধরা পড়ল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও । সম্ভাষণ শেষে কেউ করলেন গান , কেউবা করলেন স্বরচিত কবিতা পাঠ । সবশেষে পাশাপাশি বসে নাড়ু মিষ্টি খেতে খেতে স্মৃতি চারণায় মেতে উঠলেন পার্বতী রায় , গণপতি ঘোষ , আবু লায়েশ মহীউদ্দিন , সুকুমার দাস , অসীম বন্দ্যোপাধ্যায়রা । তারা জানান , এই ভাবে অনুষ্ঠানে অংশ নিতে গিয়ে আমাদের সেই স্কুল জীবনের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল । স্কুলে কোন অনুষ্ঠান থাকলে যেমন মনের মধ্যে একটা উত্তেজনা থাকত , প্রতিবছর এই অনুষ্ঠানের জন্য সেই রকমই উত্তেজনা অনুভব করি ।আয়োজক সংস্থার কর্ণধার মিঠু পাল জানান , অন্যান্য বার দিনটি সাধারণত বিশ্ব প্রবীণ দিবস হিসাবে পালিত হয় । কিন্তু এবারে প্রবীণ দিবসেই বিজয়া এবং মহরমেরও অনুষ্ঠান ।তাই প্রবীণ দিবসকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দিন হিসাবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ।




No comments:
Post a Comment