নানুরের কথা
( রামী ও চণ্ডীদাস )
অর্ঘ্য ঘোষ
বৃন্দাবনে যেমন কানু ছাড়া গীত নেই । নানুরে চণ্ডীদাস ছাড়া কথা নেই । গ্রাম
পঞ্চায়েত, স্কুল-কলেজ, গ্রন্থাগার থেকে সবজি বাজার পর্যন্ত চণ্ডীদাসময় । জড়িয়ে
রয়েছে তার প্রেমাস্পদা রজকিনী রামীর নামও। নানুরের প্রবেশপথ হিসাবে পরিচিত থানা মোড়ে রয়েছে চণ্ডীদাসের স্মৃতি তোরণ।তাতে লেখা চণ্ডীদাসের সেই বিখ্যাত বানী ' শুনহ মানুষ ভাই , সবার উপরে মানুষ সত্য , তাহার উপরে নাই।' আবার প্রস্থান পথে রয়েছে রামীর স্মৃতি তোরণ । সেখানেও লেখা চণ্ডীদাসের পদ - ' কহে চণ্ডীদাস শুন রজকিনী রামী , ঐ দুটি চরণ শীতল জানিয়া শরণ লইণু আমি।' তাই দিনে বহু বার এলাকার মানুষজনকে তার
নাম নিতে হয় । বাইরের লোকের কাছে নিজেদের চণ্ডীদাস নানুরের বাসিন্দা হিসাবে রীতিমতো গর্ব
বোধ করেন নানুরবাসী ।
বৈষ্ণব পদকর্তা রূপে চন্ডীদাসের নাম
সুপরিচিত । কিন্তু তার পরিচয় নিয়ে নানা মুনির নানা মত । ইতিহাস বলে , বৈষ্ণব
সাহিত্যে দ্বিজ চণ্ডীদাস, চণ্ডীদাস , দীন চণ্ডীদাস এবং বড়ু চণ্ডীদাস নামে ৪ জন
পদকর্তার উল্লেখ পাওয়া যায় । কিন্তু কোন জন নানুরের চণ্ডীদাস তা নিয়ে বিস্তর
মতানৈক্য রয়েছে । একাংশের মতে ৪ জনই একই ব্যক্তি । তবে যে পদকর্তার বিভিন্ন রচনায় নানুর
এবং সংলগ্ন এলাকা ঘুরে ফিরে এসেছে তিনিই নানুরের চন্ডীদাস বলে বিশেষজ্ঞদের মত।
পরবর্তীকালে অবশ্য নানুরের
চন্ডীদাসের স্বতন্ত্র পরিচিতি গড়ে উঠেছে । তিনি রামী চণ্ডীদাস হিসাবে আখ্যায়িত হয়েছেন
। কারণ কবির সঙ্গে সমোচ্চারিত তার প্রেমিকা রামীর নামও । চণ্ডীদাসের বিভিন্ন পদেও
রয়েছে তার উল্লেখ।স্বভাবতই কবির পাশাপাশি তার প্রেমিকাকে স্মরণীয় করে রাখতে
চেয়েছেন এলাকার মানুষ । কবির সঙ্গে তার যুগল মুর্তি নির্মাণ , প্রাথমিক বিদ্যালয়ের
নামকরণ, দ্যাঁওতা পুকুরের যে ঘাটে তিনি কাপড় কাচতেন সম্প্রতি সেটি বিধায়কের এলাকা
উন্নয়নের টাকায় পাকা হয়েছে । নাম দেওয়া হয়েছে রজকিনীর ঘাট । যে পাটাতে রজকিনী কাপড়
কাচতেন সেটিও সযত্নে রাখা আছে ঘাট লাগোয়া রক্ষাকালী মন্দিরের পাশে । ভ্রমনার্থীরা
ওই ঘাট- পাটা দেখে কবির প্রেম কাহিনীতে বিভোর হয়ে যান ।
প্রচলিত রয়েছে, বাল্য বিধবা রামী স্থানীয়
জমিদারের নির্দেশে গ্রামদেবী বিশালাক্ষীর মন্দিরে পরিচারিকার কাজে বহাল হন । ওই
সময় পুজারীর দায়িত্বে ছিলেন চণ্ডীদাস । মুলত তারই প্রচেষ্টায় এবং দেবীর
স্বপ্নাদেশে মন্দিরে প্রবেশাধিকার পান তথাকথিত ‘অছুৎ’ ধোপানি । ক্রমে দুজনের প্রণয়
জন্মায় । প্রণয়ের গাঢতা এমনই পর্যায়ে পৌঁছোয় যে, রামী যখন ঘাটে কাপড় কাচতেন তখন
ছিপ হাতে পুকুর পাড়ে বসে থাকতেন চণ্ডীদাস । এই প্রণয় অবশ্য জমিদার এবং সমাজপতিরা
ভাল চোখে দেখেন নি । তারা রামীকে ত্যাগ না করলে চণ্ডীদাসের বাবার সৎকার করতে
পর্যন্ত অস্বীকার করেন । কিছুটা চাপে পড়লেও রামীকে ত্যাগ করতে পারেন নি চণ্ডীদাস
। দুজনের এই অনুরাগ দেখে অবশেষে রামীকে চণ্ডীদাসের সাধনসঙ্গিনী হিসাবে মেনে নিতে
বাধ্য হন সবাই।
আর্বিভাবের মতোই চণ্ডীদাসের মৃত্যু
নিয়েও নানা মত রয়েছে । তবে নির্ভরযোগ্য মতটি হল, একদিন বিশালাক্ষী মন্দিরের
আটচালায় কীর্তন গানে বিভোর ছিলেন সাধক কবি । তাতে যোগ দিয়েছিলেন নবাবের বাড়ির
মহিলারাও । তাই নবাবের নির্দেশে কামান দাগা হয় ওই আসরে । তাতে সকলেই ধংসস্তুপে চাপা
পড়েন । ওই স্তুপ আজও রয়েছে । পুরাতত্বসর্বেক্ষণ বিভাগ ওই স্তুপকেই চণ্ডীদাসের
সমাধি হিসাবে হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে । সমাধিক্ষেত্র এবং বিশালাক্ষী মন্দির
রক্ষনাবেক্ষনের ভারও তারা নিয়েছে।
রামী-চন্ডীদাসের দাসের নানা নির্দশন
ছড়িয়ে রয়েছে নানুরের আনাচে-কানাচে । অনায়াসেই ওইসব নির্দশন ঘিরে একটি
পর্যটনক্ষেত্র গড়ে তোলা যায় বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি ।কিন্তু বিক্ষিপ্তভাবে কিছু নির্মাণ কাজ ছাড়া তেমন কোন উদ্যোগ নেওয়া হয় নি বলে তাদের অভিযোগ । তাই একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন ক্ষেত্র হিসাবে গড়ে ওঠার সমস্ত সম্ভাবনা থাকা স্বত্ত্বেও অবহেলিতই রয়ে গিয়েছে প্রেমিক-সাধক কবি রামী-চণ্ডীদাসের লীলাভূমি।
( সংস্কৃতির কথা )
বৈষ্ণব পদকর্তা রূপে চন্ডীদাসের নাম
সুপরিচিত । কিন্তু তার পরিচয় নিয়ে নানা মুনির নানা মত । ইতিহাস বলে , বৈষ্ণব
সাহিত্যে দ্বিজ চণ্ডীদাস, চণ্ডীদাস , দীন চণ্ডীদাস এবং বড়ু চণ্ডীদাস নামে ৪ জন
পদকর্তার উল্লেখ পাওয়া যায় । কিন্তু কোন জন নানুরের চণ্ডীদাস তা নিয়ে বিস্তর
মতানৈক্য রয়েছে । একাংশের মতে ৪ জনই একই ব্যক্তি । তবে যে পদকর্তার বিভিন্ন রচনায় নানুর
এবং সংলগ্ন এলাকা ঘুরে ফিরে এসেছে তিনিই নানুরের চন্ডীদাস বলে বিশেষজ্ঞদের মত।
পরবর্তীকালে অবশ্য নানুরের
চন্ডীদাসের স্বতন্ত্র পরিচিতি গড়ে উঠেছে । তিনি রামী চণ্ডীদাস হিসাবে আখ্যায়িত হয়েছেন
। কারণ কবির সঙ্গে সমোচ্চারিত তার প্রেমিকা রামীর নামও । চণ্ডীদাসের বিভিন্ন পদেও
রয়েছে তার উল্লেখ।স্বভাবতই কবির পাশাপাশি তার প্রেমিকাকে স্মরণীয় করে রাখতে
চেয়েছেন এলাকার মানুষ । কবির সঙ্গে তার যুগল মুর্তি নির্মাণ , প্রাথমিক বিদ্যালয়ের
নামকরণ, দ্যাঁওতা পুকুরের যে ঘাটে তিনি কাপড় কাচতেন সম্প্রতি সেটি বিধায়কের এলাকা
উন্নয়নের টাকায় পাকা হয়েছে । নাম দেওয়া হয়েছে রজকিনীর ঘাট । যে পাটাতে রজকিনী কাপড়
কাচতেন সেটিও সযত্নে রাখা আছে ঘাট লাগোয়া রক্ষাকালী মন্দিরের পাশে । ভ্রমনার্থীরা
ওই ঘাট- পাটা দেখে কবির প্রেম কাহিনীতে বিভোর হয়ে যান ।
প্রচলিত রয়েছে, বাল্য বিধবা রামী স্থানীয়
জমিদারের নির্দেশে গ্রামদেবী বিশালাক্ষীর মন্দিরে পরিচারিকার কাজে বহাল হন । ওই
সময় পুজারীর দায়িত্বে ছিলেন চণ্ডীদাস । মুলত তারই প্রচেষ্টায় এবং দেবীর
স্বপ্নাদেশে মন্দিরে প্রবেশাধিকার পান তথাকথিত ‘অছুৎ’ ধোপানি । ক্রমে দুজনের প্রণয়
জন্মায় । প্রণয়ের গাঢতা এমনই পর্যায়ে পৌঁছোয় যে, রামী যখন ঘাটে কাপড় কাচতেন তখন
ছিপ হাতে পুকুর পাড়ে বসে থাকতেন চণ্ডীদাস । এই প্রণয় অবশ্য জমিদার এবং সমাজপতিরা
ভাল চোখে দেখেন নি । তারা রামীকে ত্যাগ না করলে চণ্ডীদাসের বাবার সৎকার করতে
পর্যন্ত অস্বীকার করেন । কিছুটা চাপে পড়লেও রামীকে ত্যাগ করতে পারেন নি চণ্ডীদাস
। দুজনের এই অনুরাগ দেখে অবশেষে রামীকে চণ্ডীদাসের সাধনসঙ্গিনী হিসাবে মেনে নিতে
বাধ্য হন সবাই।
আর্বিভাবের মতোই চণ্ডীদাসের মৃত্যু
নিয়েও নানা মত রয়েছে । তবে নির্ভরযোগ্য মতটি হল, একদিন বিশালাক্ষী মন্দিরের
আটচালায় কীর্তন গানে বিভোর ছিলেন সাধক কবি । তাতে যোগ দিয়েছিলেন নবাবের বাড়ির
মহিলারাও । তাই নবাবের নির্দেশে কামান দাগা হয় ওই আসরে । তাতে সকলেই ধংসস্তুপে চাপা
পড়েন । ওই স্তুপ আজও রয়েছে । পুরাতত্বসর্বেক্ষণ বিভাগ ওই স্তুপকেই চণ্ডীদাসের
সমাধি হিসাবে হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে । সমাধিক্ষেত্র এবং বিশালাক্ষী মন্দির
রক্ষনাবেক্ষনের ভারও তারা নিয়েছে।
রামী-চন্ডীদাসের দাসের নানা নির্দশন
ছড়িয়ে রয়েছে নানুরের আনাচে-কানাচে । অনায়াসেই ওইসব নির্দশন ঘিরে একটি
পর্যটনক্ষেত্র গড়ে তোলা যায় বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি ।কিন্তু বিক্ষিপ্তভাবে কিছু নির্মাণ কাজ ছাড়া তেমন কোন উদ্যোগ নেওয়া হয় নি বলে তাদের অভিযোগ । তাই একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন ক্ষেত্র হিসাবে গড়ে ওঠার সমস্ত সম্ভাবনা থাকা স্বত্ত্বেও অবহেলিতই রয়ে গিয়েছে প্রেমিক-সাধক কবি রামী-চণ্ডীদাসের লীলাভূমি।
( সংস্কৃতির কথা )
একসময় নানুরে অন্যতম সংস্কৃতি চর্চা ছিল শখের যাত্রা । সেসময় কোন স্থায়ী মঞ্চ ছিল না । কিন্তু রাতের পর রাত মঞ্চস্থ হয়েছে যাত্রাপালা। আজ দু-দুটো মঞ্চ হয়েছে , কিন্তু হারিয়ে গিয়েছে শখের সেই যাত্রাপালা। কয়েক বছর আগেও অন্যান্য জায়গার মতো নানুরেও বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম বলতে ছিল স্থানীয় শিল্পীদের অভিনীত শখের যাত্রা । সে সময় কোন স্থায়ী মঞ্চ ছিল না । ছিল না বৈদ্যুতিক আলোও। নিজেরাই মঞ্চ তৈরি করে ‘হ্যাচাক’ কিম্বা ‘ ডে-লাইটের’ আলোয় একের পর এক পালা মঞ্চস্থ করেছেন উদ্যোক্তারা । আর ঠায় খোলা আকাশের নিচে বসে ওইসব পালা দেখে স্থানীয় বাসিন্দারা বাড়ি ফিরেছেন শীতের শেষ রাতে । আজ দু’টি স্থায়ী মঞ্চ হয়েছে । এসেছে বিদ্যুতও। কিন্তু যাত্রা থেমে গিয়েছে । তবুও প্রবীন শিল্পীরা আজও সিরাজদ্দৌল্লা কিম্বা পৃথীরাজ হয়ে যান । ঘুমের ঘোরে । আর ঘুম ভেঙ্গে সেই সংলাপ শুনে বিরক্তিতে গজগজ করেন স্ত্রী । তবুও সংলাপ ভুলতে পারেন না শ্যমলচাঁদ রায়, নির্মলচাঁদ রায় , আনন্দগোপাল পালরা , সুব্রত ভট্টাচার্য্যরা ।
একসময় নানুরে অন্যতম সংস্কৃতি চর্চা ছিল শখের যাত্রা । সেসময় কোন স্থায়ী মঞ্চ ছিল না । কিন্তু রাতের পর রাত মঞ্চস্থ হয়েছে যাত্রাপালা। আজ দু-দুটো মঞ্চ হয়েছে , কিন্তু হারিয়ে গিয়েছে শখের সেই যাত্রাপালা। কয়েক বছর আগেও অন্যান্য জায়গার মতো নানুরেও বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম বলতে ছিল স্থানীয় শিল্পীদের অভিনীত শখের যাত্রা । সে সময় কোন স্থায়ী মঞ্চ ছিল না । ছিল না বৈদ্যুতিক আলোও। নিজেরাই মঞ্চ তৈরি করে ‘হ্যাচাক’ কিম্বা ‘ ডে-লাইটের’ আলোয় একের পর এক পালা মঞ্চস্থ করেছেন উদ্যোক্তারা । আর ঠায় খোলা আকাশের নিচে বসে ওইসব পালা দেখে স্থানীয় বাসিন্দারা বাড়ি ফিরেছেন শীতের শেষ রাতে । আজ দু’টি স্থায়ী মঞ্চ হয়েছে । এসেছে বিদ্যুতও। কিন্তু যাত্রা থেমে গিয়েছে । তবুও প্রবীন শিল্পীরা আজও সিরাজদ্দৌল্লা কিম্বা পৃথীরাজ হয়ে যান । ঘুমের ঘোরে । আর ঘুম ভেঙ্গে সেই সংলাপ শুনে বিরক্তিতে গজগজ করেন স্ত্রী । তবুও সংলাপ ভুলতে পারেন না শ্যমলচাঁদ রায়, নির্মলচাঁদ রায় , আনন্দগোপাল পালরা , সুব্রত ভট্টাচার্য্যরা ।
নানুরে শ্রীদুর্গা এবং মহাদেব অপেরা নামে দুটি শখের যাত্রা দল ছিল। ষাটের দশকে বিজয় মণ্ডল , বিশ্বনাথ দাস , সুবল হাজরা প্রমুখদের উদ্যোগে গড়ে ওঠে শ্রীদুর্গা অপেরা । পরবর্তী কালে মদনগোপাল বৈরাগ্য , হরিসাধন পাল , শিবদাস মণ্ডল , ফেলু দাসদের উদ্যোগে আত্মপ্রকাশ করে মহাদেব অপেরা । ওই অপেরার নিজস্ব পোশাক কেনার জন্য মদনবাবু স্ত্রীর গয়না বিক্রি করে টাকা দিয়েছিলেন । দুর্গাপুজো, নবান্ন , সরস্বতীপুজো সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বছরে ৮/১০ টি যাত্রা পালা মঞ্চস্থ হত ।বাড়ি বাড়ি চাল , মুড়ি এবং চাঁদা তোলার পাশাপাশি পুকুর পরিস্কার , মাঠ পাহারা সহ নানা ছোটখাটো কাজ করেও উদ্যোক্তা ওইসব পালা মঞ্চস্থ করার খরচ যোগাড় করতেন। আবার জমিদার কিম্বা বিত্তশালীরাও তাদের ছেলেমেয়ের বিয়ে অথবা কোন পারিবারিক অনুষ্ঠানে পালা মঞ্চস্থ করার জন্য খরচ যোগাতেন । অধিকাংশ ক্ষেত্রে খরচ বাঁচাতে একই মঞ্চে পরপর দু’রাত্রি দুটি অপেরার আলাদা পালা মঞ্চস্থ হয়েছে ।কিন্তু কখনোই রেষারেষির ঘটনা ঘটে নি ।বরং সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতায় একে অন্যকে সাহার্য্য করেছেন । একপক্ষ পোশাক দিয়েছেন তো অন্যপক্ষ মেকআপের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন ।বিশ্বালাক্ষী তলা কিম্বা মেলা প্রাঙ্গণে ওই সব পালা দেখতে শুধু নানুরই নয় , লাগোয়া ১০/১২ টি গ্রামের মানুষের ঢল নামত ।
সেই ছবি আজও স্পষ্ট মনে পড়ে ৬১ বছরের শ্যামলচাঁদ রায়ের । তিনি জানান, মঞ্চের সামনে জায়গা পাওয়ার জন্য মানুষ সকাল থেকে চট, তালাই, মাদুর নিদেন পক্ষে খড় বিছিয়ে রেখে যেতেন । অভিনয়ের সময় মঞ্চে উঠে দেখতাম শুধু মাথা আর মাথা ।মানুষের উষ্ণ নিশ্বাসে শীতের রাতেও যেন গরম হয়ে উঠত যাত্রা প্রাঙ্গণ । যাত্রা ভাঙ্গার পরও বিভিন্ন রাস্তা দীর্ঘক্ষন ধরে সরগরম থাকত ঘরমুখী মানুষজনের কথাবার্তায় ।
ওইসব যাত্রার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে রয়েছে সমর পাল , চণ্ডীচরণ ফৌজদার , সুভাষ মেটে , আনন্দ সরকার , ফেলু দাস , সুনীল রায় , শ্রীমন্ত রজক , নির্মল কুমার রায় , আনন্দ গোপাল সরকার , নব কুমার দাস , আনন সাহা , শিবদাস মণ্ডল , হরিসাধন পাল , সন্তোষ বটব্যাল , চণ্ডীচরণ ঘোষ , মনিময় দত্ত প্রমুখের নাম । তাদের মধ্যে অনেকেই প্রয়াত হয়েছেন । শয্যাশায়ী হয়ে পড়ে রয়েছেন কেউ কেউ । তবু তারা স্বপ্ন দেখেন , একদিন আবার যাত্রার সংলাপে মুখর হয়ে উঠবে রাতের নানুর ।
প্রায় ৩০ টি পালায় অভিনয় করেছেন শ্যামলবাবু । সব ক’টিতেই মহিলা চরিত্রে । একটি পালায় বৃহন্নলা চরিত্রে অভিনয় করে মঞ্চ মাত করে দিয়েছেন । গীতিবহুল সেই সংলাপ আজও মনে আছে তার। কথা বলা ফাঁকেই দিব্যি দু’হাতে তালি দিয়ে গেয়ে ওঠেন ,‘ আমার কোলে সোনার নীলমনি / শাড়ি নেব , গহনা নেব , নইলে যাবনি /’ । তিনি জানান, সেসময় মহিলা অভিনেত্রী পাওয়া যেত না । চেহারাটা একটু মেয়েলি ছিল বলে মহিলা চরিত্র আমার ধরাবাঁধা ছিল । কিন্তু দিনের পর দিন মেয়েলি স্বরে রির্হেশাল করতে করতে কখন যেন আমার কথাবার্তা মেয়েদের মত হয়ে যায় । যখন যাত্রা হত তখন তো বটেই,পরেও ঘুমের ঘোরেও মেয়েলি গলায় সংলাপ বলেছি । সংবিৎ ফিরিয়ে বহু রাত্রে স্ত্রী বলেছেন , খুব হয়েছে , আর মহিলা চরিত্রে অভিনয় করতে হবে না । তাহলে অন্তত মাঝরাতে ঘুমের ঘোরে আমাদের মাঝে আবার কোন মহিলা ঢুকল বলে আমাকে দুশ্চিন্তা করতে হবে না ।
একই অভিব্যক্তি ৬৪ বছরের নির্মলচাঁদ রায়, ৮৩ বছরের আনন্দগোপাল পাল, ৬০ বছরের তমালকৃষ্ণ দাস , ৫৬ বছরের মঞ্জু দাসদেরও । ৩৫/৫০ টি করে পালায় অভিনয় করেছেন ওইসব প্রবীণ শিল্পীরা । দীর্ঘদিন আগে যাত্রা বন্ধ হয়ে গিয়েছে , কিন্তু যাত্রার প্রসঙ্গ উঠলেই আজও নষ্টালজিক হয়ে পড়েন তারা । নির্মলচাঁদ রায় যখন আবেগ বিহ্বল গলায় উচ্চারণ করেন ‘রক্তে রোঁয়া ধানের’ বৈজুর সেই বিখ্যাত সংলাপ ‘ লে বিন্দিয়া লে , তু লাচ করবি / আমি ঢোল বাজাব /’ তখন আনন্দগোপাল পাল যেন হয়ে ওঠেন ‘লালপাঞ্জা’র বাখর খাঁ ।তার হাতে তখন সপাসপ ঘোরে অদৃশ্য চাবুক । বলে ওঠেন , কার এত দুঃসাহস , কোন যুগে বাবা ঢোল বাজাত বলে আজও কে আমায় বলে বাখর ঢুলি ?
যাত্রার কথা বলতে গিয়ে নষ্টালিজিক হয়ে ওঠেন সুব্রত ভট্টাচার্য্য , উজ্জ্বল রায় , ভজনন্দন রাম , তমাল দাস , মঞ্জু দাসরাও ।একসঙ্গে মঞ্চে অভিনয় করতে গিয়েই একসময় পাড়ারই মেয়ে মঞ্জুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয় তমালবাবুর। পরে একসুত্রে বাঁধাও পড়েন । বিয়ের পরও বহু পালায় একসঙ্গে অভিনয় করেছেন দুজনে । কলকাতার তিনটি পেশাদার যাত্রাদলেও কয়েক বছর অভিনয় করেছেন তমালবাবু । তারা জানান , একসময় যাত্রার খরচ সংগ্রহের জন্য আমারা রাত জেগে মাঠ পাহারা দিয়েছি । পুকুর পরিস্কার করেছি । বাড়ি বাড়ি তক্তা ঘাড়ে করে বইয়ে এনে মঞ্চ তৈরি করেছি। দর্শকদের বাহবা পেলেই শ্রম সার্থক মনে হয়েছে । বর্তমান প্রজন্মের সেই মানসিকতা নেই । তারা অর্কেষ্টা বড়োজোর কলকাতার পেশাদার অপেরার শো করান । এভাবে চললে একদিন হারিয়ে যাবে শখের যাত্রা । সরকারি উদ্যোগ একমাত্র ক্ষয়িষ্ণু ওই শিল্পকে বাঁচাতে পারে । কলকাতার মতো ব্লক স্তরে যাত্রা উৎসবের পাশাপাশি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে সখের যাত্রাও ঘুরে দাঁড়াতে পারে । সেক্ষেত্রে আমাদের মতো প্রবীণ শিল্পীরা নবীনদের সামিল করে আবার মাত করে দিতে পারেন যাত্রার আসর । প্রবীণ যাত্রামোদী মানুষজনও খুঁজে পাবেন তাদের প্রিয় বিনোদন । বিনোদনহীন নানুরে হারিয়ে যাওয়া শখের যাত্রাই হতে পারে বয়স্কদের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম ।
নানুরে শ্রীদুর্গা এবং মহাদেব অপেরা নামে দুটি শখের যাত্রা দল ছিল। ষাটের দশকে বিজয় মণ্ডল , বিশ্বনাথ দাস , সুবল হাজরা প্রমুখদের উদ্যোগে গড়ে ওঠে শ্রীদুর্গা অপেরা । পরবর্তী কালে মদনগোপাল বৈরাগ্য , হরিসাধন পাল , শিবদাস মণ্ডল , ফেলু দাসদের উদ্যোগে আত্মপ্রকাশ করে মহাদেব অপেরা । ওই অপেরার নিজস্ব পোশাক কেনার জন্য মদনবাবু স্ত্রীর গয়না বিক্রি করে টাকা দিয়েছিলেন । দুর্গাপুজো, নবান্ন , সরস্বতীপুজো সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বছরে ৮/১০ টি যাত্রা পালা মঞ্চস্থ হত ।বাড়ি বাড়ি চাল , মুড়ি এবং চাঁদা তোলার পাশাপাশি পুকুর পরিস্কার , মাঠ পাহারা সহ নানা ছোটখাটো কাজ করেও উদ্যোক্তা ওইসব পালা মঞ্চস্থ করার খরচ যোগাড় করতেন। আবার জমিদার কিম্বা বিত্তশালীরাও তাদের ছেলেমেয়ের বিয়ে অথবা কোন পারিবারিক অনুষ্ঠানে পালা মঞ্চস্থ করার জন্য খরচ যোগাতেন । অধিকাংশ ক্ষেত্রে খরচ বাঁচাতে একই মঞ্চে পরপর দু’রাত্রি দুটি অপেরার আলাদা পালা মঞ্চস্থ হয়েছে ।কিন্তু কখনোই রেষারেষির ঘটনা ঘটে নি ।বরং সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতায় একে অন্যকে সাহার্য্য করেছেন । একপক্ষ পোশাক দিয়েছেন তো অন্যপক্ষ মেকআপের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন ।বিশ্বালাক্ষী তলা কিম্বা মেলা প্রাঙ্গণে ওই সব পালা দেখতে শুধু নানুরই নয় , লাগোয়া ১০/১২ টি গ্রামের মানুষের ঢল নামত ।
সেই ছবি আজও স্পষ্ট মনে পড়ে ৬১ বছরের শ্যামলচাঁদ রায়ের । তিনি জানান, মঞ্চের সামনে জায়গা পাওয়ার জন্য মানুষ সকাল থেকে চট, তালাই, মাদুর নিদেন পক্ষে খড় বিছিয়ে রেখে যেতেন । অভিনয়ের সময় মঞ্চে উঠে দেখতাম শুধু মাথা আর মাথা ।মানুষের উষ্ণ নিশ্বাসে শীতের রাতেও যেন গরম হয়ে উঠত যাত্রা প্রাঙ্গণ । যাত্রা ভাঙ্গার পরও বিভিন্ন রাস্তা দীর্ঘক্ষন ধরে সরগরম থাকত ঘরমুখী মানুষজনের কথাবার্তায় ।
ওইসব যাত্রার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে রয়েছে সমর পাল , চণ্ডীচরণ ফৌজদার , সুভাষ মেটে , আনন্দ সরকার , ফেলু দাস , সুনীল রায় , শ্রীমন্ত রজক , নির্মল কুমার রায় , আনন্দ গোপাল সরকার , নব কুমার দাস , আনন সাহা , শিবদাস মণ্ডল , হরিসাধন পাল , সন্তোষ বটব্যাল , চণ্ডীচরণ ঘোষ , মনিময় দত্ত প্রমুখের নাম । তাদের মধ্যে অনেকেই প্রয়াত হয়েছেন । শয্যাশায়ী হয়ে পড়ে রয়েছেন কেউ কেউ । তবু তারা স্বপ্ন দেখেন , একদিন আবার যাত্রার সংলাপে মুখর হয়ে উঠবে রাতের নানুর ।
প্রায় ৩০ টি পালায় অভিনয় করেছেন শ্যামলবাবু । সব ক’টিতেই মহিলা চরিত্রে । একটি পালায় বৃহন্নলা চরিত্রে অভিনয় করে মঞ্চ মাত করে দিয়েছেন । গীতিবহুল সেই সংলাপ আজও মনে আছে তার। কথা বলা ফাঁকেই দিব্যি দু’হাতে তালি দিয়ে গেয়ে ওঠেন ,‘ আমার কোলে সোনার নীলমনি / শাড়ি নেব , গহনা নেব , নইলে যাবনি /’ । তিনি জানান, সেসময় মহিলা অভিনেত্রী পাওয়া যেত না । চেহারাটা একটু মেয়েলি ছিল বলে মহিলা চরিত্র আমার ধরাবাঁধা ছিল । কিন্তু দিনের পর দিন মেয়েলি স্বরে রির্হেশাল করতে করতে কখন যেন আমার কথাবার্তা মেয়েদের মত হয়ে যায় । যখন যাত্রা হত তখন তো বটেই,পরেও ঘুমের ঘোরেও মেয়েলি গলায় সংলাপ বলেছি । সংবিৎ ফিরিয়ে বহু রাত্রে স্ত্রী বলেছেন , খুব হয়েছে , আর মহিলা চরিত্রে অভিনয় করতে হবে না । তাহলে অন্তত মাঝরাতে ঘুমের ঘোরে আমাদের মাঝে আবার কোন মহিলা ঢুকল বলে আমাকে দুশ্চিন্তা করতে হবে না ।
একই অভিব্যক্তি ৬৪ বছরের নির্মলচাঁদ রায়, ৮৩ বছরের আনন্দগোপাল পাল, ৬০ বছরের তমালকৃষ্ণ দাস , ৫৬ বছরের মঞ্জু দাসদেরও । ৩৫/৫০ টি করে পালায় অভিনয় করেছেন ওইসব প্রবীণ শিল্পীরা । দীর্ঘদিন আগে যাত্রা বন্ধ হয়ে গিয়েছে , কিন্তু যাত্রার প্রসঙ্গ উঠলেই আজও নষ্টালজিক হয়ে পড়েন তারা । নির্মলচাঁদ রায় যখন আবেগ বিহ্বল গলায় উচ্চারণ করেন ‘রক্তে রোঁয়া ধানের’ বৈজুর সেই বিখ্যাত সংলাপ ‘ লে বিন্দিয়া লে , তু লাচ করবি / আমি ঢোল বাজাব /’ তখন আনন্দগোপাল পাল যেন হয়ে ওঠেন ‘লালপাঞ্জা’র বাখর খাঁ ।তার হাতে তখন সপাসপ ঘোরে অদৃশ্য চাবুক । বলে ওঠেন , কার এত দুঃসাহস , কোন যুগে বাবা ঢোল বাজাত বলে আজও কে আমায় বলে বাখর ঢুলি ?
যাত্রার কথা বলতে গিয়ে নষ্টালিজিক হয়ে ওঠেন সুব্রত ভট্টাচার্য্য , উজ্জ্বল রায় , ভজনন্দন রাম , তমাল দাস , মঞ্জু দাসরাও ।একসঙ্গে মঞ্চে অভিনয় করতে গিয়েই একসময় পাড়ারই মেয়ে মঞ্জুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয় তমালবাবুর। পরে একসুত্রে বাঁধাও পড়েন । বিয়ের পরও বহু পালায় একসঙ্গে অভিনয় করেছেন দুজনে । কলকাতার তিনটি পেশাদার যাত্রাদলেও কয়েক বছর অভিনয় করেছেন তমালবাবু । তারা জানান , একসময় যাত্রার খরচ সংগ্রহের জন্য আমারা রাত জেগে মাঠ পাহারা দিয়েছি । পুকুর পরিস্কার করেছি । বাড়ি বাড়ি তক্তা ঘাড়ে করে বইয়ে এনে মঞ্চ তৈরি করেছি। দর্শকদের বাহবা পেলেই শ্রম সার্থক মনে হয়েছে । বর্তমান প্রজন্মের সেই মানসিকতা নেই । তারা অর্কেষ্টা বড়োজোর কলকাতার পেশাদার অপেরার শো করান । এভাবে চললে একদিন হারিয়ে যাবে শখের যাত্রা । সরকারি উদ্যোগ একমাত্র ক্ষয়িষ্ণু ওই শিল্পকে বাঁচাতে পারে । কলকাতার মতো ব্লক স্তরে যাত্রা উৎসবের পাশাপাশি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে সখের যাত্রাও ঘুরে দাঁড়াতে পারে । সেক্ষেত্রে আমাদের মতো প্রবীণ শিল্পীরা নবীনদের সামিল করে আবার মাত করে দিতে পারেন যাত্রার আসর । প্রবীণ যাত্রামোদী মানুষজনও খুঁজে পাবেন তাদের প্রিয় বিনোদন । বিনোদনহীন নানুরে হারিয়ে যাওয়া শখের যাত্রাই হতে পারে বয়স্কদের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম ।
চুলে পাক ধরেছে । পেকেছে দাড়িও । কিন্তু বুড়ো হন
নি মোটেই । বরং তিন প্রজন্মের বিয়ে পার করে আজও যেন তরতাজা যুবকই হয়ে রয়েছেন ছ’কড়ি ভান্ডারী, সেখ আব্দুল হাকিমরা । চশমা ছাড়াই ছিপছিপে
চেহারায় সাবলীল গতিময়তায় রীতিমতো তাক লাগিয়ে দিয়েছেন তারা । সেই সুবাদে
নানুরে পরিচিত নাম সত্তরোর্ধ ওই দুই যুবক ।
নানুর লাগোয়া সাকুলিপুরে বাড়ি ৮০ বছরের ছ’কড়ি ভাণ্ডারীর । বাবা প্রয়াত গৌরহরি ভাণ্ডারীর
হাত ধরে ৯ বছর বয়স থেকেই ক্ষৌরকর্মের কাজ শুরু করেন ছ’কড়িবাবু । আজও সেই কাজই করে চলেছেন । একসময়
লাগোয়া ১০/১২ টি গ্রামের প্রায় ৭০ টি পরিবার যজমান ছিল তাদের । সেসময় পরিবার পিছু
২০ কেজি ধানের বিনিময়ে সকল সদস্যদের চুল-দাড়ি এবং নখ কেটে দিয়ে আসতে হত তাকে । ডাক
পড়ত বিয়ে, পইতা, শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে । সেক্ষেত্রে ওইসব অনুষ্ঠানে ২০/৩০ টাকা এবং ৭ সের চাল মিলত ।
কিন্তু সময় বদলেছে । গ্রামে গ্রামে তৈরি হয়েছে
আধুনিক সেলুন । যজমানিও হাতিয়ে নিয়েছে অন্যেরা । তবু আজও বাপ ঠাকুরদার পেশা ভোলেন
নি তিনি । ভোলেন নি তার কাছে পুরুষানুক্রমে চুল-দাঁড়ি কাটা মানুষজনেরাও । আজও সকাল
হলেই ক্ষুর-কাঁইচির ঝোলা নিয়ে বেড়িয়ে পড়েন । বিশেষত রবি এবং সোমবার নানুরের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে একবার
করে তার ঢুঁ মারা তার চাইই চাই । কারণ রবিবার ছুটির দিনে সরকারি কর্মীরা বাড়িতেই
থাকেন । বাজার বন্ধ থাকায় সোমবার ব্যবসায়ীরাও বাড়ি থেকে খুব একটা বের হন না ।
বর্তমানে নানুরে বহু আধুনিক সেলুন হয়েছে । তবু কদর কমেনি তার । আজও ওইদুটি দিনে
তারই প্রতীক্ষায় থাকেন অনেকে । বাঁধাধরা কোন পারিশ্রমিক নেই । ২ টাকা থেকে ১০ টাকা দাঁড়ি-চুল কেটে যে যা দেন
তাই নিয়ে বাড়ি ফিরতে দুপুর গড়িয়ে যায় ।
দীর্ঘদিন আগে স্ত্রীকে হারিয়েছেন । রয়েছেন দুই
ছেলে এক মেয়ে। মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে বেশ কয়েক বছর আগে । বড়ছেলে অক্ষয়ের কাছেই
থাকেন তিনি । পুত্রবধু রুপালীদেবী জানান , এত বয়স হয়েছে তবু সকাল হতে তর সয় না বাবার ।ভোরে
ওঠে স্নান সেরে ঝোলা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন । অসুখ বিসুখে কখনও কাবু হতে দেখিনি । চশমাও লাগে না । অক্ষয়বাবু জানান, আলাদা থাকলেও আমাদের দুই ভাইয়েরই সেলুন রয়েছে ।
বাবাও মাসে ৪০০ টাকা করে বার্ধক্য ভাতা পান । এত বলি তোমাকে আর ওসব করতে হবে না ।
কিন্তু কথা কানেই তোলেন না । শুধু বলেন , যতদিন পারি নিজের খাওয়া পড়াটা নিজেই যোগাড় করি ।
তারপর তোরা তো আছিসই । তাছাড়া যজমানরাও আমাদের থেকেও বাবাকেই বেশি ভরষা করেন ।
বিয়ে-শ্রাদ্ধ-পইতা সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তারা বাবাকেই চান ।
শুধু
নিজের গ্রামে চুল-দাড়ি কাটা কিম্বা অনুষ্ঠান পার করাই নয় , বয়সকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে দিব্যি তিনি ছেলে
ছোকরার দলে ভীড়ে বরযাত্রীর গাড়িতে চেপে ছেলেপক্ষের নাপিত হিসাবে হাজির হন দুরের
গ্রাম-শহরে ।ওইসব বিয়ের আসরে ‘গোমোক্ষণ’ অনুষ্ঠানে তরজায় মেয়েপক্ষের নাপিতকে বহুবার কাবু
করছেন প্রচলিত ছড়ার সঙ্গে নিজের উদ্ভাবনী শক্তি মিশিয়ে । কেমন সেই ছড়া? ঈষৎ চাপা গলায় আউড়ালেন, ‘শুনুন শুনুন মহাশয়, শুনুন দিয়া মন ।হরপার্বতীর বিবাহ কথা বহুল বচন , এখন কলির ‘লাভ ম্যারেজের’ কথা করুন শ্রবণ । কলিতে নয় , আদ্যঋষি প্রাচীন গার্ন্ধব্য মতে শুকন্তলারও
হয়েছিল বিয়ে দুষ্মন্তের সাথে’। তারপরই জানালেন , শুধু টাকা পয়সাই নয় , আনন্দও আছে । আচমকা ওইসব ছড়া শুনে কন্যাপক্ষের
বহু নাপিত আর জবাব দিতে পারেন নি । তখন হইহই করে ওঠেছেন আমাদের পক্ষের লোকেরা ।
পিঠ চাপড়ে দিয়েছেন বরকর্তা । সেই আনন্দই আমাকে কাজের মধ্যে ধরে রাখে । কিছুতেই
বুড়ো হতে দেয় না ।
একই অভিব্যক্তি ৭২ বছরের সেখ আব্দুল হাকিমেরও ।
পেশায় দর্জি আব্দুল হাকিমের বাড়ি লাগোয়া আগোড়তোর গ্রামে । ১৪ বছর বয়েস থেকে সেলাই
শিখছেন । তারপর থেকে টানা ৫০ বছর ধরে নানুর সুপারমার্কেট সংলগ্ন একটি মুদিখানার
সামনে মেসিন পেতে একচিলতে জায়গায় সেলাই করে চলেছেন । আজও তার সঙ্গী ৫০ বছরের পুরোন
সেই সেলাই মেসিন । এলাকায় একের পর এক আধুনিক সেলাই দোকান গজিয়ে ওঠলেও সেলাই
মাস্টার হিসাবে তাকে অনেকেই চেনেন ।বহু পরিবারে পুরুষানুক্রমে তার হাতে তৈরি
পাঞ্জাবী পড়ে বিয়ে করতে যাওয়াটাই রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে । বয়স হলেও তার কাজ নিখুঁত , ছূঁচে সুতো পড়াতে আজও তার হাত কাঁপে না । চশমাও
লাগে না ।
আব্দুল
হাকিমের ৮ সদস্যের সংসার । তিন মেয়ের বিয়ে দিতে সব ঘুচে গিয়েছে ।এক ছটাকও জমিজমা
নেই । মাসিক ৪০০ টাকা হারে বার্ধক্য ভাতা পান ।সেলাই করে সাকুল্যে মাসে আড়াই – তিন হাজার টাকা আয় হয় । তিন ছেলে গ্রামে গ্রামে
মনোহারি জিনিস ফেরি করেন । ছোট ছেলে খুজুটিপাড়া কলেজে পড়ে। স্ত্রী আনিশা বিবি
জানান, সবার
আয়ে কোন রকমে আমাদের সংসার চলে । মুলত ওনার আয়েই ছেলের পড়াশোনার খরচ যোগাড় হয়
।বিশ্রামের কথা তুললেই বলেন, আমি তো বিশ্রাম নেওয়ার মতো এখনও বুড়ো হই নি ।
আগে ছেলেটা মানুষ হোক , তারপর বিশ্রামের কথা ভাবা যাবে । আর খোদ আব্দুল
হাকিম জানিয়েছেন , যখন কেউ এসে আমার তৈরি করা পোশাকের প্রশংসা করেন
তখন মনে হয় আমি ফুরিয়ে যায় নি । আমার দেওয়ার মতো ক্ষমতা এখনও আছে । সবথেকে
ভালোটুকু দেওয়ার জন্য সেলাই নিয়ে আজও আমি নানারকম পরীক্ষা নিরীক্ষা চালাই । মনেই
হয় না আমার বয়স হয়েছে ।
-----০-----
চুলে পাক ধরেছে । পেকেছে দাড়িও । কিন্তু বুড়ো হন
নি মোটেই । বরং তিন প্রজন্মের বিয়ে পার করে আজও যেন তরতাজা যুবকই হয়ে রয়েছেন ছ’কড়ি ভান্ডারী, সেখ আব্দুল হাকিমরা । চশমা ছাড়াই ছিপছিপে
চেহারায় সাবলীল গতিময়তায় রীতিমতো তাক লাগিয়ে দিয়েছেন তারা । সেই সুবাদে
নানুরে পরিচিত নাম সত্তরোর্ধ ওই দুই যুবক ।
নানুর লাগোয়া সাকুলিপুরে বাড়ি ৮০ বছরের ছ’কড়ি ভাণ্ডারীর । বাবা প্রয়াত গৌরহরি ভাণ্ডারীর
হাত ধরে ৯ বছর বয়স থেকেই ক্ষৌরকর্মের কাজ শুরু করেন ছ’কড়িবাবু । আজও সেই কাজই করে চলেছেন । একসময়
লাগোয়া ১০/১২ টি গ্রামের প্রায় ৭০ টি পরিবার যজমান ছিল তাদের । সেসময় পরিবার পিছু
২০ কেজি ধানের বিনিময়ে সকল সদস্যদের চুল-দাড়ি এবং নখ কেটে দিয়ে আসতে হত তাকে । ডাক
পড়ত বিয়ে, পইতা, শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে । সেক্ষেত্রে ওইসব অনুষ্ঠানে ২০/৩০ টাকা এবং ৭ সের চাল মিলত ।
কিন্তু সময় বদলেছে । গ্রামে গ্রামে তৈরি হয়েছে
আধুনিক সেলুন । যজমানিও হাতিয়ে নিয়েছে অন্যেরা । তবু আজও বাপ ঠাকুরদার পেশা ভোলেন
নি তিনি । ভোলেন নি তার কাছে পুরুষানুক্রমে চুল-দাঁড়ি কাটা মানুষজনেরাও । আজও সকাল
হলেই ক্ষুর-কাঁইচির ঝোলা নিয়ে বেড়িয়ে পড়েন । বিশেষত রবি এবং সোমবার নানুরের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে একবার
করে তার ঢুঁ মারা তার চাইই চাই । কারণ রবিবার ছুটির দিনে সরকারি কর্মীরা বাড়িতেই
থাকেন । বাজার বন্ধ থাকায় সোমবার ব্যবসায়ীরাও বাড়ি থেকে খুব একটা বের হন না ।
বর্তমানে নানুরে বহু আধুনিক সেলুন হয়েছে । তবু কদর কমেনি তার । আজও ওইদুটি দিনে
তারই প্রতীক্ষায় থাকেন অনেকে । বাঁধাধরা কোন পারিশ্রমিক নেই । ২ টাকা থেকে ১০ টাকা দাঁড়ি-চুল কেটে যে যা দেন
তাই নিয়ে বাড়ি ফিরতে দুপুর গড়িয়ে যায় ।
দীর্ঘদিন আগে স্ত্রীকে হারিয়েছেন । রয়েছেন দুই
ছেলে এক মেয়ে। মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে বেশ কয়েক বছর আগে । বড়ছেলে অক্ষয়ের কাছেই
থাকেন তিনি । পুত্রবধু রুপালীদেবী জানান , এত বয়স হয়েছে তবু সকাল হতে তর সয় না বাবার ।ভোরে
ওঠে স্নান সেরে ঝোলা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন । অসুখ বিসুখে কখনও কাবু হতে দেখিনি । চশমাও লাগে না । অক্ষয়বাবু জানান, আলাদা থাকলেও আমাদের দুই ভাইয়েরই সেলুন রয়েছে ।
বাবাও মাসে ৪০০ টাকা করে বার্ধক্য ভাতা পান । এত বলি তোমাকে আর ওসব করতে হবে না ।
কিন্তু কথা কানেই তোলেন না । শুধু বলেন , যতদিন পারি নিজের খাওয়া পড়াটা নিজেই যোগাড় করি ।
তারপর তোরা তো আছিসই । তাছাড়া যজমানরাও আমাদের থেকেও বাবাকেই বেশি ভরষা করেন ।
বিয়ে-শ্রাদ্ধ-পইতা সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তারা বাবাকেই চান ।
শুধু
নিজের গ্রামে চুল-দাড়ি কাটা কিম্বা অনুষ্ঠান পার করাই নয় , বয়সকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে দিব্যি তিনি ছেলে
ছোকরার দলে ভীড়ে বরযাত্রীর গাড়িতে চেপে ছেলেপক্ষের নাপিত হিসাবে হাজির হন দুরের
গ্রাম-শহরে ।ওইসব বিয়ের আসরে ‘গোমোক্ষণ’ অনুষ্ঠানে তরজায় মেয়েপক্ষের নাপিতকে বহুবার কাবু
করছেন প্রচলিত ছড়ার সঙ্গে নিজের উদ্ভাবনী শক্তি মিশিয়ে । কেমন সেই ছড়া? ঈষৎ চাপা গলায় আউড়ালেন, ‘শুনুন শুনুন মহাশয়, শুনুন দিয়া মন ।হরপার্বতীর বিবাহ কথা বহুল বচন , এখন কলির ‘লাভ ম্যারেজের’ কথা করুন শ্রবণ । কলিতে নয় , আদ্যঋষি প্রাচীন গার্ন্ধব্য মতে শুকন্তলারও
হয়েছিল বিয়ে দুষ্মন্তের সাথে’। তারপরই জানালেন , শুধু টাকা পয়সাই নয় , আনন্দও আছে । আচমকা ওইসব ছড়া শুনে কন্যাপক্ষের
বহু নাপিত আর জবাব দিতে পারেন নি । তখন হইহই করে ওঠেছেন আমাদের পক্ষের লোকেরা ।
পিঠ চাপড়ে দিয়েছেন বরকর্তা । সেই আনন্দই আমাকে কাজের মধ্যে ধরে রাখে । কিছুতেই
বুড়ো হতে দেয় না ।
একই অভিব্যক্তি ৭২ বছরের সেখ আব্দুল হাকিমেরও ।
পেশায় দর্জি আব্দুল হাকিমের বাড়ি লাগোয়া আগোড়তোর গ্রামে । ১৪ বছর বয়েস থেকে সেলাই
শিখছেন । তারপর থেকে টানা ৫০ বছর ধরে নানুর সুপারমার্কেট সংলগ্ন একটি মুদিখানার
সামনে মেসিন পেতে একচিলতে জায়গায় সেলাই করে চলেছেন । আজও তার সঙ্গী ৫০ বছরের পুরোন
সেই সেলাই মেসিন । এলাকায় একের পর এক আধুনিক সেলাই দোকান গজিয়ে ওঠলেও সেলাই
মাস্টার হিসাবে তাকে অনেকেই চেনেন ।বহু পরিবারে পুরুষানুক্রমে তার হাতে তৈরি
পাঞ্জাবী পড়ে বিয়ে করতে যাওয়াটাই রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে । বয়স হলেও তার কাজ নিখুঁত , ছূঁচে সুতো পড়াতে আজও তার হাত কাঁপে না । চশমাও
লাগে না ।
আব্দুল
হাকিমের ৮ সদস্যের সংসার । তিন মেয়ের বিয়ে দিতে সব ঘুচে গিয়েছে ।এক ছটাকও জমিজমা
নেই । মাসিক ৪০০ টাকা হারে বার্ধক্য ভাতা পান ।সেলাই করে সাকুল্যে মাসে আড়াই – তিন হাজার টাকা আয় হয় । তিন ছেলে গ্রামে গ্রামে
মনোহারি জিনিস ফেরি করেন । ছোট ছেলে খুজুটিপাড়া কলেজে পড়ে। স্ত্রী আনিশা বিবি
জানান, সবার
আয়ে কোন রকমে আমাদের সংসার চলে । মুলত ওনার আয়েই ছেলের পড়াশোনার খরচ যোগাড় হয়
।বিশ্রামের কথা তুললেই বলেন, আমি তো বিশ্রাম নেওয়ার মতো এখনও বুড়ো হই নি ।
আগে ছেলেটা মানুষ হোক , তারপর বিশ্রামের কথা ভাবা যাবে । আর খোদ আব্দুল
হাকিম জানিয়েছেন , যখন কেউ এসে আমার তৈরি করা পোশাকের প্রশংসা করেন
তখন মনে হয় আমি ফুরিয়ে যায় নি । আমার দেওয়ার মতো ক্ষমতা এখনও আছে । সবথেকে
ভালোটুকু দেওয়ার জন্য সেলাই নিয়ে আজও আমি নানারকম পরীক্ষা নিরীক্ষা চালাই । মনেই
হয় না আমার বয়স হয়েছে ।





No comments:
Post a Comment