বিপন্ন জীবিকা -১
( ধীরেনদের কথা )
অর্ঘ্য ঘোষ
হাড়হিম করা মাঘের রাত । পড়শিরা সব দুয়ার এঁটে লেপের তলায় । হঠাৎ ঘরের
ভাঙ্গা দরজায় ‘ঠক-ঠক’ নড়ে ওঠে রাতের কড়া। ছেঁড়া কাঁথাটাকে পাশে সরিয়ে লোম ওঠে
যাওয়া কম্বল জড়িয়ে বাইরে বেরোতেই ধীরেন ফুলমালি দেখেন দাঁড়িয়ে রয়েছে থানার হেড
কনেষ্টবল । ‘বড়বাবু ডেকেছে, থানায় চল । বীরচন্দ্রপুরের ক্যানেলে পোঁতা লাশের খবর
এসেছে । জানায় কনস্টবলটি । অগ্যতা বেরোতে হয় ধীরেনকে । পুলিশের গাড়ি তাকে পৌঁচ্ছে
দিয়ে আসে খোলা মাঠের মাঝে সেচখালের ধারে । কেউ কোথাও নেই ।থাকার মধ্যে সেই লোম ওঠা
কম্বল, টিমটিমে একটা লন্ঠন , কয়েক বান্ডিল বিড়ি – দেশলাই , বাড়ি থেকে আনা এক
পুঁটলি মুড়ি আর বোতল দুয়েক সস্তার মদ । ওই সম্বল করেই কার্যত পচাগলা লাশ আগলে
ভোরের প্রতীক্ষায় কাটে ধীরেনের । বেলার দিকে পুলিশ-প্রশাসনের কর্তারা আসেন।দুর্গন্ধ
, ঘেন্না উপেক্ষা করে মাটি খুঁড়ে সেই লাশ গাড়িতে তুলে দিয়ে হাঁফ ছাড়ার অবকাশ পান
বছর পঞ্চান্নর ধীরেন ফুলমালি । নিঁখোজ থাকা যুবকের দেহ উদ্ধার হওয়ায় আলো ফোটে
পুলিশের মুখে। এ রকম আলো পুলিশের মুখে
বহু ফুটিয়েছেন ধীরেনবাবু । তবু তার ঘরে আঁধার ঘোচে নি আজও ।
ময়ূরেশ্বরের
ফুলমালি পাড়ার বাসিন্দা ধীরেনবাবু বছর কুড়ি আগে ছিলেন পেশায় ভ্যানচালক । সেইসময়
গ্রামের লুদু সেখ নামে এক ব্যক্তি পচা-গলা
লাশ উদ্ধারের কাজ করতেন । আর যৎসামান্য ভাড়ার বিনিময় সেইসব লাশ থানা বা মর্গে
পৌঁচ্ছে দেওয়ার কাজ করতেন ধীরেনবাবু । লুদু সেখের মৃত্যুর পর চোখে আঁধার দেখেন
পুলিশ কর্তারা ।কেউই ওই কাজ করতে রাজি হন না । তখন একদিন স্থায়ী কর্মী হিসাবে
স্বীকৃতি মিলবে এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাকে ওই কাজে পুলিশ কর্তারা বহাল করেন বলে
ধীরেনবাবুর দাবি ।সেই প্রতিশ্রুতিতে টানা ২০ বছর ধরে লাশ তোলার কাজ করে চলেছেন।
স্থায়ী কর্মীর স্বীকৃতি দুরের কথা , দুবেলা দুমুঠো খাওয়া পড়ার মতো বেতনও মেলেনি
বলে অভিযোগ। সারা মাস কাজের জন্য পান সাকুল্যে ১৫০০ টাকা । ওই টাকাতেই তাকে থানা
চত্বরে ফুলগাছ পরিচর্চা ,সাফাইয়েরর কাজও করতে হয় । আর যেদিন লাশ উদ্ধার করতে যান
সেদিন খোরাকি বাবদ পান ৫০/১০০ টাকা ।যা মদ কিনতেই চলে যায়। মদ না খেলে যে ওই কাজ
করাই যায় না , দাবি তার। সহায়ক অন্য কোন কাজও করতে পারেন না । কখন কোথাই ছুটতে হয়
বলে সব সময় তাকে তৈরি থাকতে হয় ।
এর ফলে নড়বড়ে হয়ে
পড়েছে তার সংসার । টালির চালের কুঁড়ে ঘরে বৃদ্ধা মা ,স্ত্রী , এক ছেলে মেয়েকে নিয়ে
তার অভাবের সংসার । কয়েক বছর আগে মেয়ের বিয়ে দিতে গিয়ে ঘটিবাটিটুকু পর্যন্ত বিকিয়ে
গিয়েছে । ছেলের আলাদা সংসার । বৃদ্ধা মা এবং স্ত্রী’কে নিয়ে কোনরকমে জোড়াতালি দিয়ে
এতদিন সংসার চলছিল। কিন্তু অভাবের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে স্ত্রী মালাদেবী বেশ কিছুদিন
আগে বাপের বাড়ি চলে গিয়েছেন । প্রতিবেশী মায়া ফুলমালি , কাশিনাথ ফুলমালিরা জানান ,
বাপেরবাড়ি না গিয়ে কি’ই বা করবেন , স্বামী রাতবিরতে উঠে পচাগলা মৃতদেহ ঘেঁটে মদ্যপ
অবস্থায় বাড়ি ফিরবেন , অথচ পেট ভরবে না ।একজন স্ত্রী কতদিন আর তা সহ্য করতে পারবেন
?
তারপর
থেকেই মায়ের দেখভাল করে থানা চত্বরেই পড়ে থাকেন ধীরেনবাবু । তিনি জানান , সত্যিই
বড় কঠিন কাজ । যখন কবর কিম্বা কোন লাশ উদ্ধার করতে যাই মনে হয় অন্নপ্রাশনের ভাত
উঠে আসবে । অনেকক্ষেত্রে টানাহেঁচড়ার সময় পচাগলা মাংস ছিটকে চোখে মুখে লেগেছে । খাবার
সময় তা মনে পড়ে গেলে আর ভাত খেতে পারিনি ।ওইজন্য স্ত্রী ছেড়ে চলে গিয়েছে। একদিন
স্থায়ী কর্মীর স্বীকৃতি মিলবে এই প্রতিশ্রুতিতে কাজ শুরু করেছিলাম । কিন্তু সেই
প্রতিশ্রুতি আজও পূরণ হয়নি । আজ বয়স জনিত কারণে অন্য কাজ করার ক্ষমতা হারিয়েছি ।
জানিনা যেদিন লাশ তোলার কাজও আর করতে পারব না সেদিন কি হবে । সঞ্চয় বলতে তো কানাকড়িও
নেই । তবুও পুলিশ কর্তারা সমস্যায় পড়বে বলে কাজ ছেড়ে যেতে পারিনি ।
থানার পুলিশ কর্তারাও স্বীকার করেছেন ,
ধীরেনের পর ওই কাজের জন্য লোক পাওয়াই মুশকিল হবে । কারণ লাশ তোলার কাজ করে যা
পারিশ্রমিক মেলে তার থেকে অনেক কম সময়ে অনেক বেশি টাকা মেলে অন্যকাজে। ওইসব পুলিশ
কর্তারাই জানাচ্ছেন , শুধু ময়ূরেশ্বরই নয় , প্রায় প্রতিটি থানা এলাকাতেই একদিন
স্থায়ী কর্মী হিসাবে স্বীকৃতি মিলবে সেই
আশায় বছরের পর বছর একই কাজ করে চলেছেন অনেকে । ফাঁসুড়েরা তুলনামূলক ভাল বেতন পান ।
এমন কি পুলিশ কুকুরেরাও ভাল রকম যত্ন আত্তি পায় । অথচ বহুক্ষেত্রে পুলিশকে তদন্তের
প্রথম সিঁড়িতে পৌঁছোতে যাদের প্রয়োজন অস্বীকার করা যায় না তারা শোষিতই হয়ে চলেছেন
। তাই শাসক বদলায়, পুলিশ কর্তা বদলায় , বদলায় না ধীরেনদের মতো লাশ তুলিয়েদের ভাগ্য ।
----০----
ডাক আসে না । আসে না সরকারি সাহার্য্যও ।শুধু রঙ মেখে সং সাজাই
সার হয় , সংসার চলে না। পেটের তাগিদে শিল্পীদের তাই চর্চা ছেড়ে খুঁজে নিতে হচ্ছে
অন্য পেশা । একের পর এক ঝাঁপ বন্ধ হতে হতে হারাতে বসেছে লাভপুরের যাত্রাপাড়া । একসময় লাভপুরের
ষষ্ঠীনগর তথা গরুর হাট সংলগ্ন এলাকা যাত্রাপাড়া হিসাবে পরিচিত ছিল । বন্ধ হয়ে
যাওয়া ছোটলাইনের দুধারে তখন যাত্রাদলের ১০/১২ টি গদিঘর সরগরম থাকত । দুর-দূরান্ত
থেকে নায়েক পার্টিরা বায়না করতে হাজির হতেন । মূলত মহিলা শিল্পী ( দলের পরিভাষায়
ফিমেল ) , যন্ত্রী এবং পোশাকের বায়না করতে আসতেন শখের যাত্রা দলের ওইসব নায়েকেরা ।
আবার কখনও বা গোটা একটি যাত্রাপালারও বায়না হত । সব মিলিয়ে সকাল থেকে গমগম করত ওই
পাড়া । সেসময় ওই যাত্রাপাড়াকে কেন্দ্র করেই প্রায় তিন শতাধিক শিল্পীর ভাত কাপড়ের
সংস্থান হয়েছে । বিশেষত ভাগ্য বিড়ম্বিত বহু মহিলা যাত্রাপাড়ায় অভিনেত্রী হিসাবে
বেঁচে থাকার পথ খুঁজে পেয়েছেন । সেই যাত্রাপাড়াই আজ হারিয়ে যেতে বসেছে ।কোন রকমে
টিম টিম করে টিকে রয়েছ মাত্র ২ টি অপেরা । কিন্তু তাদেরও
অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়েছে । বিপন্ন হয়ে পড়েছেন শিল্পীরাও ।
এমনিতেই পারবারিক
বিপর্যয়ের শিকার হয়ে কোন রকমে বেঁচে থাকার জন্য একদিন অভিনয়কে জীবিকা হিসাবে বেছে
নিয়েছিলেন ৫৫ বছরের নারায়ণী গোস্বামী , ৫৩ বছরের কৃষ্ণা মুখোপাধ্যায় , ৫৬ বছরের শিবানী
মুখোপাধ্যায় ,২৭ বছরের চন্দনা অধিকারীরা ।তখন রাতের পর রাত মানুষকে আনন্দ দিয়েছেন
তারা । আজ তাদের অধিকাংশেরই পরানুগ্রহে কোনরকমে অর্ধাহারে অনাহারে একাকী চোখের জলে
দিন কাটছে । কারণ নিত্যনতুন বিনোদনের দাপটে শখের যাত্রা কার্যত হারিয়েই গিয়েছে ।
তাই আর ডাক পান না শিল্পীরা ।সরকারি অনুদানও মেলে না বলে অভিযোগ ।
মাত্র ১৬ বছর বয়সেই পাদপ্রদীপের তলায় দাঁড়াতে
হয়েছিল লাভপুর রামকৃষ্ণ অপেরার বর্তমান কর্ণধার নারায়ণী গোস্বামীকে। শৈশবেই মা’কে হারান । বাবা ছিলেন
নামে মাত্র বেতনে কীর্ণাহারের একটি স্কুলের নাইট গার্ড । স্কুলে নকশাল হামলার জেরে
সেই কাজও হারাতে হয় । পাঁচ ভাইবোনের বড় নারায়ণীদেবীর পড়া এগোয়নি প্রাথমিকের বেশি ।
স্রেফ দু’বেলা দুটি ভাতের জন্য বাবা তাকে রেখে আসেন কাটোয়ার এক অভিনেত্রীর বাড়িতে
। সেখানে ঝিগিরির পাশাপাশি চলত অভিনয় শিক্ষা । তারপর পালা প্রতি ৩০ টাকার চুক্তিতে
নাম লেখান বোলপুরের একটি যাত্রাদলে । সেখান থেকেই ‘মেক আপ ম্যানের’ সঙ্গে গাঁটছড়া
বাঁধেন । কিন্তু ৩ বছরের মাথায় বিচ্ছেদ ঘটে স্বামীর
সঙ্গে । তখন ২ বছরের ছেলেকে মানুষ করতে আরও বেশি করে যাত্রাকেই আঁকড়ে ধরেন। পরে
নিজে দলও খোলেন ।কিন্তু সে রকম বায়না আর হয় না বলে তেলেভাজার দোকান করেছেন । একই
পরিস্থিতি ৫৩ বছরের কৃষ্ণাদেবীর । ১৮ বছর বয়েসেই ভিনদেশী এক যুবকের সঙ্গে বিয়ের
নামে প্রতারনার শিকার হন তিনি । অন্তঃস্বত্ত্বা অবস্থায় তাকে ফেলে বেপাত্তা হয়ে
যায় সেই যুবক ।তখন দুচোখে অন্ধকার নেমে আসে তার। বাবা হারমোনিয়াম
সারাতেন। যাত্রাদলের লোকেরাও আসতেন হারমোনিয়াম সারাতে ।সেইসূত্রে
যাত্রাদলে নাম লেখান কৃষ্ণাদেবীও । যাত্রা করেই ছেলেকে মানুষ করেছেন । এখন সেই
ছেলের আলাদা সংসার । বিড়ি বেঁধে কিম্বা ধুপকাঠি তৈরি করে কোনরকমে দিন চলছে তার ।
ওইসব শিল্পী্দের
অনেকেই জানান , এই পেশায় মুখে রঙ মেখে আমারা যা পাই তাতে সংসার চলে না । প্রাপ্য
সম্মান জোটেও না। পোস্টারে বাজনা, পোশাকের পাশাপাশি আমাদের জন্য
সমগোত্রীয় সামগ্রীর মতো লেখা হয় ফিমেল ভাড়া পাওয়া যায় । যাত্রাদলের মেয়ে মানে সবাই ধরেই নেয় আমারা
সস্তা । কি নায়েক পার্টি কি দল কোথাও
প্রাপ্য মর্যাদাটুকু পর্যন্ত মেলে না । স্রেফ পেটের তাগিদে হাত বদল হতে হতে আমারা
সামগ্রীর মতোই হয়ে যায় । একই ইতিহাস লাভপুরেরই চন্দনা অধিকারি , উত্তর
২৪পরগনার পারসব্দালপুরের শিবানী মুখোপাধ্যায়দেরও।লাভপুরের
পাশাপাশি অন্যান্য দলেও কাজ করেছেন তারা। কলকাতার নামী যাত্রাদলেও জর্জ বেকার ,
শকুন্তলা বড়ুয়াদের সঙ্গেও অভিনয় করেছেন শিবানীদেবী । তারা জানান , আমরা খুব কষ্টে
আছি । আমাদের মতো শিল্পীদের বৃদ্ধ বয়সটা খুবই দুঃসহ ।কেউ খোঁজটুকু পর্যন্ত নেয় না
। সঞ্চয় বলতেও কিছুই নেই । শুনেছি সরকার নাকি লোকশিল্পীদের জন্য অনেক কিছু ঘোষণা
করেছেন । কিন্তু তার নাগাল আমারা পাই নি ।
তাদের প্রশ্ন
, তাহলে কি আমরা ওই আওতায় পড়ি না ? কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণই তো বলে গিয়েছেন যাত্রায় ‘লোক
শিক্ষে’ হয় । সেই লোকশিক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে থেকে আমারা জীবনে কি পেলাম ? একই জিজ্ঞাসা সারদা অপেরার কর্ণধার মুক্তিপদ
দাস , মেকাপম্যান নিমাই হাজরাদেরও ।তারা জানান , আগে বছরে ১০০/১১০ পালা গানের
বায়না মিলত । এখন তা ১৫/২০ পালায় ঠেকেছে। ওই আয়ের একটা অংশ পোশাক সংরক্ষণের
পিছনেই খরচ হয়ে যায় । শিল্পীদের ভাগ্যে যা জোটে তাতে পেট ভরে না , ভরে না মনও ।
অথচ এই যাত্রাপাড়াই একদিন বহু মানুষ বিশেষত ভাগ্য বিড়ম্বিত মহিলাকে বেঁচে থাকার পথ
করে দিয়েছে । সেই পাড়াটিই এখন হারিয়ে যেতে বসেছে ।
----০----
বিপন্ন জীবিকা- ৩
এমনিতেই পারবারিক
বিপর্যয়ের শিকার হয়ে কোন রকমে বেঁচে থাকার জন্য একদিন অভিনয়কে জীবিকা হিসাবে বেছে
নিয়েছিলেন ৫৫ বছরের নারায়ণী গোস্বামী , ৫৩ বছরের কৃষ্ণা মুখোপাধ্যায় , ৫৬ বছরের শিবানী
মুখোপাধ্যায় ,২৭ বছরের চন্দনা অধিকারীরা ।তখন রাতের পর রাত মানুষকে আনন্দ দিয়েছেন
তারা । আজ তাদের অধিকাংশেরই পরানুগ্রহে কোনরকমে অর্ধাহারে অনাহারে একাকী চোখের জলে
দিন কাটছে । কারণ নিত্যনতুন বিনোদনের দাপটে শখের যাত্রা কার্যত হারিয়েই গিয়েছে ।
তাই আর ডাক পান না শিল্পীরা ।সরকারি অনুদানও মেলে না বলে অভিযোগ ।
মাত্র ১৬ বছর বয়সেই পাদপ্রদীপের তলায় দাঁড়াতে
হয়েছিল লাভপুর রামকৃষ্ণ অপেরার বর্তমান কর্ণধার নারায়ণী গোস্বামীকে। শৈশবেই মা’কে হারান । বাবা ছিলেন
নামে মাত্র বেতনে কীর্ণাহারের একটি স্কুলের নাইট গার্ড । স্কুলে নকশাল হামলার জেরে
সেই কাজও হারাতে হয় । পাঁচ ভাইবোনের বড় নারায়ণীদেবীর পড়া এগোয়নি প্রাথমিকের বেশি ।
স্রেফ দু’বেলা দুটি ভাতের জন্য বাবা তাকে রেখে আসেন কাটোয়ার এক অভিনেত্রীর বাড়িতে
। সেখানে ঝিগিরির পাশাপাশি চলত অভিনয় শিক্ষা । তারপর পালা প্রতি ৩০ টাকার চুক্তিতে
নাম লেখান বোলপুরের একটি যাত্রাদলে । সেখান থেকেই ‘মেক আপ ম্যানের’ সঙ্গে গাঁটছড়া
বাঁধেন । কিন্তু ৩ বছরের মাথায় বিচ্ছেদ ঘটে স্বামীর
সঙ্গে । তখন ২ বছরের ছেলেকে মানুষ করতে আরও বেশি করে যাত্রাকেই আঁকড়ে ধরেন। পরে
নিজে দলও খোলেন ।কিন্তু সে রকম বায়না আর হয় না বলে তেলেভাজার দোকান করেছেন । একই
পরিস্থিতি ৫৩ বছরের কৃষ্ণাদেবীর । ১৮ বছর বয়েসেই ভিনদেশী এক যুবকের সঙ্গে বিয়ের
নামে প্রতারনার শিকার হন তিনি । অন্তঃস্বত্ত্বা অবস্থায় তাকে ফেলে বেপাত্তা হয়ে
যায় সেই যুবক ।তখন দুচোখে অন্ধকার নেমে আসে তার। বাবা হারমোনিয়াম
সারাতেন। যাত্রাদলের লোকেরাও আসতেন হারমোনিয়াম সারাতে ।সেইসূত্রে
যাত্রাদলে নাম লেখান কৃষ্ণাদেবীও । যাত্রা করেই ছেলেকে মানুষ করেছেন । এখন সেই
ছেলের আলাদা সংসার । বিড়ি বেঁধে কিম্বা ধুপকাঠি তৈরি করে কোনরকমে দিন চলছে তার ।
ওইসব শিল্পী্দের
অনেকেই জানান , এই পেশায় মুখে রঙ মেখে আমারা যা পাই তাতে সংসার চলে না । প্রাপ্য
সম্মান জোটেও না। পোস্টারে বাজনা, পোশাকের পাশাপাশি আমাদের জন্য
সমগোত্রীয় সামগ্রীর মতো লেখা হয় ফিমেল ভাড়া পাওয়া যায় । যাত্রাদলের মেয়ে মানে সবাই ধরেই নেয় আমারা
সস্তা । কি নায়েক পার্টি কি দল কোথাও
প্রাপ্য মর্যাদাটুকু পর্যন্ত মেলে না । স্রেফ পেটের তাগিদে হাত বদল হতে হতে আমারা
সামগ্রীর মতোই হয়ে যায় । একই ইতিহাস লাভপুরেরই চন্দনা অধিকারি , উত্তর
২৪পরগনার পারসব্দালপুরের শিবানী মুখোপাধ্যায়দেরও।লাভপুরের
পাশাপাশি অন্যান্য দলেও কাজ করেছেন তারা। কলকাতার নামী যাত্রাদলেও জর্জ বেকার ,
শকুন্তলা বড়ুয়াদের সঙ্গেও অভিনয় করেছেন শিবানীদেবী । তারা জানান , আমরা খুব কষ্টে
আছি । আমাদের মতো শিল্পীদের বৃদ্ধ বয়সটা খুবই দুঃসহ ।কেউ খোঁজটুকু পর্যন্ত নেয় না
। সঞ্চয় বলতেও কিছুই নেই । শুনেছি সরকার নাকি লোকশিল্পীদের জন্য অনেক কিছু ঘোষণা
করেছেন । কিন্তু তার নাগাল আমারা পাই নি ।
তাদের প্রশ্ন
, তাহলে কি আমরা ওই আওতায় পড়ি না ? কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণই তো বলে গিয়েছেন যাত্রায় ‘লোক
শিক্ষে’ হয় । সেই লোকশিক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে থেকে আমারা জীবনে কি পেলাম ? একই জিজ্ঞাসা সারদা অপেরার কর্ণধার মুক্তিপদ
দাস , মেকাপম্যান নিমাই হাজরাদেরও ।তারা জানান , আগে বছরে ১০০/১১০ পালা গানের
বায়না মিলত । এখন তা ১৫/২০ পালায় ঠেকেছে। ওই আয়ের একটা অংশ পোশাক সংরক্ষণের
পিছনেই খরচ হয়ে যায় । শিল্পীদের ভাগ্যে যা জোটে তাতে পেট ভরে না , ভরে না মনও ।
অথচ এই যাত্রাপাড়াই একদিন বহু মানুষ বিশেষত ভাগ্য বিড়ম্বিত মহিলাকে বেঁচে থাকার পথ
করে দিয়েছে । সেই পাড়াটিই এখন হারিয়ে যেতে বসেছে ।
----০----
বিপন্ন জীবিকা- ৩
( মধুবালাদের কথা )
' মধু নেবে গো মধু ' - একসময় গ্রামের গলি থেকে শহরের রাজপথে প্রায়ই শোনা যেত এই মধুমাখা স্বর । সারাজীবন মানুষ যাতে মিষ্টি কথা বলার অধিকারী হয় তার জন্য পুরুষানুক্রমে প্রচলিত রয়েছে মুখে মধু দেওয়ার প্রথা।আজ না হয় পয়সা ফেললেই বোতলবন্দী মধু মেলে দোকানে দোকানে। কিন্তু একসময় বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে ওই মধু যোগাতেন মধুবালারা ( মধুওয়ালা )। যেসব পরিবারে সন্তান আসছে সেইসব পরিবারের মা-মাসীরা মধুবালাদেরই নবজাতকের মুখে দেওয়ার মধুর জন্য বলে রাখতেন । মধুবালারাও বনজঙ্গল খুঁজে এনে দিতেন খাঁটি মধু। আবার বাড়িতে মৌমাছির উৎপাত থেকে উদ্ধারকর্তাও ছিলেন মধুবালারা । মৌমাছির হুলের জ্বালা অগ্রাহ্য করে মৌচাক কেটে তারাই আমাদের বাঁচাতেন । সেইসব মধুবালারাই আজ হারিয়ে যেতে বসেছেন।অন্যের সন্তানের মুখে মিষ্টি কথা ফুটিয়ে আজ মধুবালাদেরই জীবন তিক্ততায় ভরা।
কৃষিক্ষেত্রে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মৌমাচ্ছির বংশবৃদ্ধি লোপ পাচ্ছে । এর ফলে হারিয়ে যাচ্ছে মৌমাছির চাক । এক সময় গ্রামে - গঞ্জে গাছ , বাড়ির কার্ণিস প্রভৃতি জায়গা থেকে মৌমাছির চাক থেকে মধু সংগ্রহ করে বছরের বেশ কয়েকটা মাস জীবিকা নির্বাহ করতেন তারা। বর্তমানে অবলুপ্তির পথে এসে দাঁড়িয়েছে ওই পেশাটি । বাপ ঠাকুরদার হাত ধরেই মধু সংগ্রহ শুরু করেছিলেন লাভপুরের কাপসুন্দি গ্রামের বছর চল্লিশের রিয়াজুল সেখ । তিনি জানান , বাপ-ঠাকুরদার আমলে গ্রামে গ্রামে ঘুরে গৃহস্থের বাগান কিম্বা বাড়ি থেকে মজুরি কিম্বা ভাগের বিনিময়ে যা মধু মিলত তাতেই আমাদের ৭/৮ মাস সংসার চলে যেত । এখন সেই চাক নেই । থাকলেও চাকে আগের মতো মধু নেই । এখন মধু সংগ্রহ করে মাস খানেকও সংসার চলে না । ওই গ্রামেরই মেহেরুল সেখ , হাসিরুদ্দিন সেখরা জানান , বছর কুড়ি আগেও গ্রামে প্রায় ৩০ টি পরিবার মধু সংগ্রহের পেশায় জড়িত ছিল । এখন মাত্র ৪ পরিবার কোন রকমে ওই পেশায় টিকে রয়েছেন ।
একই অবস্থা ময়ূরেশ্বরের দুনা গ্রামের মধুবালাদেরও। একসময় ওইগ্রামেও ২০/২৫ টি পরিবার মধু সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন । এখন মাত্র ৩/৪ টি পরিবার মধু সংগ্রহের কাজ করেন। দানিশ সেখ , আসরাফ আলি ,ইরফান মল্লিকরা জানান, সদ্যজাতের মুখে মিষ্টি কথা ফোটানোর জন্য কতজন আমাদের কাছে মধুর বায়না দিয়ে রাখতেন । সেই মধু যুগিয়ে এখন আমাদেরই জীবন তিক্ত হয়ে গিয়েছে । চাক তো কালেভদ্রে দেখা যায় । তাও ওইসব চাকের আয়তনও খুবই কম । আগে একটি চাক থেকে ৭/৮ কেজি মধু মিলত । এখন মাত্র ২/৩ কেজি মধু মেলে । গৃহস্থকে অর্ধেক ভাগ দিয়ে যা মধু মেলে তাতে খাটনিই পোষায় না ।ওইসব মধুবালাদের হিসাব অনুযায়ী , এখন মাসে ৪/৫ টির বেশি মৌচাক পাওয়া যায় না । কেজি প্রতি ৮০ /১০০ টাকা দরে মধু আর ৫০/৬০ টাকা দরে মোম বিক্রি করে আর পেটের ভাতের যোগাড় হয় না ।
প্রাণীতত্ত্ববিদদের মতে ,চাষিরা গতানুগতিক চাষে অভ্যস্থ হয়ে পড়ায় তিল , সরষে , তিসির মতো মধুযুক্ত ফুল সমৃদ্ধ চাষ উল্লেখযোগ্য হারে কমে গিয়েছে । মধুর সন্ধানে মৌমাছিরা তাই বনে গিয়ে মৌচাক তৈরি করছে । পাশাপাশি অত্যাধিক রাসাওনিক এবং কীটনাশক ব্যবহারের জন্য ফুলে মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে মৌমাছি মারাও পড়ছে । ফলে পরাগমিলনের অভাব জনিত কারণে মধুযুক্ত বহু ফুলের গাছও গ্রামগঞ্জ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে । এই পরিস্থিতিতে ওইসব মধুবালাদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে কৃত্রিম মৌমাছি পালনে জোর দেওয়া দরকার । তবেই গ্রামের অলিতে গলিতে আবার শোনা যাবে মধুবালাদের সেই মধুমাখা স্বর -- মধু নেবে গো মধু । ছেলেমেয়ের মুখে মধু দেবে গো মধু ?
---০---
---০---
চিন্তাদের কথা
মাসিক পঞ্চাশ পয়সা থেকে তিন প্রজন্মে চিন্তা দলুই , সাদরে আলা খাদের বেতন বৃদ্ধির গ্রাফিক হার ৫০০ টাকা। না, সামন্ততান্ত্রিক শ্রম শোষক সমাজ ব্যবস্থার ঘটনা নয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই ঘটনা ঘটে চলেছে বিভিন্ন সরকারি স্কুলে।স্কুল সৃষ্টির শুরু থেকেই সংগঠিত শিক্ষকদের সংগেই কোথাও ঝাড়ুদার, কোথাও বা নৈশরক্ষী হিসাবে কাজ শুরু করেন চিন্তা দলুইদের পূর্ববর্তী প্রজন্ম। তারপর একদিন স্কুল সরকারি অনুমোদন পেয়েছে , সংগঠিত স্কুলের স্বেচ্ছাশ্রমের সেই সব শিক্ষক -শিক্ষাকর্মীরা সরকারি স্বীকৃতি পেয়েছেন। শুধু চিন্তা দলুইদেরই স্বীকৃতি মেলেনি।স্বীকৃতির আশায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম কেটে গিয়েছে তাদের। একের পর এক সরকার বদলেছে।
বদলায় নি চিন্তা দলুইদের ভাগ্য। আজও তারা অবহেলিতই রয়ে গিয়েছেন। তাদের বঞ্চনা নিয়ে কেউ সরব হয়নি। কেউ বলে নি , বয়স পেরিয়ে যাওয়া ওইসব কর্মীদের ছেলেমেয়েকে একটা চাকরি দেওয়া হোক। শেষ জীবনটা ওরা ছেলেমেয়ের আশ্রয়ে একটু সুখে থাকুক।তাই দুঃখের বারোমাস্যা ঘোচে নি চিন্তা দলুইদের। সে প্রায় পঞ্চাশ বছরেরও আগের কথা। ময়ূরেশ্বেরের লোকপাড়া হাইস্কুল তখনও সরকারি স্বীকৃতি পায় নি। সেই সময় সরকারি স্বীকৃতির প্রত্যাশায় মাসিক মাত্র ৫০ পয়সা বেতনে ঝাড়ুদারের কাজ শুরু করেছিলেন চিন্তা দলুইয়ের শাশুড়ি যশোদা দলুই। তার মৃত্যুর পর একই প্রত্যাশায় কাজ শুরু করেন তার পঙ্গু ছেলে ষষ্ঠী। ৩০ বছরে বাড়তে বাড়তে তার বেতন দাঁড়ায় ৫০ টাকা। ওই টাকায় ৬ সদস্যের সংসার চলত না বলে স্রেফ দুমুঠো ভাতের জন্য ঝাড়ুদারের পাশাপাশি মুক স্ত্রী চিন্তাকে নিয়ে স্কুল হোস্টেলে পরিচারকের কাজও শুরু করেন তিনি। সবার খাওয়া হলে রাতের অন্ধকারে দুজনের ভাত নিয়ে বাড়ি ফিরতেন স্বামী-স্ত্রী।
অভুক্ত ছেলেমেয়েরা বসে থাকত বাবা- মায়ের প্রতীক্ষায়। হোস্টেল থেকে নিয়ে আসা খাবার ছেলেমেয়েদের সংগে ভাগ করে খেতেন সবাই। ওইভাবে খাবার নিয়ে ফেরার সময় একদিন হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়ে বিছানা নেন ষষ্ঠী। আর সুস্থতা ফেরে নি তার। কার্যত বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু হয় দ্বিতীয় প্রজন্মের। বাবার মৃত্যুর পর মায়ের সংগে একই কাজ শুরু তার নাবালক ছোটছেলে সুশান্ত দলুই। তার বেতন বেড়ে দাঁড়ায় ৫০০ টাকা। ওই বেতনে সংসার চলে না বলে তাকেও স্থানীয় কলেজেও নৈশরক্ষীর কাজ নিতে হয়েছে। একই দুরবস্থা মারগ্রামের বসোয়া গ্রামের সাদরেআলা খাঁয়ের। ১৯৭৫ সালে তিনিও সংগঠিত বশোয়া বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষিকা- শিক্ষাকর্মীদের মতোই স্বেচ্ছাশ্রমে নৈশরক্ষী হিসাবে কাজ শুরু করেন।১৯৮৩ সালে জুনিয়ার থেকে পরে হাইস্কুলের সরকারি অনুমোদন পায় সেদিনের সেই স্কুল। স্বেচ্ছাশ্রমের সেইসব শিক্ষিকা--শিক্ষাকর্মীরাও সরকারি স্বীকৃতি পান। স্বীকৃতি জোটে না কেবল সাদরেআলা খাঁয়ের।এর ফলে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে তার সংসার।
পাঁচ ছেলেমেয়েকে অর্থাভাবে কার্যত মানুষ করতে পারেন নি। দুই মেয়ের বিয়ে দিতে কার্যত ঘটিবাটিটুকুপর্যন্ত বিকিয়ে গিয়েছে। এমন কি জীবনের সেরা সময়টুকু স্কুলের সেবায় লাগিয়েও কোন স্বীকৃতি না পেয়ে হারিয়ে ফেলেছেন মানসিক ভারসাম্যও।তবুও আজও স্কুল ছেড়ে যান নি।সরকার একদিন তাকেও স্বীকৃতি দেবে এই প্রত্যাশায় আজও স্কুল পাহারা দিয়ে চলেছেন। বেতন পান মাসে মাত্র ৫০০ টাকা।একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালাতে শিক্ষক, শিক্ষাকর্মীদের পাশাপাশি ওইসব কর্মীদেরও প্রয়োজন অনস্বীকার্য। কিন্তু তা স্বীকারের কোন উদারতাই নেই সরকারের। সরকার নির্ধারিত নুন্যতম বেতনটুকুও মেলে না তাদের।একই প্রতিষ্ঠানের সমসাময়িক অন্যান্য কর্মীরা যখন সরকারি স্বীকৃতি পেয়ে মোটা টাকা বেতন নিয়ে বাড়ি যাচ্ছেন তখন দয়ার দানের মতো সৎসামান্য কিছু টাকা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে তাদের।
কে বুঝবে ওদেরও ঘর সংসার আছে , জ্বর জ্বালা আছে , আছে দুর্গাপুজো - ঈদ , আছে ছেলেমেয়ের বায়না-আবদার। সর্বোপরি ওরাও মানুষ। বর্তমান বাজারে ওই যৎসামান্য টাকায় কি মানুষের মতো বাঁচা যায় ? স্বচ্ছ নির্মল ভারত অভিযানের প্রচারেই কোটি কোটি টাকা উড়ে যাচ্ছে , কিন্তু সেই অভিযানের অন্যতম কান্ডারী চিন্তা দলুইরা আজও অবহেলিত। ঘর সংসার ভুলে, শীত গ্রীষ্ম উপেক্ষা করে বছরের পর বছর সরকারি সম্পত্তি পাহারা দিতে গিয়ে সাদরেআলা খাঁ'রা মানসিক ভারসাম্য হারাচ্ছেন। এ বঞ্চনা শুধু চিন্তা দলুই কিম্বা সাদরেআলা খাঁয়েরই নয় , অধিকাংশ সরকারি সাহার্য প্রাপ্ত স্কুলে এমনই অনেক মানিক, আরতি, রহমানরা বঞ্চনার শিকার। যাদের কথা কেউ ভাবে না। গদির রঙ বদলে যায়, বদলায় না চিন্তা দলুইদের ভাগ্য। সরকারি সদিচ্ছার দিকে তাকিয়ে কেটে যায় ওদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম।
মাসিক পঞ্চাশ পয়সা থেকে তিন প্রজন্মে চিন্তা দলুই , সাদরে আলা খাদের বেতন বৃদ্ধির গ্রাফিক হার ৫০০ টাকা। না, সামন্ততান্ত্রিক শ্রম শোষক সমাজ ব্যবস্থার ঘটনা নয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই ঘটনা ঘটে চলেছে বিভিন্ন সরকারি স্কুলে।স্কুল সৃষ্টির শুরু থেকেই সংগঠিত শিক্ষকদের সংগেই কোথাও ঝাড়ুদার, কোথাও বা নৈশরক্ষী হিসাবে কাজ শুরু করেন চিন্তা দলুইদের পূর্ববর্তী প্রজন্ম। তারপর একদিন স্কুল সরকারি অনুমোদন পেয়েছে , সংগঠিত স্কুলের স্বেচ্ছাশ্রমের সেই সব শিক্ষক -শিক্ষাকর্মীরা সরকারি স্বীকৃতি পেয়েছেন। শুধু চিন্তা দলুইদেরই স্বীকৃতি মেলেনি।স্বীকৃতির আশায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম কেটে গিয়েছে তাদের। একের পর এক সরকার বদলেছে।
বদলায় নি চিন্তা দলুইদের ভাগ্য। আজও তারা অবহেলিতই রয়ে গিয়েছেন। তাদের বঞ্চনা নিয়ে কেউ সরব হয়নি। কেউ বলে নি , বয়স পেরিয়ে যাওয়া ওইসব কর্মীদের ছেলেমেয়েকে একটা চাকরি দেওয়া হোক। শেষ জীবনটা ওরা ছেলেমেয়ের আশ্রয়ে একটু সুখে থাকুক।তাই দুঃখের বারোমাস্যা ঘোচে নি চিন্তা দলুইদের। সে প্রায় পঞ্চাশ বছরেরও আগের কথা। ময়ূরেশ্বেরের লোকপাড়া হাইস্কুল তখনও সরকারি স্বীকৃতি পায় নি। সেই সময় সরকারি স্বীকৃতির প্রত্যাশায় মাসিক মাত্র ৫০ পয়সা বেতনে ঝাড়ুদারের কাজ শুরু করেছিলেন চিন্তা দলুইয়ের শাশুড়ি যশোদা দলুই। তার মৃত্যুর পর একই প্রত্যাশায় কাজ শুরু করেন তার পঙ্গু ছেলে ষষ্ঠী। ৩০ বছরে বাড়তে বাড়তে তার বেতন দাঁড়ায় ৫০ টাকা। ওই টাকায় ৬ সদস্যের সংসার চলত না বলে স্রেফ দুমুঠো ভাতের জন্য ঝাড়ুদারের পাশাপাশি মুক স্ত্রী চিন্তাকে নিয়ে স্কুল হোস্টেলে পরিচারকের কাজও শুরু করেন তিনি। সবার খাওয়া হলে রাতের অন্ধকারে দুজনের ভাত নিয়ে বাড়ি ফিরতেন স্বামী-স্ত্রী।
বদলায় নি চিন্তা দলুইদের ভাগ্য। আজও তারা অবহেলিতই রয়ে গিয়েছেন। তাদের বঞ্চনা নিয়ে কেউ সরব হয়নি। কেউ বলে নি , বয়স পেরিয়ে যাওয়া ওইসব কর্মীদের ছেলেমেয়েকে একটা চাকরি দেওয়া হোক। শেষ জীবনটা ওরা ছেলেমেয়ের আশ্রয়ে একটু সুখে থাকুক।তাই দুঃখের বারোমাস্যা ঘোচে নি চিন্তা দলুইদের। সে প্রায় পঞ্চাশ বছরেরও আগের কথা। ময়ূরেশ্বেরের লোকপাড়া হাইস্কুল তখনও সরকারি স্বীকৃতি পায় নি। সেই সময় সরকারি স্বীকৃতির প্রত্যাশায় মাসিক মাত্র ৫০ পয়সা বেতনে ঝাড়ুদারের কাজ শুরু করেছিলেন চিন্তা দলুইয়ের শাশুড়ি যশোদা দলুই। তার মৃত্যুর পর একই প্রত্যাশায় কাজ শুরু করেন তার পঙ্গু ছেলে ষষ্ঠী। ৩০ বছরে বাড়তে বাড়তে তার বেতন দাঁড়ায় ৫০ টাকা। ওই টাকায় ৬ সদস্যের সংসার চলত না বলে স্রেফ দুমুঠো ভাতের জন্য ঝাড়ুদারের পাশাপাশি মুক স্ত্রী চিন্তাকে নিয়ে স্কুল হোস্টেলে পরিচারকের কাজও শুরু করেন তিনি। সবার খাওয়া হলে রাতের অন্ধকারে দুজনের ভাত নিয়ে বাড়ি ফিরতেন স্বামী-স্ত্রী।
অভুক্ত ছেলেমেয়েরা বসে থাকত বাবা- মায়ের প্রতীক্ষায়। হোস্টেল থেকে নিয়ে আসা খাবার ছেলেমেয়েদের সংগে ভাগ করে খেতেন সবাই। ওইভাবে খাবার নিয়ে ফেরার সময় একদিন হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়ে বিছানা নেন ষষ্ঠী। আর সুস্থতা ফেরে নি তার। কার্যত বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু হয় দ্বিতীয় প্রজন্মের। বাবার মৃত্যুর পর মায়ের সংগে একই কাজ শুরু তার নাবালক ছোটছেলে সুশান্ত দলুই। তার বেতন বেড়ে দাঁড়ায় ৫০০ টাকা। ওই বেতনে সংসার চলে না বলে তাকেও স্থানীয় কলেজেও নৈশরক্ষীর কাজ নিতে হয়েছে। একই দুরবস্থা মারগ্রামের বসোয়া গ্রামের সাদরেআলা খাঁয়ের। ১৯৭৫ সালে তিনিও সংগঠিত বশোয়া বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষিকা- শিক্ষাকর্মীদের মতোই স্বেচ্ছাশ্রমে নৈশরক্ষী হিসাবে কাজ শুরু করেন।১৯৮৩ সালে জুনিয়ার থেকে পরে হাইস্কুলের সরকারি অনুমোদন পায় সেদিনের সেই স্কুল। স্বেচ্ছাশ্রমের সেইসব শিক্ষিকা--শিক্ষাকর্মীরাও সরকারি স্বীকৃতি পান। স্বীকৃতি জোটে না কেবল সাদরেআলা খাঁয়ের।এর ফলে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে তার সংসার।
পাঁচ ছেলেমেয়েকে অর্থাভাবে কার্যত মানুষ করতে পারেন নি। দুই মেয়ের বিয়ে দিতে কার্যত ঘটিবাটিটুকুপর্যন্ত বিকিয়ে গিয়েছে। এমন কি জীবনের সেরা সময়টুকু স্কুলের সেবায় লাগিয়েও কোন স্বীকৃতি না পেয়ে হারিয়ে ফেলেছেন মানসিক ভারসাম্যও।তবুও আজও স্কুল ছেড়ে যান নি।সরকার একদিন তাকেও স্বীকৃতি দেবে এই প্রত্যাশায় আজও স্কুল পাহারা দিয়ে চলেছেন। বেতন পান মাসে মাত্র ৫০০ টাকা।একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালাতে শিক্ষক, শিক্ষাকর্মীদের পাশাপাশি ওইসব কর্মীদেরও প্রয়োজন অনস্বীকার্য। কিন্তু তা স্বীকারের কোন উদারতাই নেই সরকারের। সরকার নির্ধারিত নুন্যতম বেতনটুকুও মেলে না তাদের।একই প্রতিষ্ঠানের সমসাময়িক অন্যান্য কর্মীরা যখন সরকারি স্বীকৃতি পেয়ে মোটা টাকা বেতন নিয়ে বাড়ি যাচ্ছেন তখন দয়ার দানের মতো সৎসামান্য কিছু টাকা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে তাদের।
কে বুঝবে ওদেরও ঘর সংসার আছে , জ্বর জ্বালা আছে , আছে দুর্গাপুজো - ঈদ , আছে ছেলেমেয়ের বায়না-আবদার। সর্বোপরি ওরাও মানুষ। বর্তমান বাজারে ওই যৎসামান্য টাকায় কি মানুষের মতো বাঁচা যায় ? স্বচ্ছ নির্মল ভারত অভিযানের প্রচারেই কোটি কোটি টাকা উড়ে যাচ্ছে , কিন্তু সেই অভিযানের অন্যতম কান্ডারী চিন্তা দলুইরা আজও অবহেলিত। ঘর সংসার ভুলে, শীত গ্রীষ্ম উপেক্ষা করে বছরের পর বছর সরকারি সম্পত্তি পাহারা দিতে গিয়ে সাদরেআলা খাঁ'রা মানসিক ভারসাম্য হারাচ্ছেন। এ বঞ্চনা শুধু চিন্তা দলুই কিম্বা সাদরেআলা খাঁয়েরই নয় , অধিকাংশ সরকারি সাহার্য প্রাপ্ত স্কুলে এমনই অনেক মানিক, আরতি, রহমানরা বঞ্চনার শিকার। যাদের কথা কেউ ভাবে না। গদির রঙ বদলে যায়, বদলায় না চিন্তা দলুইদের ভাগ্য। সরকারি সদিচ্ছার দিকে তাকিয়ে কেটে যায় ওদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম।



No comments:
Post a Comment