এইতো সমাজ
( ধারাবাহিক নাটক )
একাদশ দৃশ্য
( স্থান - থানা অফিস , পুলিশের বড়বাবু চেয়ারে বসে আছেন। সামনের টেবিলে প্রয়োজনীয় ফাইল ও কাগজপত্র। দারোগাবাবুর চোখ ফাইলে আবদ্ধ। এমন সময় হাঁফাতে হাঁফাতে মলয়ের প্রবেশ )
মলয় - আমাকে বাঁধুন দারোগাবাবু , আমি খুনী , আমি চোর।
দারোগাবাবু - কে তুমি ?
মলয় - আমি মলয় শর্শ্মা।
দারোগাবাবু - বাড়ী।
মলয় - লোকপাড়া।
দারোগাবাবু - হাঁ হাঁ মনে পড়েছে , তোমার নামে একটা ডাইরি তোমাদের গ্রামের পালবাবু করেছিলেন বটে , তা তুমি কেথাই চুরি করেছ আর খুনই বা করেছ কাকে ?
মলয় - আমি পালবাবুর বাড়িতে চুরি করেছি আর খুন করেছি আমার জামাইবাবুকে।
দারোগাবাবু - কিন্তু কেন তুমি এসব করেছ ?
মলয় -জানি না।
দারোগাবাবু - রুলারের গুতোয় দেখি তোমার ওই জানিনা কতক্ষণ থাকে।
মলয় - দারেগাবাবু স্বেচ্ছায় আমি যতটুকু বলেছি তার বেশি আর আপনি আমার কাছ থেকে এক বিন্দুও জানতে পারবেন না।
দারোগাবাবু - তুমি বলবে না বলছ ?
মলয় - দেখুন দারোগাবাবু , চোর - ডাকাতকে আপনারা রুলারের ভয় দেখিয়ে কথা আদায় করতে পারেন বটে , কিন্তু আমার কাছে সে আশা করবেন না ,মলয়ের প্রকৃতি অন্যরকম।
দারোগাবাবু - আচ্ছা দেখা যাবে, রামসিং এই এই রামসিং---।
( শিকল হাতে রামসিং এর প্রবেশ )
রামসিং - হুকুম দিজিয়ে বাবুজী।
দারোগাবাবু - একে বেঁধে তিন নং লক আপে নিয়ে যাও।
রামসিং - ঠিক হ্যায় বাবুজী।
( দারোগাবাবুর প্রস্থান )
( রামসিং মলয়কে বাঁধে, এবং নিয়ে যাবার জন্য প্রস্তুত হয় )
রামসিং - আইয়ে -- ।
মলয় - চল।
( চলে যেতে শুরু করে এমন সময় শর্মাজী ও কৃষ্ণার প্রবেশ )
শমাজী - দাড়াও প্রহরী , একটু দাড়াও ।
( রামসিং দাঁড়ায় )
মলয় - বাপুজী
শর্মাজী - তুই কেন এমন করতে গেলি খোঁকা ?
মলয় -বাপুজী আমি যে নিরুপায় ছিলাম।
কৃষ্ণা- মলয় তুমি আমার সব স্বপ্ন , সব সাধনা মাটি করে দিলে , আমি তোমাকে বড় করতে চেয়েছিলাম মলয় , কিন্তু তা আর হলো না ।
মলয় - কৃষ্ণা।
কৃষ্ণা- মলয়- তোমার চেয়ে আমি অনেক বেশি দুঃখ পেয়েছি , চোখের জলও অনেক ফেলেছি মলয়।
মলয় - কৃষ্ণা এবার তুমি আমাকে ভুলে যাও ভালবাসো অন্য কাউকে। তোমাকে সুখী দেখে আমিও যে সুখী হবো কৃষ্ণা। আমি,আমি যে খারাপ হয়ে গ্যাছি।আমি চোর ,আমি খুনী। এইতো আমার পরিচয়। ছাড়াও যদি কোন দিন পাই , তাহলে লোকে আমাকে আঙুল দেখিয়ে বলবে, ঐ সেই চোরটা , ঐ সেই খুনীটা। বেঁচে থেকে এর চেয়ে বড় দুঃখ আর কি হতে পারে বলো ?
কৃষ্ণা-মলয়,
শর্মাজী - খোঁকা -
রামসিং - চলিয়ে, চলিয়ে।
( বলে মলয়কে নিয়ে প্রস্থান )
( পর্দা নেমে আসে )
দ্বাদশ দৃশ্য
স্থান - জেল খানা।
( কয়েদির ড্রেস পরিহিত মলিয় ও রামসিং )
মলয় - আজ আমি দুদিন জেলে, ওদিকে পৃথিবীতে রাত্রি হচ্ছে , দিন হচ্ছে , সবই হচ্ছে ।শুধু আমি, আমিই জেলে ।বাপুজী কি করছে এখন কে জানে ? হয়তো দোকানে বসে চা ছাঁকছে , নয় বাড়ীতে মন খারাপ করে বসে আছে।
( কৃষ্ণার প্রবেশ )
কৃষ্ণা- মলয়
মলয় - কে কৃষ্ণা, তুমি এসেছো ?
কৃষ্ণা- হ্যাঁ মলয় আমি এসেছি , কিন্তু আমি দুঃখিত মলয় তোমাকে একটা দুঃসংবাদ শোনাতে হবে বলে।
মলয় - কেন, কীসের দুঃসংবাদ ?
কৃষ্ণা - জ্যাঠামশাই আর আমাদের মধ্যে নেই মলয়।
মলয় -বাপুজী , তুমিও আমাকে ছেড়ে চলে গেলে বাপুজী , আমি তোমার অধম পুত্র,মৃত্যুর সময় তোমার মুখে জলও দিতে পারিনি বাপুজী। ( কান্না )
কৃষ্ণা- দুঃখ করো না মলয় , কি লাভ দুঃখ করে ,শুধু শুধু নিজেকে কষ্ট দেওয়া ছাড় ? যার যখন সময় আসে তাকে তো
তখন যেতেই হয়। আকাশের নীল আস্তরণ ভেদ করে মাঝে মাঝে অনন্তের হাতছানি আসে। পরিচিত ও গতানুগতিক পথের বহুদুর পারের কোন পথহীন পথে সেই সুদুরের আহ্বান যার কাছে আছে তাকে যে যেতেই হয় মলয়।
মলয় - কৃষ্ণা
কৃষ্ণা- হ্যাঁ মলয় , বাবা মা সবার চিরদিন থাকে না।, এই আমাকেই দেখ না কত ছোটতেই বাপ মাকে হারিয়েছি।
মলয় - কিন্তু কৃষ্ণা আমার যে আর নিজের বলতে কেউ রইল না।
কৃষ্ণা- কেন, আমি তো রয়েছি তোমার পাশে।
মলয় - হ্যাঁ কৃষ্ণা তুমি রয়েছ , সেটাই আমার সান্ত্বনা সেটাই আমার প্রেরনা , সেটাই আমার জীবন পথের পাথেয় , সেটাই আমার সব কৃষ্ণা।
কৃষ্ণা- আজ আমি আসি কেমন , লক্ষীটি তুমি আমার গা ছুঁয়ে বলো দুঃখ করে নিজেকে কষ্ট দেবে না।
মলয় - কৃষ্ণা --
কৃষ্ণা - আজ আমি গেলাম, কাল আবার আসব কেমন।
( প্রস্থান )
মলয় - কৃষ্ণা চলে গেল ,একদিন সবাই চলে যাবে , কেউ রইবে না আর আমার কাছে। মাঝে মাঝে নিজেকে বড়ো ফাঁকা ফাঁকা লাগে, ইচ্ছা করে বাপুজী, মিলি যে শান্তির পথে যাত্রা করেছে সেই পথে যাত্রা করতে। কিন্তু ইচ্ছা করলেই তো আর জেল কর্তৃপক্ষ আমাকে যেতে দেবে না সেই শান্তির পথে।সহজ জীবনে চলার টিকিটটা আমি যে হারিয়ে ফেলেছি , সমাজে কে এমন আছে যে আমাকে হারিয়ে ফেলা সেই টিকিটটা খুজে দেবে ?
( চন্দন ও আয়ুবের প্রবেশ )
চন্দন - দুঃখ করিস না রে মলয়, জানি এ দুঃখ সহ্য করা যায় না,তবুও কি করবি বল , কোন উপায়ও তো নাই।
মলয় - চন্দনদা।
আয়ুব - দুঃখ কুরে কি লাভ বুল , লুসকানই আছে , দুঃখ কুরিস নে , আমরা তু রয়েছি , আমরা তুর পাশে থাকব রে।
মলয় - আয়ুবকাকা।
রামসিং - আইয়ে ( বলে মলয়কে নিয়ে প্রস্থান )
চন্দন - আয়ুব কাকা , মলয়ের জন্য উকিল ঠিক করতে হবে , অনেক টাকা দরকার , কৃষ্ণা অবশ্য দেবে বলেছে।
আয়ুব - টাকার লগে ভাবিস নি , টাকা ঠিক যুগাড় হয়ে যাবে , যাতে ছেলেটা বেঁচে যায় তাই কুর।
চন্দন - হ্যাঁ আর দেরি করা চলে না , কালই তো বিচার শুরু হবে।আজই উকিল ঠিক করতে হবে। যেমন করেই হোক বাঁচাতে হবে মলয়কে জ্যাঠামশাই যাবার সময় যে বলে গ্যাছেন, "মলয় রইল তোমরা দেখো "।
আয়ুব - হুঁ চুল, চুল তাই চুল।
( দুজনের একদিকে প্রস্থান অপরদিকে প্রণবের প্রবেশ )
প্রণব - মেয়েটাকে নিয়ে অনেক খেললে মলয় কিন্তু এবার ? আমি এত চেষ্টা করেও কৃষ্ণার মন জয় করতে পারিনি আর তুমি কিনা চাওয়ালার ছেলে হয়ে তুমি বিনা চেষ্টায় তা পেয়ে গিয়েছিলে। কিন্তু এবার , এবার কি হবে ?
( পালমশাই এর প্রবেশ )
পালবাবু - প্রণব তুই মলয়ের বিচারের তারিখ শুনেছিস ?
প্রণব - কই না বাবা,কবে থেকে শুরু হবে ?
পালবাবু- কেন,কাল থেকেই তো শুরু হবে।
প্রণব - সত্যি , তাহলে বিচারে যদি মলয়ের ফাঁসি হয়ে যায় তো বেশ হয় , কদিন বড় হবার খুব শখ হয়েছিল , উপরে গিয়ে শখটা মিটে যাবে।
পালমশাই- ঠিক বলেছিস , ছোঁড়াটার কদিন বেশ গরম বেঁধেছিল , আমাদের মুখের উপর কথা বলত , এবার শিক্ষা হয়ে যাবে বাছাধনের।
প্রণব - বাবা আমাদের উকিল ঠিক করেছ ?
পালমশাই - না রে ঠিক করা হয়নি।
প্রণব - সে কি এখনও ঠিক করা হয়নি , আর করবে কবে , কালই তো বিচার শুরু, চলো, চলো আজই ঠিক করে আসি।
পালমশাই- তাই চল।
( দুজনের প্রস্থান )
[ পর্দা নেমে আসে ]



No comments:
Post a Comment