অর্ঘ্য ঘোষ
( এই কলমে এমনই কিছু হারিয়ে যাওয়া মানুষের কথা ধারাবাহিক ভাবে তুলে ধরা হবে যারা নিতান্তই প্রান্তজীবি। বৃহত্তর সমাজে তাদের স্থান নেই বলেলেই চলে। তাদের জন্ম মৃত্যু এমনকি আসল নামও আজ সংগ্রহ করা কঠিন।তাদের পরিবারের লোকেরাও সে তথ্য ঠিকঠাক দিতে পারেন নি ।প্রচলিত নামেই তারা আজও এলাকার কারও কারও মনে ধুসর স্মৃতি হয়ে রয়েছেন। স্মৃতির চাদর সরালেই অবয়বটা স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। আমার ছোটবেলায় দেখা মনের মণিকোঠায় ঠাঁই করে নেওয়া ওইসব চরিত্রের সঙ্গে আপনিও মিল খুঁজে পেতে পারেন আপনার দেখা কোন মানুষের মধ্যে )
ষষ্ঠী ডোমের কথা
( ১১ )
ময়ূরেশ্বরের লোকপাড়া দলুইপাড়ার বাসিন্দা ষষ্ঠী ডোমের পোশাকী নাম ছিল ষষ্ঠীপদ দলুই । দুটি পায়েই প্রতিবন্ধকতা ছিল । লেংচে লেংচে হাঁটতেন । পেশায় ছিলেন লোকপাড়া হাইস্কুলের ঝাড়ুদার।সেই সুবাদে স্কুলের ছেলেমেয়েরা তাকে ষষ্ঠীদা বলে ডাকত। তার মা স্কুল সৃষ্টির শুরু থেকে নুন্যতম বেতনে ওই কাজ শুরু করেন। প্রত্যাশা ছিল একদিন সরকারি কর্মী হিসাবে স্বীকৃতি মিলবে। কিন্তু সে প্রত্যাশা তার পূরণ হয় নি।
একই প্রত্যাশায় মাসিক ৫০ টাকা বেতনে কাজ শুরু করেন তার প্রতিবন্ধী ছেলে ষষ্ঠীও। কিন্তু তারও প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বাড়তে বাড়তে তার সর্বোচ্চ বেতন দাঁড়ায় মাসিক ৪০০ টাকা। অথচ কি অমানসিক পরিশ্রম করতে হয়েছে তাকে। স্কুল খোলার আগে দেখতাম হাতে একগোছা চাবি আর ঝাঁটা নিয়ে যাচ্ছেন তিনি। ২০/২৫ টি ঘর খুলে ঝাঁট দিতে হত তাকে। আবার ছুটির পর দরজা বন্ধ করে তালা লাগাতে হত। একা পেরে উঠতেন না বলে সঙ্গে নিতেন বোবা স্ত্রী চিন্তাকেও।
তার বেতনের টাকার উপরেই নির্ভর ছিল দুই ছেলে আর এক মেয়ে সহ পাঁচ সদস্যের সংসার। কিন্তু নুন্যতম বেতনে সংসার চলত না।তাই ঝাড়ুদারের কাজের পাশাপাশি স্কুলের হোস্টেলে পরিচারিকার কাজ করতেন স্ত্রী চিন্তা। ফাইফরমাস খাটতে হত তাকেও। সবার খাওয়া মিটতে অনেক রাত হয়ে যেত। বাড়ির জানলা থেকে দেখতাম নিজের প্রাপ্য খাবারটুকু নিয়ে টিমটিমে হারিকেন নিয়ে বাড়ি ফিরছেন স্বামী -স্ত্রী।
বাড়িতে তখন বাবা-মায়ের খাবার নিয়ে ফেরার প্রতীক্ষায় বসে থাকত ছেলে-মেয়েরা। হোস্টেল থেকে আনা খাবার ভাগ করে খেত সবাই। একদিন সেই খাবার নিয়ে ফেরার পথেই পড়ে গিয়ে বিছানা নেন ষষ্ঠীদা। আর উঠেন নি। তার মৃত্যুর পর মায়ের সঙ্গে ওই কাজ শুরু করেন ছোট ছেলে সুশান্তও। বর্তমানে সুশান্ত লোকপাড়া কলেজে ঝাড়ুদারের কাজ করেন।কিন্তু তার মা আজও স্কুলে সেই ঝাড়ুদারের কাজ করে চলেছেন। দু'বেলা তাকে স্কুলে যেতে দেখি।তখন ষষ্ঠীদার কথা মনে পড়ে যায়।
------০------
গঙ্গা ঠাকুরের কথা
( ১২ )
ময়ূরেশ্বরের বেলেড়া গ্রামে বাড়ি ছিল গঙ্গা ঠাকুরের। তার পোশাকি নাম ছিল গঙ্গাধর চট্টোপাধ্যায় । লোকপাড়া হাইস্কুলের কাছে ছিল তার চা-বিস্কুটের ছোট্ট দোকান। সেই সুবাদেই স্কুলের ছেলেমেয়ে , শিক্ষকরা তাকে গঙ্গাদা বলে ডাকতেন।প্রথম প্রথম আমি অবশ্য জ্যেঠু বলতাম। পরে বন্ধুদের দেখাদেখি গঙ্গাদা বলা শুরু করি। উনি বার কয়েক সংশোধনের বৃথা চেষ্টা করেছেন। অন্যদের কাছে তিনি গঙ্গা ঠাকুর হিসাবে পরিচিত ছিলেন।
ছোট্ট ওই দোকানের উপরে নির্ভর করেই চলত তার ৪ সদস্যের সংসার। সেই জন্য সবসময় তার সর্বাঙ্গে লেগে থাকত যেন দৈন্যতার ছাপ।চা ছাঁকার ফাঁকে ফাঁকে গীতার শ্লোক আউড়াতেন। মনে হত যেন মন ভুলিয়ে রাখার জন্যই শ্লোক আউড়ান।
তার ছেলে অপূর্ব ছিল আমার সহপাঠী । গঙ্গাদা ছিলেন আমার বাবার বন্ধু স্থানীয়।আমি যখন প্রাইমারি স্কুলে পড়ি তখন নাকি গঙ্গাদার বাড়িতে মতবিরোধ দেখা দেয়।সেই সময় আমার বাবা তাকে আমাদের বাড়িতে দীর্ঘদিন আশ্রয় দিয়েছিলেন। তখন আমি তাকে জ্যেঠুই বলতাম।সেই কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েই উনি বলতেন --- বাবা, আমি তোমার জ্যেঠু হই। আজ গঙ্গাদা নেই।কিন্তু তার স্মৃতি আজও এলাকার মানুষের মনে রয়ে গিয়েছে।



No comments:
Post a Comment