অর্ঘ্য ঘোষ
( এই কলমে এমনই কিছু হারিয়ে যাওয়া মানুষের কথা ধারাবাহিক ভাবে তুলে ধরা হবে যারা নিতান্তই প্রান্তজীবি। বৃহত্তর সমাজে তাদের স্থান নেই বলেলেই চলে। তাদের জন্ম মৃত্যু এমনকি আসল নামও আজ সংগ্রহ করা কঠিন।তাদের পরিবারের লোকেরাও সে তথ্য ঠিকঠাক দিতে পারেন নি ।প্রচলিত নামেই তারা আজও এলাকার কারও কারও মনে ধুসর স্মৃতি হয়ে রয়েছেন। স্মৃতির চাদর সরালেই অবয়বটা স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। আমার ছোটবেলায় দেখা মনের মণিকোঠায় ঠাঁই করে নেওয়া ওইসব চরিত্রের সঙ্গে আপনিও মিল খুঁজে পেতে পারেন আপনার দেখা কোন মানুষের মধ্যে )
( ২০০৩ সালে আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ , তখন জগা'দা জীবিত )
ক্ষীরুদা ছিলেন আমাদের লোকপাড়া প্রতিবাদ ক্লাব পরিচালিত সবুজকলি বিদ্যাপীঠের গাড়ির চালক। আসল নাম ছিল ক্ষীরময় মন্ডল। আমরা বলতাম ক্ষীরুদা। ময়ূরেশ্বরেরই গিধিলা গ্রামে ছিল তার বাড়ি। চূড়ান্ত অভাবের সংসার। মূলত গাড়ি চালানোর আয়েই চলত সেই সংসার। স্কুল চালুর সময় থেকেই স্কুলের গাড়ি চালিয়েছেন।মতানৈক্যের কারণে বার কয়েক ছেড়েও গিয়েছেন , আবারও ফিরেও এসেছেন।
গাড়ি চালানোর ব্যাপারে ছিলেন প্রচণ্ড নিয়মনিষ্ঠ।কি শীত-কি বর্ষা নিধারিত সময়ে স্কুলে হাজির হয়েছেন , পরম যত্নে ছেলে-মেয়েদের স্কুলে এনেছেন। ছেলে-মেয়েরা তাকে দাদু বলত। নিজের গাড়িটাকেও তকতকে করে রাখতেন। তখন ওই ক্লাব তথা স্কুল পরিচালনায় যুক্ত থাকার সুবাদে ভুলত্রূটির কারণে অনেক সময় বকাবকি করেছি। ক্ষীরুদা চুপ করে শুনেছেন। পরে খুব মন খারাপ হয়েছে। তখন মোড়ের দোকান থেকে চা আনিয়ে খাইয়ে ছোটবেলার মতো ভাব করে নিয়েছি। ক্ষীরুদা সব ভুলে গিয়েছেন। আমারও মন থেকে আত্মগ্লানির ভার নেমে গিয়েছে। প্রচণ্ড শ্বাসকষ্টে ভুগতেন , আবার প্রচুর বিড়িও খেতেন। বকাবকি করলেও কানে তুলতেন না।
বছর তিনেক আগের শেষের সেই দিনটা আজও মনে পড়ে। সেদিনও স্কুলে এসেছিলেন তিনি।কেমন যেন মনমরা দেখাচ্ছিল তাকে ।জিজ্ঞেস করেছিলাম , কি ক্ষীরুদা শরীর খারাপ নাকি ? তাহলে ছুটি নাও। বলেছিলেন , অন্য ড্রাইভার না পেলে কি করে ছুটি নেব , স্কুল মার খাবে না ? তারপর আমি ক্লাব থেকে চলে এসেছিলাম। তার কিছুক্ষণ পরেই ক্ষীরুদার ফোন -- আপনার বৌমা'রা সব থাকল দেখেন। ভেবেছিলাম ক্ষীরুদা হয়তো অসুস্থতার কারণে হাসপাতালে ভর্তি হবেন , তাই বাড়ির লোকের যাতে কোন অসুবিধা না হয় তার জন্যই দেখতে বলেছেন। কি করে বুঝব , যে মানুষটা একটু আগেই গ্রামে গ্রামে গাড়ি নিয়ে গিয়ে ছেলেমেয়েদের নিয়ে এসেছেন তিনি ওই রকম একটা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে থাকবেন ?
তাই বলেছিলাম , হ্যা হ্যা যাও , ঘুরে এসো । চিন্তা কোর না। কিছু দরকার লাগে তো বলো ? কিন্তু ততক্ষণে ফোন কেটে যায়। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার ভুল ভাঙে।ক্ষীরুদার বাড়ি থেকে ফোন আসে , পারিবারিক অশান্তির কারণে ক্ষীরুদা স্কুল থেকে ফেরার পথে চালে পোকা মারার বিষ খেয়েছেন।সঙ্গে সঙ্গে ক্লাব থেকে হাসপাতালে পাঠানোর জন্য লোকজন সহ গাড়ি পাঠানো হয়। ছুটে যায় আমরাও।ততক্ষণে খিঁচতে শুরু করেছেন ক্ষীরুদা। সেদিনই সব চেষ্টা ব্যর্থ করে কান্দী হাসপাতালে মৃত্যু হয় তার।
ক্ষীরুদার স্ত্রী এখন ওই স্কুলের কর্মী। আজ ক্ষীরুদা নেই , কিন্তু তিনি যে গাড়িটা চালাতেন সেই গাড়িটা , আর গাড়ির দৈনন্দিন হিসাব লেখা তার নোটবইটি আছে। সেগুলি দেখলেই মনে হয় যেন ক্ষীরুদার স্পর্শ লেগে আছে। মনে হয় গাড়ির স্টিয়ারিং- এ বসে ক্ষীরুদা যেন বলছেন , গাড়িটা বাঁদিকে টানছে গো , মিস্ত্রি দেখাতে হবে।
জগা'দার কথা
( ৯ )
ছোটখাটো চেহারার মানুষটির নাম ছিল জগন্নাথ হাজরা। লোকে বলতেন জগা হাড়ি । আমরা জগাদা বলে ডাকতাম। ময়ূরেশ্বরের লোকপাড়া দলুইপাড়ার বাসিন্দা জগাদার ছিল অভাবের সংসার।দিনমজুরী করেই জোড়াতালি দুই ছেলে আর স্ত্রী'কে নিয়ে চলত তার চার সদস্যের সংসার। কিন্তু অভাবের কোন ছাপ ছিল না তার চোখে মুখে। বরং খুব আনন্দ প্রিয় ছিলেন। বোলান আর কালকে পাতার গানের দলে নাচতেন। শিবের গাজন শেষে সঙও সাজতেন। তারজন্য মাথায় বড়ো বড়ো চুল রাখতেন।
ছোটখাটো চেহারার মানুষ হলে কি হবে ? মনটা কিন্তু ছিল বিশাল। আজকের বাবা-মায়ের দায় এড়ানো সমাজের কাছে জগাদা দৃষ্টান্ত হতে পারেন। নিজের সংসারেই নুন আনতে পান্তা ফুরানোর হাল। কিন্তু স্বেচ্ছায় তিনি নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন সহায় সম্বলহীন এক ব্রাহ্মণ বিধবার দায়। আমৃত্যু সেই বিধবাকে মাতৃজ্ঞানে সেবা করেছেন তিনি এবং তার স্ত্রী শ্রীমতি।
শুধু তাই নয় , মৃত্যুর পর ওই ব্রাহ্মণ বিধবার মুখাগ্ণি , অশৌচ পালণ থেকে শুরু করে পারলৌকিক কাজও করেছেন তথাকথিত ' জলঅচল ' অছুৎ হাড়ি দম্পতি। কিন্তু কোন সময় তাকে বিরক্ত হতে দেখি নি। বরং এক নির্ভেজাল হাসি সবসময় মুখে লেগে থাকত তার। কতবার বলেছি, জগাদা তোমার নিজেরই এত অভাব , তাও তুমি কি করে সামলাচ্ছ সবদিক ? হাসি মুখে বলেছেন , তোমরা তো আছো। তোমদের ভরসাতেই তো দায়িত্বটা নিতে পেরেছি।মানুষের প্রতি কতটা ভরসা থাকলে এমনটা বলা যায় ? আজ জগাদা নেই , কিন্তু তার সেই হাসি মাখা মুখটা রয়ে গিয়েছে মনের মণিকোঠায়।
( ২০০৩ সালে আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ , তখন জগা'দা জীবিত )
-----০-----
ক্ষীরু'দার কথা
( ১০ )
ক্ষীরুদা ছিলেন আমাদের লোকপাড়া প্রতিবাদ ক্লাব পরিচালিত সবুজকলি বিদ্যাপীঠের গাড়ির চালক। আসল নাম ছিল ক্ষীরময় মন্ডল। আমরা বলতাম ক্ষীরুদা। ময়ূরেশ্বরেরই গিধিলা গ্রামে ছিল তার বাড়ি। চূড়ান্ত অভাবের সংসার। মূলত গাড়ি চালানোর আয়েই চলত সেই সংসার। স্কুল চালুর সময় থেকেই স্কুলের গাড়ি চালিয়েছেন।মতানৈক্যের কারণে বার কয়েক ছেড়েও গিয়েছেন , আবারও ফিরেও এসেছেন।
গাড়ি চালানোর ব্যাপারে ছিলেন প্রচণ্ড নিয়মনিষ্ঠ।কি শীত-কি বর্ষা নিধারিত সময়ে স্কুলে হাজির হয়েছেন , পরম যত্নে ছেলে-মেয়েদের স্কুলে এনেছেন। ছেলে-মেয়েরা তাকে দাদু বলত। নিজের গাড়িটাকেও তকতকে করে রাখতেন। তখন ওই ক্লাব তথা স্কুল পরিচালনায় যুক্ত থাকার সুবাদে ভুলত্রূটির কারণে অনেক সময় বকাবকি করেছি। ক্ষীরুদা চুপ করে শুনেছেন। পরে খুব মন খারাপ হয়েছে। তখন মোড়ের দোকান থেকে চা আনিয়ে খাইয়ে ছোটবেলার মতো ভাব করে নিয়েছি। ক্ষীরুদা সব ভুলে গিয়েছেন। আমারও মন থেকে আত্মগ্লানির ভার নেমে গিয়েছে। প্রচণ্ড শ্বাসকষ্টে ভুগতেন , আবার প্রচুর বিড়িও খেতেন। বকাবকি করলেও কানে তুলতেন না।
বছর তিনেক আগের শেষের সেই দিনটা আজও মনে পড়ে। সেদিনও স্কুলে এসেছিলেন তিনি।কেমন যেন মনমরা দেখাচ্ছিল তাকে ।জিজ্ঞেস করেছিলাম , কি ক্ষীরুদা শরীর খারাপ নাকি ? তাহলে ছুটি নাও। বলেছিলেন , অন্য ড্রাইভার না পেলে কি করে ছুটি নেব , স্কুল মার খাবে না ? তারপর আমি ক্লাব থেকে চলে এসেছিলাম। তার কিছুক্ষণ পরেই ক্ষীরুদার ফোন -- আপনার বৌমা'রা সব থাকল দেখেন। ভেবেছিলাম ক্ষীরুদা হয়তো অসুস্থতার কারণে হাসপাতালে ভর্তি হবেন , তাই বাড়ির লোকের যাতে কোন অসুবিধা না হয় তার জন্যই দেখতে বলেছেন। কি করে বুঝব , যে মানুষটা একটু আগেই গ্রামে গ্রামে গাড়ি নিয়ে গিয়ে ছেলেমেয়েদের নিয়ে এসেছেন তিনি ওই রকম একটা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে থাকবেন ?
তাই বলেছিলাম , হ্যা হ্যা যাও , ঘুরে এসো । চিন্তা কোর না। কিছু দরকার লাগে তো বলো ? কিন্তু ততক্ষণে ফোন কেটে যায়। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার ভুল ভাঙে।ক্ষীরুদার বাড়ি থেকে ফোন আসে , পারিবারিক অশান্তির কারণে ক্ষীরুদা স্কুল থেকে ফেরার পথে চালে পোকা মারার বিষ খেয়েছেন।সঙ্গে সঙ্গে ক্লাব থেকে হাসপাতালে পাঠানোর জন্য লোকজন সহ গাড়ি পাঠানো হয়। ছুটে যায় আমরাও।ততক্ষণে খিঁচতে শুরু করেছেন ক্ষীরুদা। সেদিনই সব চেষ্টা ব্যর্থ করে কান্দী হাসপাতালে মৃত্যু হয় তার।
ক্ষীরুদার স্ত্রী এখন ওই স্কুলের কর্মী। আজ ক্ষীরুদা নেই , কিন্তু তিনি যে গাড়িটা চালাতেন সেই গাড়িটা , আর গাড়ির দৈনন্দিন হিসাব লেখা তার নোটবইটি আছে। সেগুলি দেখলেই মনে হয় যেন ক্ষীরুদার স্পর্শ লেগে আছে। মনে হয় গাড়ির স্টিয়ারিং- এ বসে ক্ষীরুদা যেন বলছেন , গাড়িটা বাঁদিকে টানছে গো , মিস্ত্রি দেখাতে হবে।



No comments:
Post a Comment