সীতারামের কথা
অর্ঘ্য ঘোষ
লোকমুখে একটা কথা প্রচলিত আছে - ' যতদিন গতর ততদিন কদর''।কথাটা যে কতদুর মর্মান্তিক
সত্যি তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন সীতারাম হাজরা । যেদিন সক্ষম ছিলেন সেদিন দলকে
ক্ষমতায় আনার জন্য জান-প্রাণ লড়িয়ে দিয়েছেন । আজ দল নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারি
হয়েছে ।কিন্তু অক্ষম হয়ে পড়েছেন সীতারাম নিজে। অথচ শাসক দলের কাছে বার বার দরবার
করেও তার সামান্য একটা প্রতিবন্ধী ভাতাও জোটে নি ।
এরফলে পরানুগ্রহে অর্ধাহারে -অনাহারে দিন কাটছে তার । দলের নেতাদের তা দেখার অবসরও
নেই বলে তার অভিযোগ ।
শুধু দলের নেতাদের কাছেই নয় , প্রশাসনের সকল স্তরে আবেদন করেও ভাতা মেলে নি তার। ফলে চরম সংকটে পড়েছেন ওই
প্রতিবন্ধী যুবক । কার্যত সপরিবারে অর্ধাহারে দিন কাটছে তাদের। অর্থাভাবে শিকেয়
উঠেছে ছেলে-মেয়ের পঠনপাঠনও ।অথচ না দল , না প্রশাসন কারও কোনও হেলদোল নেই বলে অভিযোগ।
বছর নয়েক
আগে বাস থেকে পড়ে গিয়ে শিরদাঁড়া ভেঙে যায় ময়ূরেশ্বরের লোকপাড়া গ্রামের সীতারাম
হাজরার । চিকিৎসা করাতে গিয়ে ঘটিবাটিটুকু পর্যন্ত বিকিয়ে যায় । কিন্তু হাঁটাচলা
দুরের কথা সোঁজা হয়ে দাঁড়াতে পর্যন্ত পারেন না তিনি ।তিনচাকার সাইকেলে বাড়ির
লোকেরা ধরাধরি করে চাপিয়ে দেন । কিন্তু সেই সাইকেলেও বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারেন না । অসহ্য
ব্যাথায় শরীর কার্যত অবশ হয়ে যায় । তবু দাঁতে দাঁত চেপে সমস্ত যন্ত্রণা হজম করে
সেই সাইকেল ঠেলেই তাকে বেরোতে হয়।সাহার্য্যের আর্জি নিয়ে । কখনও যান দলের নেতাদের কাছে কখনও যান স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে । প্রথম প্রথম
কিছুটা সহানুভূতি মিললেও এখন অধিকাংশই তাকে দেখলেই ব্যাজার মুখ করেন।তবুও উপেক্ষা
করে তাকে যেতে হয় ।
কারণ বিপর্যস্থ হয়ে পড়েছে তার পরিবার । একসময় দিনমজুরির আয়েই
চলত দুই ছেলেমেয়ের পড়াশোনা সহ তাদের চার সদস্যের সংসার। তাই চরম সংকটে পড়েছে
দারিদ্রসীমার নিচে বসবাসকারী পরিবারটি। একচিলতে চালাঘরে বাস করেন তারা ।অর্থাভাবে সেই চালা ছাওনোরও সামর্থ্য নেই । চালের ফুটো বেয়ে জল পড়ে। তা উপেক্ষা করেই বছরের পর বছর ছেলে-মেয়েদের নিয়ে পশুর মতো সেই চালাঘরেই থাকতে হয় তাদের। ওই প্রতিবন্ধী যুবকের মেয়ে দেবশ্রী এবারে
লোকপাড়া হাইস্কুল থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে। নবম শ্রেণীতে পড়ে ছেলে সুব্রত
। কিন্তু অর্থাভাবে তাদের পঠনপাঠন শিকেয় উঠতে বসেছে।কারণ পরের যৎসামান্য
সাহার্য্যের উপর নির্ভর করে অর্থাহারে দিন কাটে তাদের।
তাই দুবেলা
দুমুঠো ভাতের যোগাড় এবং পড়াশোনা চালানোর জন্য একটি বিচিত্রা অনুষ্ঠানের দলে নাম
লেখাতে হয়েছে দেবশ্রীকে । ভাইকে নিয়ে দুর-দুরান্তে সেই দলের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে
যেতে হয় তাকে। ফলে দুজনেরই পড়াশোনার ক্ষতি হয় । দেবশ্রী জানায় , অনেক সময় পরীক্ষার আগের দিনও ভাইকে নিয়ে আমাকে অনুষ্ঠান করতে যেতে হয়েছে ।
না হলে শুধু পড়াশোনাই নয় , আমাদের ভাতের হাঁড়িও চড়বে না । যুবকের স্ত্রী সবিতা হাজরা জানিয়েছেন , বহু রাতে কাল কি করে হাঁড়ি চড়বে সেই দুশ্চিন্তায় আমরা রাতে ঘুমোতে পর্যন্ত পারি না।
অথচ বছর দুয়েক আগে আবেদন করা স্বত্ত্বেও বর্তমান শাসক দলের কর্মী হিসাবে পরিচিত ৮৫ শতাংশ
প্রতিবন্ধী ওই যুবকের আজও কোন প্রতিবন্ধী ভাতা জোটে নি। নিয়মানুযায়ী , ১৮
বছর বয়স্ক কোন প্রতিবন্ধী সমাজকল্যাণ দফতরের মাধ্যমে মাসিক ৭৫০ টাকা হারে ভাতা
পেতে পারেন । তবে ওই ভাতা নিদিষ্ট সংখ্যক কোটায় দেওয়া হয় । মৃত্যু বা অন্যকোন কারণ
বরাদ্দ কোটা ফাঁকা হলে সেই স্থলে অন্য কেউ ভাতা পেতে পারেন ।
অন্যদিকে জাতীয়
প্রতিবন্ধী ভাতা প্রকল্পে দারিদ্র সীমার নীচে বসবাসকারী নুন্যতম ১৮ বছর বয়স এবং
৮০ শতাংশ প্রতিবন্ধকতা থাকলেই ভাতা মেলে । এক্ষেত্রে কোন কোটা পদ্ধতি নেই । কিন্তু
কোন ক্ষেত্রেই ওই প্রতিবন্ধী যুবকের ভাতা জোটে নি । তিনি জানান , খোদ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতির হাতে বছর দুয়েক আগে প্রয়োজনীয়
শংসাপত্র সহ আবেদন পত্র জমা দিয়েছিলাম। তারপর প্রশাসনের পাশাপাশি দলের নেতাদেরও
বার বার বলেছি । কিন্তু কোন লাভ হয় নি ।

No comments:
Post a Comment