মনের মণিকোঠায় - ২
অর্ঘ্য ঘোষ
( এই কলমে এমনই কিছু হারিয়ে যাওয়া মানুষের কথা ধারাবাহিক ভাবে তুলে ধরা হবে যারা নিতান্তই প্রান্তজীবি। বৃহত্তর সমাজে তাদের স্থান নেই বলেলেই চলে। তাদের জন্ম মৃত্যু এমনকি আসল নামও আজ সংগ্রহ করা কঠিন।তাদের পরিবারের লোকেরাও সে তথ্য ঠিকঠাক দিতে পারেন নি ।প্রচলিত নামেই তারা আজও এলাকার কারও কারও মনে ধুসর স্মৃতি হয়ে রয়েছেন। স্মৃতির চাদর সরালেই অবয়বটা স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। আমার ছোটবেলায় দেখা মনের মণিকোঠায় ঠাঁই করে নেওয়া ওইসব চরিত্রের সঙ্গে আপনিও মিল খুঁজে পেতে পারেন আপনার দেখা কোন মানুষের মধ্যে )
ভুপো ডোমের কথা
( ৩ )
তার আসল নাম ছিল ভূপতি দলুই । লোকে বলতেন , ভুপো ডোম । কেউ কেউ বলতেন ভুপো খোঁড়া । আসলে চলতেন লেংচে লেংচে। ভিক্ষা করে দিন চলত তার। বীরভূমের ময়ূরেশ্বরের লোকপাড়া দলুইপাড়াতে ছিল তার বাড়ি। ১৯৮৫ সালের বন্যার সময় খুব কাছে থেকে তাকে দেখার সুযোগ হয়েছিল আমার। সেই সময় পাড়ার লোকেদের সঙ্গে অন্ধ বৃদ্ধা মা'কে নিয়ে তিনিও আমাদের বাড়ি লাগোয়া প্রাইমারি স্কুলে এসে উঠেছিলেন। তারপর বন্যার জল সরে গেলে একদিন সবাই ঘরবাড়ি মেরামত করে পাড়ায় ফিরে যান। কিন্তু ভুপো দলুইয়ের সেই সামর্থ্য ছিল না। তাই দীর্ঘদিন থেকে গিয়েছিলেন স্কুলেই। আমাদের বাড়ির দোতলার জানলা দিয়ে দেখতাম মা-ছেলের জীবন-যাপন।
মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানো আজকের সুসভ্য সমাজের কাছে দৃষ্টান্ত হতে পারে মা ছেলের সেই জীবন-যাপন। ততদিনে স্কুল খুলে গিয়েছে। তাই খুব ভোর ভোর উঠে ভুপোকে উনুন জ্বালাতে হত। তারই মাঝে মাকে প্রাতকৃত করিয়ে এনে স্কুলের অব্যহৃত ইন্দারার বাঁধানো চাতালে বসিয়ে দিতেন। তারপর গ্লাসে করে এনে দিতেন লাল চা আর থালায় শুকনো মুড়ি। রান্নার ফাঁকে ফাঁকে নিজেও সেই থালা থেকে দু- এক মুঠো মুড়ি মুখে ফেলতেন। রান্না হলে মা-ছেলে মুখোমুখি বসে খাওয়া সেরে নিতেন।তারপর চট পেড়ে মায়ের শোয়ার জায়গা করে , মাথার কাছে খাওয়ার জল রেখে বেরিয়ে পড়তেন ভিক্ষা করতে।
ভিক্ষা করে ফিরতেন সেই সন্ধ্যের আগে।আবার মাকে চা-মুড়ি দিয়ে রান্না বসাতেন। তার দুই সক্ষম দাদা ছিল। তারা অন্ধ মায়ের দায় নেয় নি। কিন্তু সেই দায় অস্বীকার করতে পারেন নি প্রতিবন্ধী ভুপো। মাঝে মধ্যে মা- ছেলেতে তুমুল ঝগড়া-ঝাঁটিও হয়েছে। দু'জনেই পরস্পরকে শাপ-শাপান্ত করেছেন। আবার সন্ধ্যেবেলায় অভিমান ভাঙ্গাতে ভাতের গ্রাস মায়ের মুখের সামনে ধরে নাটকীয় ভঙ্গীতে বলতে শুনেছি --- লাও মা ভগবতী , উচ্ছুগ্য করে দাও। বলাবাহুল্য দোতলার জানলা থেকে ভুপোর ওই সংলাপ শুনে আমরা তো বটিই , ছেলের বলার ধরণ দেখে অভিমান ভুলে হেসে ফেলেছেন মা'ও। আজ ভুপো নেই , নেই তার মা'ও। কিন্তু কানে যেন লেগে আছে ভুপোর সেই নাটকীয় সংলাপ। চোখের সামনে যেন ভেসে ওঠে অপত্য স্নেহে আপ্লুত চোখের কোল ভেজানো তার মায়ের সেই হাসিমুখ।
-----০----
রব্বান চাচার কথা
( ৪ )
তিনি মাঝে মাঝে সংশোধন করে দিতেন। বলতেন , চাচা নয় , আমি তোমাদের নানা হই। আমরা অবশ্য ততদিনে চাচা বলতেই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। নানাতে ফিরতে কেমন যেন বাধো বাধো ঠেকত। তাই বাবা-কাকাদের মতো উনি আমাদের কাছে চাচা হয়েই থেকে যান। চাচা আমাদের বাড়িতেই খাওয়া দাওয়া করতেন।
তার থালা-বাটি-গ্লাস ছিল , কিন্তু নবান্ন , পুজো সহ নানা অনুষ্ঠানে কলাপাতাতে খেতেন। কিন্তু পাতাটাকে উল্টো করে অর্থাৎ শির দিকটা উপরে রেখে খেতেন। কতবার সোঁজা করে দিতে গিয়েছি , কিন্তু ফের তিনি উল্টো করে নিয়েছেন। কতবার কারণ জিজ্ঞেস করেছি। খোলসা করে কিছু বলেন নি। শুধু বলেতেন , আমাদের এরকম করে খাওয়াটাই নিয়ম।
হাঁসের মাংস খেতে খুব ভালোবাসতেন। পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে কিনে নিয়ে আসতেন হাঁস। হাঁসকে বলতেন হেঁস। আমরা বার বার তা শোনার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই প্রশ্ন করতাম।আর উনি বলতেন , জারের ( শীত) সময় হেঁসের মাংসের সদই ( স্বাদ) আলাদা। আজ চাচা নেই। কিন্তু তার কথা আজও ভুলি নি।


No comments:
Post a Comment