মুকুলীয় জুজু
( নিজের ঘরের সামনে মাধুরী )
অর্ঘ্য ঘোষ
তৃণমূল ছেড়ে বি, জে, পি'তে যোগ দিয়ে প্রাক্তন রেলমন্ত্রী মুকুল রায় গেরুয়া শিবিরের কপাল খুলে দিতে পারবেন কিনা তা সময় বলবে। কিন্তু আপাতত তিনি মাধুরী হেমব্রমের কপাল খুলে দিয়েছেন তা বলাই বাহুল্য। প্রশাসন এবং শাসকদলের ভাবগতিক দেখে প্রাথমিক ভাবে সেটাই মনে হয়। বীরভূমের মহম্মদবাজার থানার আঙ্গারগড়িয়ার আদিবাসী তরুণী মাধুরী হেমব্রম দীর্ঘদিন আগে বাবাকে হারিয়েছেন। বাবাই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম। তাই তার মৃত্যুর পর মা আর মাধুরীকে দিনমজুরী সহ নানা ছোটখাটো কাজ করে পেটের ভাতের যোগাড়ের পাশাপাশি লেখাপড়া চালাতে হয়েছে।
একচিলতে চালাঘরে বাস মা--মেয়ের। অর্থাভাবে সেই চালাঘর ছাওনোর খড় পর্যন্ত জোটেনি। তার উপরে বিনা চিকিৎসায় শয্যাশায়ী হয়ে পড়ে রয়েছেন মা'ও। সমস্ত প্রতিকূলতার সংগে লড়াই করেই মাধুরী সিউড়ি বিদ্যাসাগর কলেজ থেকে বাংলায় অনার্স নিয়ে বি,এ পাশ করে। স্বপ্ন তার শিক্ষিকা হওয়ার। তাই কন্যাশ্রী প্রকল্পে পাওয়া ২৫ হাজার টাকা নিয়ে তিনি ভর্তি হন স্থানীয় একটি বেসরকারি শিক্ষক শিক্ষণ কলেজে। কিন্তু পরবর্তী সেমিস্টারের টাকা দিতে না পারায় অনিশ্চিত হয়ে পড়ে তার প্রশিক্ষণ।
সোশ্যাল মিডিয়ায় সেই খবর প্রচারিত হওয়ার পর বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা , শুভানুধ্যায়ী ব্যক্তি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। সাঁইথিয়ার একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার হাত দিয়ে সদ্য ভারতীয় জনতা পার্টিতে যোগ দেওয়া প্রাক্তন রেলমন্ত্রী তথা তৃণমূলের প্রাক্তন সর্ব ভারতীয় সম্পাদক মুকুল রায়ও ১০ হাজার টাকা পাঠিয়ে দেন। সংবাদ মাধ্যমে সেই খবর প্রকাশিত হওয়ার পর জেলা জুড়ে হইচই পড়ে যায়। জেলাশাসক মাধুরীর উচ্চশিক্ষার সমস্ত দায়িত্ব প্রশাসন বহন করবে বলে ঘোষণা করেছেন।
শাসক দলের জেলা সভাপতি মাধুরীকে দত্তক নেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন। আমাদের কাছে এ বড়ো সুখের কথা। কিন্তু প্রশাসন এবং শাসক দলের কাছে আদৌ স্বস্তির কথা কি ? কারণ এই ঘটনাই প্রশাসন এবং শাসকদলের সদিচ্ছা নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। প্রশ্ন হলো , আদিবাসী তথা উপজাতিদের কল্যাণে তো নানা প্রকল্প চালু আছে। তাহলে মাধুরীরা এতদিন সেই কল্যাণ প্রকল্পের আওতার বাইরে থেকে গেল কি করে ? কেন তাদের আজও ফুটো চালের চালাঘরে বাস করতে হয় ? কেনই বা মাধুরীকে লেখাপড়ার জন্য মজুর খাটতে হয় ?
পঞ্চায়েত সদস্য, শিক্ষাবন্ধু, ধারাবাহিক শিক্ষাক্রমের কর্মী , পঞ্চায়েত প্রধান , বি,ডি,ও'রা কি তাহলে এতদিন ঘুমোচ্ছিলেন ? সময় মতো তারা একটু সজাগ হলে তো আজ ল্যাজে গোবরে হয়ে এভাবে " ড্যামেজ কন্ট্রোলে" নামতে হত না প্রশাসন এবং শাসকদলকে। কেন সোস্যাল মিডিয়া এবং সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ্যে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলো ? যদি ওইসব মাধ্যমেরও নজর এড়িয়ে যেত ? সব মাধুরীর লড়াই তো সোস্যাল মিডিয়া কিম্বা সংবাদ মাধ্যমের গোচরে আসে না। লোকচক্ষুর অন্তরালে এরকম কত মাধুরীর কথা চাপা পড়ে আছে তার খবর রাখার দায় কার ?
শাসকদলের নেটওয়ার্ক এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়েও বিস্তর প্রশ্ন উঠেছে। পান থেকে চুন খসার খবরও যাদের কাছে এক মুহুর্তে পৌঁচ্ছে যায় , এলাকার কর্মীদের মাধ্যমে কেন মাধুরীর লড়াইয়ের খবর দলের সেই সদর দফতরে পৌঁছোল না ? রাজনৈতিক সদিচ্ছাও নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ মাস খানেক আগেই শাসকদলের জেলা সভাপতির জন্মভূমি নানুরের হাটসেরান্দি গ্রামেই পুজা টুডু নামে আরও এক আদিবাসী তরুণী দিনমজুরী করে উচ্চমাধ্যমিক পাশের পর খুজুটিপাড়া চণ্ডীদাস স্মৃতি মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি হন। অর্থাভাবে তারও পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম দেখা দেয়।
তার ক্ষেত্রেও কয়েকটি সেচ্ছাসেবী সংস্থা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। সংবাদ মাধ্যমে সে খবরও প্রকাশিত হয়। কিন্তু তাকে কেউ দত্তক নিতে এগিয়ে আসেন নি। শোনা যায় নি তার উচ্চ শিক্ষার দায়িত্ব নেওয়ার প্রশাসনিক ঘোষণাও। দুটি ক্ষেত্রেই পারিপার্শ্বিক, আর্থিক স্থিতি প্রায় এক। কিন্তু পূজার কাছে মুকুল রায়ের সাহার্য্য এসে পৌঁছোয় নি। তাই সংবাদ মাধ্যমের হাজারো সংবাদের ভীড়ে হারিয়ে যায় তার লড়াইয়ের কথা।
আসলে মুকুল রায়ের জুজু এখন তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে প্রশাসন তথা শাসক দলকে। এ প্রসংগে ২০০৩ সালের একটা ঘটনার কথা খুব মনে পড়ছে। সেবারে পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে খবর কভার করতে গিয়েছিলাম মুর্শিদাবাদের বড়ঞা থানার রানানগর গ্রামে। গ্রামটিতে তখন রাস্তার অবস্থা চরম বেহাল। নেই বিদ্যুৎও।গ্রামবাসীরা প্রশাসনের সকল স্তরে রাস্তা এবং বিদ্যুতের দাবি জানাতে জানাতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু পঞ্চায়েত নির্বাচনের মুখে হঠাৎ করে তারা দেখেন গ্রামের রাস্তায় মোড়াম ফেলার ব্যবস্থা করেছেন সাংসদ অধীর চৌধুরী। অস্বস্তিতে পড়ে রাতারাতি গ্রামে বিদ্যুতের খুটি পৌঁছে দেয় তদানীন্তন শাসকদল বামফ্রন্ট। গ্রামের মানুষ সে সময় বলেছিলেন , এমন উন্নয়ণের ভোট বছর বছর আসুক।
আসুন , আমরাও বলি, রাজনৈতিক উতোর চাপান চুলোয় যাক। এমনই দু'একটা মুকুলীয় জুজু তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াক প্রশাসন এবং শাসক দলকে। তার জেরে যদি দু'চার জন মাধুরীর কপাল খোলে , তাই বা কম কিসের ?

No comments:
Post a Comment