Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

মনের মণিকোঠায় -- ৯ ( হারু বাগদি ও শ্যামপদ)



মনের মণিকোঠায়                  



                                                      
                        

                                   অর্ঘ্য ঘোষ


( এই কলমে এমনই কিছু হারিয়ে যাওয়া মানুষের কথা ধারাবাহিক ভাবে তুলে ধরা হবে যারা নিতান্তই প্রান্তজীবি। বৃহত্তর সমাজে তাদের স্থান নেই বলেলেই চলে। তাদের জন্ম মৃত্যু এমনকি আসল নামও আজ সংগ্রহ করা কঠিন।তাদের পরিবারের লোকেরাও সে তথ্য ঠিকঠাক দিতে পারেন নি।প্রচলিত নামেই তারা আজও এলাকার কারও কারও মনে ধুসর স্মৃতি হয়ে রয়েছেন। স্মৃতির চাদর সরালেই অবয়বটা স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। আমার ছোটবেলায় দেখা মনের মণিকোঠায় ঠাঁই করে নেওয়া ওইসব চরিত্রের সঙ্গে আপনিও মিল খুঁজে পেতে পারেন আপনার দেখা কোন মানুষের মধ্যে )



                   মন্ত্রীমশাইয়ের কথা                                                    

                       ( ১৭ )


মন্ত্রীমশাইয়ের আসল নাম ছিল হারাধন বাগদি। লোকে বলত হারু বাগদি বা হারা বাগদি । আমার বাবা প্রয়াত প্রভাত কুসুম ঘোষ কিন্তু কোনদিন নাম ধরে ডাকতেন না। মন্ত্রী বলে সম্বোধন করতেন।উনি বাবাকে বলতেন রাজামশাই। কেন এত বৈচিত্রপূর্ণ  সম্বোধন তা অবশ্য আজ জানার উপায় নেই। তবে প্রতিদিন সন্ধ্যের পর আমাদের বাড়িতে অনেক লোক গল্প-গুজব করতে আসতেন।হয়তো সেটাই ছিল স্বঘোষিত রাজ দরবার। কারণ ওই আসরেই নিয়মিত অংশগ্রহণকারী আর একজন সেনাপতি হিসাবে পরিচিত ছিলেন। তার কথাও পরে একদিন আলোচিত হবে।

                                                    
                                             ছোটখাটো চেহেরার মানুষটির বাড়ি ছিল ময়ূরেশ্বরের ঢেকা গ্রামে । আমরা হারুদাদু বলে ডাকতাম। নিপাট ভালোমানুষ বলতে যা বোঝায় হারুদাদু ছিলেন তাই। যৎসামান্য জমি চাষ করে চলত তার সংসার। আমার বাবার খুব প্রিয়পাত্র ছিলেন হারুদাদু। কি শীত  , কি বর্ষা প্রতিদিন সন্ধ্যার পর বেড়াতে আসতেন আমাদের বাড়িতে। হাতে থাকত একটা টিমটিমে লন্ঠন আর লাঠি। কাঁদর পেরিয়ে আসতে হত আমাদের বাড়ি। বর্ষায় সেই কাঁদর ছাপিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত । তখন অনেক ঘুরে ঘুরে আল পগার ভেঙে ভেঙে আসতেন আমাদের বাড়ি।তবু আসার ছেদ ঘটে নি। জলজ্বালা নিয়েও এসেছেন বহুদিন।

                                          
                                                 বাড়ির বাইরে থেকেই হাঁক পাড়তেন -- ' কই গো ' বলে। আমরা ওই ডাকটার অপেক্ষাতেই থাকতাম।ছুটে গিয়ে দরজা খুলে দিতাম। দেখতাম তার হাতে কোনদিন রয়েছে আড়ায় ধরা মাছ , মাঠের সাদা কাঁকড়া , কচ্ছপ , শশা , বেগুন কিম্বা নতুন আখের গুড়। টানা রাত্রি ১০ টা পর্যন্ত চা-মুড়ি খেতে খেতে গল্প গুজব করতেন। মোটা মাছ - মাংস হলে সেসব দিনগুলোতে ভাত খেয়েও যেতেন। মা যাওয়ার সময় তারই আনা থলেতে ভরে দিতেন ঘরের গাছ পাকা কলা ,  গাছের পিয়ারা কিম্বা তারই আনা মাছের টক।


                                          এইভাবেই হারুদাদু যেন আমাদের পরিবারেরই একজন হয়ে উঠেছিলেন। সেই সময় অপেক্ষাকৃত তথাকথিত উচ্চবর্ণের বায়েন বাগদি সম্প্রদায়ের লোকেরা ছিলেন অচ্ছুৎ তথা জল অচল।কিন্তু আমাদের সেসব ছিল না। আমাদের বাড়িতে হারুদাদু একাসনেই খেতেন। তখন আমার বাবা নন্দীহাট প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। যেতে হত ঢেকা গ্রামের উপর দিয়েই।যাওয়া আসার পথে বাবা অনেকদিন হারুদাদুর বাড়িতে চা-মুড়ি খেতেন। আমি আর আমার ভাই নবান , ভাইফোঁটা , পালুনি প্রভৃতি অনুষ্ঠানে হারুদাদুর বাড়িতে গিয়েছি। হারুদাদুর পরিবারের লোকেরা তখন আমাদের পেয়ে আহ্লাদে আটখানা হয়েছেন।কোথায় বসাব , কি খাওয়াব তাই তখন তাদের ধ্যানজ্ঞান হয়ে উঠত। মামার বাড়ি ছাড়া ওইরকম সমাদর আর আমরা কোথাও পাই নি।


                                                 হারুদাদু অনেকদিন আগে আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছেন।কিন্তু রেখে গিয়েছেন নানা স্মৃতি। যখনই ছোটবেলায় ফিরি , তখন ফিরে আসে সেইসব স্মৃতি।মনের মণিকোঠায় হারুদাদু আজও আছেন , বড়ো বেশি করে আছেন। আজও যেন কানে বাজে তার সেই পরিচিত হাঁক--- কই গো ----। 


                     -----০----- 

                   শামা ঢেঙরের কথা  


                       ( ১৮ )



রোগা- পাতলা দীর্ঘদেহী  মানুষটির নাম ছিল শ্যামাপদ মুদি। লোকপাড়া আদিবাসী পাড়ায় ছিল তার বাড়ি। লোকে বলত শামা ঢেঙর বা শামা মিস্ত্রি। আসলে উনি দাদুর আমল থেকে আমাদের হাস্কিং মিল চালাতেন। সেই সুবাদে আমরা বলতাম মিস্ত্রিদাদু বা শ্যামদাদু।

                                        সে সময় আমিও দাদুর আঙুল ধরে ধরে মিলে যেতাম।শ্যামাদাদু একাই হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে বিশাল মেশিন স্টার্ট দিতেন। আমার কাজ ছিল মেশিন স্টার্ট হওয়ার সংগে সংগে ছুটে গিয়ে বাইরে পাম্পের চৌবাচ্চায়  জল পড়ছে কিনা দেখে এসে শ্যামাদাদুকে খবর দেওয়া।তার পারিশ্রমিক বাবদ শ্যামাদাদু কখনও আমাকে দুহাতের তালুতে ফু দিয়ে  দিয়ে পেষায় করা গরম চাল পরিস্কার করে দিতেন। কখনও বা লোকদের পেষাই করতে দিয়ে যাওয়া পাঁচ মিশেলি ছাতুর উপকরণ থেকে ছোলা , মটর প্রভৃতি কলাই বেছে বেছে দিতেন। 


                            তখন টিকটিকির ডিমের এক ধরণের লজেন্স খুব চালু ছিল। আমাদের মিলের অদুরেই লাহাদের দোকানে ১০ পয়সায় মিলত ১০ টা লজেন্স। কোন কোন দিন দাদুর কাছে এতবার পয়সা নিয়ে সেই লজেন্স খেতাম যে নিজেরই আর দাদুকে চাইতে কেমন বাধো বাধো ঠেকত।তখন গিয়ে চাইতাম শ্যামাদাদুর কাছে। বেশিরভাগ দিনই তিনি খুব অপ্রস্তুতে পড়ে যেতেন। কারণ তার পকেটে পয়সা থাকত না।  দিনের শেষে বেতন পেতেন। কিন্তু আমার তো তখন সেই বোধ ছিল না। আমার নিজের দাদুর থেকে ভিন্ন মনে করতাম না তাকে। তাই বোধহয় নিসংকোচে তার কাছেও পয়সা চাইতে পারতাম।


                             শ্যামাদাদু তখন দাদুর কাছে গিয়ে পয়সা চাইতেন। দিনের মাঝে শ্যামাদাদু পয়সা চাওয়ায় দাদু আমার দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে চাইতেন।তারপর শ্যামাদাদুকে জিজ্ঞেস করতেন -- কি করবি পয়সা ? শ্যামাদাদু বলতেন -- দরকার আছে , পরে আমার মাইনে থেকে কেটে নেবেন।দাদু আর কোন কথা না বলে তার হাতে আট আনা তুলে দিতেন। দাদুর আড়ালে হাতের ইশারায় আমাকে ডেকে  লাহাদের দোকানে নিয়ে যেতেন। তারপর আমাকে ১০ পয়সার লজেন্স কিনে দিয়ে নিজে বিড়ি দেশলাই কিনে ফিরতেন।

                              শ্যামাদাদু পড়াশোনা জানতেন না বললেই চলে। কিন্তু দীর্ঘ অভিজ্ঞতার সুবাদে কার্যত মেশিনের নাড়ী - নক্ষত্র তার জানা হয়ে গিয়েছিল। আওয়াজ শুনেই বলে দিতে পারতেন শুনেই কোথাই গলদ।ঘটনা এমনও ঘটেছে কলকাতা থেকে কোম্পানির পাশ করা মিস্ত্রি এসেও মেসিনের রোগ ধরতে পারেন নি , কিন্তু শ্যামাদাদু তার হাতুড়ে বিদ্যা দিয়েই মেশিন চালু করে দিয়েছেন। দাদুরা প্রায়ই বলাবলি করতেন , শ্যামাটা মদ না খেলে ওর ভাত ভুতে খেত। বাস্তবিকই প্রচণ্ড নেশা করতেন। একসময় চাষিদের পাম্প মেশিন মেরামত করে বেড়াতেন। কোন চাহিদা ছিল না। মদের পয়সাটুকু হলেই খুশি। 


                                               পরবর্তীকালে অন্যত্র আমি নিজে একটি হাস্কিং মিল করি। শ্যামাদাদু নিজে হাতে তার মেশিনপত্র বসান। প্রথমদিকে কিছুদিন চালাতেনও। আজ শ্যামাদাদু নেই , নেই দাদুর আমলের সেই হাস্কিং মিলটিও। কিন্তু শ্যামাদাদুর নিজে হাতে বসানো সেই মিলটি আজও আছে। সেই মিলটি শ্যামাদাদুর স্মৃতি বহন করে চলেছে।                                                

                                                  
                                                                                                           
                                                                                                 

            (  চলবে  ) 

     নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 

                শীঘ্রই আসছে 

       ধারাবাহিক নাটক ----                                 

                                                               

                                    

                      -----০----

No comments:

Post a Comment