অর্ঘ্য ঘোষ
( এই কলমে এমনই কিছু হারিয়ে যাওয়া মানুষের কথা ধারাবাহিক ভাবে তুলে ধরা হবে যারা নিতান্তই প্রান্তজীবি। বৃহত্তর সমাজে তাদের স্থান নেই বলেলেই চলে। তাদের জন্ম মৃত্যু এমনকি আসল নামও আজ সংগ্রহ করা কঠিন।তাদের পরিবারের লোকেরাও সে তথ্য ঠিকঠাক দিতে পারেন নি।প্রচলিত নামেই তারা আজও এলাকার কারও কারও মনে ধুসর স্মৃতি হয়ে রয়েছেন। স্মৃতির চাদর সরালেই অবয়বটা স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। আমার ছোটবেলায় দেখা মনের মণিকোঠায় ঠাঁই করে নেওয়া ওইসব চরিত্রের সঙ্গে আপনিও মিল খুঁজে পেতে পারেন আপনার দেখা কোন মানুষের মধ্যে )
তার পোশাকী ছিল গদাধর ভল্লা। সবাই তাকে গদা ভল্লা বলেই ডাকতেন। বিশেষ করে তার চা-তেলেভাজার দোকানটি গদা ভল্লার দোকান হিসাবেই পরিচিত ছিল। তার বাড়ি ছিল ময়ূরেশ্বরের রসুনপুর গ্রামে।কিন্তু দোকান ছিল লোকপাড়ায়। খুব ছোট বেলায় দেখেছি লোকপাড়া দলুইপাড়ায় এখন যেখানে বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্রের ঘরটি রয়েছে সেখানেই তখন রাম ডাক্তারের ডিসপেনসারি , লাইব্রেরী , ক্লাব ছিল। সেই সময় বাসস্ট্যান্ড ছিল সেখানেই। খান দুয়েক বাস চলাচল করত। একটি ছিল ব্যক্তি মালিকানার , অন্যটি সমাবায়ের।
সেই বাস ধরার জন্য ১৫/২০ টি গ্রামের মানুষজন আসতেন। আসতেন রোগী এবং তাদের পরিজনেরা। ক্লাব এবং বইপ্রেমী মানুষজনের ভীড়ে জায়গাটা জমজমাট হয়ে থাকত। তারই মাঝে ছিল তার চা-তেলেভাজার দোকান। সপরিবারে থাকতেনও দোকান লাগোয়া চালাঘরে।তার তেলেভাজার খুব সুখ্যাতি ছিল তখন। এখনও বয়স্কদের বলতে শুনি , ৫/১০ পয়সায় তার চপের সাইজ ছিল নাকি ঘুটের মতো। একটা খেলেই আর একটা খেতে ইচ্ছে করত। তার শরীরে ছিল দৈন্যতার ছাপ। কিন্তু মনটা ছিল খুব রসিক। ফেরিওয়ালাদের মতো মাল বিক্রির অছিলায় -- মজার মজার ছড়া আউড়াতেন। আবছা আবছা কিছুটা মনে আছে --- লে-লে বাবু টাটকা মাল , আজ না নিলে পাবি না কাল।
আমারও বেশ মনে আছে সেই দোকান , পিন খেঁজুরের গন্ধ , হুকে ঝোলানো ৫ পয়সার টিকিটের লুডো , টেলিফোন , পুতুলের লটারির সেই প্যাকেট। তার দুই ছেলে শিবু আর উত্তম ছিল আমাদের খেলার সাথী। সেই সুবাদে তাদের অন্দরমহলেও যাতায়াত ছিল আমার।যখনই যেতাম দেখতাম তিনি উনুনের সামনে কিছু না কিছু ভাজছেন। কখনও তার সামনে থাকত ভাজা ঝুরি , বাদাম কিম্বা তেলেভাজা। সবসময় কেনার মতো পয়সা থাকত না , তাই লোভাতুর চোখে চেয়ে থাকতাম সেগুলোর দিকে। ব্যাপারটা আন্দাজ করে তিনি হাতে তুলে দিতেন একমুঠো ঝুড়িভাজা কিম্বা বাদাম।
পরবর্তীকালে গ্রামের বাইরে দিয়ে তৈরি হয় পাকা সড়ক । ডিস্পেনসারি , লাইব্রেরী , ক্লাবও ঠিকানা বদলায়। বাসস্ট্যান্ডেরও ঠিকানা বদলে যায়। বিক্রিবাটা মার খাওয়ায় তিনি দোকান গুটিয়ে গ্রামে ফিরে যান। পরে অবশ্য ফের লোকপাড়া মোড়ে দোকান করেন।অর্থাভাবে সে দোকান অবশ্য বিক্রি হয়ে যায়। গদাধর ভল্লা নেই , কিন্তু লোকপাড়া মোড়ে তার বিক্রি হয়ে যাওয়া সেই দোকানটি আজও আছে। দীর্ঘদিনের অভ্যাস বশে এলাকার অনেকেই ভুল করে বলে থাকেন --গদা ভল্লার দোকান। দোকানটির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় আমারও মজাদার সেই মানুষটির কথা মনে পড়ে যায়।
-----০----
( ১৬ )
গদা ভল্লার কথা
( ১৫ )
তার পোশাকী ছিল গদাধর ভল্লা। সবাই তাকে গদা ভল্লা বলেই ডাকতেন। বিশেষ করে তার চা-তেলেভাজার দোকানটি গদা ভল্লার দোকান হিসাবেই পরিচিত ছিল। তার বাড়ি ছিল ময়ূরেশ্বরের রসুনপুর গ্রামে।কিন্তু দোকান ছিল লোকপাড়ায়। খুব ছোট বেলায় দেখেছি লোকপাড়া দলুইপাড়ায় এখন যেখানে বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্রের ঘরটি রয়েছে সেখানেই তখন রাম ডাক্তারের ডিসপেনসারি , লাইব্রেরী , ক্লাব ছিল। সেই সময় বাসস্ট্যান্ড ছিল সেখানেই। খান দুয়েক বাস চলাচল করত। একটি ছিল ব্যক্তি মালিকানার , অন্যটি সমাবায়ের।
সেই বাস ধরার জন্য ১৫/২০ টি গ্রামের মানুষজন আসতেন। আসতেন রোগী এবং তাদের পরিজনেরা। ক্লাব এবং বইপ্রেমী মানুষজনের ভীড়ে জায়গাটা জমজমাট হয়ে থাকত। তারই মাঝে ছিল তার চা-তেলেভাজার দোকান। সপরিবারে থাকতেনও দোকান লাগোয়া চালাঘরে।তার তেলেভাজার খুব সুখ্যাতি ছিল তখন। এখনও বয়স্কদের বলতে শুনি , ৫/১০ পয়সায় তার চপের সাইজ ছিল নাকি ঘুটের মতো। একটা খেলেই আর একটা খেতে ইচ্ছে করত। তার শরীরে ছিল দৈন্যতার ছাপ। কিন্তু মনটা ছিল খুব রসিক। ফেরিওয়ালাদের মতো মাল বিক্রির অছিলায় -- মজার মজার ছড়া আউড়াতেন। আবছা আবছা কিছুটা মনে আছে --- লে-লে বাবু টাটকা মাল , আজ না নিলে পাবি না কাল।
আমারও বেশ মনে আছে সেই দোকান , পিন খেঁজুরের গন্ধ , হুকে ঝোলানো ৫ পয়সার টিকিটের লুডো , টেলিফোন , পুতুলের লটারির সেই প্যাকেট। তার দুই ছেলে শিবু আর উত্তম ছিল আমাদের খেলার সাথী। সেই সুবাদে তাদের অন্দরমহলেও যাতায়াত ছিল আমার।যখনই যেতাম দেখতাম তিনি উনুনের সামনে কিছু না কিছু ভাজছেন। কখনও তার সামনে থাকত ভাজা ঝুরি , বাদাম কিম্বা তেলেভাজা। সবসময় কেনার মতো পয়সা থাকত না , তাই লোভাতুর চোখে চেয়ে থাকতাম সেগুলোর দিকে। ব্যাপারটা আন্দাজ করে তিনি হাতে তুলে দিতেন একমুঠো ঝুড়িভাজা কিম্বা বাদাম।
পরবর্তীকালে গ্রামের বাইরে দিয়ে তৈরি হয় পাকা সড়ক । ডিস্পেনসারি , লাইব্রেরী , ক্লাবও ঠিকানা বদলায়। বাসস্ট্যান্ডেরও ঠিকানা বদলে যায়। বিক্রিবাটা মার খাওয়ায় তিনি দোকান গুটিয়ে গ্রামে ফিরে যান। পরে অবশ্য ফের লোকপাড়া মোড়ে দোকান করেন।অর্থাভাবে সে দোকান অবশ্য বিক্রি হয়ে যায়। গদাধর ভল্লা নেই , কিন্তু লোকপাড়া মোড়ে তার বিক্রি হয়ে যাওয়া সেই দোকানটি আজও আছে। দীর্ঘদিনের অভ্যাস বশে এলাকার অনেকেই ভুল করে বলে থাকেন --গদা ভল্লার দোকান। দোকানটির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় আমারও মজাদার সেই মানুষটির কথা মনে পড়ে যায়।
-----০----
লাটা দাদুর কথা
( ১৬ )
লাটাদাদু ছিলেন আমার বাবার দুর সম্পর্কের মামা। বাড়ি ছিল ময়ূরেশ্বরের আমড়া গ্রামে। ঘর-সংসার করেন নি। বাবা-কাকাদের মুখে শুনেছি খুব বেপরোয়া আর ডান স্বভাবের ছিলেন নাকি তিনি। চোর - ডাকাতরাও নাকি তাকে ভয় পেত। তার স্বভাবের পরিবর্তন ঘটানোর জন্য আমার দাদু তাকে আমাদের হাস্কিং মিল চালানোর জন্য এনেছিলেন। সেই থেকে তিনি দীর্ঘদিন আমাদের বাড়িতেই ছিলেন।
চোর-ডাকাতদের কাছে তিনি ভীতিপ্রদ হলেও আমার সঙ্গে কিন্তু ছিল রীতিমতো সৌহার্দ্যের সম্পর্ক। বিশেষত তার সান্ধ্য মৎস শিকারের নিয়মিত সঙ্গী ছিলাম আমি ।মাছ ধরার চুড়ান্ত নেশা ছিল তার। কিন্তু কাজের চাপে দিনের বেলা সেই সুযোগ পেতেন না তাই সন্ধ্যে বেলায় বেড়াতেন মাছ ধরতে। মিলে থেকে ফিরে গুছিয়ে নিতেন কুড়োজালি ( মশারি ছেঁড়া আর জলে ভেসে থাকে এমন দুটো কাঠি দিয়ে তৈরি এক ধরণের জাল বিশেষ , ওই জালে মূলত চিংড়ি মাছ ধরা হয় ) আর আঁধারকাঠি ( ছোট ছিপ বিশেষ , টোপ গেঁথে পুকুরে পুঁতে দেওয়া হয়। মূলত শোল , বল , চ্যাং , ছিমুরী মাছ ধরা হয়)। মা লেবুর পাতা , সরষের খোল , ধানের কুঁড়ো ভেজে চার তৈরি করে দিতেন।
তারপর আমাকে ঘাড়ে তুলে একহাতে ওইসব সরঞ্জাম আর অন্যহাতে টিমটিমে হ্যারিকেন নিয়ে পৌঁচ্ছোতেন লইপুকুর , চৌধোরে কিম্বা চরপুকুরে।তারপর আমাকে পাড়ে বসিয়ে দিয়ে পুকুরে কুড়োজালি আর আঁধারকাঠি দিয়ে আসতেন। তারপর মাঝে মাঝে কৌটো নিয়ে গিয়ে মাছ নিয়ে আসতেন আর ফাঁকে ফাঁকে আমাকে গল্প বলতেন। সবদিন সমান মাছ পড়ত না।যেদিন বেশি মাছ পড়ত সেদিন তাকে খুশী মনে হত। আর কম হলে মুসড়ে পড়তেন যেন তার গাফিলতিতেই এমনটা হয়েছে।
বাড়ি ফিরে মাকে উদ্দেশ্য করে বলতেন , বৌ'মা আজ ভালো মাছ পড়ে নি মা।মা বলতেন, এক আধদিন না পড়াই ভালো। রোজ রোজ মাছ অরুচি ধরে গেল। লাটাদাদুর অবশ্য নিজের মাছের প্রতি খুব একটা লোভ ছিল না। আসলে অন্যকে খাইয়েই ছিল তার আনন্দ।কেউ তার ধরা মাছের প্রশংসা করলে অন্যরকম আলোয় ভরে যেত তার চোখ মুখ। আজ লাটাদাদু নেই , ওইসব পুকুর গুলো আছে। ওইসব পুকুরের পাশ দিয়ে গেলে লাটাদাদুর কথা মনে পড়ে।



No comments:
Post a Comment