Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

মনের মণিকোঠায় -- ৭ ধীরেন, শিবুডাইভার


মনের মণিকোঠায়                  



                                                      
                        

                                অর্ঘ্য ঘোষ


( এই কলমে এমনই কিছু হারিয়ে যাওয়া মানুষের কথা ধারাবাহিক ভাবে তুলে ধরা হবে যারা নিতান্তই প্রান্তজীবি। বৃহত্তর সমাজে তাদের স্থান নেই বলেলেই চলে। তাদের জন্ম মৃত্যু এমনকি আসল নামও আজ সংগ্রহ করা কঠিন।তাদের পরিবারের লোকেরাও সে তথ্য ঠিকঠাক দিতে পারেন নি।প্রচলিত নামেই তারা আজও এলাকার কারও কারও মনে ধুসর স্মৃতি হয়ে রয়েছেন। স্মৃতির চাদর সরালেই অবয়বটা স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। আমার ছোটবেলায় দেখা মনের মণিকোঠায় ঠাঁই করে নেওয়া ওইসব চরিত্রের সঙ্গে আপনিও মিল খুঁজে পেতে পারেন আপনার দেখা কোন মানুষের মধ্যে )


     

                ধীরেনদার কথা 


                              ( ১৩ )


হিসাব অনুযায়ী ধীরেনদাকে আমার কাকা বলাই উচিত ছিল। কারণ আমার বাবা-কাকাদের উনি দাদা বলে ডাকতেন।কিন্তু নৈকট্যের কারণে তিনি আমার মতো অনেকের কাছেই দাদা হয়ে উঠেছিলেন।তার আসল নাম ধীরেন মণ্ডল। বাড়ি ছিল ময়ূরেশ্বরের নবগ্রামে।বিবাহ সূত্রে পরবর্তীকালে থাকতেন ওই এলাকারই কুলিয়াড়া গ্রামে।

                                  এলাকার মানুষকে প্রথম উন্নত বিনোদনের স্বাদ দিয়েছিলেন তিনি। মূলত তারই উদ্যোগে লোকপাড়া স্কুলের ফুটবল ময়দান সংলগ্ন এলাকায় গড়ে উঠেছিল  'জয় টকিজ' নামে একটি সিনেমাহল। মা-কাকিমাদের সঙ্গে সেই হলে ' আমি সে ও সখা ' , হংসরাজ , ' অচেনা অতিথি ' , 'বিল্বমঙ্গল ' , ' সাথী হারা '   প্রভৃতি সিনেমা দেখার কথা আজও মনে পড়ে। পরবর্তী কালে আমার কাকু শিবপ্রসাদ ঘোষ , সতীনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়রাও ওই হলের অংশীদার হন। ১৯৭৮ সালের বন্যায় সেই সিনেমাহল ভেঙে যায়। তারপর আর কেউ এলাকার মানুষের বিনোদনের কথা ভেবে সিনেমা হল চালু করার কথা ভাবেন  নি।  

                                     সিনেমাহলের মালিক থাকাকালীণ ধীরেনদাকে আমার সিনেমা জগতের মতোই রহস্যময় জগতের মানুষ মনে হোত।কারণ সে সময় বাস , সিনেমাহলের মালিকদের একটু অন্যরকম চোখে দেখা হত। ধীরেনদার পরিকল্পনা ছিল অবশ্য বরাবরই বড়ো মাপের। পরবর্তীকালে তিনি ঢেকার রাজা রামজীবনের অক্ষয় কীর্তি রামসায়র , রানী ভবানী এবং বুড়োদীঘি নামে তিনটি বিশাল জলাশয় মুর্শিদাবাদের সোনারুন্দির রাজাদের কাছে থেকে দীর্ঘ মেয়াদী লিজ বন্দ্যোবস্ত নেন।

                             তারপর থেকেই ধীরেনদার সঙ্গে নৈকট্য শুরু হয় । তখন রামসায়র ছিল সাঁইথিয়ার মাছ ব্যবসায়ী মিহির বিশ্বাসের দখলে। তাই নিয়ে দু'পক্ষের বিরোধ বাঁধে।তখন ধীরেনদা আমাদের প্রতিবাদ ক্লাবের দ্বারস্থ হন। আমরা উভয় পক্ষকে নিয়ে একটা সুস্থ মীমাংসা করে দিই। সেই সুবাদেই উভয়পক্ষই ক্লাবকে স্বেচ্ছায় কিছু করে অর্থ সাহার্য্য করেন। আজ প্রতিবাদ ক্লাবের যে বিশাল ব্লিডিং তার গোঁড়াপত্তন হয়েছিল কিন্তু ধীরেনদাদের টাকাতেই। পরবর্তীকালে অন্যদুটি দীঘি বিক্রি হয়ে যায়।রামসায়রেরও অংশ বিক্রি হয়ে যায়। কিন্তু আজও রামসায়েরর ৪ আনা অংশের মালিক রয়েছেন হিসাবে নাম রয়েছে ধীরেনদার।

                                               এত বড়ো বড়ো পরিকল্পনা স্বত্বেও ধীরেনদার দিন কেটেছে চরম দৈন্যতার সঙ্গে লড়াই করে। একবার রামসায়র সহ অন্যান্য পুকুরগুলি  তৎকালীণ সি,পি,এম সরকার অন্যায়ভাবে ভেষ্ট ঘোষণা করে দখল নিয়ে নেয়। সেই দখল ফিরে পাওয়ার জন্য আইনী লড়াই করতে গিয়ে কার্যত দেনার দায়ে সর্বশান্ত হয়ে যান তিনি। পেটের দায়ে নানা উঞ্ছবৃত্তি পর্যন্ত করতে হয়েছে তাকে। তবু তার মুখে সব সময় লেগে থাকত এক অমলিন হাসি। কতজন সামান্য কিছু টাকার জন্য ধীরেনদাকে কত নির্দয়ভাবে অপমান করেছেন।অন্তরে হয়তো বোবা কান্না গুমরে মরেছে , কিন্তু গায়ে  মাখেন নি। হাসি দিয়েই উড়িয়ে দিয়েছেন।  সময় মতো টাকা দিতে না পারলে এই অপমান তো সইতেই হবে হয়তো নিজের মনকে বুঝিয়েছেন সেই কথা।

                                 
                                      তারই মাঝে একমাত্র ছেলেকে মানুষ করেছেন । ছেলে- বৌমা আজ প্রতিষ্ঠিত। বলতে গেলে এখন তার সুখের সংসার।কিন্তু সেই সুখ দেখে যাওয়া হয় নি ধীরেনদার। আজ ধীরেনদা নেই।কিন্তু তার মুখের সেই অমলিন হাসিটি যেন চোখের সামনে ভাসে। 


                                ---০---

                শিবু  ড্রাইভারের কথা                                    


                                     
                                ( ১৪ ) 


বছর পনেরো আগেও যারা লোকপাড়া- সাঁইথিয়া রুটে জয়তারা কিম্বা কলেশ্বনাথ বাসে যাতায়াত করেছেন তাদের কাছে শিবু ড্রাইভার এক পরিচিত নাম। তার আসল নাম শিবকিঙ্কর মিশ্র। বাড়ি ময়ূরেশ্বরের কুমারপুর গ্রামে। দীর্ঘদেহী মানুষটি প্রথম জীবনে ছিলেন সেনাবাহিনীর গাড়ির চালক। অবসর নেওয়ার পর ব্যক্তি মালিকানার বিভিন্ন গাড়ি চালাতেন।

                                                    খুব ছোটবেলায় মাঝে মধ্যে দাদুর সঙ্গে তার বাসে সাঁইথিয়া যেতাম।বসতাম কেবিনে। চেয়ে চেয়ে দেখতাম তার গাড়ি চালানো। আবছা মনে আছে সেসময় রেলব্রীজের উপর দিয়েই গাড়ি যাতায়াত করত। সম্ভবত গাড়ি দাঁড়াত নন্দীকেশ্বরী তলার কাছে। গাড়ি থামলে কলা কিনে আনতেন তিনি। তারপর পিছনে খোসা ঝুলিয়ে সেই কলা ছাড়িয়ে তুলে দিতেন হাতে।সাহস পেয়ে আমি একদিন বলেছিলাম - তোমার কি মজা ।একা এত বড়ো গাড়ি চালাচ্ছ। আমাকে একরাব  তোমার গাড়িটা চালাতে দেবে ? আমার কথা শুনে দাদু আর উনি দুজনেই হেসেছিলেন।কিন্তু সেদিনই  ফেরার পথে কোলে বসিয়ে উনি রেলব্রীজটা পার করেছিলেন।আর আমি তার হাতের উপর হাতে রেখে স্টিয়ারংটা নাড়াচাড়া করেছিলাম।চাপা গর্বও হয়েছিল।ভাবখানা ছিল যেন আমিই এতক্ষণ গাড়িটা চালিয়ে নিয়ে এলাম। আমি তখন নেহাতই খুব ছোট , তবু কেন জানি না সেদিনের সেই স্মৃতি কি করে আজও রয়ে গেল মনে।

                                              
                                        খুব ঠান্ডা মাথার ড্রাইভার ছিলেন শিবুদাদু। তার হাতে  নাকি কখনও অ্যাক্সিডেন্ট হয় নি। সবসময় খুব ধীরে একই গতিতে গাড়ি চালাতেন। তা নিয়ে সেই সময় একটা মজার কথা চালু ছিল। খুব লম্বা লম্বা পা ছিল তার। তাই পা রাখার সুবিধার জন্য অ্যাক্সিলেটারের কাছে একটা থান ইট রাখা থাকত। যাত্রীরা রসিকতা করে বলতেন , স্পীড কন্ট্রোলার , ওই ইটেই আটকে যাবে স্পিড। কেউ কেউ তাকে তাতানোর জন্য বলতেন , কাকা এবার ইটটা সরান , পিছনে গরুর গাড়ি আসছে , আগে নিয়ে নেবে কিন্তু। তিনি কানেও তুলতেন না সেসব কথা।আজ শিবু ড্রাইভার নেই , কিন্তু তাকে ঘিরে মজার ওই ঘটনার কথা মাঝে মধ্যেই আলোচিত হয়। 

                                                                       

                                                      

                 (  চলবে  )

                            

নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


     শীঘ্রই আসছে ----

সালিশি সভার রায়ে সর্বস্ব হারানো এক আদিবাসী তরুণীর ঘুরে দাঁড়ানোর , দাঁড় করানোর মর্মস্পর্শী কাহিনী অবলম্বনে ধারাবাহিক উপন্যাস --

                   


                                                                       

----০----                  

No comments:

Post a Comment