Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

সালিশির রায় --- ৮৪






              সালিশির রায়


                          

        

                                    অর্ঘ্য ঘোষ


          ( কিস্তি -- ৮৪)




কিন্তু ফের তাকে এক দমবন্ধ পরিস্থিতির সামনে পড়তে হয়। অঞ্জলি ভেবেছিল নতুন কিছু কাজ শুরু করার আগে কিছুদিন নিজেদের মতো করে কাটাবে। কিন্তু ওই পরিস্থিতির মোকাবিলায় ফের ব্যস্ততা বেড়ে যায় তার। ওই রকম একটা পরিস্থিতিতে যে তাকে পড়তে হতে পারে তার আঁচ সে আগেই পেয়েছিল। তাই মোকাবিলার পথ খুঁজে বের করতেও তাকে খুব একটা বেগ পেতে হয় না। সর্বোপরি আলাপন তার পাশে রয়েছে। এই ভাবনাটাই তাকে অন্যান্য কাজের মতোই এ ব্যাপারেও প্রেরণা যোগায়। একটানা কাজের পর সেদিন সবাইকে একটু আলসেমিতে পেয়ে বসেছিল। বিমলবাবু দিন কয়েকের জন্য ছুটি নিয়ে কোথাই যেন আত্মীয় বাড়ি গিয়েছেন। সমন্বয় মঞ্চের উঠোনে রোদে শতরঞ্চি বিছিয়ে সঞ্চিতারা যে যার মতো কাজ করেছে। সে আর আলাপন অফিসঘরে মুখোমুখি বসে গল্প করছিল। আলাপনের গলায় অনুযোগের সুর -- হাজারো কাজের মাঝে  তুমি তো দেখছি আমাকেও ভুলতে বসেছো। অঞ্জলিও জানে কথাটা মিথ্যা নয়। সত্যিই তো কাজের চাপ তাদের ব্যক্তিগত জীবনের শখ আহ্লাদ অনেকখানিই কেড়ে নিয়েছে। এনিয়ে তার নিজেরও অনেক আকাঙ্ক্ষা - আক্ষেপরয়েছে। কিন্তু এই আকাঙ্ক্ষা - আক্ষেপ তো শুধু তাদের দু'জনেরই নয়।বহু বিখ্যাত মানুষের জীবনী পড়ে সে জেনেছে কাজের জন্য তাদেরও ব্যক্তিগত জীবন ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। সে অবশ্য ওইসব বিখ্যাত মানুষ এবং তাদের কাজের সঙ্গে নিজের তুলনা করার স্পর্ধা রাখে না।কিন্তু সান্ত্বনা খোঁজার চেষ্টা করে। মনে মনে ভাবে তাদের মতো অত বিখ্যাত বিখ্যাত মানুষ যদি হাসি মুখে নিজেদের মুল্যবান ব্যক্তিজীবন উপেক্ষা করতে পারেন তাহলে তার মতো সমাজছুট হয়ে যাওয়া মেয়ের ব্যক্তিজীবনের কিই'বা দাম আছে ? ভাবনাটা আলাপনের সঙ্গে শেয়ার করার কথা ভাবে সে। কিন্তু সে কথা আর বলা হয় না তার। হঠাৎ মালতি ছুটে এসে বাথরুমে ঢুকে যায়। বাইরে থেকেই অঞ্জলি শুনতে পায় মালতি ওয়াক - ওয়াক করে বমির চেষ্টা করেই চলেছে। আর তা শুনেই ভ্রু কুঁচকে যায় অঞ্জলির। পেটের গন্ডগোল হল নাকি মেয়েটার? পেটের আর দোষ কি ? এখানে আসার পর থেকে তেঁতুলের আচার, কুল , কয়েতবেল, আমড়া কিছু তো আর বাদ নেই। তাই বাথরুম থেকে বেরোতেই মালতিকে ধরে সে জিজ্ঞেস করে -- হ্যা রে উল্টো পাল্টা কিছু খেয়েছিলি নাকি ?  ওষুধ আনাব ?



                                মালতি বলে , না না সেরকম কিছু নয়। তারপর কেমন যে এড়িয়ে যায় তাকে। অঞ্জলির কেমন যেন খটকা লাগে। আবার ভাবে আলাপনের সামনে পেট খারাপের কথা বলতে লজ্জা করছে বলেই হয়তো ওইভাবে এড়িয়ে গেল মালতি। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তার ভুল ভেঙে যায়। ফের ওয়াক ওয়াক করতে করতে বাথরুমে ঢোকে মালতি। তার চোখমুখের অবস্থা দেখে এবার অঞ্জলির অন্যরকম সন্দেহ হয়।
সে আলাপনকে বলে, তুমি একটু বাইরে যাও তো।
---- সে কি, কেন ?
---- আরে যাও না, পরে বলছি বলে একরকম জোর করে আলাপনকে ঠেলে ঘরের বাইরে পাঠিয়ে দেয় অঞ্জলি।
তারপর মালতিও বাথরুম থেকে বেরিয়ে বাইরে যাওয়ার উপক্রম করতেই তার হাত ধরে আটকায় সে।
তারপর সরাসরি তার চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করে -- তোর চোখ মুখে এত চোর চোর ভাব কেন রে ? কি হয়েছে বলতো ?
প্রশ্নটা কানে যেতেই মালতি দ্রুত চোখ সরিয়ে নিয়ে বলে --- কি আবার হবে ?  কিছুই হয়নি। তোমার ওই রকম মনে হচ্ছে।
---- আমার চোখকে ফাঁকি দিবি তুই ? কই আমার মাথায় হাত রেখে দিব্যি কেটে বলতো দেখি কিছু হয়নি। বলেই অঞ্জলি মালতির হাতটা নিজের মাথায় চেপে ধরে।
এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না মালতি। অঞ্জলিকে জড়িয়ে ধরে সে কান্নায় ভেঙে পড়ে। কোন কথা বলতে পারে না। কথা বলতে গেলেই গলা বুজে আসে তার। বেশ কিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, আমি নিজের সর্বনাশ বাঁধিয়ে বসে আছি গো দিদি। তোমার বিশ্বাসের অমর্যাদা করেছি। কিন্তু তোমার পায়ে ধরছি,  আমাকে তুমি তাড়িয়ে দিও না। তাহলে যে আমার গলায় দড়ি দেওয়া ছাড়া কিছু উপায় থাকবে না। বলে সত্যি সত্যি অঞ্জলির পা জড়িয়ে ধরে সে। 


                                            কথাটা শুনেই চাঁ করে মাথায় যেন বিদ্যুৎ খেলে যায়। খুব রাগ হয়ে যায় তার। আবার পরক্ষণে খুব মায়াও হয়। সব হারানোরা তো এভাবেই খড়কুটো আঁকড়ে জীবনের স্বাদ পেতে চায়। সম্বিৎ ফিরতেই দেখে তখনও পা জড়িয়ে ব্যাকুল দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে চেয়ে রয়েছে মালতি। অঞ্জলি তাকে তুলে ধরে এনে চেয়ারে বসায়। তারপর সে মুখোমুখি চেয়ারে বসে জিজ্ঞেস করে --- ঘটনাটা কার সঙ্গে ঘটল ?
প্রশ্ন শুনেই মুখ ফ্যাকাসে হয়ে যায় মালতির। সে কোন জবাব দিতে পারে না। অস্বস্তি ঢাকতে পায়ের উপর পা ঘষেই চলে। তখন অঞ্জলি কিছুটা রুষ্ট হয়ে পড়ে। কড়া গলায় বলে ,  কার সঙ্গে ঘটনা ঘটেছে সে আন্দাজ আমার আছে। কিন্তু তার নামটা ং তোর মুখ থেকেই শুনতে চায়। সেক্ষেত্রে সমস্যার একটা সমাধান হতে পারে। অন্যথায় তোকে সমন্বয় মঞ্চ ছেড়ে চলে যেতে হবে।
শেষ পর্যন্ত মুখ খোলে মালতি। খুব অনুনয় ভরা গলায় সে বলে , তুমি ওকে কিছু বলবে না বলো, তোমাকে ও খুব ভয় পায়। তাছাড়া দোষ তো ওর একার নয়। আমার প্রশ্রয় না থাকলে এমনটা ঘটত না। আমিও নিজেকে সংযত রাখতে পারি নি।
অঞ্জলি বলে, খুব হয়েছে আর ব্যাখা শুনতে চায় না,  তার নামটা বল এবার।
মালতি খুব চাপা গলায় বলে , দিদি সে তোমার ছোটভাই দুলাল।
নামটা বলেই মালতি ভয়ে ভয়ে তার মুখের দিকে তাকায়। সে ভেবেছিল কথাটা শুনে অঞ্জলির মনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হবে। কিন্তু সে একটুকুও অবাক হয় না। কাজের ফাঁকে ফাঁকে ওদের মেলামেশা তার চোখ এড়ায় নি। আজ আরও কয়েকটি রহস্যের পর্দা উন্মোচন করবে সে। কিন্তু এই দুটিতে যে তলায় তলায় বিপদ বাঁধিয়ে বসে থাকবে তা ভাবতেও পারে নি অঞ্জলি। কথাটা পাঁচ কান হয়ে বদনাম হওয়ার আগেই তার গোঁড়া মেরে দিতে চায় সে। তাই দুলালকে ঘরে ডেকে পাঠায়।দুলালও বোধহয় ব্যাপারটা আন্দাজ করেছিল। তাই সেও অপরাধীর মতো মুখ করে মাথা নিচু করে তার সামনে এসে দাঁড়ায়।
অঞ্জলি বলে , এই মুখ তুলে তাকা আমার দিকে। বল, তুই কি মালতিকে ভালোবাসিস ?
তবু মুখ তুলে তাকাতে পারে না দুলাল। তার মুখেও কোন কথা সরে না।
তাই অঞ্জলিই ফের বলে ওঠে --  আমি মনে করি ভালোবাসাটা কোন অন্যায় নয়। আর ভালোবাসার মানুষের মধ্যে দেওয়া - নেওয়া হতেই পারে। কিন্তু সেটা স্বীকার করার মতো সৎসাহস না থাকাটা কাপুরুষতা। আর স্বীকৃতি না দেওয়াটা শুধু অন্যায়ই নয় , চুড়ান্ত অপরাধও।



এবারে মুখ তোলে দুলাল।সেও অঞ্জলির পা জড়িয়ে ধরে বলে , দিদি তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও। দুর্বল মুহুর্তে নিজেকে সংযত রাখতে পারি নি। কিন্তু বিশ্বাস করো আমি সত্যিই ওকে খুব ভালোবাসি।
--- আর তুই ? মালতির দিকে ফিরে প্রশ্নটা করে অঞ্জলি।
---- দিদি , আমিও ওকে প্রানের চেয়ে বেশি  ভালোবেসে ফেলেছি।
---- বেশ তোমরা এখন যাও, কি করা যায় দেখছি। সঞ্চিতা আর দাদাকে একবার পাঠিয়ে দাও।
কিছুক্ষণ পরেই দাদা আর সঞ্চিতা ঘরে ঢোকে। তাদের মুখ দেখেই অঞ্জলির মনে হয় কোন
পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে চলেছে  , সেই আঁচ যেন তারা ইতিমধ্যেই পেয়ে গিয়েছে।
তাই কোন রকম ভনিতা না করেই সে সরাসরি জিজ্ঞেস করে -- তোরা কি পরস্পরকে ভালোবাসিস ? বিয়ে করতে প্রস্তুত ?
দুজনেই ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানায়।
তবু অঞ্জলি ফের বলে , দুজনে দুজনের অতীতের কথা জানো ?
এবারে দুজনে একসঙ্গে মুখ খোলে -- অতীত নিয়ে আমাদের আগ্রহ নেই। আমরা ভবিষতের দিকে তাকিয়ে বর্তমানকে আশ্রয় করে বেঁচে থাকতে চায়।
--- বাঃ, খুব ভালো কথা। এবার তোমরা গিয়ে প্রতিমা আর রঞ্জিতকে একবার ঘরে আসতে বলো।
রঞ্জিত আর প্রতিমার ক্ষেত্রে  ব্যাপারটা একটু অন্যরকম মনে হয় অঞ্জলির।আগের দুটি ক্ষেত্রেই দু'পক্ষের হয়ে কথা বলার এক্তিয়ার থাকলে রঞ্জিতের বাবা-মার কথা তাকে মাথায় রাখতে হয়। তাই সে রঞ্জিতকে জিজ্ঞেস করে -- তোদের ব্যাপারটা বাড়ির সবাই জানে ?
রঞ্জিত ঘাড় নেড়ে জানায় , আমার বাবা-মা আগেই বিয়েতে সম্মতি দিয়েছে।কিন্তু তোমাকে ভয়ে বলতে পারি নি দিদি।
---- কেন দিদি বাঘ না ভালুক ? বলে রঞ্জিতের মাথার চুলগুলো এলোমেলো করে দেয়। তারপর বলে, যা দেখি এবার তোদের আলাপনবাবুকে পাঠিয়ে দে।
কিছুক্ষণের মধ্যে দরজার সামনে এসে দাঁড়ায় আলাপন। সেখান থেকেই সে বলে, এতক্ষণ তো সবাই জোড়ায় জোড়ায় ইন্টারভিউ দিতে ঢুকছিল ? আমি কাকে নিয়ে ঢুকব ?
অঞ্জলি দরজার বাইরে গিয়ে আলাপনের হাত ধরে ঘরের  ভিতের আসতে আসতে বলে -- তুমি আমাকে নিয়ে ঢুকবে মশাই।
আলাপন গেয়ে ওঠে --- "হাত ধরে তুমি নিয়ে চলো সখা, আমি যে গো পথ চিনি না "

     


         

               ( ক্রমশ )




        নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


                   শীঘ্রই আসছে 

           ধারাবাহিক নাটক ----                                 

                                                               


                                    

                -----০----- 

   
       

No comments:

Post a Comment