আজকের নাটক
নেতাবাবুদের অফিস ঘরে
বন্দী নারীর ইজ্জত
মনের ভিতর গুমরে কাঁদে মর্মযন্ত্রণা
তাইতো খুঁজছি সবাই নয়া সমাজের
‘ আলোর ঠিকানা ’
রচনা :- অর্ঘ্য ঘোষ
-: নাট্যকারের নিবেদন :-
কিছু কল্পনা , কিছু বাস্তব । ছোটো ছোটো ঘটনা একএিত করে রচিত হয়েছে ‘ আলোর ঠিকানা’। নাটকে ব্যাবহৃত কোন ঘটনা, কোন চরিত্র যদি বাস্তবের সঙ্গে মিলে যায় তাহলে তাহবে কাকতালীয় ব্যাপার। কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য কোন চরি্ত্র নির্মাণ করা হয়নি।তবুও যদি কেউ আঘাত পান তা হলে দুঃখিত।নাটকের প্রয়োজনে কিছু কবি,
গীতিকারের কবিতা এবং গান ব্যাবহার করা হয়েছে। অপপ্রয়োগ হয়ে থাকলে ক্ষমা প্রার্থী। নমস্কার।
গীতিকারের কবিতা এবং গান ব্যাবহার করা হয়েছে। অপপ্রয়োগ হয়ে থাকলে ক্ষমা প্রার্থী। নমস্কার।
পাত্র-পাত্রী পরিচিতি
১।কৃষ্ণধন – প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা।বয়স ৫০/৫৫ ।পরনে ধুতি পাজামী। কাঁধে ঝোলা।
২।হরিসাধন- কৃষ্ণধনের সঙ্গী।বয়স ৪০/৫০।পরনে ধুতি ফতুয়া। পাকা চুল-গোফ। চোখে দড়ি দিয়ে বাঁধা ডাঁট ভাঙা চশমা ।.
৩।প্রলয়- ঠিকাদার।বয়স ৪০/৫০।সব সময় কেতাদুরস্ত ।
.৪।বিপুল – সমাজসেবী যুবক।বয়স ৩৫/৪০।পরনে কখনো খদ্দরের পাজামা পাঞ্জামী , কখনও প্যান্ট শার্ট।কাঁধে ঝোলা।
৫।মৃত্যুঞ্জয়- বিপুলের বাবা।বয়স ৬০/৬৫।পরনে ধুতি পাঞ্জামী।
৬।পরমেশ – অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক।বয়স ৬২/৬৫।পরনে ধুতি পাঞ্জামী।চোখে চশমা।কাঁধে ঝোলা।
.৭।স্পন্দন - বিপথগামী যুবক।বয়স ৩০/৩৫।পরনে রঙ চটা জামা প্যান্ট।
৮।ওসমান – রিস্কাচালক।বয়স ৪০/৪৫।পরনে লুঙ্গি জামা।কোমরে গামছা।
৯।দৃপ্ত - সাংবাদিক।বয়স ৩০/৩৫।পরনে কখনও জামা প্যান্ট।কখনও খদ্দরের পাজামা পাঞ্জাবী।কাঁধে কখনও ঝোলা,কখনও ক্যামেরা।
১০।অর্পণ রায় – বি.ডি.ও।বয়স ৩৫/৪০।পরনে কোট প্যান্ট টাই।চোখে চশমা।
১১।রাজেশ চক্রবতী – পুলিশ অফিসার।বয়স ৪০/৪২।পরনে পুলিশের পোশাক।
১২।রামদীন- কনেষ্টবল।বয়স ৫৫/৫৮।পরনে কনেষ্টবলের পোশাক।হাতে লাঠি ।
১৩।কালিরাম শর্মা – বৃদ্ধ বিহারী।বয়স ৬৫/৭০।পরনে খাটো ধুতি ফতুয়া।পাকা গোঁফ,পাকা চুল,লম্বা টিকি।ঘন ঘন খৈনী টেপার অভ্যাস।
১৪। ভবতারন- দুঃস্থ ব্যাক্তি।বয়স ৬০/৬৫।পরনে কখনও ধুতি, হাফ হাতওয়ালা গেঞ্জি । কখনও ধুতি-ফুলশার্ট।
১৫। ক্ষান্তমণি - ভবতারনের স্ত্রী।বয়স ৫৫/৬০।পরনে মানান সই ব্লাউজ শাড়ি।
১৬। সুচরিতা – ভবতারনের বাপ- মা মরা ভাগ্নী।বয়স ২৫/৩০।পরনে কখনও শাড়ী ব্লাউজ।কখনও সালোয়ার কামিজ।
১৭। ৫ /৭ জন ছাত্রছাত্রী।
আলোর ঠিকানা
প্রথম দৃশ্য
স্থান-ভবতারনের বাড়ি।সময়-সকাল । চেয়ারে বসে কাগজ পড়ছেন ভবতারন।টুকটাক কাজ করছেন ক্ষান্তমণি।
ক্ষান্ত-বাড়িতে রাজ্যের কাজ পড়ে রয়েছে।আর নবাবের বেটি বেরিয়েছেন পাড়ায় পাড়ায় দেশোদ্ধার করতে।আসুক আজ বাড়ি।ঝেঁটিয়ে বিষ ঝেড়ে দেব।
ভব- আঃ ক্ষান্ত একটু শান্ত হও।বুঝতে চেষ্টা কর।একে বাবা মা মরা মেয়ে।তার উপর ওর কোন শখ -আহ্লাদ তো আমরা মেটাতে পারি না।কিছু একটা নিয়ে থাকতে হবে তো ওকে।
ক্ষান্ত – তোমার আশকারা পেয়েই দিন দিন ও মাথায় উঠেছে।টো-টো করে পাড়া বেড়াচ্ছে ,আর দুবেলা গণ্ডেপিণ্ডে গিলছে।
ভব- খেতে কি ওকে তুমি শুধু শুধু দাও ক্ষান্ত ? জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ , কোন কাজটা না তুমি ওকে দিয়ে করিয়ে নাও শুনি ? তাছাড়া ওর মায়ের গয়না-টাকা তো তুমি আলমারী বন্দী করে রেখেছো।
ক্ষান্ত - থাক , আর গুণবতী ভাগ্নীর গুণকীর্তন করতে হবে না।
( নেপথ্যে মামা - মামা বলে ছুটতে ছুটতে সুচরিতার প্রবেশ )
সুচরিতা – জান মামা ,আগামী কাল থেকেই আমাদের পাড়ায় নাইট স্কুল চালু হবে। আমাকেও বাচ্চাদের পড়াতে হবে।বিপুলদা বলছে প্রতিটি শিশুকে শিক্ষার আওতায় আনতে হবে।
ক্ষান্ত- তাহলেই তো দেশোদ্ধারের ষোল-কলা পূর্ণ হয়।ওই এক জুটেছে অকম্মার ঢেঁকি বিপুল।নিজের কোন কাজ নেই।মেয়েটা কে নাচাচ্ছে।
ভব- আঃ হচ্ছেটা কি ? কাকে ছেড়ে কাকে ধরলে।নিজের বাড়ির বিনা পয়সার ঝিকে যা খুশী বল , কিন্তু পরের ছেলেকে টানা কেন ?
ক্ষান্ত- তুমি থাম তো ।তা ও আবাগীর বেটী ,পাড়া বেরিয়ে দেশোদ্ধার করে আসা তো হল । বলি , বাড়ির কাজগুলো করবে কে শুনি ? তোর মরা মা-বাপ ? ছেলেমেয়েগুলো স্কুলে যাবে , ১০ টার মধ্যে ভাত চায় , কলতলায় বাসনপত্র- জামাকাপড় পড়ে রয়েছে। গোয়ালে পড়ে রয়েছ গুচ্ছের গোবর , এসব কখন সামলানো হবে শুনি ?
ভব- তোমার ছেলেমেয়েগুলোকেও তো একটু হাত লাগাতে বলতে পার ।
ক্ষান্ত-কি , পাড়াশোনা ছেড়ে আমার ছেলেমেয়েরা যাবে ওইসব কাজ করতে ?
ভব- যা সব এক একখানা বিদ্যার জাহাজ । দু তিন বছরের কমে এক ক্লাসের চৌকাঠ ডিঙোতে পারে না।
ক্ষান্ত- তুমি থামবে ? হতছাড়িও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মামার আদিখ্যেতা শুনছে । সব কাজ যেন আধ ঘণ্টার মধ্যেই সারা হয় ।
নাহলে নাইট স্কুলে দিদিমনিগিরি করা ঘুচিয়ে দেবে এই বলে দিলাম হ্যা ।
(প্রস্থান)
ভব- চল মা , মামা ভাগ্নী মিলে হাতে হাতে কাজগুলো সেরে ফেলি। না হলে আবার ক্ষান্তমণি বিষবাণ ছুড়তে ক্ষান্ত হবে না।
সুচরিতা – কি যে বলো না মামা , ওই তো মোটে ক'টা কাজ । তাতে আবার তোমাকে হাত লাগাতে হবে ? ও আমি ঠিক আধঘণ্টার মধ্যেই সেরে ফেলবো দেখো।তাছাড়া কাজ করতে তো আমার ভালোই লাগে , কোন কষ্ট হয় না।
ভব- বুঝিরে মা , সবই বুঝি । পাছে আমার কষ্ট হয় , তোর সঙ্গে হাত লাগাতে দেখে মামী আমাকে বকাবকি করে এই ভয়েই তো তুই আমাকে নিরস্ত করছিস ।
সুচরিতা – তুমি সব বোঝ । সত্যি বলছি কাজ করতে আমার ভালোই লাগে।
ভব- ভালো লাগে না ? দেখিস ভগবান ঠিক মুখ তুলে চাইবেন । একদিন তুই সুখি হবি ।
( ভাগ্নীকে বুকে টেনে মাথায় হাত বুলাতে থাকে )
সুচরিতা- মামা , আমি কিন্তু নাইট স্কুলে পড়াব । তাতে তোমার কোন অমত নেই তো ?
ভব- শিক্ষাই একমাত্র মানুষকে প্রকৃত মানুষ করে । তুই সেই শিক্ষাদানের ব্রত নিয়েছিস তাতে কি আমার অমত থাকতে পারে ? তবে তোর মামীর কথা ভেবে ভয় পাচ্ছি ।
সুচরিতা- ছাড়ো তো । মামীর মুখ ঝামটা আমার সহ্য হয়ে গেছে।
ভব-সে তো দেখতে পাচ্ছি , সেই যে কথাই আছে না -
সুচরিতা- কানে দিয়েছি তুলো পিঠে বেঁধেছি কুলো ( হাসি)। যাই কাজ গুলো চটপট সেরে ফেলি । নাহলে ক্ষান্তদেবী আবার অশান্ত হয়ে উঠবেন ( ছুটতে ছুটতে প্রস্থান )।
ভব- ভগবান আমার অক্ষমতা ক্ষমা কর । মৃত্যুশয্যায় মেয়েটাকে আমার হাতে তুলে দিয়ে ছিল একমাত্র বোন। বলেছিল , দাদা ওকে নিজের মেয়ের মতোই মানুষ কোর।
ওকে আমিও কথা দিয়েছিলাম।কিন্তু সেই কথা আমি রাখতে পারিনি। ক্ষান্তর চাপে স্কুল ছাড়িয়ে দিয়েছিলাম।তবু নিজের চেষ্টায় রবীন্দ্র মুক্তবিদ্যালয় থেকে ভালো রেজাল্ট নিয়ে মাধ্যমিক পাশ করছে হতভাগী।
( লাঠি ঠুঁকতে ঠুঁকতে হরিসাধনের প্রবেশ )
হরি-বলি যার সরষে তার ত্যাল দেখছ বৃথা ফ্যাল ফ্যাল , ভবতারন আছ নাকি হে ?
ভব- আসুন আসুন হরিসাধনবাবু যে , সকালবেলায় কি মনে করে ?
হরি - বলি যার সরষে তার ত্যাল দেখছ বৃথা ফ্যাল ফ্যাল, শুনলাম আগামি কাল থেকে নাকি আলোর ঠিকানা ক্লাবের ছেলেরা পাড়ায় নাইট স্কুল চালু করছে ? তোমার ভাগ্নীও নাকি পড়াবে ?
ভব- এইমাত্র সুচির সুখে আমিও শুনলাম । খুব ভালো হবে পাড়ার ছেলেমেয়েগুলো শিক্ষার আলো পাবে।
হরি- যার সরষে......... ফ্যাল ফ্যাল । কচু ভালো হবে ।
ভব- খারাপটা কি দেখলেন ? শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছেলেমেয়েরা শিক্ষা অভিমুখী হবে এর চেয়ে ভাল আর কি হতে পারে ?
হরি- যার সরষে................ ফ্যাল ফ্যাল , বলি সবাই যদি শিক্ষা অভিমুখী হয়ে পড়ে তা হলে বাড়িতে আর ঝি চাকর , রাখাল বাগাল মিলবে ?
( হাততালি দিতে দিতে পরমেশের প্রবেশ )
পরমেশ- বাঃ চমৎকার যুক্তি। নিজেদের স্বার্থপুরণের জন্য হতদরিদ্র পরিবারের শিশুদের অশিক্ষার অন্ধকারে রেখে দেওয়ার কি অপূর্ব ব্যখ্যা।
হরি- যার সরষে ... ফ্যাল ফ্যাল । তাছাড়া পাটির নেতারাও বিষয়টি ভালো চোখে দেখবেন না।
পরমেশ-পাটির নেতাদের বলে দেবেন অন্ধ হলে প্রলয় বন্ধ থাকে না।
বঞ্চিত , শোষিত , নিপীড়িত মানুষের সন্তানরা একদিন ঠিক আদায় করে নেবে তাদের শিক্ষার অধিকার।
( প্রস্থান )
হরি- যার সরষে ... ফ্যাল ফ্যাল। ব্যাটা ঢ্যামনা সাপ। বিষ নেই , ছোবল দেওয়ার ইচ্ছা ।বলি কি ভবতারন , কি দরকার বাপু তোমার ভাগ্নীর ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর ওইসব কাজ করে বেড়ানোর ?
ভব-ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর কাজ ?
হরি- যার সরষে ............ফ্যাল ফ্যাল। নয়তো কি ? তাছাড়া সোমত্ত মেয়ে ।রাতের বেলা গুচ্ছের অপগন্ডের সঙ্গেঁ ওই সব করতে গিয়ে ভালো মন্দ যদি একটা কিছু ঘটে যায় ?
ভব- কি করব বলুন ? বহু চেষ্টা করেও বাপ-মা মরা ভাগ্নীটা কোন কাজকর্ম পেল না। এদিকে যতক্ষণ বাড়িতে থাকে মামীর বিষ বাণে জর্জরিত হয়। তাই কিছু একটা কাজের মধ্যে থাকলে ভালো থাকবে ভেবেই মত দিয়েছি।
হরি - যার সরষে...............ফ্যাল ফ্যাল।একে তুমি কাজ বলছ ? ঠিক মত জায়গায় ধরা-করা না করলে এ যুগে কি কোন কাজ হয় ?
ভব - আমরা আর কোথাই ধরা-করা করব বলুন ? কে'ই বা আছে আমাদের ?
হরি- ওই দেখ।যার সরষে----- ফ্যাল ফ্যাল।আমরা থাকতে তোমর ভাগ্নীর কাজের চিন্তা কি হে ?
সে আমাদের দলের নেতা কৃষ্ণধনবাবুকে বলে একটা অঙ্গনওয়াড়ীর কাজ ম্যানেজ করে দেব ক্ষণ।
ভব - আপনি সত্যি বলছেন ?
হরি - মহা মুসকিল , যার সরষে…………ফ্যাল ফ্যাল।সত্যি বই মিথ্যা বলব কেন ? আমাদের কথা মত চললে অঙ্গনওয়াড়ীর কাজ হবেই হবে। এই আমি তিন সত্যি করলাম।
ভব- সত্যি আপনি আমাকে ভার মুক্ত করলেন।
হরি - কার ভার কে মুক্ত করে ? সবই তারই তরে। যার সরষে.........ফ্যাল ফ্যাল।তাহলে ওই কথায় রইল। ঠিক সময়ে তোমার ভাগ্নীকে কৃষ্ণধনবাবুর অফিসে ডেকে পাঠাব।
( প্রস্থান )
ভব - ঠাকুর আমার বাপ-মা মরা ভাগ্নীটার দিকে মুখ তুলে চাও।ওর কষ্ট যে আর আমি দেখতে পারছি না ঠাকুর।
( পর্দা নেমে আসে )
নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন



বা দাদা, দারুণ তো
ReplyDeleteশুরুটা ভালো হয়েছে। নাটক যত এগোবে তত জমবে বলে মনে হচ্ছে। তবে "যার সর্ষে তার ত্যাল....." কথটা বারবার ব্যবহার না করে অন্য প্রবাদও মাঝে মধ্যে ব্যবহার করুন। আরও ভালো লাগবে।যদিও এটা আমার একান্ত ব্যক্তিগত মতামত।
ReplyDelete